📄 মাজহাব প্রতিষ্ঠার অভিনব কৌশল
ইসলামি শরিয়াহর দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো, নাসখ (রহিতকরণ) ও ইজমা (উম্মতের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা)। উভয় দল এ পরিভাষা দুটি ব্যবহার করে নিজের মত প্রতিষ্ঠার এক অভিনভ কৌশল অবলম্বন করে। তারা বলে— ‘আমাদের পক্ষের বিষয়গুলোর ওপর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপরীত মতের হাদিসগুলো রহিত হয়ে গেছে।’
তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়, সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি এবং বিগত ১৪০০ বছরে যেসব মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহ গত হয়েছেন, তাঁদের কেউ এই রহিত হওয়ার বিষয়টি জানতেন না। আল্লাহ তায়ালা বিশেষ কোনো মাধ্যমে বর্তমান যুগের আলিমদের তা জানিয়ে দিয়েছেন। নিজের পক্ষের দুই- চারজন একমত হলেই তারা বলে দেন, এর ওপর আলিমদের ইজমা রয়েছে।
আহলে হাদিসের শাইখদের অনেকে নিজের বিপরীত হলেই কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া বলে দেন, এটি জাল, জয়িফ; এ হাদিসের কোনো ভিত্তি নেই ইত্যাদি। পক্ষান্তরে তার সমপর্যায়ের দলিল নিজের পক্ষে হলে সেটা সাদরে গ্রহণ করেন। হানাফি আলিমদের অবস্থাও ঠিক তেমনই।
মূলত এসব বিষয়ে আমরা নিজেদের নফস, প্রবৃত্তি, ভালো লাগা ও মন্দ লাগার বেশি অনুসরণ করি। আমরা নিজেকে সুন্নাহ বা শরিয়তের অনুগত করি না। উলটো আমাদের প্রচেষ্টা থাকে, কীভাবে সুন্নাহ ও শরিয়াহকে নিজেদের মতামতের অনুগত করা যায়।
অথচ একজন মুমিনের কাজ হলো-সকল পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সহিহ সুন্নাহ খুঁজে তার অনুসরণ করা; কিন্তু আমরা প্রথমে নিজের মত ও পছন্দ নির্ধারণ করি, তারপর পছন্দের পক্ষে দলিল খুঁজতে থাকি। তাই বুজুর্গদের কারও কথা যখন আমাদের মতের অনুকূলে হয়, আমরা তা দলিল হিসেবে গ্রহণ করি। আবার একই বুজুর্গের অন্য কথা যদি আমাদের প্রতিকূলে হয়, তখন বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কারণ, আমাদের কাছে গ্রহণ-বর্জনের মাপকাঠি হলো-ভালো লাগা ও মন্দ লাগা। এটি হচ্ছে এমন মাপকাঠি, যার কোনো পরাজয় নেই। এতে আছে সীমাহীন তৃপ্তি ও আত্মপ্রসাদ।
আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে—
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْমَ الظَّالِمِينَ -
'তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্ত আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত ব্যতিরেকে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দান করেন না।' সূরা কাসাস : ৫০
📄 অন্ধ অনুসরণ ও অন্ধ বিরোধিতা
অন্ধ অনুসরণ ও অন্ধ বিরোধিতা আজ মানুষের শিরা-উপশিরায় ঢুকে পড়েছে। বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে কুরআন-সুন্নাহর সত্য গ্রহণের প্রবণতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে যারা যে দলের, তারা সে দলের অন্ধ অনুসারী হয়ে পড়ছে। নিজ মতের বিপক্ষে কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দলিল থাকলেও তা মানা জরুরি মনে করছে না। মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নিজের মতকে ঠিক রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। তারপরও না পারলে ফতোয়া দিচ্ছে-অমুকের সাথে মিশবে না, অমুকের বই পড়বে না, তাহলে গোমরাহ হয়ে যাবে ইত্যাদি। আর আমরাও তা যাচাই না করে নির্দ্বিধায় মেনে নিচ্ছি।
