📘 প্রধান ধর্মসমুহে স্রষ্টার ধারণা 📄 ধর্ম মানবীয় অস্তিত্বের অংশ

📄 ধর্ম মানবীয় অস্তিত্বের অংশ


ধর্ম নিয়ে যে আলোচনা ও গবেষণাই করা হোক না কেন, ধর্ম মূলত মানবীয় অস্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো স্রষ্টা। পৃথিবীর সকল মানুষেরই স্রষ্টা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা উচিত। তাই বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের আলোকে আমরা স্রষ্টাকে বোঝার চেষ্টা করবো, স্রষ্টার ধারণাকে ব্যাখ্যা করবো। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আলে ইমরান-এর ৬৪ তম আয়াতে বলা হয়েছে- 'আপনি বলে দিন, হে আহলে কিতাব। এসো সেই ঐক্যবাণীর ভিত্তিতে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন; তা হলো আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি এবং কোনো কিছুকেই যেন তাঁর শরীক সাব্যস্ত না করি, আর আল্লাহকে ত্যাগ করে আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করি। তৎপর যদি তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, তবে তোমরা তাদেরকে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা তো মুসলিম।' বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে তুলনামূলক অধ্যয়নের ফলে আমার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। এ অধ্যয়ন আমার বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করেছে। আমি নিশ্চিত হয়েছি, আল্লাহ তাআলা তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রত্যেক মানবাত্মাকে কিছু কিছু জ্ঞান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠন এমন যে, হয় তো সে স্রষ্টার অস্তিত্বকে গ্রহণ করে নেয়, নয়তো সে স্রষ্টার বিপরীত সত্তায় বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। তাই বলা যায়, আল্লাহতে বিশ্বাস কোনো শর্তসাপেক্ষ বিষয় নয়, বরং শর্ত সাপেক্ষ বিষয় আল্লাহতে বিশ্বাস না করা।

📘 প্রধান ধর্মসমুহে স্রষ্টার ধারণা 📄 সেমিটিক-অসেমিটিক ধর্ম

📄 সেমিটিক-অসেমিটিক ধর্ম


বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মগুলোকে প্রথমত দুটি শ্রেণিতে বিন্যাস করা যায়—সেমিটিক ও নন-সেমিটিক। নন-সেমিটিক ধর্মগুলোকে আবার আর্য এবং অনার্য—এ দু’শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

সেমিটিক ধর্ম: মূলত সেমিটীয় তথা হিব্রু, আরব, আসিরীয় ও ফিনিশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেমিটিক ধর্মগুলোর উদ্ভব ঘটেছে। বাইবেলের বর্ণনানুসারে নূহ (আ) এর এক পুত্রের নাম ছিল 'শাম'। শাম-এর বংশধরগণ 'সেমিটীয়' নামে পরিচিত। সুতরাং সেমিটিক ধর্মগুলোর উৎপত্তি হয়েছে ইহুদি, আরব, আসিরীয় ও ফিনিশীয়দের মধ্যে। প্রধান প্রধান সেমিটিক ধর্মগুলো হলো—ইহুদি মতবাদ, খ্রিস্টীয় মতবাদ এবং ইসলাম। এ ধর্মগুলো পয়গাম্বরীয় ধর্ম যা আল্লাহর নবীগণ কর্তৃক আনীত হয়েছে।

অসেমিটিক ধর্ম: অসেমিটিক ধর্মগুলোকে আবার এরিয়াল বা আর্য এবং নন-এরিয়াল বা অনার্য—এ দুভাগে ভাগ করা যায়।

আর্য ধর্ম: আর্য জাতির মধ্যেই আর্য ধর্মসমূহের উৎপত্তি। আর্য জাতি ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাভাষী একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী। এরা খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ পর্যন্ত ইরান এবং উত্তর ভারতে বসতি স্থাপন করেছিল। আবার বৈদিক ও অবৈদিক এ দু'ধারায় আর্য ধর্মগুলো বিভক্ত ছিল। বৈদিক ধর্মকে 'হিন্দুবাদ' বা 'ব্রাহ্মণ্যবাদ' নামে অভিহিত করা হয়। আর অবৈদিক ধর্মগুলো হলো—শিখবাদ, বুদ্ধবাদ, জৈনবাদ ইত্যাদি। সবকটি আর্য ধর্মই অপয়গাম্বরীয় ধর্ম অর্থাৎ কোনো নবী রাসূল কর্তৃক এসব ধর্ম প্রবর্তিত হয়নি। জরথুস্ত্রীয় ধর্মও একটি আর্য ও অবৈদিক ধর্ম যা হিন্দুবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। এ ধর্মের অনুসারীদের দাবী হলো যে এটা পয়গাম্বরীয় ধর্ম।

