📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ১২ তাকবিরের হাদিস

📄 ১২ তাকবিরের হাদিস


ঈদের সালাতে ১২ তাকবির বলার হাদিস ছয়টি সনদে বর্ণিত হয়েছে। ১. ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে।৩৯৯ ২. আম্মার ইবনে সাদ (রা.) থেকে।৪০০ ৩. আমর ইবনে আউফ (রা.) থেকে।৪০১ ৪. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে।৪০২ ৫. আমর ইবনে শুয়াইব (রা.) থেকে তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত।৪০৩ ৬. ইবনে লাহিয়া (রহ.)-এর বর্ণনা।

এসব সনদে ১২ তাকবিরসংক্রান্ত যতগুলো মারফু৪০৪ হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তার সবগুলোই দুর্বল। এর একটি হাদিসও পরিপূর্ণ সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি।৪০৫ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন-
لَيْسَ يُرْوَى في التكبير في العِيدَيْنِ عَنِ النَّبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيثٌ صَحِيحٌ -
'দুই ঈদের তাকবিরসংক্রান্ত একটি সহিহ হাদিসও রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়নি।'৪০৬

তবে এ ব্যাপারে মাওকুফ৪০৭ বা সাহাবিদের কর্মসংক্রান্ত একাধিক সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। এগুলো সাহাবিদের কর্ম হলেও তা রাসূলের শিক্ষা ও নির্দেশনা হিসেবে গণ্য। কেননা, আল্লাহর রাসূলের শিক্ষা ছাড়া সাহাবিরা নিজ থেকে কোনো কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেছেন বলে কল্পনা করা যায় না।

ইমাম মালেক (রহ.) বলেন-'আমি শুনেছি, নাফে (রহ.) বলেছেন-"আবু হুরায়রা (রা.)-এর সাথে আমি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ পড়েছি। তিনি প্রথম রাকাতে কিরাতের পূর্বে সাত তাকবির দিয়েছেন। দ্বিতীয় রাকাতে কিরাতের পর পাঁচ তাকবির বলেছেন।"'৪০৮

হাদিসটির সনদ অত্যন্ত বিশুদ্ধ। কেননা, হাদিসটি ইমাম মালেক নাফে (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তিনি হলেন প্রসিদ্ধ ফকিহ, বিশুদ্ধতম হাদিস বর্ণনাকারী। তাঁর ওস্তাদ নাফে (রহ.) ও তাবেয়িদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সহিহ হাদিস বর্ণনাকারী, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ। অতএব, তা সহিহ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই।

আতা ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করে বলেন-'তিনি (イবনে আব্বাস রা.) ঈদের সালাতের প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমাসহ সাত তাকবির বলতেন। দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবিরসহ ছয় তাকবির বলতেন। আর তাকবিরগুলো বলতেন কিরাতের আগেই।'৪০৯

শাইখ আলবানি (রহ.) বলেন-
وهذا سند صحيح على شرط الشيخين
'বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদিসটির সনদ সহিহ।'৪১০

এ হাদিসে প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমাসহ সাত তাকবির ও দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবিরসহ ছয় তাকবিরের কথা বলা হয়েছে। এ হিসেবে অতিরিক্ত তাকবির সংখ্যা হয় ১১টি। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ১০ তাকবিরের হাদিসও বর্ণিত আছে। সে হাদিসের সনদও সহিহ।

