📄 খ্রিস্টধর্মে স্রষ্টা
খ্রিস্টধর্ম একটি সেমিটিক ধর্ম। খ্রিস্টানদের দাবি অনুসারে সারা বিশ্বে রয়েছে এ ধর্মের প্রায় দুই শত কোটি অনুসারী। এ ধর্মের নামকরণ করা হয়েছে যীশু খ্রিস্ট তথা ঈসা (আ) এর নামানুসারে। ঈসা (আ) ইসলাম ধর্মেও অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। খ্রিস্ট ধর্ম ছাড়া অন্য সকল ধর্মমতের মধ্যে একমাত্র ইসলামই ঈসা (আ) এর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তাই খ্রিস্টধর্মে ঈশ্বরের ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করার আগে ইসলামে ঈসা (আ) এর মর্যাদা আলোচনার দাবী রাখে।
ইসলামে ঈসা (আ) এর মর্যাদা: অ-খ্রিস্টান ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলাম-ই একমাত্র ধর্ম যাতে ঈসা (আ) এর ওপর বিশ্বাস পোষণ করাকে ঈমান তথা বিশ্বাসের অপরিহার্য মৌলিক নীতি হিসেবে মনে করা হয়। ঈসা (আ) কে নবী হিসেবে বিশ্বাস না করে কোনো মুসলিম-ই পুরোপুরি মুসলমান হতে পারে না। কেননা— আমরা বিশ্বাস করি, তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন মর্যাদাবান নবী ছিলেন, যার ওপর কিতাব নাযিল হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কোনো পুরুষের সংস্রব ছাড়া অলৌকিকভাবে পিতৃবিহীন জন্মগ্রহণ করেছেন, যা আধুনিককালের অনেক খ্রিস্টান মানতে চান না। আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর হুকুমে তিনি মৃতকে জীবন দান করতে পারতেন। আমরা বিশ্বাস করি তিনি আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধকে দৃষ্টিদান করতে এবং কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য দানে সক্ষম ছিলেন।
মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ধারণাগত পার্থক্য: মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয়ই যদি ঈসা (আ) কে ভালোবাসে ও সম্মান করে, তাহলে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়— প্রসঙ্গত এ প্রশ্ন আসতেই পারে। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা ঈসা (আ) কে ঐশ্বরিক গুণসম্পন্ন সত্তা ও উপাস্যের যোগ্য মনে করে, যা ইসলাম স্বীকার করে না। খ্রিস্টধর্মের পবিত্র গ্রন্থ অধ্যয়নে জানা যায় যে, ঈসা (আ) কখনো নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেননি। মূলত বাইবেলের নতুন নিয়মে এ জাতীয় দাবি সম্বলিত একটি বাক্যও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তিনি বলেছেন, 'আমি ঈশ্বর' অথবা 'আমাকে উপাসনা করো।' বরং বাইবেলে এমন একাধিক বাক্য রয়েছে যা এর বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। দেখা যাক বাইবেলে উদ্ধৃত তার বাক্যগুলোতে কী আছে— "My Father is Greater than I." অর্থ— "আমার পিতা আমার চেয়ে মহান।" (যোহন ১৪: ২৮)। "My Father is Greater than all." অর্থ— “আমার পিতা সকলের চেয়ে মহান।" (যোহন ১০: ২৯)। "... I cast out devils by the spirit of God..." অর্থ— "... আমি সকল মন্দ আত্মাকে তাড়াই ঈশ্বরের শক্তিতে...।" (মথি ১২: ২৮)। "... With the finger of God cast out devils..." অর্থ— "... ঈশ্বরের সাহায্যেই আমি মন্দ দূর করি।" (লুক ১১: ২০)।
যীশু খ্রিস্টের মিশন: যীশু কখনো নিজের ঐশ্বরিকতার দাবি করেননি। অর্থাৎ তিনি নিজেকে 'ঈশ্বর' বা 'ঈশ্বরের পুত্র' বলে দাবি করেননি। তিনি তাঁর মিশনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার করে বলেছেন। ইতিপূর্বের কিতাব তাওরাতকে পূর্ণতা দানের জন্য ঈশ্বর তাকে পাঠিয়েছেন, যা ইয়াহুদিদের হাতে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। মথি লিখিত সুসমাচারের (Gospel) নিম্নোক্ত বর্ণনায় ঈসা (আ) এর নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিতে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুঠে উঠেছে— "তোমরা মনে করো না যে, আমি আইন তথা মূসা (আ) এর তাওরাতের বিধান অথবা নবীদের বিধান ধ্বংস করতে এসেছি। আমি ধ্বংস করতে আসিনি, বরং সেসব পূর্ণ করতে এসেছি। আমি তোমাদেরকে সত্যই বলছি— আকাশ ও পৃথিবী যতদিন চলতে থাকবে ততদিন সেই বিধানের কোনো একটি মাত্রা বা একটি বিন্দুও মুছে যাবে না, যতক্ষণ না পরিপূর্ণ হয়।" "আমি নিজ থেকে কিছুই করতে পারি না; আমি যেমন শুনি তেমন-ই বিচার করি এবং আমার বিচার সঠিক। কেননা আমি নিজের ইচ্ছায় কিছু করতে চাই না; বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, সেই পিতার ইচ্ছা অনুসারেই আমি কাজ করতে চাই।" "অতঃপর যে কেউ এসব বিধানের ছোট একটি বিধানও অমান্য করবে এবং মানুষকে তা অমান্য করতে শিক্ষা দেবে, তাকে স্বর্গরাজ্যে সবচেয়ে ছোট মনে করা হবে। অপরদিকে যে কেউ বিধানসমূহ পালন করবে এবং মানুষকে তা পালন করতে শিক্ষা দেবে, তাকে স্বর্গরাজ্যে অত্যন্ত মর্যাদাবান মনে করা হবে।" (বাইবেল, মথি ৫: ১৭-২০)।
যীশু স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত পুরুষ: বাইবেল বেশ কিছু শ্লোকে যীশুর মিশনের ঐশ্বরিক প্রকৃতি সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। নিম্নে সূত্রসহ উদ্ধৃতিগুলো উপস্থাপন করা হলো— "... and the word which ye hear is not mine, but the Father's which has sent me." অর্থ: "... এবং তোমরা যা আমার থেকে শোনো, তা-তো আমার কথা নয়, বরং সেসব কথা পিতার যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন।” (বাইবেল যোহন ১৪: ২৪)। "And this is life eternal, that they might know thee, the only true God and Jesus christ, whom thou has sent." অর্থ: "এবং এটাই শাশ্বত জীবন যে, তারা তোমাকে তথা সত্য ঈশ্বরকে আর তুমি যাকে পাঠিয়েছ সেই যীশু খ্রিস্টকে জানবে।" (বাইবেল যোহন ১৭: ৩)।
যীশু তার ওপর দেবত্ব আরোপের বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন: বাইবেলে উল্লিখিত নিচের ঘটনার প্রতি লক্ষ করলে তা যে কেউ বুঝতে সক্ষম। বাইবেলে বলা হয়েছে— "And behold, one came and said unto him, Good master, what good thing shall I do, that I may have eternal life?" And he said unto him "Why callest thou me good? There is none good but one, that is God; but if thou will enters into life, keeps the commandments." অর্থ: "এবং দেখো, একজন লোক আসলো এবং যীশুকে বললো— ওহে ভালো প্রভু! আমাকে এমন ভালো কাজ সম্পর্কে বলুন, যা করলে আমি অনন্ত জীবন লাভ করতে পারবো।' যীশু তাকে বললেন, "আমাকে ভালো বলছো কেন, একক ছাড়া কেউ ভালো নেই, আর তিনি হলেন 'ঈশ্বর'; তুমি যদি অনন্ত জীবন লাভ করতে চাও, তবে তাঁর সব আদেশ পালন করো।' বাইবেলে উপস্থাপিত উপরোক্ত ঘটনাটি যীশুর 'ঈশ্বর' হওয়া সংক্রান্ত খ্রিস্টানদের মতবাদ এবং যীশুর আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাদের পরিত্রাণ লাভের মতবাদ বাইবেল প্রত্যাখ্যান করেছে। মথির বর্ণনা অনুসারে যীশু মানবজাতির চূড়ান্ত মুক্তি লাভের জন্য স্রষ্টার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার ওপর জোর দিয়েছেন। (বাইবেল; মথি ৫: ১৭-২০ দ্রষ্টব্য)।
