📄 বিতর সালাত সুন্নত না ওয়াজিব
বিতর নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এশার পর থেকে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত এ নামাজ আদায় করা যায়। এ নামাজের অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। রাসূল ﷺ বলেছেন- إِنَّ اللَّهَ أَمَدَّكُمْ بِصَلَاةٍ هِيَ خَيْرٌ لَكُمْ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ : الوِتْرُ - 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের একটি সালাত দিয়ে সাহায্য করেছেন। এটা তোমাদের জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। তা হচ্ছে বিতরের সালাত।'৩৩০
বিতর নামাজ ওয়াজিব না সুন্নত, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ)-এর মতে, বিতর নামাজ ওয়াজিব। তাঁর দলিল হচ্ছে, রাসূল ﷺ বলেছেন- الْوَتْرُ حَقٌّ، فَمَنْ لَمْ يُوْتِرْ فَلَيْسَ مِنَّا قَالَهَا ثَلَاثًا- 'বিতর হলো সত্য। যে বিতর পড়ে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। তিনি তিনবার এ কথা বলেছেন।'৩৩১
হাদিসটিতে একই কথা তিনবার বলে বিতরের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। আর এ রকম গুরুত্ব কেবল ওয়াজিবের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। এ ছাড়া রাসূল ﷺ আরও বলেছেন-
يَا أَهْلَ الْقُرْآنِ ، أَوْتِرُوا ، فَإِنَّ اللَّهَ وِتْرُ يُحِبُّ الْوِتْرَ 'হে কুরআনের ধারকগণ! তোমরা বিতর পড়ো। কেননা, আল্লাহ বিজোড়। আর তিনি বিজোড় ভালোবাসেন।'৩৩২
এ হাদিসে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর নির্দেশ ওয়াজিব হওয়াকে প্রমাণ করে। মাওলানা আব্দুর রহিম (রহ.) বলেন- 'হাদিসের ভাষ্য হলো, اَمَدَّكُمْ (আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সাহায্য করেছেন)।' এ থেকে বোঝা যায়, বিতর নামাজের ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা করেছেন; রাসূল ﷺ করেননি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে যা করতে বলা হয়, তা ওয়াজিব হয়; নফল হয় না।৩৩৩
ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ অধিকাংশ আলিমের মতে, বিতর সালাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা, ওয়াজিব নয়। কাজি আবু তাইয়্যিব বলেন- إن العلماء كَافَة قَالَتْ: إِنَّه سنة ، حَتَّى أَبُو يُوسُفَ وَمُحَمَّد، وَقَالَ أَبُو حنيفة وحده: هُوَ وَاجِب وَلَيْسَ بِفَرْضِ 'সমস্ত আলিমের ঐকমত্যে বিতর সালাত সুন্নত; এমনকী আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের অভিমতও এটি। শুধু আবু হানিফা (রহ.) এককভাবে বিতর নামাজকে ওয়াজিব বলেছেন, ফরজ নয়।'৩৩৪
আবু হামিদ আল গাজ্জালি বলেন- الوترسنة مؤكدة لَيْسَ بفَرْض وَلَا وَاجِب وَبِه قَالَت الأئمة كلها إلا أبا حنيفة 'বিতর সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। আবু হানিফা (রহ.) ছাড়া ইমামদের সবাই এ কথা বলেছেন।'৩৩৫
তাঁরা দলিল হিসেবে বলেন- 'রাসূল ﷺ আহলে কুরআনদের বিতর পড়তে বলেছেন। আর আহলে কুরআন বলতে হাফিজ, আলিম ও ক্বারিদের বোঝায়।৩৩৬ যদি বিতর ওয়াজিব হতো, তাহলে তা সবাইকে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হতো।'
আলি (রা.) বলেন- الوِتْرُ لَيْسَ بِحَتْمٍ كَصَلَاتِكُمُ المَكْتُوبَةِ، وَلَكِنْ سَنَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -
'বিতর তোমাদের ফরজ নামাজের মতো অত্যাবশ্যক নয়। তবে রাসূল ﷺ তা সুন্নতরূপে প্রবর্তন করেছেন।'৩৩৭
তিনি আরও বলেন-'বিতর পড়া ফরজ নামাজের মতো অনিবার্য নয়; বরং এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিষ্ঠিত সুন্নত।'৩৩৮
ইবনে মুনজির বলেন- لَا أَعْلَمُ أَحَدًا وَافَقَ أَبَا حَنِيفَةً فِي هَذَا 'আমি এমন কারও কথা জানি না, যিনি এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সাথে একমত হয়েছেন।৩৩৯
