📄 আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)-এর অভিমত
বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান আলিম, মুহাদ্দিস ও ফকিহ কানাইঘাটের গর্ব আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (মৃ. ১৯৭১ খ্রি.)। তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে হাদিসবিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তিনি একজন দেওবন্দি আলিম। মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। সত্যের আলো গ্রন্থে তিনি তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। আমরা এখানে তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরছি।
শাইখুল হাদিস আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) বলেন-'সালাতুল লাইল, কিয়ামুল লাইল, কিয়ামে রমজান, তাহাজ্জুদ ও তারাবি একই সালাতের বিভিন্ন নাম। ২৩১ অন্যত্র এই শব্দসমূহের শাব্দিক বিশ্লেষণের পর তিনি বলেন-'নাম ভিন্ন হলেও মূলত তা এক নামাজ। '২৩২
তারাবি নামাজ আট রাকাতের পক্ষে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা (রা.)- এর যে হাদিসটি আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি, আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) তা উল্লেখ করার পর বলেন- 'ইমাম মুহাম্মাদ ও ইমাম বুখারি, অন্যান্য ফুকাহা ও মুহাদ্দিসগণ রাসূল ﷺ-এর রমজান শরিফের তিন রাতের জামাতের রাকাত নির্ণয় করতে এই হাদিসের ওপর নির্ভর করেছেন।'
এরপর তিনি বলেন-'তদুপরি রাকাত সম্বন্ধে আরও একটি পরিষ্কার হাদিস বিদ্যমান রয়েছে। জাবির (রা.) বলেছেন-ওই রাত্রিসমূহে নবি করিম ﷺ তাঁদের নিয়ে আট রাকাত তারাবি ও বিতর পড়েছেন। এই হাদিসটি ইবনে খুজাইমা ও ইবনে হিব্বান তাঁদের সহিহহাইনে লিখেছেন। হাফিজ জাইলাই নাসবুর রায়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১৫২ পৃষ্ঠায় এ হাদিস উল্লেখ করে কোনো খুঁত লিখেননি। অনুরূপ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারি-তে ও ইবনে হুমাম (রহ.) ফাতহুল কাদির গ্রন্থে উক্ত হাদিস উল্লেখ করে কোনো দোষ বর্ণনা করেননি। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনিও অনুরূপ লিখেছেন।' ২৩৩
আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) ইবনে হুমামের বরাতে বলেন- 'কিয়ামে রমজান সুন্নত এবং তা বিতরসহ ১১ রাকাত... এবং এই নামাজের সময় এশা হতে ফজর পর্যন্ত এবং সর্বোত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষ অর্ধেকে। '২৩৪
তিনি আরও বলেন-'কেউ যদি ২০ রাকাতে সীমাবদ্ধ তারাবির নামাজের কথা মুহাম্মাদ ﷺ-এর মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে বলে কোনো সহিহ বা হাসান হাদিস দ্বারা প্রমাণ দেখাতে পারেন, তবে আমি আজীবন তার দাসত্ব করব।' ২৩৫
তারাবির রাকাত সংখ্যার ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) বলেন-'সকলের জেনে রাখা উচিত যে, মুহাম্মাদ ﷺ তারাবির সালাতকে কোনো নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করেননি। ২০ রাকাতে সীমাবদ্ধ তারাবি নামীয় সালাতের বয়ান ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর জাহিরি রেওয়ায়েতের ছয় কিতাবের২৩৬ কোনো কিতাবে নেই।'২৩৭
তিনি আরও বলেন-'তারাবি নামাজকে রাসূলে করিম ﷺ কোনো নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করেননি। সুতরাং কিয়ামে রমজান (তারাবি)-কে কোনো নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করা অযৌক্তিক এবং নবিজির আদর্শের ওপর হস্তক্ষেপ।'২৩৮