অনার্য ধর্ম: বিভিন্ন প্রকারে অনার্য ধর্মসমূহের উৎপত্তি হয়েছে। 'কনফুসীয়' ও 'তাও'বাদের উৎপত্তি হয়েছে চীনে। আবার 'শিন্টো' ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে জাপানে। এ সব অনার্য ধর্মসমূহে 'আল্লাহ' সম্পর্কিত কোনো ধারণার অস্তিত্ব নেই। এসব ধর্মকে বড়জোর কিছু কিছু নৈতিক নিয়মাবলির সমাহার বলা যেতে পারে।

স্রষ্টা সম্পর্কিত ধারণা: কোন ধর্মের অনুসারীদের ব্যবহারিক জীবনকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ছাড়া স্রষ্টা সম্পর্কিত তাদের ধারণা কী তা বিচার করা যায় না। এমনকি অনেক ধর্মের অনুসারীরা তাদের ধর্মগ্রন্থে 'স্রষ্টা' সম্পর্কে কী বর্ণনা আছে তা অবহিত নয়। কাজেই কোনো ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে 'স্রষ্টা' সম্পর্কে কী ধারণা দেয়া আছে সেটাই বিশ্লেষণ করা উত্তম। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলোতে 'স্রষ্টা' সম্পর্কিত যে ধারণা উল্লেখিত আছে সেটাই এখন বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে।

📘 প্রধান ধর্মসমুহে স্রষ্টার ধারণা 📄 হিন্দুধর্মে স্রষ্টা

📄 হিন্দুধর্মে স্রষ্টা


আর্য ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় ধর্ম হলো হিন্দুধর্ম। 'হিন্দু' শব্দটি মূলত একটি ফারসি শব্দ। সিন্ধু উপত্যকার আশে-পাশে বসবাসকারী অধিবাসীদেরকে 'হিন্দু' নামে অভিহিত করা হয়। হিন্দুধর্ম বহুত্ববাদে বিশ্বাস সম্বলিত একটি সাধারণ ধর্ম যার অধিকাংশ 'বেদ', 'উপনিষদ', এবং 'শ্রীমৎ ভগবদ্গীতা' প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল।

হিন্দু ও মুসলিমের বিশ্বাস ও ধারণাগত পার্থক্য: বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী একটি ধর্ম হিন্দুধর্ম। অধিকাংশ হিন্দুই এ বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত এবং তারা 'বহু ঈশ্বর'-এ বিশ্বাস করে। কোনো কোনো হিন্দু তিন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, আবার কিছু হিন্দু তেত্রিশ কোটি দেবতায়ও বিশ্বাসী, অর্থাৎ ৩ শত ৩০ মিলিয়ন দেবতা। তবে শিক্ষিত হিন্দুরা যারা ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন তারা বলেন, একজন হিন্দুর উচিত এক ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এক ঈশ্বরের পূজা করা।

হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণা ও বিশ্বাসে। সাধারণভাবে হিন্দুদের বিশ্বাস সর্বেশ্বরবাদ তথা সর্বভূতে ঈশ্বর অর্থাৎ সবকিছুতে ঈশ্বর আছেন। জৈব-অজৈব সব কিছুই ঐশ্বরিক এবং পবিত্র—এটিই হচ্ছে সর্বেশ্বরবাদের মূলকথা। সেই বিশ্বাসের আলোকেই হিন্দুরা গাছ, সূর্য, চন্দ্র, জীবজন্তু এমনকি মানব প্রজাতির মধ্যেও ঈশ্বরের প্রকাশ উপলব্ধি করে এবং সাধারণ হিন্দুদের বিশ্বাস যে প্রত্যেক বস্তুই ঈশ্বর।