ইমাম ইবনে বাত্তাল বলেন- الوتر واجب على أهل القرآن دون غيرهم ، لقوله عليه السلام : (أوتروا يا أهل القرآن) ، روى ذلك عن ابن مسعود ، وحذيفة وهو قول النخعى- 'বিতর শুধু আহলে কুরআনদের ওপর ওয়াজিব, অন্যদের ওপর নয়। কেননা রাসূল ﷺ-এর বাণী হলো-"হে কুরআনের ধারকগণ! তোমরা বিতর পড়ো।" ইবনে মাসউদ ও হুজাইফা (রা.) থেকেও এটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাখায়ির অভিমতও তা-ই।'৩৪০
তিনি আরও বলেন-'আলি ও উবাদা ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতে, বিতর সালাত সুন্নত। সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব, হাসান, শাবি ও ইবনে শিহাব জুহুরি (রা.)-এর মতও অনুরূপ।'৩৪১
ইমাম শাবি বলেন- الْوِتْرُ تَطَوُّعُ وَهُوَ مِنْ أَشْرَفِ التَّطَوُّعِ 'বিতর সালাত হলো নফল। তবে তা নফলের মধ্যে সর্বোত্তম।'৩৪২
সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন- الْوِتْرُ لَيْسَ بِفَرِيضَةٍ، وَلَكِنَّهُ سُنَّةٌ 'বিতর ফরজ নয়, তবে তা সুন্নত।'৩৪৩
ইমাম নসর আল মারওয়াজি বলেন- أَنَّ الْوِتْرَ سُنَّةٌ وَلَيْسَ بِفَرْضٍ 'বিতর সালাত সুন্নত, ফরজ নয়।'৩৪৪
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন- الْوِتْرُ سُنَّةٌ مُؤَكَدَةٌ بِاتِّفَاقِ الْمُسْلِمِينَ. وَمَنْ أَصَرَّ عَلَى تَرْكِهِ فَإِنَّهُ تُرَدُّ شَهَادَتُهُ 'মুসলমানদের ঐকমত্যে বিতর সুন্নতে মুয়াক্কাদা। যদি কেউ নিয়মিত তা ছেড়ে দেয়, তাহলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।'৩৪৫
শাইখ সালেহ আল উসাইমিন (মৃ. ২০০০ খ্রি.) বলেন-'বিতর সালাত সুন্নত, ওয়াজিব নয়। কেউ না পড়লে গুনাহ হবে না। তবে নিয়মিত ছেড়ে দিলে আদালত (ন্যায়নিষ্ঠতা) ক্ষুণ্ণ হবে। ফলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।'৩৪৬
সাইয়েদ সাবিক (মৃ. ১৯৯৯ খ্রি.) বলেন-'বিতর সালাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসূল ﷺ এটির প্রতি মানুষকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন।'৩৪৭
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়। যারা বিতর সালাতকে সুন্নত বলেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই এর বিপরীতে ফরজ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ওয়াজিব শব্দ ব্যবহার করেননি। তারা এই নামাজকে সুন্নত প্রমাণ করতে দলিল হিসেবে দুটি হাদিস পেশ করে থাকেন।
এক. জনৈক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞেস করল-'ইসলাম কী?' তিনি বললেন—'দিন-রাত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।' লোকটি বলল-'আমার ওপর এ ছাড়া আর কোনো সালাত আছে?' তিনি বললেন-'না। তবে নফল পড়তে পারো।'৩৪৮
দুই. আব্দুল্লাহ ইবনে সুবহানি বলেন-'আবু মুহাম্মাদের মতে, বিতর ওয়াজিব।' এ কথা শুনে উবাদা ইবনে সামিত বললেন- 'সে মিথ্যা বলেছে। আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করবে। নির্ধারিত সময়ে মনোযোগ সহকারে পূর্ণ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে নামাজ আদায় করবে, তাকে ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'৩৪৯
এ দুটি হাদিস দ্বারা তাঁরা বোঝাতে চেয়েছেন, বিতর নামাজ ফরজ নামাজের মতো অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি একটি সুন্নত নামাজ।
এ কথা ধ্রুব সত্য, বিতর ফরজ নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)ও এটাকে ফরজ বলেননি, ওয়াজিব বলেছেন। এ মতবিরোধের মূল কারণ হচ্ছে, ওয়াজিব পরিভাষা শুধু হানাফি মাজহাবের রয়েছে। অন্য মাজহাবের নেই। তাঁদের কাছে হয়তো ফরজ হবে, নয়তো নফল (সুন্নত)।
