📄 ইসলামে আল্লাহর অস্তিত্ব
কুরআন ও অপরাপর আসমানী কিতাবসমূহে মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট ধারণা দেয়া রয়েছে। সারা বিশ্বে ইসলামের প্রায় একশত বিশ কোটি অনুসারী রয়েছে। এটি একটি সেমিটিক ধর্ম। 'ইসলাম' অর্থ আল্লাহর ইচ্ছার নিকট আত্মসমর্পণ। মুসলিমজাতি কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে গ্রহণ করে, যা হযরত মুহাম্মদ (স) এর ওপর নাযিল করা হয়েছিল। ইসলাম বলে যে, আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে একত্ববাদের দাওয়াত এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জবাবদিহিতার বার্তাসহ তাওহীদের নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। সুতরাং, ইসলাম অতীতকালের সকল নবী-রাসূল তথা আদম (আ) থেকে শুরু করে যত নবী-রাসূল দুনিয়াতে এসেছেন তাদের সকলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করাকে তার বিশ্বাসের মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন— হযরত নূহ (আ), ইবরাহীম (আ), ইসমাঈল (আ), ইসহাক (আ), ইয়াকুব (আ), মূসা (আ), দাউদ (আ), ইয়াহইয়া (আ) ও ঈসা (আ) এবং অন্য সকল আম্বিয়ায়ে কিরাম।
আল্লাহর সংক্ষিপ্ত পরিচয়: কুরআন মাজীদের ১১২ নং সূরা ইখলাসের চারটি আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হয়েছে— ১. قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدُ - বলুন, তিনি আল্লাহ একক (অদ্বিতীয়)। ২. اللَّهُ الصَّمَدُ - আল্লাহ মুখাপেক্ষিহীন। ৩. لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ - তিনি কাউকে জন্মদান করেননি, কারো থেকে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। ৪. وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدًا - আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা ইখলাস: ১-৪)। সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত 'আস-সামাদ' আরবি শব্দটির যথার্থ অনুবাদ একটু কঠিন। তবে এর মূল অর্থের কাছাকাছি অর্থ হলো Absolute existence অর্থাৎ পরম অস্তিত্ব। এই বিশেষণটি একমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; কেননা অন্য সকল কিছুর অস্তিত্ব অস্থায়ী ও শর্তসাপেক্ষ। এ শব্দ দ্বারা এ অর্থ প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহ কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর নির্ভরশীল নন বরং সকল ব্যক্তি বা বস্তু তাঁর ওপরই নির্ভরশীল এবং তাঁরই মুখাপেক্ষী।
📄 স্রষ্টার মৌলিক বৈশিষ্ট্য
ভারতীয় উপমহাদেশকে বলা হয় মানব-ঈশ্বরের দেশ। কারণ, এখানে রয়েছে অগণিত তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরু। এ সকল গুরু এবং বাবার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা জানি, মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ করাকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না বরং ঘৃণা করে। মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান বোঝার জন্য এরূপ এক মানব-ঈশ্বর 'ভগবান রজনীশ' সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
মানুষের স্রষ্টা হওয়া অসম্ভব: রজনীশ হলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক গুরু। ১৯৮১ সালের মে মাসে তিনি আমেরিকা গমন করেন এবং সেখানে 'রজনীশপূরম' নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি পাশ্চাত্যের রোষানলে পড়েন ও গ্রেফতার হন। পরিশেষে তিনি সে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার জন্মভূমি 'পুনা'-তে 'ওশো' নামে আরেকটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ওশোতে রজনীশের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি ছিলেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মানবরূপ তথা অবতার। একজন পর্যটক 'ওশো' জনপদে ভ্রমণ করলে দেখতে পাবে তাঁর অনুসারীরা তাঁর সমাধি-ফলকে পাথরে খোদাই করে লিখে রেখেছে— 'ওশো রজনীশ কখনো জন্মগ্রহণ করেননি। কখনো মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি কেবল পৃথিবী গ্রহটি পরিদর্শন করে গেছেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৩১ সাল থেকে ১৯ জানুয়ারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত'। সম্ভবত তারা এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছে যে, তাঁকে পৃথিবীর ২১টি বিভিন্ন দেশের ভিসা দেয়া হয়নি। রজনীশের অনুসারীরা এটাকে কোনো সমস্যা হিসেবে মনে করেনি যে তারা যাকে 'পৃথিবী ভ্রমণকারী অবতার' বলে বিশ্বাস করে তাকে কোন দেশে প্রবেশ করার জন্য সে দেশের অনুমতি তথা ভিসার প্রয়োজন হয়। গ্রীসের আর্চ বিশপ বলেছেন, রজনীশ যদি সেদেশ থেকে বের হয়ে না যায় তাহলে তারা তার শিষ্য-সাগরেদসহ রজনীশের বাসস্থান জ্বালিয়ে দেবেন।
এবার ভগবান রজনীশের 'অবতার' হওয়ার দাবিকে সূরা ইখলাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করে দেখা যাক— প্রথম মানদণ্ড— "বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।" রজনীশ কি এক ও অদ্বিতীয়? এর উত্তরে বলতে হবে— 'না'। রজনীশের মতো অনেকেই ঈশ্বরের অবতার হওয়ার দাবি করেছে। রজনীশের কয়েকজন শিষ্য এখনো এ দাবির উপর অটল রয়েছে যে রজনীশ এক ও অদ্বিতীয়।
দ্বিতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ পরম অস্তিত্বশীল ও মুখাপেক্ষীহীন।' নিশ্চয়ই রজনীশ পরম অস্তিত্বশীল ছিলেন না। কেননা তিনি ১৯৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। রজনীশের জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও পুরাতন শিরদাঁড়ার ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকান সরকার তাঁকে কারাগারে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করেছেন এবং তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। ভেবে দেখুন, সর্বশক্তিমান ভগবানকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। সুতরাং, রজনীশ যেমন চিরঞ্জীব ছিলেন না, তেমনি তিনি মুখাপেক্ষীহীনও ছিলেন না।
তৃতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্মগ্রহণও করেননি।' আমরা জানি, রজনীশ ভারতের জবলপুরে এক পিতার ঔরসে ও মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁরা উভয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
চতুর্থ মানদণ্ড— 'আল্লাহর সদৃশ সমকক্ষ কেউ নেই, কিছু নেই।' ঈশ্বরত্বের দাবিদার কাউকে যদি কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনা করা সম্ভব হয়, তাহলে তার ঈশ্বরত্ব তাৎক্ষণিক বাতিল বলে গণ্য হবে। সত্যিকার একক আল্লাহর কোনো কাল্পনিক আকার-আকৃতি কল্পনা করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। আমরা জানি, রজনীশ রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নন। তিনি ছিলেন শুভ্র লম্বা দাড়ির অধিকারী। তার ছিল দুটি চোখ, দুটি কান, একটি নাক, একটি মুখ। রজনীশের ছবি সম্বলিত পোস্টার প্রচুর পাওয়া যায়। এতে এটা সহজেই ধারণা করা যায় যে তিনি 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' হতে পারেন না। একইভাবে যে ব্যক্তিটি শারীরিক শক্তিমত্তা হেতু 'মিস্টার ইউনিভার্স' উপাধিপ্রাপ্ত তাঁকেও কেউ 'ঈশ্বর' হিসেবে কল্পনা করতে পারে বটে, কিন্তু সূরা ইখলাসে বর্ণিত ৪টি মানদণ্ডের আলোকে একমাত্র একক অদ্বিতীয় 'আল্লাহ' ছাড়া কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেন না।
স্রষ্টা একক সত্তা: একক সৃষ্টিকর্তাকে ইংরেজি শব্দ 'গড' এর পরিবর্তে 'আল্লাহ' নামেই মুসলমানরা ডাকে। 'গড' এর চেয়ে আরবি শব্দ 'আল্লাহ'-ই সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও যথার্থ। 'গড' শব্দের সাথে 'এস' ইংরেজি বর্ণ যুক্ত করে তাকে বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করা যায়; কিন্তু 'আল্লাহ' একক সত্তা। এ শব্দের কোনো বহুবচন হয় না। আবার 'গড' এর সাথে 'ই-এস' ইংরেজি বর্ণ যোগ করলে তা স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ নেই। 'আল্লাহ' শব্দের লিঙ্গান্তর হয় না। 'গড' শব্দের আগে Tin শব্দাংশ যোগ করলে তার অর্থ দাঁড়ায় 'মিথ্যা উপাস্য'। 'আল্লাহ' শব্দটি এমন এক অসাধারণ ও অদ্বিতীয় শব্দ যা সম্পর্কে কল্পনা করে কোনো আকৃতি বা আকার ধারণা করা বা তা নিয়ে কোনো প্রকার যথেচ্ছাচার করা যায় না। এসব কারণে মুসলমান এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে 'আল্লাহ' নামেই ডাকে। তবে যেহেতু এই বইয়ের পাঠক বা সম্বোধিত মানুষ সাধারণভাবে মুসলমান ও অমুসলমান উভয় প্রকার রয়েছে, তাই আমি এতে 'আল্লাহ' শব্দের বদলে 'গড' শব্দটি-ই অনেক জায়গায় ব্যবহার করেছি।