উমর (রা.) কর্তৃক তারাবির নামাজের সূচনা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-'উমর (রা.) কাউকে ২৩ রাকাত (তারাবি) পড়ার নির্দেশ দেননি। শত চেষ্টা করেও কেউ নির্ভুল সনদে তা দর্শাতে পারবে না; বরং মুয়াত্তা গ্রন্থে নির্ভুল সনদে রয়েছে, সাইব ইবনে ইয়াজিদ বলেন-উমর (রা.) উবাই ইবনে কাবকে লোকদের নিয়ে ১১ রাকাত তারাবি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।'
এই বিশুদ্ধ হাদিস (আসার২৩৯) দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, উমর (রা.) ও উবাই ইবনে কাব (রা.) ১১ রাকাতেই রাত্রি শেষে করে দিতেন। ইমাম বায়হাকি (রহ.) লিখেছেন যে, নিশ্চয় প্রথমত ১১ রাকাত পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন পরে লোকদের পক্ষে অসহনীয় হয়ে দাঁড়ালে রাকাতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। কারণ, সাইব ইবনে ইয়াজিদ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে একটি আসার আমি পেয়েছি। তিনি বলেছেন-'মানুষ উমর (রা.)-এর সময় ২৩ রাকাত জামাতে পড়তেন।'
তিনি আরও বলেন-'ইমাম বায়হাকি (রহ.)-এর এ কথায় ঘোর আপত্তি আছে। ইমাম মালেক (রহ.)-এর সঙ্গে কোনো বিষয়ে তাঁর তুলনা হতে পারে না। বায়হাকির লিখিত আসারে উমর (রা.)-এর কোনো নির্দেশ নেই।'২৪০
অতঃপর তিনি বলেন-'আমাদের দেশে আরও একদল আছেন, যারা নিজেকে আহলে হাদিস বলে দাবি করেন। তারা এশার পরেই মামুলিভাবে শুধু ৮ রাকাত জামাতে পড়ে কিয়ামে রমজানের সুন্নত পালন করে থাকেন। আর জিজ্ঞেস করলে বলেন-আমরা বুখারি শরিফের মতো কাজ করছি।' তারা মারাত্মক ভুলের মধ্যে আছেন। শুধু বুখারি শরিফের অনুসরণ করতে হলে 'বুখারি শরিফে কিয়ামে রমজানের বাবে' লিখিত হাদিসগুলোর যথার্থ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ, রাতের প্রথম অর্ধেক অতিবাহিত হওয়ার পর নামাজ শুরু করে ফজরের ক্ষণিক পূর্ব পর্যন্ত (দীর্ঘ সময় ধরে) ৮ রাকাত পড়তে হবে। তবে বুখারি শরিফের অনুসরণ করা হবে।'২৪১
আলোচনার শেষাংশে তিনি বলেন-'পবিত্র রমজান মাসে রাত্রিসমূহে এশার নামাজের পর থেকে ফজর পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় অথবা সময়ের যেকোনো অংশে যত রাকাত ইচ্ছা জামাতে পড়বেন, তা কিয়ামে রমজানের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে ২০ রাকাতের কম আমি সমুচিত মনে করি না। হ্যাঁ, যদি কোনো জামাত ৮ রাকাতেই রাত্রির অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করে দেন, তবে ওই জামাত পূর্ণ সুন্নত পালন করেছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। আর এটি আমার ব্যক্তিগত মত।'২৪২
টিকাঃ
২৩১. মোহাম্মাদ মুশাহিদ, সত্যের আলো, (প্রকাশক: কারি আব্দুর রহমান চৌধুরী, মেসার্স চৌধুরী লেদার স্টোর, বন্দর বাজার, সিলেট), ২য় খণ্ড: পৃষ্ঠা-২০
২৩২. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৩৬
২৩৩. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-২৪
২৩৪. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা: ১১-১২
২৩৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৫
২৩৬. হানাফি মাজহাবের মাসয়ালাগুলো যে ছয়টি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেগুলোকে জাহিরে রেওয়ায়েত বলে। গ্রন্থগুলো হচ্ছে-জামিয়ে ছগির, জামিয়ে কবির, ছিয়ারে ছগির, ছিয়ারে কবির, মবসুত, জিয়াদাত।
২৩৭. মোহাম্মাদ মুশাহিদ, সত্যের আলো, প্রাগুক্ত: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯
২৩৮. প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা-৩৫
২৩৯. রাসূল-এর সাহাবিদের কথা ও কাজকে আসার বলে।
২৪০. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-২৭-২৮
২৪১. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৩২
২৪২. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৩৭