📄 স্রষ্টার একত্বই যৌক্তিক
বহু ঈশ্বরের অস্তিত্ব অযৌক্তিক নয় বলে যুক্তি দেন বহু ঈশ্বরবাদীরা। তাদের এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তি পেশ করা যায় যে, বিশ্ব-জগতের যদি একাধিক ঈশ্বর থাকতো, তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো। প্রত্যেক ঈশ্বরই অন্য ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের ইচ্ছাকে কার্যকর করতে চাইতেন। এ বিষয়ের প্রতিক্রিয়া ও প্রমাণ মেলে বহু ঈশ্বরবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী ধর্মীয় উপাখ্যানগুলোতে। যদি এক ঈশ্বর অন্য ঈশ্বরের নিকট পরাজিত হন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে অক্ষম হন, তাহলে তিনি 'ঈশ্বর' হওয়ার যোগ্য হতে পারেন না। ফলে তিনি প্রকৃত ঈশ্বরও হতে পারেন না। বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে বহু ঈশ্বরের ধারণা অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ সেখানে বিভিন্ন ঈশ্বরের বিভিন্ন দায়িত্ব। যেমন— সূর্যদেবতা, বৃষ্টির দেবতা ইত্যাদি। তাদের প্রত্যেকে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন ঈশ্বর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এ বর্ণনা একথার ইঙ্গিত দেয় যে, এসব ঈশ্বরের কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো কাজের এককভাবে যোগ্য নয়। অধিকন্তু এক ঈশ্বরের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অন্য ঈশ্বর কিছুই জানেন না। একটি অজ্ঞ ও অক্ষম সত্তা 'ঈশ্বর' হতে পারেন না। যদি ঈশ্বর একাধিক হতো, তাহলে মহাবিশ্বে অবশ্যই সংশয়, বিশৃঙ্খলা, গোলমাল ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হতো।
কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য ইলাহ থাকতো, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো। অতএব আরশের অধিপতি আল্লাহ সেসব বিষয় থেকে পবিত্র যা তারা বলে থাকে।' (সূরা আম্বিয়া: ২২)। একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে তারা তাদের সৃষ্ট ও আয়ত্তাধীন রাজত্ব নিয়ে আলাদা আলাদা হয়ে যেতো। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহ-ও নেই; (যদি অন্য ইলাহ থাকতো) তাহলে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে অবশ্যই পৃথক হয়ে যেতো এবং একে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতো। আল্লাহ পবিত্র মহান (তিনি মুক্ত) তা থেকে যা তারা বলে।' (সূরা মুমিনুন: ৯১)। সুতরাং, এক ও অদ্বিতীয় সার্বভৌম, সর্বশক্তিমান স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকাটাই যুক্তি ও বুদ্ধির দাবি।
কিছু ধর্ম রয়েছে অজ্ঞেয়বাদে বিশ্বাসী, যেমন বৌদ্ধধর্ম ও কনফুসীয় ধর্ম। অজ্ঞেয়বাদ (অ্যাগনস্টিক) এর মূলকথা হলো— 'ঈশ্বর' সম্বন্ধে কোনো কিছু আমাদের জানা নেই। সুতরাং সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর অন্তরালে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না— এটা হলো অজ্ঞেয়বাদের ধারণা। তারা 'স্রষ্টার'-এর অস্তিত্ব স্বীকারও করে না আবার অস্বীকারও করে না। অপর কিছু ধর্ম আছে যেমন জৈন ধর্ম — এগুলো নাস্তিক্যবাদী ধর্ম। এরা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।
একত্ববাদ: বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মই মূলত এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টায় বিশ্বাসী। সকল ধর্মগ্রন্থই একত্ববাদের কথা বলে অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় সত্য-স্রষ্টায় বিশ্বাস করে। এ একত্ববাদই ইসলামে 'তাওহীদ'।
মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মগ্রন্থে পরিবর্তন করেছে: প্রায় সব ধর্মগ্রন্থই কালের প্রবাহে তাদের অনুসারীদের নিজেদের স্বার্থে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সকল ধর্মের মূল কথা বিকৃত হয়ে একত্ববাদ থেকে সর্বেশ্বরবাদে অথবা বহু ঈশ্বরবাদে পরিণত হয়েছে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'সুতরাং আফসোস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ, যাতে এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য পেতে পারে। কাজেই তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য এবং তারা যা উপার্জন করছে তার জন্য।' (সূরা বাকারা: ৭৯)