অন্যদিকে ইসলাম মানব সমাজের কাছে এই ধারণা প্রদান করে যে, মানুষ নিজে এবং তার পারিপার্শ্বিক সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টির নমুনা মাত্র—এসব কিছু আল্লাহ নয়। অন্য কথায় মুসলমানরা বিশ্বাস করে সবকিছুর মালিক আল্লাহ। গাছপালা, সূর্য-চন্দ্র এবং এ বিশ্বে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং হিন্দু এবং মুসলিমের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো apostrophe 's' অর্থাৎ হিন্দুরা বলে, 'সবকিছুই ঈশ্বর' আর মুসলিমরা বলে, 'সবকিছুই আল্লাহ'র। পবিত্র কুরআন থেকে নেয়া: 'এসো তোমাদের ও আমাদের মধ্যকার একটি সাধারণ বিষয়ে। প্রথম সাধারণ বিষয় হলো আমরা আল্লাহ ছাড়া আর-কারো ইবাদত করবো না।' (সূরা আলে ইমরান: ৬৪)

আসুন, আমরা হিন্দু ও মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ বিশ্লেষণ করে তা থেকে উভয়ের মধ্যকার সামঞ্জস্যগুলো বের করার চেষ্টা করি।

ভগবদ্গীতা: হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো 'শ্রীমৎ ভগবদ্গীতা'। গীতার নিম্নোক্ত শ্লোক দেখুন— "ঐ সব লোক যাদের বুদ্ধি মেধা বস্তুতান্ত্রিক ইচ্ছে কর্তৃক আচ্ছন্ন, তারা সাকার ঈশ্বরের এবং তারা তাদের প্রকৃতি অনুসারে পূজার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ করে।" (ভগবদ্গীতা, অধ্যায় ৭, শ্লোক ২০)। গীতার বর্ণনা—যারা বস্তুবাদী তারা সাকার ঈশ্বরের পূজা করে অর্থাৎ সত্যিকার নিরাকার ঈশ্বরের পাশাপাশি পূজা করে সাকার (যার আকার আছে, যেমন মূর্তি) ঈশ্বরের।

উপনিষদ: উপনিষদকে হিন্দুরা পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করে। এ গ্রন্থে হিন্দু ধর্মের স্রষ্টা সম্পর্কিত ধারণা সুস্পষ্ট হয়েছে। এবার উপনিষদের শ্লোকগুলোর পাশাপাশি কুরআনের আয়াতের সাদৃশ্যগুলো লক্ষ্য করুন— "একম ইভাদ্বিতীয়ম" অর্থাৎ 'তিনি এক, দ্বিতীয় ছাড়া।' (Chandogya উপনিষদ ৬: ২: ১)। "তার কোনো মাতা-পিতা নেই, কোনো প্রভুও নেই।" (Svetasvatara উপনিষদ, দ্বিতীয় খণ্ড পৃ. ২৬৩)। "তার মতো কিছুই নেই।" "তাঁর মতো কিছু নেই যার নাম মহিমময় উজ্জ্বল।" (Svetasvatara উপনিষদ অধ্যায় ৪: ১৯)। উপরোক্ত শ্লোকগুলোর সাথে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো তুলনা করুন— 'তাঁর সদৃশ কিছু নেই [কেউ নেই]।' (সূরা ইখলাস: ৪)। 'কোনো কিছুই এমন নেই যা তাঁর মতো হতে পারে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।' (সূরা শূরা: ১১)। অনুরূপভাবে উপনিষদের নিম্নোক্ত শ্লোকটিও আল্লাহর প্রকৃত রূপ ধারণ করতে মানুষের অক্ষমতা প্রকাশ করেছে— "তাঁর রূপ দেখা যায় না, কেউ তাঁকে চোখে দেখেনি; যারা হৃদয় ও আত্মা দ্বারা তাঁকে উপলব্ধি করে, তাঁর উপস্থিতি অন্তরে অনুভব করে, তারাই অমরত্ব লাভ করে।" (Svetasvatara উপনিষদ, ৪: ২০)। পবিত্র কুরআন উপরোক্ত ধারণাকে নিম্নোক্ত আয়াতে প্রকাশ করেছে— 'দৃষ্টিসমূহ তাঁকে পরিবেষ্টন করতে পারে না। অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে পরিবেষ্টন করে আছেন। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী সুবিজ্ঞ।' (সূরা আন'আম: ১০৩)

বেদ: হিন্দুদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ হলো বেদ। তাদের প্রধান 'বেদ' ৪টি—ঋগবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ।