স্রষ্টা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন না: গভীরভাবে চিন্তা না করেই কিছু লোক যুক্তি পেশ করে যে, ঈশ্বর যদি সবকিছু করতে সক্ষম, তবে তিনি মানব আকৃতি ধারণ করতে পারবেন না কেন? তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তিনি মানব-আকৃতি ধারণ করতে পারেন; কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলে 'ঈশ্বর' আর ঈশ্বর থাকতে পারেন না। কেননা 'ঈশ্বর' আর মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বিপরীতধর্মী। একই সত্তার মধ্যে ঈশ্বরত্ব ও মানবত্বের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় হতে পারে না। 'অবতারবাদ' বা ঈশ্বরের মানবাকৃতি ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ কোনো কোনো ধর্মে থাকলেও তা অবাস্তব। আমরা জানি, 'ঈশ্বর' অবিনশ্বর কিন্তু মানুষ নশ্বর। মানব-ঈশ্বর নামক এমন কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই যার মধ্যে অবিনশ্বর ঐশ্বরিক সত্তা নশ্বর মানবদেহ ধারণ করবে। এমন ধারণা বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থহীন ও অযৌক্তিক।
ঈশ্বর-এর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অনাদি ও অনন্ত। অন্যদিকে মানুষের শুরু যেমন আছে তেমনি শেষও আছে। এমন কোনো সত্তা মানুষের মধ্যে নেই যার মধ্যে শুরু না থাকা এবং শুরু থাকা উভয়ই বিদ্যমান আছে। মানুষের শেষ আছে, কারণ মানুষ মরণশীল। এমন কোনো মানুষ নেই যার মধ্যে অবিনশ্বরতা ও নশ্বরতা উভয় গুণের সমাবেশ পাওয়া যাবে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পানাহারের প্রয়োজন নেই, কিন্তু মানুষকে তার জীবন কর্মচঞ্চল রাখার জন্য পানাহার করতে হয়। অতএব স্রষ্টা বা ঈশ্বর বা আল্লাহর মানুরূপ ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ একটি ভ্রান্ত মতবাদ।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তিনি খাদ্য দান করেন, কিন্তু তিনি খাদ্যগ্রহণ করেন না।' (সূরা আনআম: ১৪)। অর্থাৎ আল্লাহর কখনো বিশ্রাম বা নিদ্রার প্রয়োজন হয় না; অথচ মানুষ বিশ্রাম ও নিদ্রা ছাড়া চলতে পারে না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— 'আল্লাহ— তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না তন্দ্রা ও নিদ্রা। আসমানে ও জমিনে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর।' (সূরা বাকারা: ২৫৫)
মানব-ঈশ্বরের উপাসনা অযৌক্তিক: 'ঈশ্বরে'র মানবরূপ ধারণ তথা অবতারবাদ যেহেতু গ্রহণীয় নয় তাই আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে একমত হবো যে, কোনো মানুষের উপাসনা করা অযৌক্তিক। এরূপ কর্মকাণ্ড নিষ্ফল ছাড়া আর কিছু নয়। ঈশ্বর যদি মানব-আকৃতি ধারণ করেন তাহলে তিনি অবশ্যই ঐশ্বরিক গুণাবলি ত্যাগ করেই মানবরূপ ধারণ করবেন এবং তিনি মানুষের মধ্যকার সমস্ত গুণের অধিকারী হবেন। উদাহরণস্বরূপ ধরুন, একজন মেধাবী অধ্যাপক যদি দুর্ঘটনায় পড়ে তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে এ অবস্থায় তার ছাত্রদের পক্ষে তাঁর নিকট তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর শিক্ষা গ্রহণের কাজ চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই সঙ্গত কারণেই বলা যায়, ঈশ্বর যদি মানবরূপ ধারণ করেন, তাহলে এ মানুষটি আর কখনো তার পূর্বরূপ ঈশ্বরত্বে ফিরে যেতে পারবেন না। কেননা মানুষ তার প্রকৃতি অনুযায়ী ঈশ্বরে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং মানব-ঈশ্বর এর উপাসনা করা অযৌক্তিক এবং তা অবশ্যই নিষ্ফল। এ জন্যই কুরআন মাজীদে সর্বপ্রকার মানব-ঈশ্বর বা অবতারবাদের অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিরূপ নির্ধারণের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে— 'কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।' (সূরা শুরা: ১১)
স্রষ্টা অন্যায় ও অশোভন কাজ করেন না: 'ঈশ্বর' সর্বশক্তিমান যিনি ন্যায়বিচার, করুণা, সত্য, অনন্ত ও অনিন্দ্যনীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি কখনো এমন সৃষ্টিসুলভ কাজ করতে পারেন না, যা তাঁর সত্তা ও বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। তদ্রূপ তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার মিথ্যা কথা বলার ধারণাও করা যায় না। একইভাবে অন্যায়, ভুল, কোনো বিষয়ে স্মৃতিভ্রম ইত্যাদি যাবতীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশ পাওয়ার কথাও কল্পনা করা যায় না। তবে 'ঈশ্বর' যদি ইচ্ছা করেন তাহলে অন্যায় করতে পারেন; কিন্তু তিনি কখনো তা করেন না, করবেনও না, যেহেতু এটা অন্যায় সেহেতু এমন অন্যায় কাজ তাঁর জন্য অশোভন। এ সম্পর্কে মানবজাতির জ্ঞানের বাহক আল কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কখনো এক বিন্দু পরিমাণও যুলুম করেন না।' (সূরা নিসা: ৪০)। ঈশ্বর চাইলে অত্যাচারী হতে পারেন কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি অন্যায়কারী হবেন সেই মুহূর্তেই তিনি হারাবেন তাঁর ঐশ্বরিকতা।
ভুলে যাওয়া ও ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য নয়: ঈশ্বর কখনো ভুলে যেতে পারেন না। কেননা ভুলে যাওয়া স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার উদাহরণ। একইরূপে ঈশ্বর ভুল করতে পারেন না। কেননা ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মানবজাতির পথ প্রদর্শক: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আমার প্রভু বিভ্রান্তও হন না, ভুলেও যান না।' (সূরা তা-হা: ৫২)। ঈশ্বর ঈশ্বরসুলভ কাজই করেন। ঈশ্বরের সবকিছু করার ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর সম্পর্কে ইসলামের ধারণা হলো— 'ঈশ্বরের ক্ষমতা সবকিছুর ওপর বিরাজমান।' পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ অবশ্যই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।' (আল-কুরআন- ২:১০৬, ২:১০৯, ২: ২৮৪, ৩:২৯, ১৬: ৭৭, ৩৫: ১)। কুরআন মাজিদ আরো বলে— 'তিনি যা চান তা-ই করেন।' (সূরা বুরূজ: ১৬)।
একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাঁর সত্তা ও গুণাবলির সাথে সামঞ্জস্যশীল কাজেরই ইচ্ছা করেন এবং তা সম্পাদন করেন। অন্যায় এবং তাঁর সত্তা ও গুণাবলির বিপরীত কাজ তিনি করেন না। অনেক ধর্মই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো পর্যায়ে অবতারবাদে বিশ্বাস করে, অর্থাৎ ঈশ্বর মানব আকৃতি ধারণ করেন। তাদের যুক্তি হলো— সর্বশক্তিমান 'ঈশ্বর' অত্যন্ত পবিত্র, সত্য, পরিপূর্ণ ও নিষ্কলুষ। তাই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সীমাবদ্ধতা ও অনুভূতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। অতএব, মানুষের জন্য নীতি-নিয়ম প্রণয়নের লক্ষ্যে পৃথিবীতে মানবরূপে আবির্ভূত হন। যুগে যুগে এ প্রতারণাপূর্ণ যুক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এ যুক্তিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক এটা কতটুকু যৌক্তিক।
স্রষ্টাই দিকনির্দেশক ও বিধিমালা প্রণেতা: মহান স্রষ্টা আমাদেরকে মানবীয় গুণাবলী ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে আমরা বিভিন্ন কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন ধরনের সহায়ক হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে নিয়েছি। যেমন— টেপরেকর্ডার। টেপরেকর্ডার এমনই একটি যন্ত্র যা শিল্প-কারখানায় বহুল পরিমাণে তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু এটা কি কখনো বলা হয়েছে যে, টেপরেকর্ডারের কী ভালো, আর কী মন্দ, তা জানার জন্য প্রস্তুতকারককে টেপরেকর্ডারের রূপ ধারণ করতে হবে? বরং এটাই স্বাভাবিক যে, প্রস্তুতকারক তার এ যন্ত্রের উৎপাদন ও চালানোর নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধিমালা সম্বলিত একটি ক্যাটালগ (ম্যানুয়েল) তৈরি করবেন। যার মাধ্যমে এ যন্ত্রের ব্যবহারকারীরা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নিয়মাবলি পেতে পারে। এ পুস্তকের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া থাকবে যে, এ যন্ত্র কী পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, আর কীভাবে ব্যবহার করলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষকে যদি তেমনি একটি যন্ত্র বলে ধরে নেন, তাহলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই দুনিয়াতে এসে মানুষের জন্য কী ভাল আর কী মন্দ তা জানার। তবে এটা নিশ্চিত যে, তিনি মানবজাতির জন্য নির্দেশিকা গ্রন্থ (ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়েল) দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন-ই মানবজাতির জন্য সেই গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা শেষ বিচারের দিন তাঁর এ সুনিপুণ সৃষ্টির কাজ-কর্মের হিসাব নেবেন। সুতরাং এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, তিনি যে বিষয়ে হিসাব নেবেন, সে বিষয়ে পূর্ণ নির্দেশিকা আগেই পাঠিয়ে দেবেন। তাই তিনি পবিত্র কুরআন নাযিল করে দুনিয়ার জীবনে মানুষের কী করণীয় আর কী বর্জনীয় তা যথারীতি জানিয়ে দিয়েছেন।