যীশু স্রষ্টার মনোনীত ব্যক্তি: বাইবেলের নিম্নোক্ত বিবরণ ইসলামি এ বিশ্বাসকে সমর্থন করে যে যীশু আল্লাহর নবী ছিলেন— "Ye men of Israel, hear these words: Jesus of Nazareth, man approved of God among you by miracles and wonders and signs, which God did by him in the midst of you, as ye yourselves also know." অর্থ: "হে ইসরাঈলীরা এ কথাগুলো শোনো: নাজারাথবাসী যীশু ঈশ্বরের মনোনীত একজন মানুষ যিনি ঈশ্বরের অলৌকিক, আশ্চর্যজনক নিদর্শন। ঈশ্বর তার দ্বারা যা করেছেন তা তোমাদের মধ্য থেকেই করেছেন যা তোমরা নিজেরাই জানো।'
ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়: খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ বাইবেল কখনো সমর্থন করে না। একদা বাইবেলের একজন লিপিকার যীশুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ঈশ্বরের সর্বপ্রথম নির্দেশ কোনটি? এর উত্তরে তিনি তা-ই পুনরুক্তি করলেন যা মূসা (আ) বলেছিলেন— 'শামা ইসরাঈলু আদোনাই ইলা হাইনো আদনা ইখাদ'— এটা একটা হিব্রু উদ্ধৃতি যার অর্থ হলো— 'হে ইসরাঈলীরা শোনো। আমাদের প্রভু ঈশ্বর একক প্রভু।' (মার্ক ১২: ২৯)
📄 ইসলামে আল্লাহর অস্তিত্ব
কুরআন ও অপরাপর আসমানী কিতাবসমূহে মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট ধারণা দেয়া রয়েছে। সারা বিশ্বে ইসলামের প্রায় একশত বিশ কোটি অনুসারী রয়েছে। এটি একটি সেমিটিক ধর্ম। 'ইসলাম' অর্থ আল্লাহর ইচ্ছার নিকট আত্মসমর্পণ। মুসলিমজাতি কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে গ্রহণ করে, যা হযরত মুহাম্মদ (স) এর ওপর নাযিল করা হয়েছিল। ইসলাম বলে যে, আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে একত্ববাদের দাওয়াত এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জবাবদিহিতার বার্তাসহ তাওহীদের নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। সুতরাং, ইসলাম অতীতকালের সকল নবী-রাসূল তথা আদম (আ) থেকে শুরু করে যত নবী-রাসূল দুনিয়াতে এসেছেন তাদের সকলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করাকে তার বিশ্বাসের মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন— হযরত নূহ (আ), ইবরাহীম (আ), ইসমাঈল (আ), ইসহাক (আ), ইয়াকুব (আ), মূসা (আ), দাউদ (আ), ইয়াহইয়া (আ) ও ঈসা (আ) এবং অন্য সকল আম্বিয়ায়ে কিরাম।
আল্লাহর সংক্ষিপ্ত পরিচয়: কুরআন মাজীদের ১১২ নং সূরা ইখলাসের চারটি আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হয়েছে— ১. قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدُ - বলুন, তিনি আল্লাহ একক (অদ্বিতীয়)। ২. اللَّهُ الصَّمَدُ - আল্লাহ মুখাপেক্ষিহীন। ৩. لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ - তিনি কাউকে জন্মদান করেননি, কারো থেকে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। ৪. وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدًا - আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা ইখলাস: ১-৪)। সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত 'আস-সামাদ' আরবি শব্দটির যথার্থ অনুবাদ একটু কঠিন। তবে এর মূল অর্থের কাছাকাছি অর্থ হলো Absolute existence অর্থাৎ পরম অস্তিত্ব। এই বিশেষণটি একমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; কেননা অন্য সকল কিছুর অস্তিত্ব অস্থায়ী ও শর্তসাপেক্ষ। এ শব্দ দ্বারা এ অর্থ প্রকাশিত হয় যে, আল্লাহ কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর নির্ভরশীল নন বরং সকল ব্যক্তি বা বস্তু তাঁর ওপরই নির্ভরশীল এবং তাঁরই মুখাপেক্ষী।
📄 স্রষ্টার মৌলিক বৈশিষ্ট্য
ভারতীয় উপমহাদেশকে বলা হয় মানব-ঈশ্বরের দেশ। কারণ, এখানে রয়েছে অগণিত তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরু। এ সকল গুরু এবং বাবার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা জানি, মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ করাকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না বরং ঘৃণা করে। মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান বোঝার জন্য এরূপ এক মানব-ঈশ্বর 'ভগবান রজনীশ' সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
মানুষের স্রষ্টা হওয়া অসম্ভব: রজনীশ হলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক গুরু। ১৯৮১ সালের মে মাসে তিনি আমেরিকা গমন করেন এবং সেখানে 'রজনীশপূরম' নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি পাশ্চাত্যের রোষানলে পড়েন ও গ্রেফতার হন। পরিশেষে তিনি সে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার জন্মভূমি 'পুনা'-তে 'ওশো' নামে আরেকটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ওশোতে রজনীশের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি ছিলেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মানবরূপ তথা অবতার। একজন পর্যটক 'ওশো' জনপদে ভ্রমণ করলে দেখতে পাবে তাঁর অনুসারীরা তাঁর সমাধি-ফলকে পাথরে খোদাই করে লিখে রেখেছে— 'ওশো রজনীশ কখনো জন্মগ্রহণ করেননি। কখনো মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি কেবল পৃথিবী গ্রহটি পরিদর্শন করে গেছেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৩১ সাল থেকে ১৯ জানুয়ারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত'। সম্ভবত তারা এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছে যে, তাঁকে পৃথিবীর ২১টি বিভিন্ন দেশের ভিসা দেয়া হয়নি। রজনীশের অনুসারীরা এটাকে কোনো সমস্যা হিসেবে মনে করেনি যে তারা যাকে 'পৃথিবী ভ্রমণকারী অবতার' বলে বিশ্বাস করে তাকে কোন দেশে প্রবেশ করার জন্য সে দেশের অনুমতি তথা ভিসার প্রয়োজন হয়। গ্রীসের আর্চ বিশপ বলেছেন, রজনীশ যদি সেদেশ থেকে বের হয়ে না যায় তাহলে তারা তার শিষ্য-সাগরেদসহ রজনীশের বাসস্থান জ্বালিয়ে দেবেন।
এবার ভগবান রজনীশের 'অবতার' হওয়ার দাবিকে সূরা ইখলাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করে দেখা যাক— প্রথম মানদণ্ড— "বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।" রজনীশ কি এক ও অদ্বিতীয়? এর উত্তরে বলতে হবে— 'না'। রজনীশের মতো অনেকেই ঈশ্বরের অবতার হওয়ার দাবি করেছে। রজনীশের কয়েকজন শিষ্য এখনো এ দাবির উপর অটল রয়েছে যে রজনীশ এক ও অদ্বিতীয়।