অথচ দুনিয়াবি ক্ষেত্রে কেউ কিছু বললে, যাচাই করা ছাড়া আমরা সেদিকে সামান্যও অগ্রসর হই না। বাজার থেকে এক কেজি আলু কিনতে গেলেও কোনটি ভালো আর কোনটি পচা, তা যাচাই করি। দেখেশুনে পাল্লায় তুলি, কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে আমরা উদাসীন। কারও কথা যাচাই করার প্রয়োজন অনুভব করি না। হুজুর যা বলে, তা-ই মেনে নিই। এতেই বোঝা যায়, আমরা হুজুরদের কতটা অন্ধ ভক্ত হয়ে পড়েছি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
আমাদের হুজুররা একসময় রাজনীতি করা হারাম মনে করতেন। কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট দলিল থাকা সত্ত্বেও তারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন। তাদের অনুসরণে আমরাও রাজনীতি হারাম মনে করতাম, কিন্তু তারা যেদিন থেকে রাজনীতি শুরু করেছেন, সেদিন থেকে আমরাও রাজনীতিতে নেমে পড়েছি। অথচ আমাদের মনে একবারও প্রশ্ন জাগল না, ১৪০০ বছর আগের কুরআন-হাদিসই এখনও বিদ্যমান। তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। কোনো নতুন ফিকাহও সৃষ্টি হয়নি। তাহলে এতদিন যা হারাম ছিল, তা আজ হঠাৎ করে কীভাবে হালাল হয়ে গেল? কোন দলিলের ভিত্তিতে তা আজ ফরজ হয়ে গেল? এ রকম প্রশ্ন জাগাটাই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু আমাদের মনে প্রশ্ন জাগেনি।
রাজনীতির পক্ষে ফতোয়া দিয়ে তারা যখন বলতে লাগল, অমুক মার্কায় ভোট দিতে হবে, নয়তো কবিরা গুনাহ হবে। অন্য প্রতীকে ভোট দিলে ওই ভোট তাদের নেতা পাবে। আর আমার প্রতীকে ভোট দিলে, সে ভোট পাবেন স্বয়ং মুহাম্মাদ ﷺ (নাউজুবিল্লাহ)! তখনও আমাদের হুঁশ ফিরল না। আমরা অন্ধভাবে তাদের অনুসরণ করে যেতে লাগলাম। তাদের এই কথাকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কীভাবে ঠিক রাখা যায়, সেই পথ খুঁজতে থাকলাম। একের পর এক অপব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করলাম।
বিশেষ কোনো পীর, বুজুর্গ ও আলিমের ভুল তুলে ধরা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা কোনো আলিমকে ছোটো করে দেখছি না। হেয় করছি না। হকপন্থি আলিমসমাজ ও পীর-বুজুর্গগণ আমাদের মাথার মুকুট। তবে একজন মানুষ যতই বড়ো আলিম হন, তার ভুল হতে পারে। মানুষমাত্রই ভুলকারী। কেউ ভুলের উর্ধ্বে নয়। তাই পীর বা আলিমের অন্ধ অনুসারী হওয়া উচিত নয়। তারা যখন রাজনীতিতে নেমেই এমন ফতোয়া দেওয়া শুরু করল, তখন তাদের ফতোয়াগুলো যাচাই করা আমাদের উচিত ছিল। তারা ফতোয়ায় যে ভুল করেছেন, তা ধরিয়ে দেওয়া জরুরি ছিল, কিন্তু আমরা তা না করে তাদের অন্ধ অনুসারী হয়ে থাকলাম। কুরআন-সুন্নাহকে কীভাবে তাদের ভুল ফতোয়ার অনুগামী করা যায়, সে চিন্তায় মগ্ন হলাম। যেন কুরআন-সুন্নাহর চেয়ে হুজুররাই আমাদের কাছে বেশি মর্যাদার অধিকারী!