তারা ওয়াজিব বলতে ফরজ বুঝিয়ে থাকেন। ফরজ ছাড়া সবকিছুই তাদের কাছে নফল। এ কারণেই বিতর সালাত নিয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সাথে কারও মতামত মেলেনি; কিন্তু এই সালাতের গুরুত্বের ব্যাপারে তাঁরা সবাই একমত। বিনা ওজরে এই নামাজ না পড়া তাঁরা কেউ-ই অনুমোদন করেননি। এ ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর কথা সুস্পষ্ট-'যদি কেউ নিয়মিত বিতর ছেড়ে দেয়, তাহলে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।'
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন- من ترك الوتر فهو رجل سوء لا ينبغي أن تقبل له شهادة - 'যে বিতর ছেড়ে দেয়, সে খারাপ লোক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা উচিত নয়।'৩৫০
তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। হানাফি মাজহাবের ওয়াজিব পরিভাষা সম্পর্কে তো ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ পরিচিত, তাহলে তাঁরা এটিকে ওয়াজিব না বলে কেন সুন্নত বললেন? হুকুমের ক্ষেত্রেও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সাথে কেন মতবিরোধ করলেন? আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বিতর কাজা রেখে ফজর আদায় করলে তা শুদ্ধ হয় না (যেহেতু বিতর ওয়াজিব)। সাহাবাইনের মতে শুদ্ধ হয়। কারণ, তাঁদের মতে বিতর সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ থেকে বোঝা যায়, তাঁরা সর্বাবস্থায় বিতরকে সুন্নতই মনে করতেন।
টিকাঃ
৩৩০. তিরমিজি: ৪৫২। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন, হাদিসটি সহিহ লিগাইরিহি, মুসনাদে আহমদ: ৩৯/৪৪৪
৩৩১. আবু দাউদ: ১৪১৯। শাইখ আলবানি (মৃ ১৯৯৯ খ্রি.) বলেন- 'হাদিসটি দুর্বল। এই হাদিসের সনদে উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ আতাকি নামে একজন রাবি রয়েছেন। তিনি রাবি হিসেবে দুর্বল।' (জইফ আবু দাউদ লিল আলবানি : ২/৮১)। ইবনে মাইন (মৃ ২৩৩ হি) তাঁকে সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। ইমাম হাকিমও (মৃ ৪০৫ হি.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। উমদাতুল কারি, ৭/ ১১। শুয়াইব আরনাউতের মতে, হাদিসটি হাসান লিগাইরিহি। তাখরিজ, আবু দাউদ: ১৪১৯
৩৩২. আবু দাউদ: ১৪১৬, নাসায়ি: ১৬৭৫
৩৩৩. মাওলানা আব্দুর রহিম, হাদিস শরিফ, (খাইরুন প্রকাশনী, ঢাকা, ১৩ প্রকাশ, ২০০৮), ২য় খণ্ড: পৃষ্ঠা-১৩৯
৩৩৪. উমদাতুল কারি: ৭/১১
৩৩৫. উমদাতুল কারি: ৭/১১
৩৩৬. মাওলানা আবদুর রহীম, হাদিস শরিফ : ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩৯
৩৩৭. তিরমিজি: ৪৫৩
৩৩৮. তিরমিজি: ৪৫৪
৩৩৯. নববি: ৪/১৯; সাইয়েদ সাবিক, ফিকহুস-সুন্নাহ: ১/১৯২
৩৪০. প্রাগুক্ত
৩৪১. শরাহ, বুখারি: ২/৫৮০
৩৪২. নাসর আল-মারওয়াজি, মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল: ১/২৭৪
৩৪৩. প্রাগুক্ত
৩৪৪. প্রাগুক্ত: ১/২৬৯
৩৪৫. মাজমুউল ফতওয়া: ২৩/৮৮
৩৪৬. সালেহ আল উসাইমিন, শরহে রিয়াদুস-সালেহিন: ৫/২৪৪
৩৪৭. ফিকহুস সুন্নাহ: ১/১৯১
৩৪৮. বুখারি: ৪৬
৩৪৯. বিস্তারিত দেখুন, ইবনু আবদুল বার, আল ইসতিযকার : ২/১১৩; মারওয়াজি, মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল : ১/২৭৪, আইনি, উমদাতুল কারি: ৭/১১; নববি, আল মাজমুউ: ৪/১৯; ইবনে কুদামা, আল মুগনি : ২/১১৮. শাওকানি, নাইলুল আওতার: ১/৩৬৪
৩৫০. সালেহ আল উসাইমিন, শরহে রিয়াদুস-সালেহিন: ৫/২৪৪
📄 বিতরের রাকাত সংখ্যা ও পড়ার পদ্ধতি
বিতরের রাকাত সংখ্যা নিয়ে হানাফি ও আহলে হাদিসের আলিমগণ চরম বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। হানাফিরা বলেন-বিতর সালাত তিন রাকাত নির্দিষ্ট। এর কম পড়া যাবে না, বেশিও পড়া যাবে না। হানাফি মাজহাবের প্রচলিত পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতিতেও পড়া যাবে না।