দ্বিতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ পরম অস্তিত্বশীল ও মুখাপেক্ষীহীন।' নিশ্চয়ই রজনীশ পরম অস্তিত্বশীল ছিলেন না। কেননা তিনি ১৯৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। রজনীশের জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও পুরাতন শিরদাঁড়ার ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকান সরকার তাঁকে কারাগারে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করেছেন এবং তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। ভেবে দেখুন, সর্বশক্তিমান ভগবানকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। সুতরাং, রজনীশ যেমন চিরঞ্জীব ছিলেন না, তেমনি তিনি মুখাপেক্ষীহীনও ছিলেন না।
তৃতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্মগ্রহণও করেননি।' আমরা জানি, রজনীশ ভারতের জবলপুরে এক পিতার ঔরসে ও মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁরা উভয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
চতুর্থ মানদণ্ড— 'আল্লাহর সদৃশ সমকক্ষ কেউ নেই, কিছু নেই।' ঈশ্বরত্বের দাবিদার কাউকে যদি কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনা করা সম্ভব হয়, তাহলে তার ঈশ্বরত্ব তাৎক্ষণিক বাতিল বলে গণ্য হবে। সত্যিকার একক আল্লাহর কোনো কাল্পনিক আকার-আকৃতি কল্পনা করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। আমরা জানি, রজনীশ রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নন। তিনি ছিলেন শুভ্র লম্বা দাড়ির অধিকারী। তার ছিল দুটি চোখ, দুটি কান, একটি নাক, একটি মুখ। রজনীশের ছবি সম্বলিত পোস্টার প্রচুর পাওয়া যায়। এতে এটা সহজেই ধারণা করা যায় যে তিনি 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' হতে পারেন না। একইভাবে যে ব্যক্তিটি শারীরিক শক্তিমত্তা হেতু 'মিস্টার ইউনিভার্স' উপাধিপ্রাপ্ত তাঁকেও কেউ 'ঈশ্বর' হিসেবে কল্পনা করতে পারে বটে, কিন্তু সূরা ইখলাসে বর্ণিত ৪টি মানদণ্ডের আলোকে একমাত্র একক অদ্বিতীয় 'আল্লাহ' ছাড়া কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেন না।
স্রষ্টা একক সত্তা: একক সৃষ্টিকর্তাকে ইংরেজি শব্দ 'গড' এর পরিবর্তে 'আল্লাহ' নামেই মুসলমানরা ডাকে। 'গড' এর চেয়ে আরবি শব্দ 'আল্লাহ'-ই সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও যথার্থ। 'গড' শব্দের সাথে 'এস' ইংরেজি বর্ণ যুক্ত করে তাকে বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করা যায়; কিন্তু 'আল্লাহ' একক সত্তা। এ শব্দের কোনো বহুবচন হয় না। আবার 'গড' এর সাথে 'ই-এস' ইংরেজি বর্ণ যোগ করলে তা স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ নেই। 'আল্লাহ' শব্দের লিঙ্গান্তর হয় না। 'গড' শব্দের আগে Tin শব্দাংশ যোগ করলে তার অর্থ দাঁড়ায় 'মিথ্যা উপাস্য'। 'আল্লাহ' শব্দটি এমন এক অসাধারণ ও অদ্বিতীয় শব্দ যা সম্পর্কে কল্পনা করে কোনো আকৃতি বা আকার ধারণা করা বা তা নিয়ে কোনো প্রকার যথেচ্ছাচার করা যায় না। এসব কারণে মুসলমান এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে 'আল্লাহ' নামেই ডাকে। তবে যেহেতু এই বইয়ের পাঠক বা সম্বোধিত মানুষ সাধারণভাবে মুসলমান ও অমুসলমান উভয় প্রকার রয়েছে, তাই আমি এতে 'আল্লাহ' শব্দের বদলে 'গড' শব্দটি-ই অনেক জায়গায় ব্যবহার করেছি।
স্রষ্টা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন না: গভীরভাবে চিন্তা না করেই কিছু লোক যুক্তি পেশ করে যে, ঈশ্বর যদি সবকিছু করতে সক্ষম, তবে তিনি মানব আকৃতি ধারণ করতে পারবেন না কেন? তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তিনি মানব-আকৃতি ধারণ করতে পারেন; কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলে 'ঈশ্বর' আর ঈশ্বর থাকতে পারেন না। কেননা 'ঈশ্বর' আর মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বিপরীতধর্মী। একই সত্তার মধ্যে ঈশ্বরত্ব ও মানবত্বের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় হতে পারে না। 'অবতারবাদ' বা ঈশ্বরের মানবাকৃতি ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ কোনো কোনো ধর্মে থাকলেও তা অবাস্তব। আমরা জানি, 'ঈশ্বর' অবিনশ্বর কিন্তু মানুষ নশ্বর। মানব-ঈশ্বর নামক এমন কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই যার মধ্যে অবিনশ্বর ঐশ্বরিক সত্তা নশ্বর মানবদেহ ধারণ করবে। এমন ধারণা বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থহীন ও অযৌক্তিক।
ঈশ্বর-এর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অনাদি ও অনন্ত। অন্যদিকে মানুষের শুরু যেমন আছে তেমনি শেষও আছে। এমন কোনো সত্তা মানুষের মধ্যে নেই যার মধ্যে শুরু না থাকা এবং শুরু থাকা উভয়ই বিদ্যমান আছে। মানুষের শেষ আছে, কারণ মানুষ মরণশীল। এমন কোনো মানুষ নেই যার মধ্যে অবিনশ্বরতা ও নশ্বরতা উভয় গুণের সমাবেশ পাওয়া যাবে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পানাহারের প্রয়োজন নেই, কিন্তু মানুষকে তার জীবন কর্মচঞ্চল রাখার জন্য পানাহার করতে হয়। অতএব স্রষ্টা বা ঈশ্বর বা আল্লাহর মানুরূপ ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ একটি ভ্রান্ত মতবাদ।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তিনি খাদ্য দান করেন, কিন্তু তিনি খাদ্যগ্রহণ করেন না।' (সূরা আনআম: ১৪)। অর্থাৎ আল্লাহর কখনো বিশ্রাম বা নিদ্রার প্রয়োজন হয় না; অথচ মানুষ বিশ্রাম ও নিদ্রা ছাড়া চলতে পারে না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— 'আল্লাহ— তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না তন্দ্রা ও নিদ্রা। আসমানে ও জমিনে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর।' (সূরা বাকারা: ২৫৫)
মানব-ঈশ্বরের উপাসনা অযৌক্তিক: 'ঈশ্বরে'র মানবরূপ ধারণ তথা অবতারবাদ যেহেতু গ্রহণীয় নয় তাই আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে একমত হবো যে, কোনো মানুষের উপাসনা করা অযৌক্তিক। এরূপ কর্মকাণ্ড নিষ্ফল ছাড়া আর কিছু নয়। ঈশ্বর যদি মানব-আকৃতি ধারণ করেন তাহলে তিনি অবশ্যই ঐশ্বরিক গুণাবলি ত্যাগ করেই মানবরূপ ধারণ করবেন এবং তিনি মানুষের মধ্যকার সমস্ত গুণের অধিকারী হবেন। উদাহরণস্বরূপ ধরুন, একজন মেধাবী অধ্যাপক যদি দুর্ঘটনায় পড়ে তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে এ অবস্থায় তার ছাত্রদের পক্ষে তাঁর নিকট তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর শিক্ষা গ্রহণের কাজ চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই সঙ্গত কারণেই বলা যায়, ঈশ্বর যদি মানবরূপ ধারণ করেন, তাহলে এ মানুষটি আর কখনো তার পূর্বরূপ ঈশ্বরত্বে ফিরে যেতে পারবেন না। কেননা মানুষ তার প্রকৃতি অনুযায়ী ঈশ্বরে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং মানব-ঈশ্বর এর উপাসনা করা অযৌক্তিক এবং তা অবশ্যই নিষ্ফল। এ জন্যই কুরআন মাজীদে সর্বপ্রকার মানব-ঈশ্বর বা অবতারবাদের অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিরূপ নির্ধারণের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে— 'কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।' (সূরা শুরা: ১১)