ঋগবেদ: ঋগবেদ হলো সকল বেদের মধ্যে প্রাচীনতম গ্রন্থ। হিন্দুরা এটাকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করে। ঋগবেদে উল্লেখ আছে যে, 'জ্ঞানী ঋষিগণ এক ঈশ্বরকে বহু নামে ডাকে।' (ঋগবেদ ১: ১৬৪: ৪৬)। গ্রন্থটিতে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কমপক্ষে ৩৩টি বিভিন্ন গুণবাচক নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর বেশিরভাগ উল্লেখিত হয়েছে ঋগবেদ ২য় পুস্তকে ১ম শ্লোকে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উল্লিখিত গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে সুন্দরতম নাম হলো 'ব্রহ্মা' অর্থাৎ 'স্রষ্টা'। এ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো 'খালিক'। এক্ষেত্রে 'ব্রহ্মা' দ্বারা Creator বা 'স্রষ্টা' বুঝানো হলে এবং এর দ্বারা সর্বশক্তিমান আল্লাহকে বোঝালে মুসলমানদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মুসলমানরা কখনো এমত সমর্থন করে না যে, 'ব্রহ্মা'-ই স্রষ্টা বা খালিক যার মাথা ৪টি। (আমরা এরূপ বিভ্রান্তিমূলক বিশ্বাস থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই)। মুসলমানরা চরমভাবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে।

'সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে 'জড়বিজ্ঞান' শাস্ত্রের পরিভাষায় প্রকাশ করা স্বয়ং যজুর্বেদের নিম্নোক্ত বক্তব্যেরও পরিপন্থী— 'ন তস্যৎ প্রতিমা অস্তি' অর্থাৎ 'তার কোনো সদৃশ বা প্রতিমা নেই।' (যজুর্বেদ ৩২: ৩)। ঋগবেদ দ্বিতীয় পুস্তক প্রথম চরণ ৩য় শ্লোক—এ উল্লিখিত হয়েছে 'বিষ্ণু' অর্থাৎ 'প্রতিপালক' যার আরবি প্রতিশব্দ 'রব'। এতেও মুসলমানদের কোনো আপত্তি নেই যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে 'রব', 'সাসটেইনার' বা 'বিষ্ণু' নামে ডাকা হবে। কিন্তু হিন্দুদের সর্বজনীন ধারণা বিষ্ণুর হাত চারটি। তিনি ডান দিকের এক হাতে 'চক্র' (ভারী চাকা), আর বাম দিকের এক হাতে 'শঙ্খ' (শামুক) ধারণ করে আছেন। তিনি একটি পাখির কিংবা সাপের ওপর উপবেশন করে আছেন। মুসলমানরা কখনো ঈশ্বরের এমন ধারণাকে গ্রহণ করতে পারে না। উপরোল্লিখিত বিশ্বাসও যজুর্বেদের ৪০তম অধ্যায় ১৯তম শ্লোকের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়াও ঋগবেদের ৮ম পুস্তকের ১ম চরণের ১ নং শ্লোকে উল্লেখ আছে— "বন্ধুগণ, তাঁকে ছাড়া আর কাউকে উপাসনা করো না, যিনি একমাত্র ঈশ্বর।"

অথর্ববেদ: অথর্ববেদের বিভিন্ন শ্লোকে স্রষ্টার গুণ বা সিফাত বর্ণনা করা হয়েছে। স্রষ্টার প্রশংসা ব্যক্ত করে বলা হয়েছে— "দেব মহা অসি" অর্থাৎ ঈশ্বর অত্যন্ত মহান। (অথর্ববেদ ৩০: ৫৮: ৩)। "যথার্থই তুমি আলোময়, তোমার প্রকাশ মহান: তুমিই সত্য, অদ্বিতীয়, তোমার প্রকাশ মহান, যেহেতু তোমার প্রকাশ মহান, তাই তোমার মহানত্ব সর্ব স্বীকৃত, সত্যই মহান তোমার প্রকাশ, হে ঈশ্বর!" (অথর্ববেদ সংহিতা ভলিউম ২)। কুরআন মাজীদের সূরা রা'দ-এর ৯ নং আয়াতে অনুরূপভাবে আল্লাহর সিফাত প্রকাশিত হয়েছে— 'তিনিই একমাত্র মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান।'