স্রষ্টা তাঁর রাসূল মনোনীত করেন: মানবজাতিকে তাঁর কল্যাণের জন্য প্রদত্ত বিধি-বিধান জানিয়ে দেয়ার জন্য স্রষ্টার স্বয়ং দুনিয়াতে আসার প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠির মধ্য থেকে বাছাই করা মানুষদের মাধ্যমে তাঁর আসমানি বিধি-বিধান দুনিয়াতে মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। স্রষ্টার বাছাই করা ও মনোনীত এসকল মানুষদের 'বার্তাবাহক' বা 'নবী-রাসূল বলা হয়।
'অন্ধ' ও 'বধির' লোকেরা শিক্ষা নেয় না: অবাক ব্যাপার যে, অবতারবাদী দর্শনের অসম্ভাব্যতা ও অযৌক্তিতা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অনেক অনুসারীরা নিজেরাও এ অবতারবাদে বিশ্বাস করে এবং অন্যদেরকেও এটা শিক্ষা দেয়। এটা কি মানুষের বুদ্ধিমত্তা (ইন্টেলিজেন্স) এবং যিনি মানুষকে এ বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন তাঁর প্রতি অবমাননা প্রদর্শন নয়? এ সমস্ত লোকই প্রকৃতপক্ষে 'অন্ধ' ও 'বধির', যদিও আল্লাহ তাদেরকে শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয় দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসবে না।' (সূরা বাকারা: ১৮)। মথি বাইবেলের লিখিত সুসমাচারে একই কথা বলেছে— অর্থ: তারা দেখেও দেখে না এবং শুনেও শোনে না, তারা বুঝতেও সক্ষম নয়। (মথি ১৩: ১৩)। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ 'ঋগবেদে'ও একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে— অর্থ: এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বাণীসমূহ দেখে, প্রকৃতপক্ষে তারা দেখে না; এমন কিছু লোকও রয়েছে যারা এ বাণীসমূহ শোনে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শোনে না। (ঋগবেদ ১০:৭১:৪)। পবিত্র গ্রন্থের এসব বাণী তাদের পাঠকদের বলে যে, যদিও স্রষ্টা বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তবুও এরা বিচ্যুতই হয়ে যাবে সত্য থেকে।
ভারতীয় উপমহাদেশকে বলা হয় মানব-ঈশ্বরের দেশ। কারণ, এখানে রয়েছে অগণিত তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরু। এ সকল গুরু এবং বাবার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা জানি, মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ করাকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না বরং ঘৃণা করে। মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান বোঝার জন্য এরূপ এক মানব-ঈশ্বর 'ভগবান রজনীশ' সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
মানুষের স্রষ্টা হওয়া অসম্ভব: রজনীশ হলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক গুরু। ১৯৮১ সালের মে মাসে তিনি আমেরিকা গমন করেন এবং সেখানে 'রজনীশপূরম' নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি পাশ্চাত্যের রোষানলে পড়েন ও গ্রেফতার হন। পরিশেষে তিনি সে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার জন্মভূমি 'পুনা'-তে 'ওশো' নামে আরেকটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ওশোতে রজনীশের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি ছিলেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মানবরূপ তথা অবতার। একজন পর্যটক 'ওশো' জনপদে ভ্রমণ করলে দেখতে পাবে তাঁর অনুসারীরা তাঁর সমাধি-ফলকে পাথরে খোদাই করে লিখে রেখেছে— 'ওশো রজনীশ কখনো জন্মগ্রহণ করেননি। কখনো মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি কেবল পৃথিবী গ্রহটি পরিদর্শন করে গেছেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৩১ সাল থেকে ১৯ জানুয়ারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত'। সম্ভবত তারা এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছে যে, তাঁকে পৃথিবীর ২১টি বিভিন্ন দেশের ভিসা দেয়া হয়নি। রজনীশের অনুসারীরা এটাকে কোনো সমস্যা হিসেবে মনে করেনি যে তারা যাকে 'পৃথিবী ভ্রমণকারী অবতার' বলে বিশ্বাস করে তাকে কোন দেশে প্রবেশ করার জন্য সে দেশের অনুমতি তথা ভিসার প্রয়োজন হয়। গ্রীসের আর্চ বিশপ বলেছেন, রজনীশ যদি সেদেশ থেকে বের হয়ে না যায় তাহলে তারা তার শিষ্য-সাগরেদসহ রজনীশের বাসস্থান জ্বালিয়ে দেবেন।
এবার ভগবান রজনীশের 'অবতার' হওয়ার দাবিকে সূরা ইখলাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করে দেখা যাক— প্রথম মানদণ্ড— "বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।" রজনীশ কি এক ও অদ্বিতীয়? এর উত্তরে বলতে হবে— 'না'। রজনীশের মতো অনেকেই ঈশ্বরের অবতার হওয়ার দাবি করেছে। রজনীশের কয়েকজন শিষ্য এখনো এ দাবির উপর অটল রয়েছে যে রজনীশ এক ও অদ্বিতীয়।
দ্বিতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ পরম অস্তিত্বশীল ও মুখাপেক্ষীহীন।' নিশ্চয়ই রজনীশ পরম অস্তিত্বশীল ছিলেন না। কেননা তিনি ১৯৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। রজনীশের জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও পুরাতন শিরদাঁড়ার ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকান সরকার তাঁকে কারাগারে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করেছেন এবং তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। ভেবে দেখুন, সর্বশক্তিমান ভগবানকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। সুতরাং, রজনীশ যেমন চিরঞ্জীব ছিলেন না, তেমনি তিনি মুখাপেক্ষীহীনও ছিলেন না।
তৃতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্মগ্রহণও করেননি।' আমরা জানি, রজনীশ ভারতের জবলপুরে এক পিতার ঔরসে ও মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁরা উভয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
চতুর্থ মানদণ্ড— 'আল্লাহর সদৃশ সমকক্ষ কেউ নেই, কিছু নেই।' ঈশ্বরত্বের দাবিদার কাউকে যদি কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনা করা সম্ভব হয়, তাহলে তার ঈশ্বরত্ব তাৎক্ষণিক বাতিল বলে গণ্য হবে। সত্যিকার একক আল্লাহর কোনো কাল্পনিক আকার-আকৃতি কল্পনা করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। আমরা জানি, রজনীশ রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নন। তিনি ছিলেন শুভ্র লম্বা দাড়ির অধিকারী। তার ছিল দুটি চোখ, দুটি কান, একটি নাক, একটি মুখ। রজনীশের ছবি সম্বলিত পোস্টার প্রচুর পাওয়া যায়। এতে এটা সহজেই ধারণা করা যায় যে তিনি 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' হতে পারেন না। একইভাবে যে ব্যক্তিটি শারীরিক শক্তিমত্তা হেতু 'মিস্টার ইউনিভার্স' উপাধিপ্রাপ্ত তাঁকেও কেউ 'ঈশ্বর' হিসেবে কল্পনা করতে পারে বটে, কিন্তু সূরা ইখলাসে বর্ণিত ৪টি মানদণ্ডের আলোকে একমাত্র একক অদ্বিতীয় 'আল্লাহ' ছাড়া কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেন না।
স্রষ্টা একক সত্তা: একক সৃষ্টিকর্তাকে ইংরেজি শব্দ 'গড' এর পরিবর্তে 'আল্লাহ' নামেই মুসলমানরা ডাকে। 'গড' এর চেয়ে আরবি শব্দ 'আল্লাহ'-ই সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও যথার্থ। 'গড' শব্দের সাথে 'এস' ইংরেজি বর্ণ যুক্ত করে তাকে বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করা যায়; কিন্তু 'আল্লাহ' একক সত্তা। এ শব্দের কোনো বহুবচন হয় না। আবার 'গড' এর সাথে 'ই-এস' ইংরেজি বর্ণ যোগ করলে তা স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ নেই। 'আল্লাহ' শব্দের লিঙ্গান্তর হয় না। 'গড' শব্দের আগে Tin শব্দাংশ যোগ করলে তার অর্থ দাঁড়ায় 'মিথ্যা উপাস্য'। 'আল্লাহ' শব্দটি এমন এক অসাধারণ ও অদ্বিতীয় শব্দ যা সম্পর্কে কল্পনা করে কোনো আকৃতি বা আকার ধারণা করা বা তা নিয়ে কোনো প্রকার যথেচ্ছাচার করা যায় না। এসব কারণে মুসলমান এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে 'আল্লাহ' নামেই ডাকে। তবে যেহেতু এই বইয়ের পাঠক বা সম্বোধিত মানুষ সাধারণভাবে মুসলমান ও অমুসলমান উভয় প্রকার রয়েছে, তাই আমি এতে 'আল্লাহ' শব্দের বদলে 'গড' শব্দটি-ই অনেক জায়গায় ব্যবহার করেছি।
স্রষ্টা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন না: গভীরভাবে চিন্তা না করেই কিছু লোক যুক্তি পেশ করে যে, ঈশ্বর যদি সবকিছু করতে সক্ষম, তবে তিনি মানব আকৃতি ধারণ করতে পারবেন না কেন? তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তিনি মানব-আকৃতি ধারণ করতে পারেন; কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলে 'ঈশ্বর' আর ঈশ্বর থাকতে পারেন না। কেননা 'ঈশ্বর' আর মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বিপরীতধর্মী। একই সত্তার মধ্যে ঈশ্বরত্ব ও মানবত্বের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় হতে পারে না। 'অবতারবাদ' বা ঈশ্বরের মানবাকৃতি ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ কোনো কোনো ধর্মে থাকলেও তা অবাস্তব। আমরা জানি, 'ঈশ্বর' অবিনশ্বর কিন্তু মানুষ নশ্বর। মানব-ঈশ্বর নামক এমন কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই যার মধ্যে অবিনশ্বর ঐশ্বরিক সত্তা নশ্বর মানবদেহ ধারণ করবে। এমন ধারণা বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থহীন ও অযৌক্তিক।