স্রষ্টা অন্যায় ও অশোভন কাজ করেন না: 'ঈশ্বর' সর্বশক্তিমান যিনি ন্যায়বিচার, করুণা, সত্য, অনন্ত ও অনিন্দ্যনীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি কখনো এমন সৃষ্টিসুলভ কাজ করতে পারেন না, যা তাঁর সত্তা ও বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। তদ্রূপ তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার মিথ্যা কথা বলার ধারণাও করা যায় না। একইভাবে অন্যায়, ভুল, কোনো বিষয়ে স্মৃতিভ্রম ইত্যাদি যাবতীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশ পাওয়ার কথাও কল্পনা করা যায় না। তবে 'ঈশ্বর' যদি ইচ্ছা করেন তাহলে অন্যায় করতে পারেন; কিন্তু তিনি কখনো তা করেন না, করবেনও না, যেহেতু এটা অন্যায় সেহেতু এমন অন্যায় কাজ তাঁর জন্য অশোভন। এ সম্পর্কে মানবজাতির জ্ঞানের বাহক আল কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কখনো এক বিন্দু পরিমাণও যুলুম করেন না।' (সূরা নিসা: ৪০)। ঈশ্বর চাইলে অত্যাচারী হতে পারেন কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি অন্যায়কারী হবেন সেই মুহূর্তেই তিনি হারাবেন তাঁর ঐশ্বরিকতা।
ভুলে যাওয়া ও ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য নয়: ঈশ্বর কখনো ভুলে যেতে পারেন না। কেননা ভুলে যাওয়া স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার উদাহরণ। একইরূপে ঈশ্বর ভুল করতে পারেন না। কেননা ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মানবজাতির পথ প্রদর্শক: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আমার প্রভু বিভ্রান্তও হন না, ভুলেও যান না।' (সূরা তা-হা: ৫২)। ঈশ্বর ঈশ্বরসুলভ কাজই করেন। ঈশ্বরের সবকিছু করার ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর সম্পর্কে ইসলামের ধারণা হলো— 'ঈশ্বরের ক্ষমতা সবকিছুর ওপর বিরাজমান।' পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ অবশ্যই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।' (আল-কুরআন- ২:১০৬, ২:১০৯, ২: ২৮৪, ৩:২৯, ১৬: ৭৭, ৩৫: ১)। কুরআন মাজিদ আরো বলে— 'তিনি যা চান তা-ই করেন।' (সূরা বুরূজ: ১৬)।
একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাঁর সত্তা ও গুণাবলির সাথে সামঞ্জস্যশীল কাজেরই ইচ্ছা করেন এবং তা সম্পাদন করেন। অন্যায় এবং তাঁর সত্তা ও গুণাবলির বিপরীত কাজ তিনি করেন না। অনেক ধর্মই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো পর্যায়ে অবতারবাদে বিশ্বাস করে, অর্থাৎ ঈশ্বর মানব আকৃতি ধারণ করেন। তাদের যুক্তি হলো— সর্বশক্তিমান 'ঈশ্বর' অত্যন্ত পবিত্র, সত্য, পরিপূর্ণ ও নিষ্কলুষ। তাই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সীমাবদ্ধতা ও অনুভূতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। অতএব, মানুষের জন্য নীতি-নিয়ম প্রণয়নের লক্ষ্যে পৃথিবীতে মানবরূপে আবির্ভূত হন। যুগে যুগে এ প্রতারণাপূর্ণ যুক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এ যুক্তিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক এটা কতটুকু যৌক্তিক।
স্রষ্টাই দিকনির্দেশক ও বিধিমালা প্রণেতা: মহান স্রষ্টা আমাদেরকে মানবীয় গুণাবলী ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে আমরা বিভিন্ন কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন ধরনের সহায়ক হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে নিয়েছি। যেমন— টেপরেকর্ডার। টেপরেকর্ডার এমনই একটি যন্ত্র যা শিল্প-কারখানায় বহুল পরিমাণে তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু এটা কি কখনো বলা হয়েছে যে, টেপরেকর্ডারের কী ভালো, আর কী মন্দ, তা জানার জন্য প্রস্তুতকারককে টেপরেকর্ডারের রূপ ধারণ করতে হবে? বরং এটাই স্বাভাবিক যে, প্রস্তুতকারক তার এ যন্ত্রের উৎপাদন ও চালানোর নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধিমালা সম্বলিত একটি ক্যাটালগ (ম্যানুয়েল) তৈরি করবেন। যার মাধ্যমে এ যন্ত্রের ব্যবহারকারীরা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নিয়মাবলি পেতে পারে। এ পুস্তকের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া থাকবে যে, এ যন্ত্র কী পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, আর কীভাবে ব্যবহার করলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষকে যদি তেমনি একটি যন্ত্র বলে ধরে নেন, তাহলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই দুনিয়াতে এসে মানুষের জন্য কী ভাল আর কী মন্দ তা জানার। তবে এটা নিশ্চিত যে, তিনি মানবজাতির জন্য নির্দেশিকা গ্রন্থ (ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়েল) দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন-ই মানবজাতির জন্য সেই গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা শেষ বিচারের দিন তাঁর এ সুনিপুণ সৃষ্টির কাজ-কর্মের হিসাব নেবেন। সুতরাং এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, তিনি যে বিষয়ে হিসাব নেবেন, সে বিষয়ে পূর্ণ নির্দেশিকা আগেই পাঠিয়ে দেবেন। তাই তিনি পবিত্র কুরআন নাযিল করে দুনিয়ার জীবনে মানুষের কী করণীয় আর কী বর্জনীয় তা যথারীতি জানিয়ে দিয়েছেন।
স্রষ্টা তাঁর রাসূল মনোনীত করেন: মানবজাতিকে তাঁর কল্যাণের জন্য প্রদত্ত বিধি-বিধান জানিয়ে দেয়ার জন্য স্রষ্টার স্বয়ং দুনিয়াতে আসার প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠির মধ্য থেকে বাছাই করা মানুষদের মাধ্যমে তাঁর আসমানি বিধি-বিধান দুনিয়াতে মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। স্রষ্টার বাছাই করা ও মনোনীত এসকল মানুষদের 'বার্তাবাহক' বা 'নবী-রাসূল বলা হয়।
'অন্ধ' ও 'বধির' লোকেরা শিক্ষা নেয় না: অবাক ব্যাপার যে, অবতারবাদী দর্শনের অসম্ভাব্যতা ও অযৌক্তিতা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অনেক অনুসারীরা নিজেরাও এ অবতারবাদে বিশ্বাস করে এবং অন্যদেরকেও এটা শিক্ষা দেয়। এটা কি মানুষের বুদ্ধিমত্তা (ইন্টেলিজেন্স) এবং যিনি মানুষকে এ বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন তাঁর প্রতি অবমাননা প্রদর্শন নয়? এ সমস্ত লোকই প্রকৃতপক্ষে 'অন্ধ' ও 'বধির', যদিও আল্লাহ তাদেরকে শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয় দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসবে না।' (সূরা বাকারা: ১৮)। মথি বাইবেলের লিখিত সুসমাচারে একই কথা বলেছে— অর্থ: তারা দেখেও দেখে না এবং শুনেও শোনে না, তারা বুঝতেও সক্ষম নয়। (মথি ১৩: ১৩)। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ 'ঋগবেদে'ও একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে— অর্থ: এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বাণীসমূহ দেখে, প্রকৃতপক্ষে তারা দেখে না; এমন কিছু লোকও রয়েছে যারা এ বাণীসমূহ শোনে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শোনে না। (ঋগবেদ ১০:৭১:৪)। পবিত্র গ্রন্থের এসব বাণী তাদের পাঠকদের বলে যে, যদিও স্রষ্টা বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তবুও এরা বিচ্যুতই হয়ে যাবে সত্য থেকে।