টিকাঃ
৩৯৯. তাবরানি, আল মুজামুল কাবির: ১০৭০৮
৪০০. ইবনে মাজাহ: ১২৭৭
৪০১. তিরমিজি: ৫৩৬
৪০২. দারেকুতনি: ১৭৩২
৪০৩. ইবনে মাজাহ: ১২৭৮
৪০৪. যে হাদিসের সনদ বা বর্ণনাধারা রাসূল পর্যন্ত পৌঁছেছে; অর্থাৎ যে হাদিসে রাসূল ﷺ-এর কথা, কাজ বা অনুমোদন বর্ণিত হয়েছে, তাকে মারফু হাদিস বলে।
৪০৫. দেখুন, শাওকানি, নাইলুল আওতার: ৩/৩৫৪
৪০৬. মুসনাদে আহমদ: ১১/২৮৫
৪০৭. যে হাদিসের সনদ বা বর্ণনাধারা সাহাবিদের পর্যন্ত পৌঁছেছে: অর্থাৎ যে হাদিসে সাহাবিদের কথা, কাজ বা অনুমোদন বর্ণিত হয়েছে, তাকে মাওকুফ হাদিস বলে।
৪০৮. মালিক বিন আনাস, আল মুয়াত্তা : ৬১৯
৪০৯. মুসান্নাফে আবি শাইবা: ৫৭০৪
৪১০. ইরাউল গালিল: ৩/১১১

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ছয় তাকবিরের হাদিস

📄 ছয় তাকবিরের হাদিস


ছয় তাকবিরের ব্যাপারে সহিহ সনদে বর্ণিত কোনো মারফু হাদিস নেই। তবে অনেক মাওকুফ হাদিস রয়েছে, যেগুলোর সনদ সহিহ। তা থেকে দুটি হাদিস উল্লেখ করছি-

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত-'তিনি (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ঈদের সালাতে) নয়বার তাকবির বলতেন। প্রথম তাকবির বলে নামাজ শুরু করতেন। এরপর অতিরিক্ত তিন তাকবির বলে কুরআন পড়তেন। পঞ্চম তাকবির বলে রুকু করতেন। এরপর সিজদা করতেন। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়তেন। পড়া শেষে অতিরিক্ত তিন তাকবির বলতেন। চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে যেতেন।'৪১১

অর্থাৎ, তাকবিরে তাহরিমা ও রুকুর তাকবির বাদ দিলে অতিরিক্ত তাকবির সংখ্যা হয় মোট ছয়টি। এ হাদিসটি মুসলিম শরিফের শর্তানুযায়ী সহিহ। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে সহিহ সনদে এ রকম আরও অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের সম্পর্কে বর্ণিত আছে-
كَانَ لَا يُكَبِّرُ إِلَّا أَرْبَعًا فِي كُلِّ رَكْعَةٍ سَوَاءٌ يُكَبِّرُهُنَّ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ
'তিনি প্রত্যেক রাকাতে চার তাকবির ছাড়া বলতেন না। তিনি দুই রাকাতেই এভাবে চার তাকবির বলতেন।'৪১২

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) বলেন-'এই হাদিসটি বুখারি-মুসলিমের হাদিসের সমপর্যায়ের সহিহ। কেননা, এর প্রত্যেক রাবি থেকে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রহ.) হাদিস গ্রহণ করেছেন।'৪১৩

এখানে চার তাকবির বলতে প্রথম রাকাতের তাকবিরে তাহরিমা ও দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবিরকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই অতিরিক্ত তাকবির সংখ্যা ছয়।

পর্যালোচনা:
ঈদের তাকবিরের ব্যাপারে এ রকম আরও অনেক হাদিস রয়েছে। ঈদের সালাতে অতিরিক্ত ১২, ১১ বা ১০ তাকবিরবিষয়ক হাদিসগুলো আবু হুরায়রা, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রমুখ সাহাবির কর্ম হিসেবে সহিহ সনদে বর্ণিত ও প্রমাণিত। আবার ছয় তাকবিরসহ আট ও নয় তাকবিরবিষয়ক হাদিসগুলো আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, হুজাইফা, আবু মুসা আশআরি, মুগিরা ইবনে শুবা, আনাস বিন মালেক (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত ও প্রমাণিত।৪১৪