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ বা একত্ববাদ। যার অর্থ কেবল 'একেশ্বরবাদ' তথা কেবল এক-অদ্বিতীয় ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করাই নয়। 'তাওহীদ' আক্ষরিক অর্থে সংযোগ সাধন করাকে বলা হয়। 'তাওহীদ' অর্থ একত্বের সাথে দৃঢ় সংযোগ স্থাপন করা। তাওহীদ তিনটি শাখায় বিভক্ত— ক. তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ, খ. তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত এবং গ. তাওহীদ আল-ইবাদাহ।
তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ: তাওহীদের প্রথম শ্রেণী হলো তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ অর্থাৎ আল্লাহর প্রভুত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। মূল শব্দ 'রাব্বুন' থেকে 'রবূবীয়াহ' উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ 'প্রভু' রক্ষাকারী ও প্রতিপালনকারী। সুতরাং 'তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ্' অর্থ প্রভুত্বের একত্ব-কে দৃঢ়তার সাথে মেনে নেয়া। এটা এ মৌলিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, যখন কিছুই ছিল না তখন আল্লাহই সকল বস্তুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। একমাত্র আল্লাহ দুনিয়াতে অস্তিত্বশীল সব কিছুরই স্রষ্টা। বিশ্বে যা কিছু আছে এবং পুরো বিশ্বজগতের তিনি একক স্রষ্টা, প্রতিপালক এবং রক্ষাকারী। তবে এই সৃষ্টির প্রতি তাঁর কোনো মুখাপেক্ষিতা নেই।
তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত: তাওহীদের দ্বিতীয় শ্রেণী হলো— তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত অর্থাৎ আল্লাহর মূল সত্তা ও একক গুণাবলীতে বিশ্বাস। এর অর্থ হলো— আল্লাহর মূল নাম ও গুণবাচক নামসমূহের একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। এ শ্রেণীর তাওহীদের পাঁচটি দিক রয়েছে— ক. আল্লাহ নিজে এবং তাঁর রাসূল যেসব নামে তাঁকে ডেকেছেন সে নামেই তাঁকে ডাকতে হবে। এসব নামসমূহের যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় দেয়া হয়েছে, তার বিপরীত বা অন্য কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য নয়। খ. আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে, যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তাঁকে কোনো নব উদ্ভাবিত মূল বা গুণবাচক নামে কখনো ডাকা যাবে না। গ. আল্লাহর গুণকে তাঁর সৃষ্টির গুণের সদৃশ মনে করা যাবে না। আমাদের অবশ্যই তাঁর সৃষ্টির গুণকে তাঁর গুণের সদৃশ বলে মনে করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতে হবে। ঘ. আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'কোনো বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।' যদিও শোনা এবং দেখার ব্যাপার মানুষের সাথেও সংশ্লিষ্ট কিন্তু যখন তা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হবে, তখন তার প্রকৃত রূপ কী হবে তা মানুষের জ্ঞানের আওতাধীন নয়। মানুষের শোনার জন্য কান, দেখার জন্য চোখ ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর মহান সত্তা সেসব সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। ঙ. আল্লাহর কোনো অনুপম ও অতুলনীয় গুণকে মানুষের সাথে সংযুক্ত করা তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চ. আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামে তাঁর সৃষ্টির নামকরণ করা যাবে না। আল্লাহর কোনো কোনো গুণবাচক নামকে অনির্দিষ্টভাবে 'আল' যোগ না করে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— 'রাউফ', 'রাহীম'।