ভারতীয় উপমহাদেশকে বলা হয় মানব-ঈশ্বরের দেশ। কারণ, এখানে রয়েছে অগণিত তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরু। এ সকল গুরু এবং বাবার অনুসারীরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা জানি, মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ করাকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না বরং ঘৃণা করে। মানুষের প্রতি দেবত্ব আরোপ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান বোঝার জন্য এরূপ এক মানব-ঈশ্বর 'ভগবান রজনীশ' সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
মানুষের স্রষ্টা হওয়া অসম্ভব: রজনীশ হলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্মিক গুরু। ১৯৮১ সালের মে মাসে তিনি আমেরিকা গমন করেন এবং সেখানে 'রজনীশপূরম' নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি পাশ্চাত্যের রোষানলে পড়েন ও গ্রেফতার হন। পরিশেষে তিনি সে দেশ থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার জন্মভূমি 'পুনা'-তে 'ওশো' নামে আরেকটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ওশোতে রজনীশের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি ছিলেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মানবরূপ তথা অবতার। একজন পর্যটক 'ওশো' জনপদে ভ্রমণ করলে দেখতে পাবে তাঁর অনুসারীরা তাঁর সমাধি-ফলকে পাথরে খোদাই করে লিখে রেখেছে— 'ওশো রজনীশ কখনো জন্মগ্রহণ করেননি। কখনো মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি কেবল পৃথিবী গ্রহটি পরিদর্শন করে গেছেন ১১ ডিসেম্বর ১৯৩১ সাল থেকে ১৯ জানুয়ারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত'। সম্ভবত তারা এটা উল্লেখ করতে ভুলে গেছে যে, তাঁকে পৃথিবীর ২১টি বিভিন্ন দেশের ভিসা দেয়া হয়নি। রজনীশের অনুসারীরা এটাকে কোনো সমস্যা হিসেবে মনে করেনি যে তারা যাকে 'পৃথিবী ভ্রমণকারী অবতার' বলে বিশ্বাস করে তাকে কোন দেশে প্রবেশ করার জন্য সে দেশের অনুমতি তথা ভিসার প্রয়োজন হয়। গ্রীসের আর্চ বিশপ বলেছেন, রজনীশ যদি সেদেশ থেকে বের হয়ে না যায় তাহলে তারা তার শিষ্য-সাগরেদসহ রজনীশের বাসস্থান জ্বালিয়ে দেবেন।
এবার ভগবান রজনীশের 'অবতার' হওয়ার দাবিকে সূরা ইখলাসের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করে দেখা যাক— প্রথম মানদণ্ড— "বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।" রজনীশ কি এক ও অদ্বিতীয়? এর উত্তরে বলতে হবে— 'না'। রজনীশের মতো অনেকেই ঈশ্বরের অবতার হওয়ার দাবি করেছে। রজনীশের কয়েকজন শিষ্য এখনো এ দাবির উপর অটল রয়েছে যে রজনীশ এক ও অদ্বিতীয়।
দ্বিতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ পরম অস্তিত্বশীল ও মুখাপেক্ষীহীন।' নিশ্চয়ই রজনীশ পরম অস্তিত্বশীল ছিলেন না। কেননা তিনি ১৯৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। রজনীশের জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও পুরাতন শিরদাঁড়ার ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকান সরকার তাঁকে কারাগারে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করেছেন এবং তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। ভেবে দেখুন, সর্বশক্তিমান ভগবানকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। সুতরাং, রজনীশ যেমন চিরঞ্জীব ছিলেন না, তেমনি তিনি মুখাপেক্ষীহীনও ছিলেন না।
তৃতীয় মানদণ্ড— 'আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্মগ্রহণও করেননি।' আমরা জানি, রজনীশ ভারতের জবলপুরে এক পিতার ঔরসে ও মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁরা উভয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
চতুর্থ মানদণ্ড— 'আল্লাহর সদৃশ সমকক্ষ কেউ নেই, কিছু নেই।' ঈশ্বরত্বের দাবিদার কাউকে যদি কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনা করা সম্ভব হয়, তাহলে তার ঈশ্বরত্ব তাৎক্ষণিক বাতিল বলে গণ্য হবে। সত্যিকার একক আল্লাহর কোনো কাল্পনিক আকার-আকৃতি কল্পনা করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। আমরা জানি, রজনীশ রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু নন। তিনি ছিলেন শুভ্র লম্বা দাড়ির অধিকারী। তার ছিল দুটি চোখ, দুটি কান, একটি নাক, একটি মুখ। রজনীশের ছবি সম্বলিত পোস্টার প্রচুর পাওয়া যায়। এতে এটা সহজেই ধারণা করা যায় যে তিনি 'ঈশ্বর' বা 'ভগবান' হতে পারেন না। একইভাবে যে ব্যক্তিটি শারীরিক শক্তিমত্তা হেতু 'মিস্টার ইউনিভার্স' উপাধিপ্রাপ্ত তাঁকেও কেউ 'ঈশ্বর' হিসেবে কল্পনা করতে পারে বটে, কিন্তু সূরা ইখলাসে বর্ণিত ৪টি মানদণ্ডের আলোকে একমাত্র একক অদ্বিতীয় 'আল্লাহ' ছাড়া কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেন না।
স্রষ্টা একক সত্তা: একক সৃষ্টিকর্তাকে ইংরেজি শব্দ 'গড' এর পরিবর্তে 'আল্লাহ' নামেই মুসলমানরা ডাকে। 'গড' এর চেয়ে আরবি শব্দ 'আল্লাহ'-ই সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও যথার্থ। 'গড' শব্দের সাথে 'এস' ইংরেজি বর্ণ যুক্ত করে তাকে বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করা যায়; কিন্তু 'আল্লাহ' একক সত্তা। এ শব্দের কোনো বহুবচন হয় না। আবার 'গড' এর সাথে 'ই-এস' ইংরেজি বর্ণ যোগ করলে তা স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ নেই। 'আল্লাহ' শব্দের লিঙ্গান্তর হয় না। 'গড' শব্দের আগে Tin শব্দাংশ যোগ করলে তার অর্থ দাঁড়ায় 'মিথ্যা উপাস্য'। 'আল্লাহ' শব্দটি এমন এক অসাধারণ ও অদ্বিতীয় শব্দ যা সম্পর্কে কল্পনা করে কোনো আকৃতি বা আকার ধারণা করা বা তা নিয়ে কোনো প্রকার যথেচ্ছাচার করা যায় না। এসব কারণে মুসলমান এক ও অদ্বিতীয় উপাস্যকে 'আল্লাহ' নামেই ডাকে। তবে যেহেতু এই বইয়ের পাঠক বা সম্বোধিত মানুষ সাধারণভাবে মুসলমান ও অমুসলমান উভয় প্রকার রয়েছে, তাই আমি এতে 'আল্লাহ' শব্দের বদলে 'গড' শব্দটি-ই অনেক জায়গায় ব্যবহার করেছি।