ঈশ্বর-এর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অনাদি ও অনন্ত। অন্যদিকে মানুষের শুরু যেমন আছে তেমনি শেষও আছে। এমন কোনো সত্তা মানুষের মধ্যে নেই যার মধ্যে শুরু না থাকা এবং শুরু থাকা উভয়ই বিদ্যমান আছে। মানুষের শেষ আছে, কারণ মানুষ মরণশীল। এমন কোনো মানুষ নেই যার মধ্যে অবিনশ্বরতা ও নশ্বরতা উভয় গুণের সমাবেশ পাওয়া যাবে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পানাহারের প্রয়োজন নেই, কিন্তু মানুষকে তার জীবন কর্মচঞ্চল রাখার জন্য পানাহার করতে হয়। অতএব স্রষ্টা বা ঈশ্বর বা আল্লাহর মানুরূপ ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ একটি ভ্রান্ত মতবাদ।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তিনি খাদ্য দান করেন, কিন্তু তিনি খাদ্যগ্রহণ করেন না।' (সূরা আনআম: ১৪)। অর্থাৎ আল্লাহর কখনো বিশ্রাম বা নিদ্রার প্রয়োজন হয় না; অথচ মানুষ বিশ্রাম ও নিদ্রা ছাড়া চলতে পারে না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— 'আল্লাহ— তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না তন্দ্রা ও নিদ্রা। আসমানে ও জমিনে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর।' (সূরা বাকারা: ২৫৫)
মানব-ঈশ্বরের উপাসনা অযৌক্তিক: 'ঈশ্বরে'র মানবরূপ ধারণ তথা অবতারবাদ যেহেতু গ্রহণীয় নয় তাই আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে একমত হবো যে, কোনো মানুষের উপাসনা করা অযৌক্তিক। এরূপ কর্মকাণ্ড নিষ্ফল ছাড়া আর কিছু নয়। ঈশ্বর যদি মানব-আকৃতি ধারণ করেন তাহলে তিনি অবশ্যই ঐশ্বরিক গুণাবলি ত্যাগ করেই মানবরূপ ধারণ করবেন এবং তিনি মানুষের মধ্যকার সমস্ত গুণের অধিকারী হবেন। উদাহরণস্বরূপ ধরুন, একজন মেধাবী অধ্যাপক যদি দুর্ঘটনায় পড়ে তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে এ অবস্থায় তার ছাত্রদের পক্ষে তাঁর নিকট তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর শিক্ষা গ্রহণের কাজ চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই সঙ্গত কারণেই বলা যায়, ঈশ্বর যদি মানবরূপ ধারণ করেন, তাহলে এ মানুষটি আর কখনো তার পূর্বরূপ ঈশ্বরত্বে ফিরে যেতে পারবেন না। কেননা মানুষ তার প্রকৃতি অনুযায়ী ঈশ্বরে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং মানব-ঈশ্বর এর উপাসনা করা অযৌক্তিক এবং তা অবশ্যই নিষ্ফল। এ জন্যই কুরআন মাজীদে সর্বপ্রকার মানব-ঈশ্বর বা অবতারবাদের অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিরূপ নির্ধারণের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে— 'কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।' (সূরা শুরা: ১১)
স্রষ্টা অন্যায় ও অশোভন কাজ করেন না: 'ঈশ্বর' সর্বশক্তিমান যিনি ন্যায়বিচার, করুণা, সত্য, অনন্ত ও অনিন্দ্যনীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি কখনো এমন সৃষ্টিসুলভ কাজ করতে পারেন না, যা তাঁর সত্তা ও বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। তদ্রূপ তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার মিথ্যা কথা বলার ধারণাও করা যায় না। একইভাবে অন্যায়, ভুল, কোনো বিষয়ে স্মৃতিভ্রম ইত্যাদি যাবতীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশ পাওয়ার কথাও কল্পনা করা যায় না। তবে 'ঈশ্বর' যদি ইচ্ছা করেন তাহলে অন্যায় করতে পারেন; কিন্তু তিনি কখনো তা করেন না, করবেনও না, যেহেতু এটা অন্যায় সেহেতু এমন অন্যায় কাজ তাঁর জন্য অশোভন। এ সম্পর্কে মানবজাতির জ্ঞানের বাহক আল কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কখনো এক বিন্দু পরিমাণও যুলুম করেন না।' (সূরা নিসা: ৪০)। ঈশ্বর চাইলে অত্যাচারী হতে পারেন কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি অন্যায়কারী হবেন সেই মুহূর্তেই তিনি হারাবেন তাঁর ঐশ্বরিকতা।
ভুলে যাওয়া ও ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য নয়: ঈশ্বর কখনো ভুলে যেতে পারেন না। কেননা ভুলে যাওয়া স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার উদাহরণ। একইরূপে ঈশ্বর ভুল করতে পারেন না। কেননা ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মানবজাতির পথ প্রদর্শক: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আমার প্রভু বিভ্রান্তও হন না, ভুলেও যান না।' (সূরা তা-হা: ৫২)। ঈশ্বর ঈশ্বরসুলভ কাজই করেন। ঈশ্বরের সবকিছু করার ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর সম্পর্কে ইসলামের ধারণা হলো— 'ঈশ্বরের ক্ষমতা সবকিছুর ওপর বিরাজমান।' পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ অবশ্যই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।' (আল-কুরআন- ২:১০৬, ২:১০৯, ২: ২৮৪, ৩:২৯, ১৬: ৭৭, ৩৫: ১)। কুরআন মাজিদ আরো বলে— 'তিনি যা চান তা-ই করেন।' (সূরা বুরূজ: ১৬)।
একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাঁর সত্তা ও গুণাবলির সাথে সামঞ্জস্যশীল কাজেরই ইচ্ছা করেন এবং তা সম্পাদন করেন। অন্যায় এবং তাঁর সত্তা ও গুণাবলির বিপরীত কাজ তিনি করেন না। অনেক ধর্মই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো পর্যায়ে অবতারবাদে বিশ্বাস করে, অর্থাৎ ঈশ্বর মানব আকৃতি ধারণ করেন। তাদের যুক্তি হলো— সর্বশক্তিমান 'ঈশ্বর' অত্যন্ত পবিত্র, সত্য, পরিপূর্ণ ও নিষ্কলুষ। তাই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সীমাবদ্ধতা ও অনুভূতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। অতএব, মানুষের জন্য নীতি-নিয়ম প্রণয়নের লক্ষ্যে পৃথিবীতে মানবরূপে আবির্ভূত হন। যুগে যুগে এ প্রতারণাপূর্ণ যুক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এ যুক্তিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক এটা কতটুকু যৌক্তিক।
স্রষ্টাই দিকনির্দেশক ও বিধিমালা প্রণেতা: মহান স্রষ্টা আমাদেরকে মানবীয় গুণাবলী ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে আমরা বিভিন্ন কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন ধরনের সহায়ক হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে নিয়েছি। যেমন— টেপরেকর্ডার। টেপরেকর্ডার এমনই একটি যন্ত্র যা শিল্প-কারখানায় বহুল পরিমাণে তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু এটা কি কখনো বলা হয়েছে যে, টেপরেকর্ডারের কী ভালো, আর কী মন্দ, তা জানার জন্য প্রস্তুতকারককে টেপরেকর্ডারের রূপ ধারণ করতে হবে? বরং এটাই স্বাভাবিক যে, প্রস্তুতকারক তার এ যন্ত্রের উৎপাদন ও চালানোর নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধিমালা সম্বলিত একটি ক্যাটালগ (ম্যানুয়েল) তৈরি করবেন। যার মাধ্যমে এ যন্ত্রের ব্যবহারকারীরা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নিয়মাবলি পেতে পারে। এ পুস্তকের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া থাকবে যে, এ যন্ত্র কী পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, আর কীভাবে ব্যবহার করলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষকে যদি তেমনি একটি যন্ত্র বলে ধরে নেন, তাহলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই দুনিয়াতে এসে মানুষের জন্য কী ভাল আর কী মন্দ তা জানার। তবে এটা নিশ্চিত যে, তিনি মানবজাতির জন্য নির্দেশিকা গ্রন্থ (ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়েল) দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন-ই মানবজাতির জন্য সেই গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা শেষ বিচারের দিন তাঁর এ সুনিপুণ সৃষ্টির কাজ-কর্মের হিসাব নেবেন। সুতরাং এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, তিনি যে বিষয়ে হিসাব নেবেন, সে বিষয়ে পূর্ণ নির্দেশিকা আগেই পাঠিয়ে দেবেন। তাই তিনি পবিত্র কুরআন নাযিল করে দুনিয়ার জীবনে মানুষের কী করণীয় আর কী বর্জনীয় তা যথারীতি জানিয়ে দিয়েছেন।
স্রষ্টা তাঁর রাসূল মনোনীত করেন: মানবজাতিকে তাঁর কল্যাণের জন্য প্রদত্ত বিধি-বিধান জানিয়ে দেয়ার জন্য স্রষ্টার স্বয়ং দুনিয়াতে আসার প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠির মধ্য থেকে বাছাই করা মানুষদের মাধ্যমে তাঁর আসমানি বিধি-বিধান দুনিয়াতে মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। স্রষ্টার বাছাই করা ও মনোনীত এসকল মানুষদের 'বার্তাবাহক' বা 'নবী-রাসূল বলা হয়।