এ থেকে বোঝা গেল, ৬, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ তাকবিরসংক্রান্ত হাদিসের সবগুলোই সাহাবিদের আমল। এর যেকোনোটির ওপর আমল করলেই সুন্নত আদায় হবে। কিন্তু আমরা নিজের মত ও মাজহাব টেকাতে গিয়ে কেউ ১২ তাকবিরের হাদিস জয়িফ বলছি। আবার কেউ ছয় তাকবিরের হাদিসকে জয়িফ বলে অপর পক্ষের নামাজ বাতিল করে দিচ্ছি। আমরা কেউ একবারও এটা চিন্তা করছি না, বিপরীত মতের আমল বাতিল করতে গিয়ে আমরা সাহাবিদের আমলই বাতিল করে দিচ্ছি। তাঁদের অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়ন করছি। আমরা এতই সংকীর্ণমনা হয়ে পড়েছি, নিজের মত ছাড়া অন্য মতকে স্বীকৃতি দিতেও নারাজ।

অথচ পূর্ববর্তী ইমামদের মন ছিল আকাশসম প্রশস্ত ও উদার। তাঁরা শুধু নিজের মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন; কিন্তু কখনোই অন্যের মতকে অবজ্ঞা করেননি, বাতিল করেননি।

ইমাম মুহাম্মাদ বলেন-'আমি আবু হানিফা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইমাম যদি ঈদের সালাতে ৯টির বেশি তাকবির বলে, তাহলে মুক্তাদিরা কি তার সাথে তাকবির বলবে? তিনি বললেন- “হ্যাঁ, ৯-এর অতিরিক্ত তাকবিরগুলোতেও মুক্তাদিরা ইমামের অনুসরণ করবে। তবে ইমাম যদি এমন সংখ্যক তাকবির বলে, যা কোনো হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাহলে সেক্ষেত্রে মুক্তাদিরা ইমামের অনুসরণ করবে না।”'৪১৫

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছয়-এর অতিরিক্ত তাকবির বলা নাজায়েজ বলেননি। কেউ অতিরিক্ত তাকবির বললে তার অনুসরণ করতেও নিষেধ করেননি; বরং হাদিস দ্বারা স্বীকৃত সকল পন্থাকেই তিনি জায়েজ বলেছেন, অনুসরণযোগ্য বলেছেন।

শাইখ আলবানি (রহ.) ও বলেছেন- وَالْحَقُّ أَنَّ كُلَّ ذَلِكَ جَائِزٌ فَبِأَيِّهِمَا فَعَلَ فَقَدْ أَدَّى السُّنَّةَ. وَلَا دَاعِيَ لِلتَّعَصُّبِ وَالْفُرْقَةِ- 'প্রকৃত সত্য হচ্ছে, (ঈদের সালাতের তাকবিরসংক্রান্ত) সব পদ্ধতিই বৈধ। ব্যক্তি যে পদ্ধতিতেই তাকবির বলুক, তাতে সুন্নত আদায় হবে। কাজেই এ নিয়ে বিভক্তি ও বাড়াবাড়ির কিছু নেই।'৪১৬

আহলে হাদিসরা শাইখ আলবানি (রহ.)-কে নিজেদের স্মরণীয় ও বরণীয় ইমাম হিসেবে মান্য করে। অথচ এক্ষেত্রে তারাও নিজের ইমামকে উপেক্ষা করে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়িতে লিপ্ত।

টিকাঃ
৪১১. মুসান্নাফে আবি শাইবা: ৫৬৯৯
৪১২. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৫৬৭৬
৪১৩. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সালাতুল ঈদের অতিরিক্ত তাকবির: পৃষ্ঠা-৮৭
৪১৪. বিস্তারিত জানতে দেখুন ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রচিত সালাতুল ঈদের অতিরিক্ত তাকবির।
৪১৫. ইমাম মুহাম্মাদ আশ শায়বানি, মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, (অনুবাদ: মাওলানা মুহাম্মাদ মুসা), প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৭০
৪১৬. আলবানি, সালাতুত তারাবিহ: পৃষ্ঠা-৮৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px