yajurveda: যজুর্বেদেও স্রষ্টার ধারণা সংক্রান্ত বেশকিছু শ্লোক রয়েছে। এখানে সৃষ্টি কর্তার সত্তা সম্পর্কে বলা হয়েছে 'তার কোনো প্রতিরূপ বা প্রতিমা নেই।' (যজুর্বেদ ৩২: ৩)। এতে আরো উল্লেখিত আছে— "যেহেতু তিনি কিছু থেকে, কারো থেকে জন্ম নেননি, তাই তিনি আমাদের উপাসনার উপযুক্ত।" "তাঁর কোনো প্রতিরূপ বা প্রতিমা নেই, তাঁর মহিমা অত্যন্ত মহান। তিনি তাঁর মধ্যে সকল উজ্জ্বল বস্তু ধারণ করেন। যেমন সূর্য। তিনি যেন আমার অকল্যাণ না ঘটান—এটাই আমার প্রার্থনা। যেহেতু তিনি কিছু থেকে বা কারো থেকে জন্ম নেননি। তাই তিনি আমাদের উপাসনার উপযুক্ত।” (যজুর্বেদ ৩২: ৩)। "তিনি আলোময়, নিরাকার, নিস্পৃশ্য, পবিত্র, যাকে শয়তান বিদ্ধ করতে পারে না; তিনি অদৃশ্য, প্রাজ্ঞ, পরিবেষ্টনকারী; তিনি স্বয়ম্ভু। তিনি যখন যা ইচ্ছা তাই করেন, তিনি চিরঞ্জীব।' (যজুর্বেদ ৪০: ৮)। "তারাই অন্ধকারে প্রবেশ করে যারা প্রাকৃতিক বস্তুর উপাসনা করে; যেমন বায়ু, পানি, আগুন ইত্যাদি। তারা গভীর অন্ধকারে ডুবে যায়—যারা শম্ভুতির উপাসনা করে। 'শম্ভুতি' হলো সৃষ্ট বস্তু যেমন টেবিল, চেয়ার, প্রতিমা ইত্যাদি। (যজুর্বেদ ৪০: ৯)। যজুর্বেদে স্রষ্টার মহিমা প্রকাশের পর সূরা ফাতিহার মতো একটি প্রার্থনার উল্লেখ আছে। স্রষ্টার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে— "আমাদের ভালো পথে পরিচালিত করুন এবং আমাদের পাপরাশি মুছে ফেলুন যা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করে।" (যজুর্বেদ ৪০: ১৬)

বেদান্তবাদের ব্রহ্মস্তুতি: হিন্দু বেদান্তবাদের ব্রহ্মস্তোত্র হলো— 'একম ব্রহ্মা, দ্বিতীয়া ন্যস্ত নেহন ন্যস্ত কিঞ্চন।' অর্থাৎ 'ঈশ্বর এক দ্বিতীয় নেই। মোটেই নেই মোটেই নেই, একেবারেই নেই।' যা হোক হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহ থেকে উদ্ধৃত বিষয়ের মাধ্যমে আমরা হিন্দুধর্মে 'ঈশ্বর' এর ধারণা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলাম।

📘 প্রধান ধর্মসমুহে স্রষ্টার ধারণা 📄 শিখ ধর্মে স্রষ্টা

📄 শিখ ধর্মে স্রষ্টা


শিখ একটি আর্য ধর্ম। এটি অসেমিটিক ও অবৈদিক ধর্মও বটে। এই ধর্মটি প্রধান ধর্মসমূহের তালিকাভুক্ত নয়। এটা হিন্দু ধর্মেরই একটি বিশেষ শাখা যা গুরু নানক কর্তৃক পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রবর্তিত। এ ধর্মটির উৎপত্তি ঘটেছে পাকিস্তান অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে; পঞ্চনদের অববাহিকায়। শিখ ধর্মের প্রবক্তা গুরু নানক একটি ক্ষত্রিয় (যোদ্ধা গোত্র) হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।

'শিখবাদ': 'শিখ' শব্দটি 'শিষ্য' শব্দ থেকে উদ্ভূত। শিষ্য অর্থ ভক্ত বা অনুসারী। 'শিখ' ধর্ম দশজন গুরুর ধর্ম। প্রথম গুরু হলেন গুরু নানক এবং ১০ম ও শেষ গুরু হলেন গুরু গোবিন্দ শিং। শিখদের পবিত্র গ্রন্থ শ্রী গুরুগ্রন্থ যাকে 'আদি গ্রন্থসাহেব' বলা হয়ে থাকে।