আহলে হাদিসের আলিমগণ বলেন-'আমাদের দেশে প্রচলিত বিতর নামাজ শুদ্ধ নয়; বরং এক বৈঠকে তিন রাকাত পড়তে হবে। নতুবা দুই রাকাত পড়ে সালাম ফেরানোর পর নতুন করে আরও এক রাকাত পড়তে হবে। দুই বৈঠকে তিন রাকাত পড়া সালফে সালেহিনদের আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়।' তাই আমরা এখানে বিতর নামাজের রাকাত সংখ্যা ও পড়ার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
বিতর তাহাজ্জুদ নামাজের অংশ। হাদিসে তাহাজ্জুদ ও বিতরকে একত্রে বোঝাতে কিয়ামুল লাইল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। রাসূল ﷺ তাহাজ্জুদ বা কোনো নফল নামাজের পর বিতর পড়তেন। এ কারণেই অনেক হাদিসে এক রাকাত বিতরের কথা এসেছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-তিনি তাহাজ্জুদের সাথে বিতর হিসেবে এক রাকাত সালাত যোগ করেছেন। কিন্তু তাহাজ্জুদ বা নফল না পড়ে শুধু এক রাকাত বিতর পড়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এখন আমরা সালাতুল বিতরের রাকাত সংখ্যা ও তা পড়ার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
বিতর নামাজের ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ-এর নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি ছিল না। উম্মতকেও কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তিনি আবদ্ধ করে যাননি। তিনি বিতর পড়েছেন বিভিন্ন পদ্ধতিতে। কখনো বৈঠক ছাড়া একটানা আট রাকাত পড়ে অষ্টম রাকাতে সালাম ফিরিয়েছেন। এরপর বিতর হিসেবে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়েছেন। পুনরায় নতুন নিয়্যাত করে আরও এক রাকাত বিতর পড়েছেন।৩৫১
এই পদ্ধতিতে বিতর পড়ার হাদিসের সংখ্যা বেশি এবং অধিক মজবুত। অধিকাংশ আলিম এ পদ্ধতিতেই আমল করেন। ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমদ ও ইসহাক (রহ.)-এর মতও এটিই।৩৫২
ইবনে উমর (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে- كَانَ يُسَلِّمُ بَيْنَ الرَّكْعَةِ وَالرَّكْعَتَيْنِ فِي الْوِتْرِ حَتَّى يَأْمُرَ بِبَعْضِ حَاجَتِهِ 'তিনি বিতর সালাতে প্রথম দুই রাকাত ও শেষ এক রাকাতের মাঝে সালাম ফেরাতেন। অতঃপর কাউকে কোনো প্রয়োজনীয় কাজের নির্দেশ দিতেন।'৩৫৩
জনৈক ব্যক্তি ইবনে উমর (রা.)-কে বিতর নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি তাকে প্রথম দুই রাকাত ও শেষ রাকাতের মাঝে পৃথক করার নির্দেশ দিলেন। লোকটি বলল-'আমার আশঙ্কা হচ্ছে, লোকেরা এটাকে লেজকাটা সালাত বলবে।' তিনি উত্তরে বললেন-'তুমি আল্লাহ ও রাসূলের সুন্নত চাচ্ছ, এটিই হচ্ছে আল্লাহ ও রাসূলের সুন্নত।'৩৫৪
আবার আল্লাহর রাসূল ﷺ কখনো একটানা সাত বা পাঁচ রাকাত বিতর পড়তেন। মাঝে কোথাও বসতেন না। একেবারে পঞ্চম বা সপ্তম রাকাতে বসে সালাম ফেরাতেন।৩৫৫
হাদিসের আলোকে এ নামাজ ১, ৩, ৫, ৭, ৯, ১১ ও ১৩ রাকাত পড়া যায়। তবে রাসূল ﷺ অধিকাংশ সময় তিন রাকাত বিতর পড়েছেন। আর তা পড়ার তিনটি পদ্ধতি ছিল। এক. দুই রাকাত পড়ে সালাম ফেরাতেন। এরপর নতুন করে তাকবিরে তাহরিমা বলে আরও এক রাকাত পড়তেন। এই পদ্ধতির হাদিস সংখ্যা বেশি এবং শক্তিশালী। দুই. দুই রাকাত পর বৈঠক না করে একটানা তিন রাকাত পড়া। তিন. দুই রাকাত পর বৈঠক করা, এরপর উঠে তৃতীয় রাকাত পড়া। অর্থাৎ প্রথম দুই রাকাত পর বসা, কিন্তু প্রথম দুই রাকাত ও তৃতীয় রাকাতের মাঝে সালাম দ্বারা পার্থক্য না করা। আমাদের সমাজে অধিকাংশ স্থানে এই পদ্ধতিতে বিতর পড়া হয়।
নিম্নে এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো-
১. বিশিষ্ট তাবেয়ি আব্দুল্লাহ ইবনে আবু কাইস (রহ.) বলেন- 'আমি আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল ﷺ কত রাকাত বিতর পড়তেন? তিনি বললেন-“রাসূল ﷺ ৩, ৪ ও ৩, ৬ ও ৩, ৮ এবং ৩, ১০ রাকাত বিতর পড়তেন। তিনি সাত রাকাতের কম এবং ১৩ রাকাতের বেশি বিতর পড়তেন না।”৩৫৬ অর্থাৎ, তিনি তাহাজ্জুদ পড়তেন ৪, ৬, ৮ ও ১০ রাকাত এবং বিতর তিন রাকাত পড়তেন। আর এইভাবে সমস্ত নামাজ বিতরে পরিণত হতো।