তাওহীদ আল-ইবাদাহ: ক. 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' এর অর্থ ইবাদত-উপাসনার ক্ষেত্রেও আল্লাহর একত্ব সংরক্ষণ করতে হবে। 'ইবাদাহ' আরবি 'আব্দ' শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ দাস বা চাকর। আর 'ইবাদাহ' অর্থ দাসত্ব বা উপাসনা। 'সালাত' বা নামায হলো দাসত্বের একটি আনুষ্ঠানিক রূপ; কিন্তু এটাই একমাত্র রূপ নয়। ইসলামে 'ইবাদত' হলো— আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা। আর এ ইবাদতও কেবল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়। খ. তাওহীদের উপরোল্লিখিত তিনটি শাখাই যুগপৎ অবিচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাওহীদের প্রথমোক্ত দুটি শাখায় বিশ্বাস করা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি তৃতীয় শাখাকে তথা ইবাদতকে কার্যকর করা না হয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও জমীন থেকে কে তোমাদেরকে রুজি দান করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে মৃত হতে জীবিতকে এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন এবং সকল বিষয়কে কে নিয়ন্ত্রিত করেন? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। আপনি বলুন তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?' (সূরা ইউনুস: ৩১)। আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন— কে তাদের সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে— আল্লাহ। তবুও তারা উল্টো কোন্ দিকে চলছে? (সূরা যুখরুফ: ৮৭)। মক্কার বিধর্মীরা জানতো যে আল্লাহই তাদের সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক ও রিযিকদাতা। তবুও তারা মুসলিম ছিল না, কেননা তারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য দেব-দেবীর পূজা করতো। আল্লাহ তাদের কুফফার তথা অবিশ্বাসী এবং মুশরিকিন তথা আল্লাহর সাথে অংশীবাদীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন— 'তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সাথে তাঁর সাথে শরিক ও সাব্যস্ত করে।' (সূরা ইউসুফ: ১০৬)। সুতরাং 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' তথা ইবাদতের ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অংশীবাদ কী: অংশীবাদকে ইসলামে 'শিরক' বলা হয়। আক্ষরিক অর্থে 'শিরক' হলো অংশীদার সাব্যস্ত করা। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা প্রতিমাপূজার সমতুল্য। এটি স্রষ্টার একত্ববাদ বা তাওহীদের পরিপন্থী।
অংশীবাদীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না: কুরআন মাজিদে সূরা নিসায় সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। অনন্তর যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করে সে মহাপাপ করে।' (সূরা নিসা: ৪৮)। সূরা নিসায় একই কথা পুনরুক্ত হয়েছে— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, তিনি ঐ শিরক ছাড়া সব পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, অনন্তর কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হবে।' (সূরা নিসা: ১১৬)
অংশীবাদ নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে নিয়ে যায়: কুরআন মাজিদে সূরা মায়িদায় বলা হয়েছে— 'নিঃসন্দেহে তারা কুফরী করেছে, যারা বলে মরিয়ম-পুত্র মসীহই আল্লাহ, অথচ মসীহ বলেছিল, হে বনি ঈসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর যিনি আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। নিশ্চয় যে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।' (সূরা মায়িদা: ७২)
একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করতে হবে: প্রধান ধর্মসমূহের ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে আমরা স্রষ্টার একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছি। জানতে পেরেছি তাঁর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সম্পর্কে। তাই একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদের সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে— 'আপনি বলে দিন! হে আহলে কিতাব! এসো সেই ঐক্যবাণীর ভিত্তিতে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন; তা হলো আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি এবং কোন কিছুকেই যেন তার শরীক সাব্যস্ত না করি, আর আল্লাহকে ত্যাগ করে আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করি। তৎপর যদি তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, তবে তোমরা তাদেরকে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা তো মুসলিম।'