শিখদের বৈশিষ্ট্য: প্রত্যেক 'শিখ'-কে পাঁচ 'ক' ধারণ করতে হয়। এটা তাদের ধর্মীয় পরিচিতি বহন করে। নিম্নোক্ত ৫টি বৈশিষ্ট্যই শিখদেরকে হিন্দুদের থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো— ১. 'কেশ'— অকর্তিত কেশ বা চুল, যা সকল গুরুই রাখে। ২. 'কঙ্গ'— চিরুনী যা চুলকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যবহার করা হয়। ৩. 'কাদা'— লোহা বা অন্য ধাতুর তৈরি বালা বা কঙ্কন, যা শক্তি-ক্ষমতা বা আত্মসংযমের প্রতীক। ৪. 'কৃপাণ'— ত্রিফলা খঞ্জর যা আত্মরক্ষার্থে ব্যবহৃত হয়। ৫. 'কাচ্চা'— জানু পর্যন্ত লম্বা অন্তর্বাস বিশেষ যা কর্মতৎপরতার পক্ষে সুবিধাজনক।

শিখ ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস: শিখরা তাদের পবিত্র গ্রন্থের শুরুতে 'মূলমন্ত্র' উদ্ধৃত করে থাকে ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা দিতে—এটি তাদের মৌলিক বিশ্বাস, যা 'গ্রন্থ সাহেব'-এর শুরুতে উল্লেখিত আছে। গ্রন্থসাহেব-এর প্রথম খণ্ডের, জাপূজী অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে উল্লেখিত হয়েছে— "ঈশ্বর মাত্র একজন যাকে বলা হয় সত্যিকার সৃষ্টিকর্তা, তিনি ভয় ও ঘৃণা থেকে ঊর্ধ্বে। তিনি অমর, তিনি জাতকহীন, তিনি স্বয়ম্ভু, তিনি মহান এবং করুণাময়।" শিখধর্ম তার অনুসারীদেরকে কঠোরভাবে একত্ববাদের দীক্ষায় দীক্ষিত করে। এ ধর্ম এই সার্বভৌম বিমূর্ত ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, যাকে 'এক ওমকারা' বলা হয়। 'ওমকারা' পরিচয় প্রকাশে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখিত হয়েছে— 'করতার'— স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা। 'সাহিব'— প্রভু। 'অকাল'— আদি-অন্তহীন। 'সত্যনামা'— পবিত্র নাম। 'পরওয়ারদিগার'— প্রতিপালক। 'রহীম'— দয়াময়। 'করিম'— সদাশয়। তাঁকে 'ওয়াহি গুরু' অর্থাৎ একক সত্য ঈশ্বরও বলা হয়। শিখ ধর্মে বিশ্বাসীরা কঠোরভাবে একত্ববাদী—তারা 'অবতারবাদ'-এ বিশ্বাস করে না। অবতারবাদ হলো ঈশ্বরের মানবাকৃতিতে পৃথিবীতে আগমন সংক্রান্ত মতবাদ। তাদের মতে, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কখনো অবতার রূপে মানব আকৃতিতে পৃথিবীতে আগমন করেন না। তারা মূর্তি পূজারও ঘোর বিরোধী।

শিখ ধর্মে কবীর এর প্রভাব: 'কবীর' নামক এক মুসলিম সাধকের শিক্ষায় প্রভাবিত হন গুরু নানক। 'শ্রী গুরু নানক সাহেব' এর বিভিন্ন অধ্যায়ে সাধক কবীর রচিত চরণগুলো উল্লেখিত আছে। কয়েকটি চরণ নিচে উল্লেখ করা হলো— "দুঃখ মে সুমিরানা সব করে সুখ মে করে না কয়া জু সুখ মে সুমিরানা করে তু দুখ কায়ে হুয়ে"। অর্থাৎ, বিপদে পড়লে সবাই স্রষ্টাকে স্মরণ করে, কিন্তু শান্তি ও সুখের সময় কেউ তাঁর স্মরণ করে না। যে শান্তি ও সুখের সময় তাঁকে স্মরণ করবে তার কেন বিপদ হবে?" এবার ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াত উপরোক্ত চরণের সাথে তুলনা করুন— 'আর যখন মানুষের ওপর কোনো দুঃখ-দৈন্য এসে পড়ে তখন সে তার প্রতিপালককে ডাকতে থাকে একনিষ্ঠভাবে তার অভিমুখী হয়ে; অতঃপর তিনি যখন তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করেন, তখন সে ভুলে যায় সে কথা, যার জন্য পূর্বে তাকে ডেকেছিল এবং আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করে, যাতে অপরকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করতে পারে।' (সূরা যুমার: ৮)

ফন্ট সাইজ
15px
17px