স্রষ্টা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন না: গভীরভাবে চিন্তা না করেই কিছু লোক যুক্তি পেশ করে যে, ঈশ্বর যদি সবকিছু করতে সক্ষম, তবে তিনি মানব আকৃতি ধারণ করতে পারবেন না কেন? তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তিনি মানব-আকৃতি ধারণ করতে পারেন; কিন্তু এই যুক্তি মেনে নিলে 'ঈশ্বর' আর ঈশ্বর থাকতে পারেন না। কেননা 'ঈশ্বর' আর মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বিপরীতধর্মী। একই সত্তার মধ্যে ঈশ্বরত্ব ও মানবত্বের বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় হতে পারে না। 'অবতারবাদ' বা ঈশ্বরের মানবাকৃতি ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ কোনো কোনো ধর্মে থাকলেও তা অবাস্তব। আমরা জানি, 'ঈশ্বর' অবিনশ্বর কিন্তু মানুষ নশ্বর। মানব-ঈশ্বর নামক এমন কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই যার মধ্যে অবিনশ্বর ঐশ্বরিক সত্তা নশ্বর মানবদেহ ধারণ করবে। এমন ধারণা বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থহীন ও অযৌক্তিক।
ঈশ্বর-এর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অনাদি ও অনন্ত। অন্যদিকে মানুষের শুরু যেমন আছে তেমনি শেষও আছে। এমন কোনো সত্তা মানুষের মধ্যে নেই যার মধ্যে শুরু না থাকা এবং শুরু থাকা উভয়ই বিদ্যমান আছে। মানুষের শেষ আছে, কারণ মানুষ মরণশীল। এমন কোনো মানুষ নেই যার মধ্যে অবিনশ্বরতা ও নশ্বরতা উভয় গুণের সমাবেশ পাওয়া যাবে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পানাহারের প্রয়োজন নেই, কিন্তু মানুষকে তার জীবন কর্মচঞ্চল রাখার জন্য পানাহার করতে হয়। অতএব স্রষ্টা বা ঈশ্বর বা আল্লাহর মানুরূপ ধারণ সংক্রান্ত মতবাদ একটি ভ্রান্ত মতবাদ।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তিনি খাদ্য দান করেন, কিন্তু তিনি খাদ্যগ্রহণ করেন না।' (সূরা আনআম: ১৪)। অর্থাৎ আল্লাহর কখনো বিশ্রাম বা নিদ্রার প্রয়োজন হয় না; অথচ মানুষ বিশ্রাম ও নিদ্রা ছাড়া চলতে পারে না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— 'আল্লাহ— তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না তন্দ্রা ও নিদ্রা। আসমানে ও জমিনে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর।' (সূরা বাকারা: ২৫৫)
মানব-ঈশ্বরের উপাসনা অযৌক্তিক: 'ঈশ্বরে'র মানবরূপ ধারণ তথা অবতারবাদ যেহেতু গ্রহণীয় নয় তাই আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে একমত হবো যে, কোনো মানুষের উপাসনা করা অযৌক্তিক। এরূপ কর্মকাণ্ড নিষ্ফল ছাড়া আর কিছু নয়। ঈশ্বর যদি মানব-আকৃতি ধারণ করেন তাহলে তিনি অবশ্যই ঐশ্বরিক গুণাবলি ত্যাগ করেই মানবরূপ ধারণ করবেন এবং তিনি মানুষের মধ্যকার সমস্ত গুণের অধিকারী হবেন। উদাহরণস্বরূপ ধরুন, একজন মেধাবী অধ্যাপক যদি দুর্ঘটনায় পড়ে তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে এ অবস্থায় তার ছাত্রদের পক্ষে তাঁর নিকট তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর শিক্ষা গ্রহণের কাজ চালিয়ে যাওয়া অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই সঙ্গত কারণেই বলা যায়, ঈশ্বর যদি মানবরূপ ধারণ করেন, তাহলে এ মানুষটি আর কখনো তার পূর্বরূপ ঈশ্বরত্বে ফিরে যেতে পারবেন না। কেননা মানুষ তার প্রকৃতি অনুযায়ী ঈশ্বরে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং মানব-ঈশ্বর এর উপাসনা করা অযৌক্তিক এবং তা অবশ্যই নিষ্ফল। এ জন্যই কুরআন মাজীদে সর্বপ্রকার মানব-ঈশ্বর বা অবতারবাদের অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিরূপ নির্ধারণের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে— 'কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।' (সূরা শুরা: ১১)
স্রষ্টা অন্যায় ও অশোভন কাজ করেন না: 'ঈশ্বর' সর্বশক্তিমান যিনি ন্যায়বিচার, করুণা, সত্য, অনন্ত ও অনিন্দ্যনীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি কখনো এমন সৃষ্টিসুলভ কাজ করতে পারেন না, যা তাঁর সত্তা ও বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। তদ্রূপ তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার মিথ্যা কথা বলার ধারণাও করা যায় না। একইভাবে অন্যায়, ভুল, কোনো বিষয়ে স্মৃতিভ্রম ইত্যাদি যাবতীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশ পাওয়ার কথাও কল্পনা করা যায় না। তবে 'ঈশ্বর' যদি ইচ্ছা করেন তাহলে অন্যায় করতে পারেন; কিন্তু তিনি কখনো তা করেন না, করবেনও না, যেহেতু এটা অন্যায় সেহেতু এমন অন্যায় কাজ তাঁর জন্য অশোভন। এ সম্পর্কে মানবজাতির জ্ঞানের বাহক আল কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ কখনো এক বিন্দু পরিমাণও যুলুম করেন না।' (সূরা নিসা: ৪০)। ঈশ্বর চাইলে অত্যাচারী হতে পারেন কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি অন্যায়কারী হবেন সেই মুহূর্তেই তিনি হারাবেন তাঁর ঐশ্বরিকতা।
ভুলে যাওয়া ও ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য নয়: ঈশ্বর কখনো ভুলে যেতে পারেন না। কেননা ভুলে যাওয়া স্রষ্টার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার উদাহরণ। একইরূপে ঈশ্বর ভুল করতে পারেন না। কেননা ভুল করা ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মানবজাতির পথ প্রদর্শক: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আমার প্রভু বিভ্রান্তও হন না, ভুলেও যান না।' (সূরা তা-হা: ৫২)। ঈশ্বর ঈশ্বরসুলভ কাজই করেন। ঈশ্বরের সবকিছু করার ক্ষমতা আছে। ঈশ্বর সম্পর্কে ইসলামের ধারণা হলো— 'ঈশ্বরের ক্ষমতা সবকিছুর ওপর বিরাজমান।' পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'আল্লাহ অবশ্যই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।' (আল-কুরআন- ২:১০৬, ২:১০৯, ২: ২৮৪, ৩:২৯, ১৬: ৭৭, ৩৫: ১)। কুরআন মাজিদ আরো বলে— 'তিনি যা চান তা-ই করেন।' (সূরা বুরূজ: ১৬)।
একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাঁর সত্তা ও গুণাবলির সাথে সামঞ্জস্যশীল কাজেরই ইচ্ছা করেন এবং তা সম্পাদন করেন। অন্যায় এবং তাঁর সত্তা ও গুণাবলির বিপরীত কাজ তিনি করেন না। অনেক ধর্মই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো পর্যায়ে অবতারবাদে বিশ্বাস করে, অর্থাৎ ঈশ্বর মানব আকৃতি ধারণ করেন। তাদের যুক্তি হলো— সর্বশক্তিমান 'ঈশ্বর' অত্যন্ত পবিত্র, সত্য, পরিপূর্ণ ও নিষ্কলুষ। তাই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সীমাবদ্ধতা ও অনুভূতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। অতএব, মানুষের জন্য নীতি-নিয়ম প্রণয়নের লক্ষ্যে পৃথিবীতে মানবরূপে আবির্ভূত হন। যুগে যুগে এ প্রতারণাপূর্ণ যুক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এ যুক্তিটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক এটা কতটুকু যৌক্তিক।
