📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 একটি হাদিসের সংশয় নিরসন

📄 একটি হাদিসের সংশয় নিরসন


হিজরি নবম শতকের একজন প্রসিদ্ধ হাদিসবিশারদ ও ফকিহ হচ্ছেন আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)। তিনি বিভিন্ন গ্রন্থে তারাবির সালাত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর রচিত আত-তালখিসুল হাবির গ্রন্থে রাসূল ﷺ ২০ রাকাত তারাবি পড়েছেন মর্মে একটি বক্তব্য রয়েছে। আমাদের সমাজের কিছু আলিম এই বক্তব্যকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে জোর দিয়ে বলে থাকেন-এ হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত, রাসূল ﷺ ২০ রাকাত তারাবি পড়েছেন। বক্তব্যটি হচ্ছে এই-

আন্নাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা সাল্লা বিলন্নাসি ইরিনা রকাতাল্লাইলাতাইনি ফাল্লামা কানা ফিল্লাইলাতিতস সালিছাতি ইজতামাউননাসু ফালম ইয়াখরুজু ইলাইহিম ছুম্মা কালা মিনাল গাদি খাশিয়াতু আন তুফরাদা আলাইকুম ফালা তুতিকুহা মুত্তাফাকুন আলা সিহাতিহি মিন হাদিসি আয়েশা দুনা আদাদি যাদা আল বুখারী ফি রিওয়ায়াতিন ফুতুন্নি রাসুলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ওয়াল আমরু আলা যালিক।

'রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে রমজানের দুই রাতে ২০ রাকাত করে তারাবি পড়েছেন। তৃতীয় রাতে লোকজন জড়ো হলে তিনি আর বের হননি। পরদিন সকালে তিনি বললেন- “আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, হয়তো এই নামাজ তোমাদের ওপর ফরজ করে দেওয়া হবে। আর তোমরা তা আদায় করতে সক্ষম হবে না (এজন্য আমি গতকাল বের হইনি)।” এ ব্যাপারে রাকাত সংখ্যা উল্লেখ ছাড়া আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর বর্ণনায় আরও রয়েছে, রাসূল ﷺ-এর ওফাত পর্যন্ত বিষয়টি এভাবেই থেকে যায়। ২২৫

এই বক্তব্য থেকে তারা তিনটি দলিল পেশ করেছেন- ১. রাসূল ﷺ লোকদের নিয়ে ২০ রাকাত তারাবি পড়েছেন। ২. এটি সহিহ হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত এবং ৩. নবি ﷺ মৃত্যু পর্যন্ত ২০ রাকাত তারাবি পড়েছেন।

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর বর্ণনার আলোকে তাদের বক্তব্য মেনে নিলেও দুটি প্রশ্নের উদ্ভব হয়। এক. তারাবির সালাতের রাকাত সংখ্যা নিয়ে যুগ যুগ ধরে মতবিরোধ চলে আসছে। ২০ রাকাতের পক্ষে অসংখ্য গ্রন্থও রচিত হয়েছে, কিন্তু আলিমদের কেউই এই হাদিসটিকে তাদের গ্রন্থে ২০ রাকাতের পক্ষে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেননি। ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম বুখারি (মৃ. ২৫৬ হি.), ইমাম তিরমিজি (মৃ. ২৭৯ হি.), নসর আল মারওয়াজি (মৃ. ২৯৪ হি.), ইমাম ইবনে তাইমিয়া, আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী ও ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (মৃ. ২০১৬ খ্রি.) (রহ.)সহ অসংখ্য হাদিসবিশারদ তারাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁদের কেউই এ গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি একবারও উল্লেখ করেননি; তাঁরা প্রত্যেকেই বলেছেন—তারাবির নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা নিয়ে রাসূল ﷺ থেকে কোনো বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়নি। ২/৩ দিন জামাতে তারাবি পড়ার বর্ণনাসংবলিত যে বিশুদ্ধ হাদিসগুলো রয়েছে, তাতে নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা উল্লেখ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস সবার চোখের আড়ালে থেকে গেল কী করে?