বহু ঈশ্বরের অস্তিত্ব অযৌক্তিক নয় বলে যুক্তি দেন বহু ঈশ্বরবাদীরা। তাদের এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তি পেশ করা যায় যে, বিশ্ব-জগতের যদি একাধিক ঈশ্বর থাকতো, তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো। প্রত্যেক ঈশ্বরই অন্য ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের ইচ্ছাকে কার্যকর করতে চাইতেন। এ বিষয়ের প্রতিক্রিয়া ও প্রমাণ মেলে বহু ঈশ্বরবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী ধর্মীয় উপাখ্যানগুলোতে। যদি এক ঈশ্বর অন্য ঈশ্বরের নিকট পরাজিত হন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে অক্ষম হন, তাহলে তিনি 'ঈশ্বর' হওয়ার যোগ্য হতে পারেন না। ফলে তিনি প্রকৃত ঈশ্বরও হতে পারেন না। বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে বহু ঈশ্বরের ধারণা অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ সেখানে বিভিন্ন ঈশ্বরের বিভিন্ন দায়িত্ব। যেমন— সূর্যদেবতা, বৃষ্টির দেবতা ইত্যাদি। তাদের প্রত্যেকে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন ঈশ্বর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এ বর্ণনা একথার ইঙ্গিত দেয় যে, এসব ঈশ্বরের কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো কাজের এককভাবে যোগ্য নয়। অধিকন্তু এক ঈশ্বরের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অন্য ঈশ্বর কিছুই জানেন না। একটি অজ্ঞ ও অক্ষম সত্তা 'ঈশ্বর' হতে পারেন না। যদি ঈশ্বর একাধিক হতো, তাহলে মহাবিশ্বে অবশ্যই সংশয়, বিশৃঙ্খলা, গোলমাল ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হতো।
কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য ইলাহ থাকতো, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো। অতএব আরশের অধিপতি আল্লাহ সেসব বিষয় থেকে পবিত্র যা তারা বলে থাকে।' (সূরা আম্বিয়া: ২২)। একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে তারা তাদের সৃষ্ট ও আয়ত্তাধীন রাজত্ব নিয়ে আলাদা আলাদা হয়ে যেতো। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহ-ও নেই; (যদি অন্য ইলাহ থাকতো) তাহলে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে অবশ্যই পৃথক হয়ে যেতো এবং একে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতো। আল্লাহ পবিত্র মহান (তিনি মুক্ত) তা থেকে যা তারা বলে।' (সূরা মুমিনুন: ৯১)। সুতরাং, এক ও অদ্বিতীয় সার্বভৌম, সর্বশক্তিমান স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকাটাই যুক্তি ও বুদ্ধির দাবি।
কিছু ধর্ম রয়েছে অজ্ঞেয়বাদে বিশ্বাসী, যেমন বৌদ্ধধর্ম ও কনফুসীয় ধর্ম। অজ্ঞেয়বাদ (অ্যাগনস্টিক) এর মূলকথা হলো— 'ঈশ্বর' সম্বন্ধে কোনো কিছু আমাদের জানা নেই। সুতরাং সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর অন্তরালে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না— এটা হলো অজ্ঞেয়বাদের ধারণা। তারা 'স্রষ্টার'-এর অস্তিত্ব স্বীকারও করে না আবার অস্বীকারও করে না। অপর কিছু ধর্ম আছে যেমন জৈন ধর্ম — এগুলো নাস্তিক্যবাদী ধর্ম। এরা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।
একত্ববাদ: বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মই মূলত এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টায় বিশ্বাসী। সকল ধর্মগ্রন্থই একত্ববাদের কথা বলে অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় সত্য-স্রষ্টায় বিশ্বাস করে। এ একত্ববাদই ইসলামে 'তাওহীদ'।
মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মগ্রন্থে পরিবর্তন করেছে: প্রায় সব ধর্মগ্রন্থই কালের প্রবাহে তাদের অনুসারীদের নিজেদের স্বার্থে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সকল ধর্মের মূল কথা বিকৃত হয়ে একত্ববাদ থেকে সর্বেশ্বরবাদে অথবা বহু ঈশ্বরবাদে পরিণত হয়েছে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'সুতরাং আফসোস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ, যাতে এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য পেতে পারে। কাজেই তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য এবং তারা যা উপার্জন করছে তার জন্য।' (সূরা বাকারা: ৭৯)