২. আয়িশা (রা.) বলেন- 'রাসূল ﷺ ফজরের পূর্বের দুই রাকাত (সুন্নত)সহ মোট ১৩ রাকাত সালাত আদায় করতেন। দুই দুই রাকাত করে (কিয়ামুল লাইল) ছয় রাকাত পড়তেন। বিতর পাঁচ রাকাত পড়তেন। আর বিতরের সর্বশেষ রাকাত ছাড়া মাঝে বসতেন না।'৩৫৭ অর্থাৎ, কোনো বৈঠক ছাড়া একটানা পাঁচ রাকাত পড়তেন।
৩. জনৈক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন- 'রাতের সালাত দুই রাকাত দুই রাকাত করে। তবে ভোর হওয়ার আশঙ্কা হলে এক রাকাত বিতর পড়ে নেবে, তাহলে এটি তার পূর্ববর্তী সালাতকে বিতর করে দেবে।'৩৫৮
৪. আয়িশা (রা.) বলেন- 'রাসূল ﷺ তিন রাকাত বিতর পড়তেন। শেষ রাকাতের পূর্বে তিনি সালাম ফেরাতেন না।'৩৫৯
এর দুটি পদ্ধতি হতে পারে। হয় কোনো বৈঠক ছাড়া একটানা তিন রাকাত পড়তেন। অথবা দুই রাকাত পর বসে তাশাহুদ পাঠ করতেন। এরপর উঠে তৃতীয় রাকাত পড়ে সালাম ফেরাতেন। সাহাবিদের আমল দুই দিকেই পাওয়া যায়।
৫. বিতর এক রাকাত পড়ার অনুমোদন দিয়ে রাসূল ﷺ বলেন-'বিতর পড়া প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। যার পাঁচ রাকাত পছন্দ, সে যেন তা-ই পড়ে। যার তিন রাকাত পছন্দ, সে যেন তা-ই পড়ে। যার এক রাকাত পছন্দ, সে যেন তা-ই পড়ে।'৩৬০
৬. অন্য হাদিসে আছে- 'রাতের শেষাংশে বিতর নামাজ এক রাকাত।'৩৬১
৭. আয়িশা (রা.) বলেন- 'রাসূল ﷺ ১১ রাকাত সালাত আদায় করতেন। তন্মধ্যে বিতর পড়তেন এক রাকাত।'৩৬২
রাসূল ﷺ-এর বিতর সালাত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সব হাদিস একত্র করলে বিতর নামাজ পড়ার প্রায় ১৩টি পদ্ধতি পাওয়া যায়। এর কারণ, রাসূল ﷺ বিতর নামাজ তাহাজ্জুদের সাথে একত্রে পড়েছেন। সাহাবিগণ তাঁকে যেভাবে বিতর পড়তে দেখেছেন, সেভাবে বর্ণনা করেছেন। নিজেও সেই অনুযায়ী আমল করেছেন। তাই সহিহ হাদিসে বর্ণিত যেকোনো পন্থায় আমল করলেই সুন্নত আদায় হবে।
ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো- 'মুয়াবিয়া (রা.) এক রাকাত বিতর পড়েন, এই ব্যাপারে আপনার মতামত কী?' তিনি উত্তরে বললেন- أَصَابَ، إِنَّهُ فَقِيةٌ 'ঠিক করেছেন, তিনি তো একজন ফকিহ।'৩৬৩ শাইখুল ইসলাম মাওলানা তাকি উসমানি মুয়াবিয়া (রা.) সম্পর্কে মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর পর্যালোচনার একটা জবাব দিতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে ইতিহাসের কাঠগড়ায় মুয়াবিয়া (রা.) বইয়ের ৩৬ নং পৃষ্ঠায় এই হাদিসটি উল্লেখ করেন। এতে বোঝা যায় যে, মাওলানা তাকি উসমানি সাহেবের মতেও এক রাকাত বিতর বৈধ।
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে- كَانَ يُوتِرُ بَعْدَ الْعَتَمَةِ بِوَاحِدَةٍ 'তিনি এশার পর এক রাকাত বিতর আদায় করতেন।'৩৬৪
অনুরূপ উসমান, ইবনে উমর, ইবনে জুবাইর, ইবনে আব্বাস, আবু মুসা আশআরি (রা.) এক রাকাত বিতর আদায় করতেন।৩৬৫
উমর (রা.)-এর যুগেও সাহাবিরা (কখনো কখনো) এক রাকাত বিতর পড়তেন।৩৬৬
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- إِنَّمَا هِيَ وَاحِدَةٌ، أَوْ خَمْسٌ . أَوْ سَبْعٌ، أَوْ أَكْثَرُ مِنْ ذَلِكَ . يُوتِرُ بِمَا شَاءَ . 'বিতর নামাজ এক রাকাত, পাঁচ রাকাত, সাত রাকাত অথবা তার চেয়েও বেশি। নামাজি এর মধ্যে যেটা ইচ্ছা সেটা করতে পারে।'৩৬৭
সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন- إِنْ شِئْتَ أَوْ تَرْتَ بِخَمْسٍ، وَإِنْ شِئْتَ أَوْ تَرْتَ بِثَلَاثٍ، وَإِنْ شِئْتَ أَوْ تَرْتَ بِرَكْعَةٍ 'তুমি চাইলে বিতর নামাজ পাঁচ রাকাত, তিন রাকাত বা এক রাকাত আদায় করতে পারো।'৩৬৮
তিনি আরও বলেছেন- وَالَّذِي أَسْتَحِبُّ أَنْ أُوتِرَ بِثَلَاثِ رَكَعَاتٍ، وَهُوَ قَوْلُ ابْنِ الْمُبَارَكِ، وَأَهْلِ الكوفة 'তবে আমার কাছে তিন রাকাত বিতর উত্তম। আর এটি ইবনে মুবারাক ও কুফাবাসীর মত।'৩৬৯