'অন্ধ' ও 'বধির' লোকেরা শিক্ষা নেয় না: অবাক ব্যাপার যে, অবতারবাদী দর্শনের অসম্ভাব্যতা ও অযৌক্তিতা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অনেক অনুসারীরা নিজেরাও এ অবতারবাদে বিশ্বাস করে এবং অন্যদেরকেও এটা শিক্ষা দেয়। এটা কি মানুষের বুদ্ধিমত্তা (ইন্টেলিজেন্স) এবং যিনি মানুষকে এ বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন তাঁর প্রতি অবমাননা প্রদর্শন নয়? এ সমস্ত লোকই প্রকৃতপক্ষে 'অন্ধ' ও 'বধির', যদিও আল্লাহ তাদেরকে শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয় দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসবে না।' (সূরা বাকারা: ১৮)। মথি বাইবেলের লিখিত সুসমাচারে একই কথা বলেছে— অর্থ: তারা দেখেও দেখে না এবং শুনেও শোনে না, তারা বুঝতেও সক্ষম নয়। (মথি ১৩: ১৩)। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ 'ঋগবেদে'ও একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে— অর্থ: এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বাণীসমূহ দেখে, প্রকৃতপক্ষে তারা দেখে না; এমন কিছু লোকও রয়েছে যারা এ বাণীসমূহ শোনে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শোনে না। (ঋগবেদ ১০:৭১:৪)। পবিত্র গ্রন্থের এসব বাণী তাদের পাঠকদের বলে যে, যদিও স্রষ্টা বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তবুও এরা বিচ্যুতই হয়ে যাবে সত্য থেকে।
📄 স্রষ্টার গুণাবলি
মানবজাতির সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব পবিত্র কুরআনের বনী ইসরাঈল এর ১১০ নং আয়াতে স্রষ্টাকে কী নামে সম্বোধন করতে হবে, তা স্পষ্ট ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে— 'বলুন, তোমরা আল্লাহ বলে ডাক কিংবা রাহমান বলে ডাক, যে নামেই ডাক না কেন, তাঁর তো রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম।' একই ধরনের কথা কুরআনের অন্যান্য সূরাতেও উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে আল-কুরআন সর্বশক্তিমান আল্লাহর কমপক্ষে ৯৯টি বিভিন্ন গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো 'আল্লাহ'। কুরআন 'আল্লাহ'র পরিচয় প্রকাশে অনেক নামের মধ্যে 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়) 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু) 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি নাম উল্লেখ করেছে। আপনি যে কোনো নামেই আল্লাহকে ডাকতে পারেন; কিন্তু সেই নামগুলো হতে হবে সুন্দর। তবে সেই নামগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে মানসপটে কোনো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো চিত্র যেন ফুটে না ওঠে।
গুণবাচক নামের মালিক স্বয়ং আল্লাহ: মহান আল্লাহ তাআলা সুন্দর নামসমূহের অধিকারী। প্রত্যেকটি নামের মধ্যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত পরিচয় পাওয়া যায়। আমি এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করবো। একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উদাহরণ পেশ করা যাক। ধরুন নভোচারি নীল আর্মস্ট্রং। কেউ যদি বলে, 'নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান'। উক্তিটি যথার্থ; কিন্তু তার পরিচয়ের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। 'নীল আর্মস্ট্রং একজন নভোচারী'— এ পরিচয়ও তার জন্য অনন্য পরিচয় নয়, কেননা এ পরিচয় অন্যদেরও আছে। যদি বলা হয় যে, 'নীল আর্মস্ট্রং প্রথম ব্যক্তি যিনি চাঁদে পা রেখেছেন'। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে চাঁদে প্রথম পদার্পণ করেছেন কে? উত্তরে কেবল বলা হবে 'নীল আর্মস্ট্রং'। এ কৃতিত্বে তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার গুণাবলিও হতে হবে অনন্য ও অতুলনীয়। তিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা। আমি যদি বলি— 'তিনি ইমারতের নির্মাণকারী' তাহলে তাঁর পরিচয় হিসেবে অনন্য নয়, কেননা অনেক মানুষ ইমারতের নির্মাতা হতে পারে। অতএব 'নির্মাতা' গুণ দ্বারা স্রষ্টার ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে না। স্রষ্টা বা আল্লাহর গুণসমূহ এমন হবে যার দ্বারা তাঁকেই নির্দেশ করবে অন্য কাউকে নয়। উদাহরণ স্বরূপ— 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়), 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু), 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি বিশেষ গুণবাচক নামগুলোর উল্লেখ করা যায়। সুতরাং কেউ যদি প্রশ্ন করে— 'আর-রহমান' বা পরম করুণাময় কে? তাহলে এর উত্তরে একটি মাত্র জবাবই হতে পারে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহ'।
স্রষ্টার গুণাবলী সাংঘর্ষিক নয়: পূর্বের উদাহরণটিকে ধরা যাক। কেউ যদি বলে, "নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান নভোচারী যিনি মাত্র চার ফুট লম্বা' তবে এ পরিচয় 'আমেরিকান নভোচারী' যথার্থ, কিন্তু সহায়ক গুণটি 'চার ফুট লম্বা' মিথ্যা। একইভাবে কেউ যদি বলে আল্লাহ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর একটি মাথা, দুটো হাত, দুটো পা ইত্যাদি ইত্যাদি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য তথা 'বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা' বৈশিষ্ট্যটি যথার্থ; কিন্তু সহায়ক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ, 'মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া' ভুল এবং মিথ্যা।
গুণ-বৈশিষ্ট্য স্রষ্টার একক সত্তার পরিচায়ক: আল্লাহ যেহেতু এক ও অদ্বিতীয়, তাই তাঁর সব গুণ-বৈশিষ্ট্য দ্বারা একমাত্র তাকেই নির্দেশ করাটা স্বাভাবিক। যদি বলা হয়, 'নীল আর্মস্ট্রং ছিলেন একজন নভোচারী যিনি চাঁদের বুকে প্রথম পদার্পণ করেন; কিন্তু পরে দ্বিতীয় জন এডউইন অলড্রিন — একথাটা সঠিক নয়। কেননা প্রথম পদার্পণকারী একজনই হতে পারে। প্রথম পদার্পণকারী দ্বিতীয় হতে পারে না। সুতরাং স্রষ্টা এক ঈশ্বর এবং প্রতিপালক অন্য ঈশ্বর — এ বক্তব্য অবাস্তব; কারণ, বিশ্বজগতে স্রষ্টার এক ও অদ্বিতীয়— যাবতীয় মহৎ গুণ স্রষ্টার একক সত্তার পূর্ণতা লাভ করেছে।
মানবজাতির সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব পবিত্র কুরআনের বনী ইসরাঈল এর ১১০ নং আয়াতে স্রষ্টাকে কী নামে সম্বোধন করতে হবে, তা স্পষ্ট ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে— 'বলুন, তোমরা আল্লাহ বলে ডাক কিংবা রাহমান বলে ডাক, যে নামেই ডাক না কেন, তাঁর তো রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম।' একই ধরনের কথা কুরআনের অন্যান্য সূরাতেও উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে আল-কুরআন সর্বশক্তিমান আল্লাহর কমপক্ষে ৯৯টি বিভিন্ন গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো 'আল্লাহ'। কুরআন 'আল্লাহ'র পরিচয় প্রকাশে অনেক নামের মধ্যে 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়) 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু) 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি নাম উল্লেখ করেছে। আপনি যে কোনো নামেই আল্লাহকে ডাকতে পারেন; কিন্তু সেই নামগুলো হতে হবে সুন্দর। তবে সেই নামগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে মানসপটে কোনো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো চিত্র যেন ফুটে না ওঠে।
গুণবাচক নামের মালিক স্বয়ং আল্লাহ: মহান আল্লাহ তাআলা সুন্দর নামসমূহের অধিকারী। প্রত্যেকটি নামের মধ্যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত পরিচয় পাওয়া যায়। আমি এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করবো। একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উদাহরণ পেশ করা যাক। ধরুন নভোচারি নীল আর্মস্ট্রং। কেউ যদি বলে, 'নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান'। উক্তিটি যথার্থ; কিন্তু তার পরিচয়ের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। 'নীল আর্মস্ট্রং একজন নভোচারী'— এ পরিচয়ও তার জন্য অনন্য পরিচয় নয়, কেননা এ পরিচয় অন্যদেরও আছে। যদি বলা হয় যে, 'নীল আর্মস্ট্রং প্রথম ব্যক্তি যিনি চাঁদে পা রেখেছেন'। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে চাঁদে প্রথম পদার্পণ করেছেন কে? উত্তরে কেবল বলা হবে 'নীল আর্মস্ট্রং'। এ কৃতিত্বে তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার গুণাবলিও হতে হবে অনন্য ও অতুলনীয়। তিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা। আমি যদি বলি— 'তিনি ইমারতের নির্মাণকারী' তাহলে তাঁর পরিচয় হিসেবে অনন্য নয়, কেননা অনেক মানুষ ইমারতের নির্মাতা হতে পারে। অতএব 'নির্মাতা' গুণ দ্বারা স্রষ্টার ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে না। স্রষ্টা বা আল্লাহর গুণসমূহ এমন হবে যার দ্বারা তাঁকেই নির্দেশ করবে অন্য কাউকে নয়। উদাহরণ স্বরূপ— 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়), 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু), 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি বিশেষ গুণবাচক নামগুলোর উল্লেখ করা যায়। সুতরাং কেউ যদি প্রশ্ন করে— 'আর-রহমান' বা পরম করুণাময় কে? তাহলে এর উত্তরে একটি মাত্র জবাবই হতে পারে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহ'।