দুই. ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) নিজেই ফাতহুল বারি-তে তারাবি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। সেখানেও এই হাদিসটি তিনি একবারও উল্লেখ করেননি; বরং ৮, ১০ ও ২০ রাকাতসংক্রান্ত হাদিসগুলোকেই তিনি সমর্থন করেছেন। সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে বলেছেন— وَالْجَمْعُ بَيْنَ هَذِهِ الرِّوَايَاتِ مُمْكِنُ بِاخْتِلَافِ الْأَحْوَالِ وَيُحْتَمَلُ أَنَّ ذَلِكَ الْاخْتِلَافَ بِحَسَبِ تَطْوِيلِ الْقِرَاءَةِ وَتَخْفِيفِهَا فَحَيْثُ يُطِিলُ الْقِرَاءَةَ تَقِلُّ الرَّكַعاتُ 'অবস্থার বিভিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে এ বর্ণনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব। তা এভাবে, কিরাত লম্বা হলে রাকাত সংখ্যা কম হতো। আবার কিরাত সংক্ষিপ্ত হলে রাকাত বেশি হতো।'২২৬

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কেন ওই গুরুত্বপূর্ণ হাদিসকে ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারি-তে উল্লেখ করলেন না? এমন শক্তিশালী হাদিস থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি বিভিন্ন বর্ণনাগুলোর মাঝে সমন্বয় করার প্রয়োজন অনুভব করলেন? উত্তর হলো-ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর ওই হাদিসকে যারা ২০ রাকাতের দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাদের গবেষণায় মারাত্মক ভুল হয়েছে। ভুল হওয়ার কারণেই তারা এর সঠিক মর্ম উদঘাটন করতে পারেনি। তাদের ভুলগুলো হচ্ছে-

এক. তাঁরা এটিকে হাদিস ভেবেছেন। অথচ এটি আদৌ হাদিস নয়। এটি শাফেয়ি মাজহাবের প্রখ্যাত আলিম ইমাম রাফেয়ির বক্তব্য। যা ইবনে হাজার (রহ.) তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ইমাম রাফেয়ি এখানে ভিন্ন ভিন্ন দুটি হাদিস একত্র করে নিজ ভাষায় উদ্ধৃত করেছেন। একটি হচ্ছে-ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ২০ রাকাতসংবলিত তারাবির হাদিস। অন্যটি হচ্ছে-রাকাত সংখ্যা উল্লেখ ছাড়া আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস। এখানে যে দুটি হাদিস একত্র করা হয়েছে, তা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা যায়। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন-রাকাত সংখ্যা উল্লেখ করে ইবনে হিব্বান তাঁর সহিহ গ্রন্থে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ আট রাকাত তারাবি ও বিতর পড়তেন। এটি ইমাম রাফেয়ির বর্ণনার বিপরীত। তবে হ্যাঁ, বায়হাকির বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন; কিন্তু এ হাদিসটি দুর্বল। ২২৭

দুই. হাদিসটিতে (مُتَّفَقٌ عَلَى صِحْتِهِ) বাক্য রয়েছে। এর অর্থ হলো-তা সহিহ হওয়ার ব্যাপারে আলিমদের সবাই একমত। এখানে 'তা' বলতে ২০ রাকাতের ওপর সবাই একমত হয়েছেন, এটা বোঝানো হয়নি; বরং রাকাত সংখ্যা উল্লেখ ছাড়া আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন-এটা বোঝানো হয়েছে। হাদিস দুটি উল্লেখ করার পরে ইমাম রাফেয়ি নিজেই বলেন-'এ ব্যাপারে রাকাত সংখ্যা উল্লেখ ছাড়া আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই।' অর্থাৎ রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে দুই দিন তারাবি পড়েছেন। এ ব্যাপারে সবাই একমত; কিন্তু তৃতীয় দিন তিনি বের হয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম রাফেয়ির উপরিউক্ত বক্তব্য উল্লেখ করার পর শাফেয়ি মাজহাবের আরেকজন আলিম ইমাম ইবনে মুলকিন আল বদরুল মুনির গ্রন্থে আয়িশা (রা.)-এর হাদিসটিও উল্লেখ করেছেন, যা আমাদের এই অর্থকে আরও সুস্পষ্ট করে দেয়। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত-'রাসূল ﷺ এক রাতে মসজিদে নামাজ পড়ছিলেন। এ সময় কিছু লোকও তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করল। পরের রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন। এ রাতে লোকসংখ্যা আরও বেড়ে গেল। এরপর তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে অনেক লোকজন সমবেত হলো, কিন্তু রাসূল ﷺ বের হলেন না...'২২৮