স্রষ্টাই দিকনির্দেশক ও বিধিমালা প্রণেতা: মহান স্রষ্টা আমাদেরকে মানবীয় গুণাবলী ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে আমরা বিভিন্ন কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন ধরনের সহায়ক হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে নিয়েছি। যেমন— টেপরেকর্ডার। টেপরেকর্ডার এমনই একটি যন্ত্র যা শিল্প-কারখানায় বহুল পরিমাণে তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু এটা কি কখনো বলা হয়েছে যে, টেপরেকর্ডারের কী ভালো, আর কী মন্দ, তা জানার জন্য প্রস্তুতকারককে টেপরেকর্ডারের রূপ ধারণ করতে হবে? বরং এটাই স্বাভাবিক যে, প্রস্তুতকারক তার এ যন্ত্রের উৎপাদন ও চালানোর নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধিমালা সম্বলিত একটি ক্যাটালগ (ম্যানুয়েল) তৈরি করবেন। যার মাধ্যমে এ যন্ত্রের ব্যবহারকারীরা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নিয়মাবলি পেতে পারে। এ পুস্তকের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া থাকবে যে, এ যন্ত্র কী পদ্ধতিতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, আর কীভাবে ব্যবহার করলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষকে যদি তেমনি একটি যন্ত্র বলে ধরে নেন, তাহলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই দুনিয়াতে এসে মানুষের জন্য কী ভাল আর কী মন্দ তা জানার। তবে এটা নিশ্চিত যে, তিনি মানবজাতির জন্য নির্দেশিকা গ্রন্থ (ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়েল) দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন-ই মানবজাতির জন্য সেই গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা শেষ বিচারের দিন তাঁর এ সুনিপুণ সৃষ্টির কাজ-কর্মের হিসাব নেবেন। সুতরাং এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, তিনি যে বিষয়ে হিসাব নেবেন, সে বিষয়ে পূর্ণ নির্দেশিকা আগেই পাঠিয়ে দেবেন। তাই তিনি পবিত্র কুরআন নাযিল করে দুনিয়ার জীবনে মানুষের কী করণীয় আর কী বর্জনীয় তা যথারীতি জানিয়ে দিয়েছেন।
স্রষ্টা তাঁর রাসূল মনোনীত করেন: মানবজাতিকে তাঁর কল্যাণের জন্য প্রদত্ত বিধি-বিধান জানিয়ে দেয়ার জন্য স্রষ্টার স্বয়ং দুনিয়াতে আসার প্রয়োজন হয় না। তিনি প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠির মধ্য থেকে বাছাই করা মানুষদের মাধ্যমে তাঁর আসমানি বিধি-বিধান দুনিয়াতে মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। স্রষ্টার বাছাই করা ও মনোনীত এসকল মানুষদের 'বার্তাবাহক' বা 'নবী-রাসূল বলা হয়।
'অন্ধ' ও 'বধির' লোকেরা শিক্ষা নেয় না: অবাক ব্যাপার যে, অবতারবাদী দর্শনের অসম্ভাব্যতা ও অযৌক্তিতা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অনেক অনুসারীরা নিজেরাও এ অবতারবাদে বিশ্বাস করে এবং অন্যদেরকেও এটা শিক্ষা দেয়। এটা কি মানুষের বুদ্ধিমত্তা (ইন্টেলিজেন্স) এবং যিনি মানুষকে এ বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন তাঁর প্রতি অবমাননা প্রদর্শন নয়? এ সমস্ত লোকই প্রকৃতপক্ষে 'অন্ধ' ও 'বধির', যদিও আল্লাহ তাদেরকে শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয় দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— 'তারা বধির, বোবা ও অন্ধ, তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসবে না।' (সূরা বাকারা: ১৮)। মথি বাইবেলের লিখিত সুসমাচারে একই কথা বলেছে— অর্থ: তারা দেখেও দেখে না এবং শুনেও শোনে না, তারা বুঝতেও সক্ষম নয়। (মথি ১৩: ১৩)। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ 'ঋগবেদে'ও একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে— অর্থ: এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বাণীসমূহ দেখে, প্রকৃতপক্ষে তারা দেখে না; এমন কিছু লোকও রয়েছে যারা এ বাণীসমূহ শোনে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শোনে না। (ঋগবেদ ১০:৭১:৪)। পবিত্র গ্রন্থের এসব বাণী তাদের পাঠকদের বলে যে, যদিও স্রষ্টা বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তবুও এরা বিচ্যুতই হয়ে যাবে সত্য থেকে।
📄 স্রষ্টার গুণাবলি
মানবজাতির সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব পবিত্র কুরআনের বনী ইসরাঈল এর ১১০ নং আয়াতে স্রষ্টাকে কী নামে সম্বোধন করতে হবে, তা স্পষ্ট ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে— 'বলুন, তোমরা আল্লাহ বলে ডাক কিংবা রাহমান বলে ডাক, যে নামেই ডাক না কেন, তাঁর তো রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম।' একই ধরনের কথা কুরআনের অন্যান্য সূরাতেও উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে আল-কুরআন সর্বশক্তিমান আল্লাহর কমপক্ষে ৯৯টি বিভিন্ন গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো 'আল্লাহ'। কুরআন 'আল্লাহ'র পরিচয় প্রকাশে অনেক নামের মধ্যে 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়) 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু) 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি নাম উল্লেখ করেছে। আপনি যে কোনো নামেই আল্লাহকে ডাকতে পারেন; কিন্তু সেই নামগুলো হতে হবে সুন্দর। তবে সেই নামগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে মানসপটে কোনো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো চিত্র যেন ফুটে না ওঠে।
গুণবাচক নামের মালিক স্বয়ং আল্লাহ: মহান আল্লাহ তাআলা সুন্দর নামসমূহের অধিকারী। প্রত্যেকটি নামের মধ্যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত পরিচয় পাওয়া যায়। আমি এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করবো। একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উদাহরণ পেশ করা যাক। ধরুন নভোচারি নীল আর্মস্ট্রং। কেউ যদি বলে, 'নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান'। উক্তিটি যথার্থ; কিন্তু তার পরিচয়ের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। 'নীল আর্মস্ট্রং একজন নভোচারী'— এ পরিচয়ও তার জন্য অনন্য পরিচয় নয়, কেননা এ পরিচয় অন্যদেরও আছে। যদি বলা হয় যে, 'নীল আর্মস্ট্রং প্রথম ব্যক্তি যিনি চাঁদে পা রেখেছেন'। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে চাঁদে প্রথম পদার্পণ করেছেন কে? উত্তরে কেবল বলা হবে 'নীল আর্মস্ট্রং'। এ কৃতিত্বে তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার গুণাবলিও হতে হবে অনন্য ও অতুলনীয়। তিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা। আমি যদি বলি— 'তিনি ইমারতের নির্মাণকারী' তাহলে তাঁর পরিচয় হিসেবে অনন্য নয়, কেননা অনেক মানুষ ইমারতের নির্মাতা হতে পারে। অতএব 'নির্মাতা' গুণ দ্বারা স্রষ্টার ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে না। স্রষ্টা বা আল্লাহর গুণসমূহ এমন হবে যার দ্বারা তাঁকেই নির্দেশ করবে অন্য কাউকে নয়। উদাহরণ স্বরূপ— 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়), 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু), 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি বিশেষ গুণবাচক নামগুলোর উল্লেখ করা যায়। সুতরাং কেউ যদি প্রশ্ন করে— 'আর-রহমান' বা পরম করুণাময় কে? তাহলে এর উত্তরে একটি মাত্র জবাবই হতে পারে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহ'।