স্রষ্টার গুণাবলী সাংঘর্ষিক নয়: পূর্বের উদাহরণটিকে ধরা যাক। কেউ যদি বলে, "নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান নভোচারী যিনি মাত্র চার ফুট লম্বা' তবে এ পরিচয় 'আমেরিকান নভোচারী' যথার্থ, কিন্তু সহায়ক গুণটি 'চার ফুট লম্বা' মিথ্যা। একইভাবে কেউ যদি বলে আল্লাহ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর একটি মাথা, দুটো হাত, দুটো পা ইত্যাদি ইত্যাদি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য তথা 'বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা' বৈশিষ্ট্যটি যথার্থ; কিন্তু সহায়ক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ, 'মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া' ভুল এবং মিথ্যা।
গুণ-বৈশিষ্ট্য স্রষ্টার একক সত্তার পরিচায়ক: আল্লাহ যেহেতু এক ও অদ্বিতীয়, তাই তাঁর সব গুণ-বৈশিষ্ট্য দ্বারা একমাত্র তাকেই নির্দেশ করাটা স্বাভাবিক। যদি বলা হয়, 'নীল আর্মস্ট্রং ছিলেন একজন নভোচারী যিনি চাঁদের বুকে প্রথম পদার্পণ করেন; কিন্তু পরে দ্বিতীয় জন এডউইন অলড্রিন — একথাটা সঠিক নয়। কেননা প্রথম পদার্পণকারী একজনই হতে পারে। প্রথম পদার্পণকারী দ্বিতীয় হতে পারে না। সুতরাং স্রষ্টা এক ঈশ্বর এবং প্রতিপালক অন্য ঈশ্বর — এ বক্তব্য অবাস্তব; কারণ, বিশ্বজগতে স্রষ্টার এক ও অদ্বিতীয়— যাবতীয় মহৎ গুণ স্রষ্টার একক সত্তার পূর্ণতা লাভ করেছে।
📄 স্রষ্টার একত্বই যৌক্তিক
বহু ঈশ্বরের অস্তিত্ব অযৌক্তিক নয় বলে যুক্তি দেন বহু ঈশ্বরবাদীরা। তাদের এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তি পেশ করা যায় যে, বিশ্ব-জগতের যদি একাধিক ঈশ্বর থাকতো, তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো। প্রত্যেক ঈশ্বরই অন্য ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের ইচ্ছাকে কার্যকর করতে চাইতেন। এ বিষয়ের প্রতিক্রিয়া ও প্রমাণ মেলে বহু ঈশ্বরবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী ধর্মীয় উপাখ্যানগুলোতে। যদি এক ঈশ্বর অন্য ঈশ্বরের নিকট পরাজিত হন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে অক্ষম হন, তাহলে তিনি 'ঈশ্বর' হওয়ার যোগ্য হতে পারেন না। ফলে তিনি প্রকৃত ঈশ্বরও হতে পারেন না। বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে বহু ঈশ্বরের ধারণা অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ সেখানে বিভিন্ন ঈশ্বরের বিভিন্ন দায়িত্ব। যেমন— সূর্যদেবতা, বৃষ্টির দেবতা ইত্যাদি। তাদের প্রত্যেকে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন ঈশ্বর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এ বর্ণনা একথার ইঙ্গিত দেয় যে, এসব ঈশ্বরের কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো কাজের এককভাবে যোগ্য নয়। অধিকন্তু এক ঈশ্বরের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অন্য ঈশ্বর কিছুই জানেন না। একটি অজ্ঞ ও অক্ষম সত্তা 'ঈশ্বর' হতে পারেন না। যদি ঈশ্বর একাধিক হতো, তাহলে মহাবিশ্বে অবশ্যই সংশয়, বিশৃঙ্খলা, গোলমাল ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হতো।
কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য ইলাহ থাকতো, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো। অতএব আরশের অধিপতি আল্লাহ সেসব বিষয় থেকে পবিত্র যা তারা বলে থাকে।' (সূরা আম্বিয়া: ২২)। একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে তারা তাদের সৃষ্ট ও আয়ত্তাধীন রাজত্ব নিয়ে আলাদা আলাদা হয়ে যেতো। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহ-ও নেই; (যদি অন্য ইলাহ থাকতো) তাহলে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে অবশ্যই পৃথক হয়ে যেতো এবং একে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতো। আল্লাহ পবিত্র মহান (তিনি মুক্ত) তা থেকে যা তারা বলে।' (সূরা মুমিনুন: ৯১)। সুতরাং, এক ও অদ্বিতীয় সার্বভৌম, সর্বশক্তিমান স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকাটাই যুক্তি ও বুদ্ধির দাবি।
কিছু ধর্ম রয়েছে অজ্ঞেয়বাদে বিশ্বাসী, যেমন বৌদ্ধধর্ম ও কনফুসীয় ধর্ম। অজ্ঞেয়বাদ (অ্যাগনস্টিক) এর মূলকথা হলো— 'ঈশ্বর' সম্বন্ধে কোনো কিছু আমাদের জানা নেই। সুতরাং সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর অন্তরালে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না— এটা হলো অজ্ঞেয়বাদের ধারণা। তারা 'স্রষ্টার'-এর অস্তিত্ব স্বীকারও করে না আবার অস্বীকারও করে না। অপর কিছু ধর্ম আছে যেমন জৈন ধর্ম — এগুলো নাস্তিক্যবাদী ধর্ম। এরা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।
একত্ববাদ: বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মই মূলত এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টায় বিশ্বাসী। সকল ধর্মগ্রন্থই একত্ববাদের কথা বলে অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় সত্য-স্রষ্টায় বিশ্বাস করে। এ একত্ববাদই ইসলামে 'তাওহীদ'।
মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মগ্রন্থে পরিবর্তন করেছে: প্রায় সব ধর্মগ্রন্থই কালের প্রবাহে তাদের অনুসারীদের নিজেদের স্বার্থে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সকল ধর্মের মূল কথা বিকৃত হয়ে একত্ববাদ থেকে সর্বেশ্বরবাদে অথবা বহু ঈশ্বরবাদে পরিণত হয়েছে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'সুতরাং আফসোস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ, যাতে এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য পেতে পারে। কাজেই তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য এবং তারা যা উপার্জন করছে তার জন্য।' (সূরা বাকারা: ৭৯)
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ বা একত্ববাদ। যার অর্থ কেবল 'একেশ্বরবাদ' তথা কেবল এক-অদ্বিতীয় ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করাই নয়। 'তাওহীদ' আক্ষরিক অর্থে সংযোগ সাধন করাকে বলা হয়। 'তাওহীদ' অর্থ একত্বের সাথে দৃঢ় সংযোগ স্থাপন করা। তাওহীদ তিনটি শাখায় বিভক্ত— ক. তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ, খ. তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত এবং গ. তাওহীদ আল-ইবাদাহ।
তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ: তাওহীদের প্রথম শ্রেণী হলো তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ অর্থাৎ আল্লাহর প্রভুত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। মূল শব্দ 'রাব্বুন' থেকে 'রবূবীয়াহ' উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ 'প্রভু' রক্ষাকারী ও প্রতিপালনকারী। সুতরাং 'তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ্' অর্থ প্রভুত্বের একত্ব-কে দৃঢ়তার সাথে মেনে নেয়া। এটা এ মৌলিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, যখন কিছুই ছিল না তখন আল্লাহই সকল বস্তুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। একমাত্র আল্লাহ দুনিয়াতে অস্তিত্বশীল সব কিছুরই স্রষ্টা। বিশ্বে যা কিছু আছে এবং পুরো বিশ্বজগতের তিনি একক স্রষ্টা, প্রতিপালক এবং রক্ষাকারী। তবে এই সৃষ্টির প্রতি তাঁর কোনো মুখাপেক্ষিতা নেই।
তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত: তাওহীদের দ্বিতীয় শ্রেণী হলো— তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত অর্থাৎ আল্লাহর মূল সত্তা ও একক গুণাবলীতে বিশ্বাস। এর অর্থ হলো— আল্লাহর মূল নাম ও গুণবাচক নামসমূহের একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। এ শ্রেণীর তাওহীদের পাঁচটি দিক রয়েছে— ক. আল্লাহ নিজে এবং তাঁর রাসূল যেসব নামে তাঁকে ডেকেছেন সে নামেই তাঁকে ডাকতে হবে। এসব নামসমূহের যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় দেয়া হয়েছে, তার বিপরীত বা অন্য কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য নয়। খ. আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে, যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তাঁকে কোনো নব উদ্ভাবিত মূল বা গুণবাচক নামে কখনো ডাকা যাবে না। গ. আল্লাহর গুণকে তাঁর সৃষ্টির গুণের সদৃশ মনে করা যাবে না। আমাদের অবশ্যই তাঁর সৃষ্টির গুণকে তাঁর গুণের সদৃশ বলে মনে করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতে হবে। ঘ. আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'কোনো বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।' যদিও শোনা এবং দেখার ব্যাপার মানুষের সাথেও সংশ্লিষ্ট কিন্তু যখন তা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হবে, তখন তার প্রকৃত রূপ কী হবে তা মানুষের জ্ঞানের আওতাধীন নয়। মানুষের শোনার জন্য কান, দেখার জন্য চোখ ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর মহান সত্তা সেসব সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। ঙ. আল্লাহর কোনো অনুপম ও অতুলনীয় গুণকে মানুষের সাথে সংযুক্ত করা তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চ. আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামে তাঁর সৃষ্টির নামকরণ করা যাবে না। আল্লাহর কোনো কোনো গুণবাচক নামকে অনির্দিষ্টভাবে 'আল' যোগ না করে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— 'রাউফ', 'রাহীম'।