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ বা একত্ববাদ। যার অর্থ কেবল 'একেশ্বরবাদ' তথা কেবল এক-অদ্বিতীয় ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করাই নয়। 'তাওহীদ' আক্ষরিক অর্থে সংযোগ সাধন করাকে বলা হয়। 'তাওহীদ' অর্থ একত্বের সাথে দৃঢ় সংযোগ স্থাপন করা। তাওহীদ তিনটি শাখায় বিভক্ত— ক. তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ, খ. তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত এবং গ. তাওহীদ আল-ইবাদাহ।
তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ: তাওহীদের প্রথম শ্রেণী হলো তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ অর্থাৎ আল্লাহর প্রভুত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। মূল শব্দ 'রাব্বুন' থেকে 'রবূবীয়াহ' উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ 'প্রভু' রক্ষাকারী ও প্রতিপালনকারী। সুতরাং 'তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ্' অর্থ প্রভুত্বের একত্ব-কে দৃঢ়তার সাথে মেনে নেয়া। এটা এ মৌলিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, যখন কিছুই ছিল না তখন আল্লাহই সকল বস্তুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। একমাত্র আল্লাহ দুনিয়াতে অস্তিত্বশীল সব কিছুরই স্রষ্টা। বিশ্বে যা কিছু আছে এবং পুরো বিশ্বজগতের তিনি একক স্রষ্টা, প্রতিপালক এবং রক্ষাকারী। তবে এই সৃষ্টির প্রতি তাঁর কোনো মুখাপেক্ষিতা নেই।
তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত: তাওহীদের দ্বিতীয় শ্রেণী হলো— তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত অর্থাৎ আল্লাহর মূল সত্তা ও একক গুণাবলীতে বিশ্বাস। এর অর্থ হলো— আল্লাহর মূল নাম ও গুণবাচক নামসমূহের একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। এ শ্রেণীর তাওহীদের পাঁচটি দিক রয়েছে— ক. আল্লাহ নিজে এবং তাঁর রাসূল যেসব নামে তাঁকে ডেকেছেন সে নামেই তাঁকে ডাকতে হবে। এসব নামসমূহের যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় দেয়া হয়েছে, তার বিপরীত বা অন্য কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য নয়। খ. আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে, যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তাঁকে কোনো নব উদ্ভাবিত মূল বা গুণবাচক নামে কখনো ডাকা যাবে না। গ. আল্লাহর গুণকে তাঁর সৃষ্টির গুণের সদৃশ মনে করা যাবে না। আমাদের অবশ্যই তাঁর সৃষ্টির গুণকে তাঁর গুণের সদৃশ বলে মনে করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতে হবে। ঘ. আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'কোনো বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।' যদিও শোনা এবং দেখার ব্যাপার মানুষের সাথেও সংশ্লিষ্ট কিন্তু যখন তা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হবে, তখন তার প্রকৃত রূপ কী হবে তা মানুষের জ্ঞানের আওতাধীন নয়। মানুষের শোনার জন্য কান, দেখার জন্য চোখ ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর মহান সত্তা সেসব সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। ঙ. আল্লাহর কোনো অনুপম ও অতুলনীয় গুণকে মানুষের সাথে সংযুক্ত করা তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চ. আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামে তাঁর সৃষ্টির নামকরণ করা যাবে না। আল্লাহর কোনো কোনো গুণবাচক নামকে অনির্দিষ্টভাবে 'আল' যোগ না করে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— 'রাউফ', 'রাহীম'।