এটি সহিহ বুখারির ১১২৯ ও সহিহ মুসলিমের ৭৬১ নং হাদিস। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) আত-তালখিসুল হাবির গ্রন্থে 'সহিহ হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত' কথাটি উল্লেখ করার পর টীকায় বলেন-বুখারি-মুসলিমের উক্ত হাদিসদ্বয় থেকে তিনি এই তথ্য গ্রহণ করেছেন। সে টীকায় জামাতে নামাজ পড়ার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু ২০ রাকাত তারাবির কথা উল্লেখ নেই। অতএব বোঝা গেল মুত্তাফাকুন 'আলা সিহ্‌হাতিহি বলতে দুই দিন জামাতে তারাবি পড়ার ব্যাপারে সবাই একমত, এ কথা বোঝানো হয়েছে।

তিন. তাঁরা বলেছেন (ফুতুক্কিয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াল আমরু আলা জালিকা) মৃত্যু পর্যন্ত ২০ রাকাত তারাবি পড়েছেন। এটি বুঝতেও তারা মারাত্মক ভুলের শিকার হয়েছেন। কারণ, এটি মূলত বুখারি-মুসলিমের একটি হাদিসের অংশ। হাদিসটি ভিন্ন ভিন্ন সনদে বুখারিতে দুবার এবং মুসলিমে একবার উল্লিখিত হয়েছে।
সহিহ বুখারিতে এই হাদিসের অনুরূপ আরেকটি হাদিস রয়েছে। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত-'রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে তিন রাত তারাবি পড়লেন। চতুর্থ রাতে তিনি আর বের হননি। পরদিন বললেন-“তোমাদের অবস্থা আমার অজানা ছিল না। এই নামাজ ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমি গত রাতে বের হইনি। কেননা, (ফরজ হলে) তোমরা তা আদায় করতে সক্ষম হবে না।”' এটুকু বলার পর আয়িশা (রা.) বলেন- فَتُونِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْأَمْرُ عَلَى ذَلِكَ 'রাসূল-এর মৃত্যু পর্যন্ত বিষয়টি এভাবেই থেকে যায়।'২২৯

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল-এর ওফাত হলো আর বিষয়টি এভাবেই থেকে গেল; এমনকী আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত আমলে এবং উমর (রা.)-এর খিলাফত আমলের প্রথম ভাগে বিষয়টি এরূপই ছিল। ২৩০সব বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে ২/৩ দিন তারাবি পড়েছিলেন। এরপর আর জামাতে পড়েননি। একা একা পড়েছেন। সাহাবারাও একা একা পড়েছেন; এমনকী রাসূল ﷺ ও আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও বিষয়টি এভাবে থেকে যায়। উমর (রা.)-এর খিলাফত আমলের শুরুর দিকে এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলেও পরবর্তী সময়ে জামাতের সাথে তারাবি চালু হয়। অতএব, 'মৃত্যু পর্যন্ত বিষয়টি এভাবেই থেকে যায়' বলতে দু-তিন দিন ছাড়া বাকি জীবন রাসূল ﷺ একা একা তারাবি পড়েছেন-এ কথা বোঝানো হয়েছে। এর সাথে ২০ রাকাতের কোনো সম্পর্ক নেই। সর্বশেষ কথা হচ্ছে, ইমাম রাফেয়ির এই বক্তব্যটি আসকালানি (রহ.)-এর গ্রন্থ ছাড়া আর কোনো সহিহ হাদিস গ্রন্থে নেই। তার কোনো সনদও উল্লেখ নেই। এ থেকেই বোঝা যায়, তা কোনো হাদিস নয়; বরং তা ইমাম রাফেয়ির নিজস্ব বক্তব্য।

টিকাঃ
২২৫. আত-তালখিসুল হাবির: ৫৪০
২২৬. ফাতহুল বারি, ৪/২৫৩
২২৭. আলবানি, সালাতুত তারাবিহ: পৃষ্ঠা-৭৬
২২৮. আল বদরুল মুনির: ৪/৩৪৯
২২৯. বুখারি: ২০১২
২৩০. বুখারি: ২০০৯, মুসলিম: ৭৫৯