তাওহীদ আল-ইবাদাহ: ক. 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' এর অর্থ ইবাদত-উপাসনার ক্ষেত্রেও আল্লাহর একত্ব সংরক্ষণ করতে হবে। 'ইবাদাহ' আরবি 'আব্দ' শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ দাস বা চাকর। আর 'ইবাদাহ' অর্থ দাসত্ব বা উপাসনা। 'সালাত' বা নামায হলো দাসত্বের একটি আনুষ্ঠানিক রূপ; কিন্তু এটাই একমাত্র রূপ নয়। ইসলামে 'ইবাদত' হলো— আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা। আর এ ইবাদতও কেবল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়। খ. তাওহীদের উপরোল্লিখিত তিনটি শাখাই যুগপৎ অবিচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাওহীদের প্রথমোক্ত দুটি শাখায় বিশ্বাস করা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি তৃতীয় শাখাকে তথা ইবাদতকে কার্যকর করা না হয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও জমীন থেকে কে তোমাদেরকে রুজি দান করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে মৃত হতে জীবিতকে এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন এবং সকল বিষয়কে কে নিয়ন্ত্রিত করেন? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। আপনি বলুন তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?' (সূরা ইউনুস: ৩১)। আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন— কে তাদের সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে— আল্লাহ। তবুও তারা উল্টো কোন্ দিকে চলছে? (সূরা যুখরুফ: ৮৭)। মক্কার বিধর্মীরা জানতো যে আল্লাহই তাদের সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক ও রিযিকদাতা। তবুও তারা মুসলিম ছিল না, কেননা তারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য দেব-দেবীর পূজা করতো। আল্লাহ তাদের কুফফার তথা অবিশ্বাসী এবং মুশরিকিন তথা আল্লাহর সাথে অংশীবাদীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন— 'তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সাথে তাঁর সাথে শরিক ও সাব্যস্ত করে।' (সূরা ইউসুফ: ১০৬)। সুতরাং 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' তথা ইবাদতের ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অংশীবাদ কী: অংশীবাদকে ইসলামে 'শিরক' বলা হয়। আক্ষরিক অর্থে 'শিরক' হলো অংশীদার সাব্যস্ত করা। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা প্রতিমাপূজার সমতুল্য। এটি স্রষ্টার একত্ববাদ বা তাওহীদের পরিপন্থী।
অংশীবাদীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না: কুরআন মাজিদে সূরা নিসায় সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। অনন্তর যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করে সে মহাপাপ করে।' (সূরা নিসা: ৪৮)। সূরা নিসায় একই কথা পুনরুক্ত হয়েছে— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, তিনি ঐ শিরক ছাড়া সব পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, অনন্তর কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হবে।' (সূরা নিসা: ১১৬)
অংশীবাদ নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে নিয়ে যায়: কুরআন মাজিদে সূরা মায়িদায় বলা হয়েছে— 'নিঃসন্দেহে তারা কুফরী করেছে, যারা বলে মরিয়ম-পুত্র মসীহই আল্লাহ, অথচ মসীহ বলেছিল, হে বনি ঈসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর যিনি আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। নিশ্চয় যে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।' (সূরা মায়িদা: ७২)
একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করতে হবে: প্রধান ধর্মসমূহের ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে আমরা স্রষ্টার একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছি। জানতে পেরেছি তাঁর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সম্পর্কে। তাই একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদের সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে— 'আপনি বলে দিন! হে আহলে কিতাব! এসো সেই ঐক্যবাণীর ভিত্তিতে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন; তা হলো আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি এবং কোন কিছুকেই যেন তার শরীক সাব্যস্ত না করি, আর আল্লাহকে ত্যাগ করে আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করি। তৎপর যদি তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, তবে তোমরা তাদেরকে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা তো মুসলিম।'
বহু ঈশ্বরের অস্তিত্ব অযৌক্তিক নয় বলে যুক্তি দেন বহু ঈশ্বরবাদীরা। তাদের এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তি পেশ করা যায় যে, বিশ্ব-জগতের যদি একাধিক ঈশ্বর থাকতো, তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো। প্রত্যেক ঈশ্বরই অন্য ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের ইচ্ছাকে কার্যকর করতে চাইতেন। এ বিষয়ের প্রতিক্রিয়া ও প্রমাণ মেলে বহু ঈশ্বরবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী ধর্মীয় উপাখ্যানগুলোতে। যদি এক ঈশ্বর অন্য ঈশ্বরের নিকট পরাজিত হন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে অক্ষম হন, তাহলে তিনি 'ঈশ্বর' হওয়ার যোগ্য হতে পারেন না। ফলে তিনি প্রকৃত ঈশ্বরও হতে পারেন না। বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মগুলোতে বহু ঈশ্বরের ধারণা অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ সেখানে বিভিন্ন ঈশ্বরের বিভিন্ন দায়িত্ব। যেমন— সূর্যদেবতা, বৃষ্টির দেবতা ইত্যাদি। তাদের প্রত্যেকে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন ঈশ্বর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এ বর্ণনা একথার ইঙ্গিত দেয় যে, এসব ঈশ্বরের কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো কাজের এককভাবে যোগ্য নয়। অধিকন্তু এক ঈশ্বরের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অন্য ঈশ্বর কিছুই জানেন না। একটি অজ্ঞ ও অক্ষম সত্তা 'ঈশ্বর' হতে পারেন না। যদি ঈশ্বর একাধিক হতো, তাহলে মহাবিশ্বে অবশ্যই সংশয়, বিশৃঙ্খলা, গোলমাল ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হতো।
কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য ইলাহ থাকতো, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো। অতএব আরশের অধিপতি আল্লাহ সেসব বিষয় থেকে পবিত্র যা তারা বলে থাকে।' (সূরা আম্বিয়া: ২২)। একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলে তারা তাদের সৃষ্ট ও আয়ত্তাধীন রাজত্ব নিয়ে আলাদা আলাদা হয়ে যেতো। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহ-ও নেই; (যদি অন্য ইলাহ থাকতো) তাহলে প্রত্যেক ইলাহ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে অবশ্যই পৃথক হয়ে যেতো এবং একে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতো। আল্লাহ পবিত্র মহান (তিনি মুক্ত) তা থেকে যা তারা বলে।' (সূরা মুমিনুন: ৯১)। সুতরাং, এক ও অদ্বিতীয় সার্বভৌম, সর্বশক্তিমান স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকাটাই যুক্তি ও বুদ্ধির দাবি।
কিছু ধর্ম রয়েছে অজ্ঞেয়বাদে বিশ্বাসী, যেমন বৌদ্ধধর্ম ও কনফুসীয় ধর্ম। অজ্ঞেয়বাদ (অ্যাগনস্টিক) এর মূলকথা হলো— 'ঈশ্বর' সম্বন্ধে কোনো কিছু আমাদের জানা নেই। সুতরাং সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর অন্তরালে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না— এটা হলো অজ্ঞেয়বাদের ধারণা। তারা 'স্রষ্টার'-এর অস্তিত্ব স্বীকারও করে না আবার অস্বীকারও করে না। অপর কিছু ধর্ম আছে যেমন জৈন ধর্ম — এগুলো নাস্তিক্যবাদী ধর্ম। এরা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।
একত্ববাদ: বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মই মূলত এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টায় বিশ্বাসী। সকল ধর্মগ্রন্থই একত্ববাদের কথা বলে অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় সত্য-স্রষ্টায় বিশ্বাস করে। এ একত্ববাদই ইসলামে 'তাওহীদ'।