তাওহীদ আল-ইবাদাহ: ক. 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' এর অর্থ ইবাদত-উপাসনার ক্ষেত্রেও আল্লাহর একত্ব সংরক্ষণ করতে হবে। 'ইবাদাহ' আরবি 'আব্দ' শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ দাস বা চাকর। আর 'ইবাদাহ' অর্থ দাসত্ব বা উপাসনা। 'সালাত' বা নামায হলো দাসত্বের একটি আনুষ্ঠানিক রূপ; কিন্তু এটাই একমাত্র রূপ নয়। ইসলামে 'ইবাদত' হলো— আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা। আর এ ইবাদতও কেবল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়। খ. তাওহীদের উপরোল্লিখিত তিনটি শাখাই যুগপৎ অবিচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাওহীদের প্রথমোক্ত দুটি শাখায় বিশ্বাস করা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি তৃতীয় শাখাকে তথা ইবাদতকে কার্যকর করা না হয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও জমীন থেকে কে তোমাদেরকে রুজি দান করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে মৃত হতে জীবিতকে এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন এবং সকল বিষয়কে কে নিয়ন্ত্রিত করেন? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। আপনি বলুন তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?' (সূরা ইউনুস: ৩১)। আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন— কে তাদের সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে— আল্লাহ। তবুও তারা উল্টো কোন্ দিকে চলছে? (সূরা যুখরুফ: ৮৭)। মক্কার বিধর্মীরা জানতো যে আল্লাহই তাদের সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক ও রিযিকদাতা। তবুও তারা মুসলিম ছিল না, কেননা তারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য দেব-দেবীর পূজা করতো। আল্লাহ তাদের কুফফার তথা অবিশ্বাসী এবং মুশরিকিন তথা আল্লাহর সাথে অংশীবাদীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন— 'তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সাথে তাঁর সাথে শরিক ও সাব্যস্ত করে।' (সূরা ইউসুফ: ১০৬)। সুতরাং 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' তথা ইবাদতের ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অংশীবাদ কী: অংশীবাদকে ইসলামে 'শিরক' বলা হয়। আক্ষরিক অর্থে 'শিরক' হলো অংশীদার সাব্যস্ত করা। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা প্রতিমাপূজার সমতুল্য। এটি স্রষ্টার একত্ববাদ বা তাওহীদের পরিপন্থী।
অংশীবাদীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না: কুরআন মাজিদে সূরা নিসায় সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। অনন্তর যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করে সে মহাপাপ করে।' (সূরা নিসা: ৪৮)। সূরা নিসায় একই কথা পুনরুক্ত হয়েছে— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, তিনি ঐ শিরক ছাড়া সব পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, অনন্তর কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হবে।' (সূরা নিসা: ১১৬)
অংশীবাদ নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে নিয়ে যায়: কুরআন মাজিদে সূরা মায়িদায় বলা হয়েছে— 'নিঃসন্দেহে তারা কুফরী করেছে, যারা বলে মরিয়ম-পুত্র মসীহই আল্লাহ, অথচ মসীহ বলেছিল, হে বনি ঈসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর যিনি আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। নিশ্চয় যে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।' (সূরা মায়িদা: ७২)
একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করতে হবে: প্রধান ধর্মসমূহের ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে আমরা স্রষ্টার একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছি। জানতে পেরেছি তাঁর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সম্পর্কে। তাই একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদের সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে— 'আপনি বলে দিন! হে আহলে কিতাব! এসো সেই ঐক্যবাণীর ভিত্তিতে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন; তা হলো আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি এবং কোন কিছুকেই যেন তার শরীক সাব্যস্ত না করি, আর আল্লাহকে ত্যাগ করে আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করি। তৎপর যদি তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, তবে তোমরা তাদেরকে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা তো মুসলিম।'