নসর আল মারওয়াজি বলেন-'এর প্রত্যেকটাই বৈধ।'৩৭০ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন-'তাঁরা (নিজেরা) বিতর পাঁচ রাকাত, তিন রাকাত ও এক রাকাত আদায় করতেন। তাঁরা এর প্রতিটি উত্তম মনে করেছেন।'৩৭১
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)ও এক রাকাত বিতর সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন-'আমার দৃষ্টিতে সত্য হলো-উভয় আমলই সঠিক। এর উদাহরণ হলো এক রাকাত বা তিন রাকাত বিতর।'৩৭২
আবু মুসা (রহ.) বলেন- ثَلَاثُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ وَاحِدَةٍ وَخَمْسٌ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ ثَلَاثٍ، وَسَبْعٌ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ خَمْسٍ، وَتِسْعٌ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ سَبْعٍ 'আমার কাছে এক রাকাত বিতরের চেয়ে তিন রাকাত বিতর উত্তম, তিন রাকাতের চেয়ে পাঁচ রাকাত, পাঁচ রাকাতের চেয়ে সাত রাকাত এবং সাত রাকাতের চেয়ে নয় রাকাত উত্তম।'৩৭৩
আবার একদল আলিম বলেন-আমাদের দেশে প্রচলিত বিতর অর্থাৎ দুই বৈঠকে তিন রাকাত পড়া বিশুদ্ধ নয়। তাদের এ কথাও সঠিক নয়। যদিও রাসূল ﷺ এই পদ্ধতিতে নামাজ পড়েছেন তা স্পষ্ট বর্ণনা নেই, তবে একাধিক হাদিস থেকে বাহ্যত বোঝা যায় যে, তিনি এই পদ্ধতিতেও নামাজ পড়েছেন। ইবনে উমর (রা.) থেকে ইবনে সিরিন (রহ.) বর্ণনা করে বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন- صَلَاةُ الْمَغْرِبِ وِتْرُ صَلَاةِ النَّهَارِ فَأَوْتِرُوا صَلَاةَ اللَّيْلِ 'মাগরিবের সালাত হচ্ছে দিনের বিতর। অতএব, তোমরা রাতের বিতর আদায় করো।'৩৭৪
ইবনে হাজম (রহ.)ও আল মুহাল্লা গ্রন্থে হাদিসটি সহিহ বলেছেন।৩৭৫ এ ছাড়াও একাধিক হাদিসে মাগরিবের নামাজকে দিনের বিতর বলা হয়েছে।৩৭৬
এসব হাদিসে বিতর সালাতকে মাগরিবের নামাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অতএব, তা দুই বৈঠকে আদায় করা হবে।৩৭৭ উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন- كَانَ يُوتِرُ بِثَلَاثٍ مِثْلَ الْمَغْرِبِ لَا يُسَلِّمُ بَيْنَهُنَّ 'বিতর নামাজ মাগরিবের নামাজের মতো; এর মধ্যে সালাম হবে না।'৩৭৮
আল্লামা ইবনে আবদিল বার (রহ.) বলেন- أَنَّ الْمَغْرِبَ ثَلَاثَ رَكَعَاتٍ لَا يُسَلِّمُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ فَكَذَلِكَ وِتْرُ صَلَاةِ اللَّيْلِ 'মাগরিবের নামাজ তিন রাকাত, শেষ রাকাত ছাড়া সালাম ফেরানো হবে না। অতএব, রাতের সালাত "বিতর"ও অনুরূপ।'৩৭৯
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রা.), আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরি, আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ, আহমদ, ইবনে মুবারাক (রহ.)-এর মতও তা-ই।৩৮০ সুফিয়ান সাওরি বলেন- 'তাঁরা বিতর নামাজে প্রথম রাকাতে সূরা আলা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন পড়তেন। তারপর বসে তাশাহুদ পড়ে আবার উঠতেন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়তেন।'৩৮১
আবার আতা (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে- أَنَّهُ كَانَ يُوتِرُ بِثَلَاثٍ لَا يَجْلِسُ فِيهِنَّ، وَلَا يَتَشَهَدُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ 'তিনি তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং এর মাঝে বসতেন না, শেষ রাকাত ছাড়া তাশাহুদও পড়তেন না।'
মাগরিবের মতো বিতর না পড়ার হাদিসগুলোতে রাকাতের সাথে সাদৃশ্য না রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, মাগরিবের মতো শুধু তিন রাকাত বিতর না পড়ে তার আগে দুই-চার রাকাত নফল সালাত পড়ে তারপর বিতর পড়তে বলা হয়েছে। ৩৮২, ৩৮৩