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)-এর অভিমত

📄 আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)-এর অভিমত


বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান আলিম, মুহাদ্দিস ও ফকিহ কানাইঘাটের গর্ব আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (মৃ. ১৯৭১ খ্রি.)। তৎকালীন ভারত উপমহাদেশে হাদিসবিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তিনি একজন দেওবন্দি আলিম। মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। সত্যের আলো গ্রন্থে তিনি তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। আমরা এখানে তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরছি।

শাইখুল হাদিস আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) বলেন-'সালাতুল লাইল, কিয়ামুল লাইল, কিয়ামে রমজান, তাহাজ্জুদ ও তারাবি একই সালাতের বিভিন্ন নাম। ২৩১ অন্যত্র এই শব্দসমূহের শাব্দিক বিশ্লেষণের পর তিনি বলেন-'নাম ভিন্ন হলেও মূলত তা এক নামাজ। '২৩২

তারাবি নামাজ আট রাকাতের পক্ষে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা (রা.)- এর যে হাদিসটি আমরা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি, আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) তা উল্লেখ করার পর বলেন- 'ইমাম মুহাম্মাদ ও ইমাম বুখারি, অন্যান্য ফুকাহা ও মুহাদ্দিসগণ রাসূল ﷺ-এর রমজান শরিফের তিন রাতের জামাতের রাকাত নির্ণয় করতে এই হাদিসের ওপর নির্ভর করেছেন।'

এরপর তিনি বলেন-'তদুপরি রাকাত সম্বন্ধে আরও একটি পরিষ্কার হাদিস বিদ্যমান রয়েছে। জাবির (রা.) বলেছেন-ওই রাত্রিসমূহে নবি করিম ﷺ তাঁদের নিয়ে আট রাকাত তারাবি ও বিতর পড়েছেন। এই হাদিসটি ইবনে খুজাইমা ও ইবনে হিব্বান তাঁদের সহিহহাইনে লিখেছেন। হাফিজ জাইলাই নাসবুর রায়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১৫২ পৃষ্ঠায় এ হাদিস উল্লেখ করে কোনো খুঁত লিখেননি। অনুরূপ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারি-তে ও ইবনে হুমাম (রহ.) ফাতহুল কাদির গ্রন্থে উক্ত হাদিস উল্লেখ করে কোনো দোষ বর্ণনা করেননি। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনিও অনুরূপ লিখেছেন।' ২৩৩

আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) ইবনে হুমামের বরাতে বলেন- 'কিয়ামে রমজান সুন্নত এবং তা বিতরসহ ১১ রাকাত... এবং এই নামাজের সময় এশা হতে ফজর পর্যন্ত এবং সর্বোত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষ অর্ধেকে। '২৩৪

তিনি আরও বলেন-'কেউ যদি ২০ রাকাতে সীমাবদ্ধ তারাবির নামাজের কথা মুহাম্মাদ ﷺ-এর মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে বলে কোনো সহিহ বা হাসান হাদিস দ্বারা প্রমাণ দেখাতে পারেন, তবে আমি আজীবন তার দাসত্ব করব।' ২৩৫

তারাবির রাকাত সংখ্যার ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) বলেন-'সকলের জেনে রাখা উচিত যে, মুহাম্মাদ ﷺ তারাবির সালাতকে কোনো নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করেননি। ২০ রাকাতে সীমাবদ্ধ তারাবি নামীয় সালাতের বয়ান ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর জাহিরি রেওয়ায়েতের ছয় কিতাবের২৩৬ কোনো কিতাবে নেই।'২৩৭

তিনি আরও বলেন-'তারাবি নামাজকে রাসূলে করিম ﷺ কোনো নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করেননি। সুতরাং কিয়ামে রমজান (তারাবি)-কে কোনো নির্দিষ্ট রাকাতে সীমাবদ্ধ করা অযৌক্তিক এবং নবিজির আদর্শের ওপর হস্তক্ষেপ।'২৩৮

উমর (রা.) কর্তৃক তারাবির নামাজের সূচনা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-'উমর (রা.) কাউকে ২৩ রাকাত (তারাবি) পড়ার নির্দেশ দেননি। শত চেষ্টা করেও কেউ নির্ভুল সনদে তা দর্শাতে পারবে না; বরং মুয়াত্তা গ্রন্থে নির্ভুল সনদে রয়েছে, সাইব ইবনে ইয়াজিদ বলেন-উমর (রা.) উবাই ইবনে কাবকে লোকদের নিয়ে ১১ রাকাত তারাবি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।'