কুরআন-সুন্নাহ দিয়ে যেখানে পীর-মাশায়েখ যাচাই করা দরকার ছিল, সেখানে আমরা পীর-মাশায়েখ দিয়ে কুরআন-সুন্নাহ যাচাই করছি। আমরা একদিকে নিজ দলের আলিমদের অন্ধ অনুসরণে অভ্যস্ত। অন্যদিকে বিপরীত মত পোষণকারীদের অন্ধ বিরোধিতায় লিপ্ত। যেন আমাদের মত গ্রহণকারীরাই শুধু আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত। আর ভিন্নমত গ্রহণকারীরা বাতিল, গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট। ইলম শুধু আমাদের আছে, আর তারা ইলম থেকে বঞ্চিত। আমাদের আলিমরা উলামায়ে হক্কানি, আর তাদের আলিমরা উলামায়ে ছুঁ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ 'ইহুদিরা বলে, খ্রিষ্টানদের কোনো ভিত্তি নেই। খ্রিষ্টানরা বলে, ইহুদিদের কোনো ভিত্তি নেই। অথচ তারা কিতাব পাঠ করে।' সূরা বাকারা : ১১৩
আমাদের অবস্থাও আল্লাহ তায়ালার এ বাণীর অনুরূপ হয়ে গেছে। এক আলিম আরেক আলিমকে কটাক্ষ করে বলছে-সে কী জানে? তার তো কোনো ইলমই নেই; যা আছে সব আমাদের মধ্যে। আরও নানা ধরনের কথা বলে বিপরীত মতের আলিমদের আমরা হেয় করছি। সামান্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কুফরির ফতোয়া দিচ্ছে। অমুক কাফির, তমুক ফাসিক, গোমরাহ, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করছি। নিজ মতের কোনো আলিম মারা গেলে বলছি, আল্লাহ হক্কানি আলিমের মৃত্যুর মাধ্যমে ইলম তুলে নিচ্ছেন। আর বিপরীত মতের কোনো আলিম মারা গেলে বলছি, একটা আপদ দূর হলো।
মুসলমানদের মধ্যে যত মত ও পথ রয়েছে, প্রত্যেকের দাবি হলো-আমাদের মত ও পথ সঠিক: বাকি সবাই ভুল। এতে মুসলমানরা আজ গোলকধাঁধায় পড়ে পরস্পর বিবাদের মাধ্যমে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলছে। আর আলিমদের এ রকম রেষারেষির ফলে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে।
দুঃখের বিষয় হলো-ওয়াজ-মাহফিলে ও সভা-সেমিনারে জনসম্মুখে আলিমদের একপক্ষ অন্যপক্ষকে কাফির, ফাসিক, গোমরাহ ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করছে। আলিমদের মুখে এমন অশালীন কথাবার্তা শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। তাদের ভাষা শুনেই বোঝা যায়, তারা মূলত দ্বীনের স্বার্থে এসব করছেন, নাকি করছেন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রতিষ্ঠায়।
যেসব বিষয়ে মতবিরোধ করে এমন গালাগালি হয়, সেগুলো আদৌ এমন বিষয় নয়-যা আলোচনার গুরুত্ব রাখে। তারপরও যদি একান্ত আলোচনা করতে হয়, তাহলে উভয়পক্ষের আলিমগণ ঘরোয়াভাবে আলোচনা করতে পারেন। জনসম্মুখে এগুলো আলোচনার বিষয় হতে পারে না। কারণ, এগুলো ইলমি বিষয়। সাধারণ মানুষ এসবের কী বুঝবে? তারা তো পানির মতো। তাদের যে পাত্রে রাখা হবে, সে পাত্রেরই রূপ ধারণ করবে।
আলিমসমাজের প্রতি সাধারণ মানুষের রয়েছে এক অনন্য শ্রদ্ধা, সুগভীর আস্থা, প্রভূত সম্মান। এখন আলিমসমাজই যদি তাদের সামনে একে অন্যকে গালাগালি করেন, তাহলে সেই সম্মান, শ্রদ্ধা ও আস্থা কি অটুট থাকবে? আলিমদের এমন বাড়াবাড়ি ও গালাগালির কারণে মানুষের সামনে ইসলামের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ইসলাম প্রচার-প্রসার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইসলামপ্রিয় সাধারণ মানুষ।