স্রষ্টার গুণাবলী সাংঘর্ষিক নয়: পূর্বের উদাহরণটিকে ধরা যাক। কেউ যদি বলে, "নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান নভোচারী যিনি মাত্র চার ফুট লম্বা' তবে এ পরিচয় 'আমেরিকান নভোচারী' যথার্থ, কিন্তু সহায়ক গুণটি 'চার ফুট লম্বা' মিথ্যা। একইভাবে কেউ যদি বলে আল্লাহ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর একটি মাথা, দুটো হাত, দুটো পা ইত্যাদি ইত্যাদি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য তথা 'বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা' বৈশিষ্ট্যটি যথার্থ; কিন্তু সহায়ক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ, 'মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া' ভুল এবং মিথ্যা।
গুণ-বৈশিষ্ট্য স্রষ্টার একক সত্তার পরিচায়ক: আল্লাহ যেহেতু এক ও অদ্বিতীয়, তাই তাঁর সব গুণ-বৈশিষ্ট্য দ্বারা একমাত্র তাকেই নির্দেশ করাটা স্বাভাবিক। যদি বলা হয়, 'নীল আর্মস্ট্রং ছিলেন একজন নভোচারী যিনি চাঁদের বুকে প্রথম পদার্পণ করেন; কিন্তু পরে দ্বিতীয় জন এডউইন অলড্রিন — একথাটা সঠিক নয়। কেননা প্রথম পদার্পণকারী একজনই হতে পারে। প্রথম পদার্পণকারী দ্বিতীয় হতে পারে না। সুতরাং স্রষ্টা এক ঈশ্বর এবং প্রতিপালক অন্য ঈশ্বর — এ বক্তব্য অবাস্তব; কারণ, বিশ্বজগতে স্রষ্টার এক ও অদ্বিতীয়— যাবতীয় মহৎ গুণ স্রষ্টার একক সত্তার পূর্ণতা লাভ করেছে।
মানবজাতির সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব পবিত্র কুরআনের বনী ইসরাঈল এর ১১০ নং আয়াতে স্রষ্টাকে কী নামে সম্বোধন করতে হবে, তা স্পষ্ট ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে— 'বলুন, তোমরা আল্লাহ বলে ডাক কিংবা রাহমান বলে ডাক, যে নামেই ডাক না কেন, তাঁর তো রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম।' একই ধরনের কথা কুরআনের অন্যান্য সূরাতেও উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে আল-কুরআন সর্বশক্তিমান আল্লাহর কমপক্ষে ৯৯টি বিভিন্ন গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো 'আল্লাহ'। কুরআন 'আল্লাহ'র পরিচয় প্রকাশে অনেক নামের মধ্যে 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়) 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু) 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি নাম উল্লেখ করেছে। আপনি যে কোনো নামেই আল্লাহকে ডাকতে পারেন; কিন্তু সেই নামগুলো হতে হবে সুন্দর। তবে সেই নামগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে মানসপটে কোনো সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো চিত্র যেন ফুটে না ওঠে।
গুণবাচক নামের মালিক স্বয়ং আল্লাহ: মহান আল্লাহ তাআলা সুন্দর নামসমূহের অধিকারী। প্রত্যেকটি নামের মধ্যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত পরিচয় পাওয়া যায়। আমি এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করবো। একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের উদাহরণ পেশ করা যাক। ধরুন নভোচারি নীল আর্মস্ট্রং। কেউ যদি বলে, 'নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান'। উক্তিটি যথার্থ; কিন্তু তার পরিচয়ের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। 'নীল আর্মস্ট্রং একজন নভোচারী'— এ পরিচয়ও তার জন্য অনন্য পরিচয় নয়, কেননা এ পরিচয় অন্যদেরও আছে। যদি বলা হয় যে, 'নীল আর্মস্ট্রং প্রথম ব্যক্তি যিনি চাঁদে পা রেখেছেন'। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে চাঁদে প্রথম পদার্পণ করেছেন কে? উত্তরে কেবল বলা হবে 'নীল আর্মস্ট্রং'। এ কৃতিত্বে তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার গুণাবলিও হতে হবে অনন্য ও অতুলনীয়। তিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা। আমি যদি বলি— 'তিনি ইমারতের নির্মাণকারী' তাহলে তাঁর পরিচয় হিসেবে অনন্য নয়, কেননা অনেক মানুষ ইমারতের নির্মাতা হতে পারে। অতএব 'নির্মাতা' গুণ দ্বারা স্রষ্টার ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে না। স্রষ্টা বা আল্লাহর গুণসমূহ এমন হবে যার দ্বারা তাঁকেই নির্দেশ করবে অন্য কাউকে নয়। উদাহরণ স্বরূপ— 'আর-রাহমান' (পরম করুণাময়), 'আর-রাহীম' (পরম দয়ালু), 'আল-হাকীম' (সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান) প্রভৃতি বিশেষ গুণবাচক নামগুলোর উল্লেখ করা যায়। সুতরাং কেউ যদি প্রশ্ন করে— 'আর-রহমান' বা পরম করুণাময় কে? তাহলে এর উত্তরে একটি মাত্র জবাবই হতে পারে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহ'।
স্রষ্টার গুণাবলী সাংঘর্ষিক নয়: পূর্বের উদাহরণটিকে ধরা যাক। কেউ যদি বলে, "নীল আর্মস্ট্রং একজন আমেরিকান নভোচারী যিনি মাত্র চার ফুট লম্বা' তবে এ পরিচয় 'আমেরিকান নভোচারী' যথার্থ, কিন্তু সহায়ক গুণটি 'চার ফুট লম্বা' মিথ্যা। একইভাবে কেউ যদি বলে আল্লাহ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর একটি মাথা, দুটো হাত, দুটো পা ইত্যাদি ইত্যাদি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্য তথা 'বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা' বৈশিষ্ট্যটি যথার্থ; কিন্তু সহায়ক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ, 'মানুষের আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া' ভুল এবং মিথ্যা।
গুণ-বৈশিষ্ট্য স্রষ্টার একক সত্তার পরিচায়ক: আল্লাহ যেহেতু এক ও অদ্বিতীয়, তাই তাঁর সব গুণ-বৈশিষ্ট্য দ্বারা একমাত্র তাকেই নির্দেশ করাটা স্বাভাবিক। যদি বলা হয়, 'নীল আর্মস্ট্রং ছিলেন একজন নভোচারী যিনি চাঁদের বুকে প্রথম পদার্পণ করেন; কিন্তু পরে দ্বিতীয় জন এডউইন অলড্রিন — একথাটা সঠিক নয়। কেননা প্রথম পদার্পণকারী একজনই হতে পারে। প্রথম পদার্পণকারী দ্বিতীয় হতে পারে না। সুতরাং স্রষ্টা এক ঈশ্বর এবং প্রতিপালক অন্য ঈশ্বর — এ বক্তব্য অবাস্তব; কারণ, বিশ্বজগতে স্রষ্টার এক ও অদ্বিতীয়— যাবতীয় মহৎ গুণ স্রষ্টার একক সত্তার পূর্ণতা লাভ করেছে।