এই বিশুদ্ধ হাদিস (আসার২৩৯) দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, উমর (রা.) ও উবাই ইবনে কাব (রা.) ১১ রাকাতেই রাত্রি শেষে করে দিতেন। ইমাম বায়হাকি (রহ.) লিখেছেন যে, নিশ্চয় প্রথমত ১১ রাকাত পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন পরে লোকদের পক্ষে অসহনীয় হয়ে দাঁড়ালে রাকাতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। কারণ, সাইব ইবনে ইয়াজিদ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে একটি আসার আমি পেয়েছি। তিনি বলেছেন-'মানুষ উমর (রা.)-এর সময় ২৩ রাকাত জামাতে পড়তেন।'

তিনি আরও বলেন-'ইমাম বায়হাকি (রহ.)-এর এ কথায় ঘোর আপত্তি আছে। ইমাম মালেক (রহ.)-এর সঙ্গে কোনো বিষয়ে তাঁর তুলনা হতে পারে না। বায়হাকির লিখিত আসারে উমর (রা.)-এর কোনো নির্দেশ নেই।'২৪০

অতঃপর তিনি বলেন-'আমাদের দেশে আরও একদল আছেন, যারা নিজেকে আহলে হাদিস বলে দাবি করেন। তারা এশার পরেই মামুলিভাবে শুধু ৮ রাকাত জামাতে পড়ে কিয়ামে রমজানের সুন্নত পালন করে থাকেন। আর জিজ্ঞেস করলে বলেন-আমরা বুখারি শরিফের মতো কাজ করছি।' তারা মারাত্মক ভুলের মধ্যে আছেন। শুধু বুখারি শরিফের অনুসরণ করতে হলে 'বুখারি শরিফে কিয়ামে রমজানের বাবে' লিখিত হাদিসগুলোর যথার্থ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ, রাতের প্রথম অর্ধেক অতিবাহিত হওয়ার পর নামাজ শুরু করে ফজরের ক্ষণিক পূর্ব পর্যন্ত (দীর্ঘ সময় ধরে) ৮ রাকাত পড়তে হবে। তবে বুখারি শরিফের অনুসরণ করা হবে।'২৪১

আলোচনার শেষাংশে তিনি বলেন-'পবিত্র রমজান মাসে রাত্রিসমূহে এশার নামাজের পর থেকে ফজর পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় অথবা সময়ের যেকোনো অংশে যত রাকাত ইচ্ছা জামাতে পড়বেন, তা কিয়ামে রমজানের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে ২০ রাকাতের কম আমি সমুচিত মনে করি না। হ্যাঁ, যদি কোনো জামাত ৮ রাকাতেই রাত্রির অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করে দেন, তবে ওই জামাত পূর্ণ সুন্নত পালন করেছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। আর এটি আমার ব্যক্তিগত মত।'২৪২

টিকাঃ
২৩১. মোহাম্মাদ মুশাহিদ, সত্যের আলো, (প্রকাশক: কারি আব্দুর রহমান চৌধুরী, মেসার্স চৌধুরী লেদার স্টোর, বন্দর বাজার, সিলেট), ২য় খণ্ড: পৃষ্ঠা-২০
২৩২. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৩৬
২৩৩. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-২৪
২৩৪. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা: ১১-১২
২৩৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৫
২৩৬. হানাফি মাজহাবের মাসয়ালাগুলো যে ছয়টি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেগুলোকে জাহিরে রেওয়ায়েত বলে। গ্রন্থগুলো হচ্ছে-জামিয়ে ছগির, জামিয়ে কবির, ছিয়ারে ছগির, ছিয়ারে কবির, মবসুত, জিয়াদাত।
২৩৭. মোহাম্মাদ মুশাহিদ, সত্যের আলো, প্রাগুক্ত: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৯
২৩৮. প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা-৩৫
২৩৯. রাসূল-এর সাহাবিদের কথা ও কাজকে আসার বলে।
২৪০. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-২৭-২৮
২৪১. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৩২
২৪২. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৩৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px