আল্লামা ইবনে হাজম (মৃ. ৪৫৬ হি.) আল মুহাল্লা গ্রন্থে বিতর সালাতের ১৩টি পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন:
১. ১২ রাকাত কিয়ামুল লাইল এবং ১ রাকাত বিতর।
২. ৮ রাকাত নফল এবং বৈঠক ছাড়া একসঙ্গে ৫ রাকাত বিতর।
৩. ১০ রাকাত নফল এবং ১ রাকাত বিতর।
৪. ৮ রাকাত নফল এবং ১ রাকাত বিতর।
৫. একটানা ৮ রাকাত পড়ার পর অষ্টম রাকাতে বৈঠক করে সালাম না ফিরিয়ে উঠে ১ রাকাত পড়ে সালাম।
৬. ৬ রাকাত নফল এবং বৈঠক ছাড়া একটানা ৭ রাকাত বিতর।
৭. একটানা ৭ রাকাত পড়ার পর বৈঠক করে সালাম না ফিরিয়ে উঠে ১ রাকাত পড়ে সালাম।
৮. কোনো বৈঠক ছাড়াই একটানা ৭ রাকাত পড়ে শেষ বৈঠকে সালাম।
৯. ৪ রাকাত নফল এবং ১ রাকাত বিতর।
১০. কোনো বৈঠক ও তাশাহুদ ছাড়াই একটানা ৫ রাকাত।
১১. ৩ রাকাত বিতর (২ রাকাতের পর সালাম এবং পরে ১ রাকাত)।
১২. ৩ রাকাত বিতর (২ রাকাতের পর বৈঠক কিন্তু সালাম না ফিরিয়ে উঠে ৩য় রাকাত)।
১৩. শুধু ১ রাকাত বিতরণ।
টিকাঃ
৩৫১. নাসায়ি: ১৬০১
৩৫২. তিরমিজি: ৪৬১
৩৫৩. বুখারি : ৯৯১
৩৫৪. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১০৭৪। সনদ সহিহ
৩৫৫. মুসলিম: ১/৫০৮; তিরমিজি: ৪৫৯, আবু দাউদ: ১৩৫৬
৩৫৬. আবু দাউদ: ১৩৬২
৩৫৭. আবু দাউদ: ১৩৫৯
৩৫৮. বুখারি: ৯৯০, ৪৭২: মুসলিম: ১/৫১৬
৩৫৯. আল মুস্তাদরাক হাকিম: ১১৪০
৩৬০. আবু দাউদ: ১৪২২
৩৬১. মুসলিম: ১/৫১৮
৩৬২. মুসলিম: ১/৫০৮
৩৬৩. বুখারি: ৩৭৬৫
৩৬৪. মুয়াত্তা ইমাম মালেক: ২৬৭
৩৬৫. প্রাগুক্ত, টীকা
৩৬৬. আবদুর রাজ্জাক, আল মুসান্নাফ: ৭৭৩০
৩৬৭. ইবনে কুদামা, আল মুগনি: ২/১১১
৩৬৮. সুনানে তিরমিজি: ৪৬০, টীকা
৩৬৯. প্রাগুক্ত
৩৭০. মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল: ১/১২৭
৩৭১. তিরমিজি: ৪৬০, টীকা
৩৭২. শাহ ওয়ালিউল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ২/১৬
৩৭৩. ইবনে কুদামা, আল মুগনি, ২/১১১
৩৭৪. আইনি, উমদাতুল কারি, ৭/৪
৩৭৫. আল মুহাল্লা: ২/৯০
৩৭৬. জামিউস সগির লিল আলবানি: ৩৮৩১
৩৭৭. তবে এখানে দিনের বিতর বলতে পদ্ধতিগত পার্থক্য না করে শুধু বিজোড় রাকাত সংখ্যাও উদ্দেশ্য হতে পারে।
৩৭৮. মুহাম্মাদ ইবনু নাসর আল মারওয়াজি, মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল : ১/২৯৪
৩৭৯. আল-ইস্তিজকার: ২/১২০
৩৮০. উমদাতুল কারি: ৪/২৫২
৩৮১. নাসর আল মারওয়াজি, মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল : ১/৩০৩
৩৮২. ইবনে হিব্বান : ২৪২৯, হাকিম, আল মুস্তাদরাক: ১১৩৭
৩৮৩. উমদাতুল কারি: ৪/৩৫৩
📄 কুনুতের পূর্বে তাকবির দেওয়া ও হাত তোলা
আমাদের দেশে দুআ কুনুত পড়ার আগে তাকবির বলে হাত তোলার প্রচলন রয়েছে। সহিহ হাদিসে এই ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। তবে সালফে সালেহিনদের কেউ কেউ হাত তুলে তাকবির দিতেন। আবার কেউ কেউ হাত উঠাতেন না। নাসর আল মারওয়াজি ইবরাহিম থেকে বর্ণনা করে বলেন- إِذَا فَرَغَ مِنَ الْقِرَاءَةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ، ثُمَّ قَنَتَ 'তিনি (তৃতীয় রাকাতে) কিরাত শেষে তাকবির বলতেন এবং দুই হাত ওঠাতেন। এরপর দুআয়ে কুনুত পড়তেন।'
ওয়ালিদ বিন মুসলিম বলেন- 'আমি ইমাম আওজায়িকে বিতর নামাজে হাত উঠানো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন- لَا تَرْفَعُ يَدَيْكَ "তুমি হাত ওঠাবে না।”'৩৮৫
সাইয়েদ সাবিক (মৃ. ১৯৯৯ খ্রি.) বলেন- 'রুকুর পূর্বে কুনুত পড়লে কিরাত শেষে আল্লাহু আকবার বলে হাত ওঠাবে; এ বিষয়টি কতক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে। কিছু আলিমের মতে, কুনুতের সময় হাত তোলা মুস্তাহাব। আবার কারও কারও মতে, হাত তোলা মুস্তাহাব নয়।'৩৮৬
টিকাঃ
৩৮৫. ইবনু নাসর আল মারওয়াজি, মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল: ১/৩২০
৩৮৬. ফিকহুস সুন্নাহ: ১/১৯৬
📄 দুআয়ে কুনুত পাঠ