মানুষ নিজেদের স্বার্থে ধর্মগ্রন্থে পরিবর্তন করেছে: প্রায় সব ধর্মগ্রন্থই কালের প্রবাহে তাদের অনুসারীদের নিজেদের স্বার্থে বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সকল ধর্মের মূল কথা বিকৃত হয়ে একত্ববাদ থেকে সর্বেশ্বরবাদে অথবা বহু ঈশ্বরবাদে পরিণত হয়েছে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে— 'সুতরাং আফসোস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ, যাতে এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য পেতে পারে। কাজেই তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য এবং তারা যা উপার্জন করছে তার জন্য।' (সূরা বাকারা: ৭৯)
ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসের মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ বা একত্ববাদ। যার অর্থ কেবল 'একেশ্বরবাদ' তথা কেবল এক-অদ্বিতীয় ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করাই নয়। 'তাওহীদ' আক্ষরিক অর্থে সংযোগ সাধন করাকে বলা হয়। 'তাওহীদ' অর্থ একত্বের সাথে দৃঢ় সংযোগ স্থাপন করা। তাওহীদ তিনটি শাখায় বিভক্ত— ক. তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ, খ. তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত এবং গ. তাওহীদ আল-ইবাদাহ।
তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ: তাওহীদের প্রথম শ্রেণী হলো তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ অর্থাৎ আল্লাহর প্রভুত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। মূল শব্দ 'রাব্বুন' থেকে 'রবূবীয়াহ' উদ্ভূত হয়েছে। এর অর্থ 'প্রভু' রক্ষাকারী ও প্রতিপালনকারী। সুতরাং 'তাওহীদ আর-রবূবীয়াহ্' অর্থ প্রভুত্বের একত্ব-কে দৃঢ়তার সাথে মেনে নেয়া। এটা এ মৌলিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, যখন কিছুই ছিল না তখন আল্লাহই সকল বস্তুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। একমাত্র আল্লাহ দুনিয়াতে অস্তিত্বশীল সব কিছুরই স্রষ্টা। বিশ্বে যা কিছু আছে এবং পুরো বিশ্বজগতের তিনি একক স্রষ্টা, প্রতিপালক এবং রক্ষাকারী। তবে এই সৃষ্টির প্রতি তাঁর কোনো মুখাপেক্ষিতা নেই।
তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত: তাওহীদের দ্বিতীয় শ্রেণী হলো— তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত অর্থাৎ আল্লাহর মূল সত্তা ও একক গুণাবলীতে বিশ্বাস। এর অর্থ হলো— আল্লাহর মূল নাম ও গুণবাচক নামসমূহের একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন। এ শ্রেণীর তাওহীদের পাঁচটি দিক রয়েছে— ক. আল্লাহ নিজে এবং তাঁর রাসূল যেসব নামে তাঁকে ডেকেছেন সে নামেই তাঁকে ডাকতে হবে। এসব নামসমূহের যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় দেয়া হয়েছে, তার বিপরীত বা অন্য কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য নয়। খ. আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে, যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তাঁকে কোনো নব উদ্ভাবিত মূল বা গুণবাচক নামে কখনো ডাকা যাবে না। গ. আল্লাহর গুণকে তাঁর সৃষ্টির গুণের সদৃশ মনে করা যাবে না। আমাদের অবশ্যই তাঁর সৃষ্টির গুণকে তাঁর গুণের সদৃশ বলে মনে করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকতে হবে। ঘ. আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'কোনো বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।' যদিও শোনা এবং দেখার ব্যাপার মানুষের সাথেও সংশ্লিষ্ট কিন্তু যখন তা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত হবে, তখন তার প্রকৃত রূপ কী হবে তা মানুষের জ্ঞানের আওতাধীন নয়। মানুষের শোনার জন্য কান, দেখার জন্য চোখ ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর মহান সত্তা সেসব সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। ঙ. আল্লাহর কোনো অনুপম ও অতুলনীয় গুণকে মানুষের সাথে সংযুক্ত করা তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চ. আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামে তাঁর সৃষ্টির নামকরণ করা যাবে না। আল্লাহর কোনো কোনো গুণবাচক নামকে অনির্দিষ্টভাবে 'আল' যোগ না করে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— 'রাউফ', 'রাহীম'।
তাওহীদ আল-ইবাদাহ: ক. 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' এর অর্থ ইবাদত-উপাসনার ক্ষেত্রেও আল্লাহর একত্ব সংরক্ষণ করতে হবে। 'ইবাদাহ' আরবি 'আব্দ' শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ দাস বা চাকর। আর 'ইবাদাহ' অর্থ দাসত্ব বা উপাসনা। 'সালাত' বা নামায হলো দাসত্বের একটি আনুষ্ঠানিক রূপ; কিন্তু এটাই একমাত্র রূপ নয়। ইসলামে 'ইবাদত' হলো— আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা। আর এ ইবাদতও কেবল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়। খ. তাওহীদের উপরোল্লিখিত তিনটি শাখাই যুগপৎ অবিচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাওহীদের প্রথমোক্ত দুটি শাখায় বিশ্বাস করা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি তৃতীয় শাখাকে তথা ইবাদতকে কার্যকর করা না হয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আপনি জিজ্ঞেস করুন, আসমান ও জমীন থেকে কে তোমাদেরকে রুজি দান করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে মৃত হতে জীবিতকে এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন এবং সকল বিষয়কে কে নিয়ন্ত্রিত করেন? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। আপনি বলুন তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না?' (সূরা ইউনুস: ৩১)। আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন— কে তাদের সৃষ্টি করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে— আল্লাহ। তবুও তারা উল্টো কোন্ দিকে চলছে? (সূরা যুখরুফ: ৮৭)। মক্কার বিধর্মীরা জানতো যে আল্লাহই তাদের সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক ও রিযিকদাতা। তবুও তারা মুসলিম ছিল না, কেননা তারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্য দেব-দেবীর পূজা করতো। আল্লাহ তাদের কুফফার তথা অবিশ্বাসী এবং মুশরিকিন তথা আল্লাহর সাথে অংশীবাদীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন— 'তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সাথে তাঁর সাথে শরিক ও সাব্যস্ত করে।' (সূরা ইউসুফ: ১০৬)। সুতরাং 'তাওহীদ আল-ইবাদাহ' তথা ইবাদতের ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অংশীবাদ কী: অংশীবাদকে ইসলামে 'শিরক' বলা হয়। আক্ষরিক অর্থে 'শিরক' হলো অংশীদার সাব্যস্ত করা। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা প্রতিমাপূজার সমতুল্য। এটি স্রষ্টার একত্ববাদ বা তাওহীদের পরিপন্থী।
অংশীবাদীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না: কুরআন মাজিদে সূরা নিসায় সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। অনন্তর যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করে সে মহাপাপ করে।' (সূরা নিসা: ৪৮)। সূরা নিসায় একই কথা পুনরুক্ত হয়েছে— 'নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, তিনি ঐ শিরক ছাড়া সব পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, অনন্তর কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হবে।' (সূরা নিসা: ১১৬)
অংশীবাদ নিশ্চিতভাবে জাহান্নামে নিয়ে যায়: কুরআন মাজিদে সূরা মায়িদায় বলা হয়েছে— 'নিঃসন্দেহে তারা কুফরী করেছে, যারা বলে মরিয়ম-পুত্র মসীহই আল্লাহ, অথচ মসীহ বলেছিল, হে বনি ঈসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর যিনি আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। নিশ্চয় যে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।' (সূরা মায়িদা: ७২)
একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করতে হবে: প্রধান ধর্মসমূহের ধর্মীয় গ্রন্থের আলোকে আমরা স্রষ্টার একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছি। জানতে পেরেছি তাঁর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সম্পর্কে। তাই একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদের সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে— 'আপনি বলে দিন! হে আহলে কিতাব! এসো সেই ঐক্যবাণীর ভিত্তিতে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন; তা হলো আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি এবং কোন কিছুকেই যেন তার শরীক সাব্যস্ত না করি, আর আল্লাহকে ত্যাগ করে আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করি। তৎপর যদি তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, তবে তোমরা তাদেরকে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা তো মুসলিম।'