কুনুত শব্দের অর্থ আনুগত্য করা, দণ্ডায়মান হওয়া, প্রার্থনা করা বা দণ্ডায়মান হয়ে দুআ করা। বিতর সালাতের শেষ রাকাতে রাসূল ﷺ ও সাহাবিগণ বিভিন্ন দুআ করতেন। এ দুআগুলোই দুআয়ে কুনুত নামে পরিচিত।
উবাই ইবনে কাব থেকে বর্ণিত-'রাসূল ﷺ তিন রাকাত বিতর পড়তেন। প্রথম রাকাতে সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আলা, দ্বিতীয় রাকাতে কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন, তৃতীয় রাকাতে কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ পাঠ করতেন। রুকু যওয়ার পূর্বে দুআ কুনুত পড়তেন। সালাত শেষ করার আগে তিনবার সুবহানাল মালিকিল কুদ্দুস বলতেন। শেষবার একটু টেনে বলতেন।'৩৮৭
সুনানে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে- كَانَ يُوتِرُ فَيَقْنُتُ قَبْلَ الرُّكُوعِ 'রাসূল ﷺ বিতর পড়তেন এবং রুকুর পূর্বে দুআ কুনুত পড়তেন।'৩৮৮
কিছু কিছু হাদিসে রুকুর পরে দুআ করার কথাও উল্লেখ আছে। তবে সে হাদিসগুলো কারও পক্ষে বা বিপক্ষে দুআর ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَدْعُوَ عَلَى أَحَدٍ أَوْ يَدْعُوَ لِأَحَدٍ ، قَنَتَ بَعْدَ الرُّكُوعِ 'কারও পক্ষে বা বিপক্ষে দুআ করার ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ রুকুর পরে কুনুত পড়তেন।'৩৮৯
আবু আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত- أَنَّ عَلِيًّا كَانَ يَقْنُتُ فِي الْوِتْرِ بَعْدَ الرَّكْعَةِ 'আলি (রা.) বিতর নামাজে রুকুর পর দুআ কুনুত পাঠ করতেন।'৩৯০
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো- 'বিতর সালাতে দুআয়ে কুনুত কখন পড়া হয়? এ দুআয় হাত উঠাতে হয় কি না'? ফজর নামাজের কুনুতে নাজিলার ওপর কিয়াস করে তিনি বললেন- الْقُنُوتُ بَعْدَ الرُّكُوعِ، وَيَرْفَعُ يَدَيْهِ 'কুনুত রুকুর পরে পড়তে হয়। এর দুআয় হাত উঠাতে হয়।'৩৯১
উমর ও ইবনে মাসউদ (রা.) রুকুর পূর্বে কুনুত পড়তেন।৩৯২ আনাস ও উবাই ইবনে কাব (রা.)ও রুকুর পূর্বে কুনুত পড়তেন।৩৯৩
তাবেয়ি আলকামা (রহ.) বলেন- أَنَّ ابْنَ مَسْعُودٍ وَأَصْحَابَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانُوا يَقْنُتُونَ فِي الْوِتْرِ قَبْلَ الرُّكُوعِ 'ইবনে মাসউদ (রা.) ও রাসূল ﷺ-এর সাহাবারা বিতর নামাজে রুকুর পূর্বে কুনুত পড়তেন।'৩৯৪
হুমাইদি (রা.) বলেন-'আমি আনাস (রা.)-কে বিতর সালাতে দুআ কুনুত পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন- كُنَّا نَفْعَلُ قَبْلُ وَبَعْدُ "আমরা রুকুর পূর্বে ও পরে দুইভাবেই কুনুত পড়ে থাকি।”'৩৯৫
উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী বলেন- 'বিতর সালাতে দুআ কুনুত রুকুর পূর্বে ও পরে দুইভাবেই পড়া যায়। তবে আমার কাছে রুকুর পূর্বে পড়া উত্তম। কেননা, এর পক্ষে হাদিস সংখ্যা বেশি।'৩৯৬
আমাদের অনেকে মনে করি, এ দুআ-ই (প্রচলিত দুআ) পড়তে হবে। আমাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কেননা, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও সাহাবাইন স্পষ্ট বলেছেন, কুনুতের কোনো নির্দিষ্ট দুআ নেই।৩৯৭
ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে বলা হয়েছে- وَلَيْسَ فِي الْقُنُوتِ دُعَاءُ مُؤَقَّتْ 'কুনুতে নির্দিষ্ট কোনো দুআ নেই।'৩৯৮ হাদিসে একাধিক মাসনুন দুআ বর্ণিত হয়েছে। তার যেকোনো দুআই কুনুতে পাঠ করা যায়।
টিকাঃ
৩৮৭. নাসায়ি: ১৬৯৯
৩৮৮. ইবনে মাজাহ: ১১৮২
৩৮৯. বুখারি: ৪৫৬০
৩৯০. নসর আল মারওয়াজি, মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল : পৃষ্ঠা-৩১৭
৩৯১. প্রাগুক্ত: ৩১৮
৩৯২. প্রাগুক্ত: ৩১৮
৩৯৩. মিরআতুল মাফাতিহ: ১২৮২
৩৯৪. ইবনু হুমাম, ফাতহুল কাদির: ১/৪২৯; আলবানি, ইরওয়াউল গালিল: ২/১৬৬
৩৯৫. প্রাগুক্ত: ৩১৮
৩৯৬. মিরআতুল মাফাতিহ: ১২৮২
৩৯৭. আল মাবসূত : (১/১৬৪)
৩৯৮. ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/১১১