📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 রাসূল ﷺ-এর তারাবি

📄 রাসূল ﷺ-এর তারাবি


হাদিস থেকে জানা যায়, রমজান মাসে রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে তিন দিন কিয়ামুল লাইল বা তারাবি আদায় করেছেন।১৭২ এই তিন দিন তিনি কত রাকাত তারাবি পড়েছেন, তার কোনো সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায় না।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত—'রাসূল ﷺ তাঁদের নিয়ে আট রাকাত তারাবি পড়েছেন।১৭৩

হাদিসটির মান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এই হাদিসের একজন রাবি হচ্ছেন ঈসা ইবনে জারিয়া। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইবনে হিব্বান ও ইবনে খুজাইমা তাঁকে সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আবু জুরআ বলেছেন তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। কেউ কেউ তাঁকে চলনসই বলেছেন। ইয়াইয়াহ ইবনে মায়িন, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম নাসায়ি (রহ.)সহ অনেকেই তাঁকে দুর্বল বলেছেন। তাঁর কিছু বর্ণনাকে আপত্তিকর বলেছেন।১৭৪ ইমাম জাহাবি ও মুবারকপুরী (রহ.) বলেছেন-'এর সনদ মধ্যম মানের।১৭৫ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তাঁর সনদ হাসান বলেছেন।১৭৬

সার্বিক দিক বিবেচনা করে হাদিসটি হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়। অবশ্য বাংলাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (মৃ. ১৯৭১ খ্রি.) এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন।১৭৭

উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বললেন-
نِسْوَةٌ دَارِي قُلْنَ إِنَّا لَا نَقْرَأُ الْقُرْآنَ فَنُصَلِّي خَلْفَكَ بِصَلَاتِكَ, فَصَلَّيْتُ بِهِنَّ ثَمَانِ رَكَعَاتٍ وَالْوِتْرَ . فَسَكَتَ عَنْهُ وَكَানَ شِبْهَ الرِّضَاءِ -
'আমার বাড়ির মহিলা বলল, আমরা কুরআন পড়তে পারি না। তাই আপনার পেছনে আপনার নামাজে আমরাও অংশগ্রহণ করব। ফলে আমি তাদের নিয়ে আট রাকাত নামাজ ও বিতর পড়েছি। (এ কথা শুনে) রাসূল ﷺ চুপ ছিলেন। যা ছিল তাঁর সন্তুষ্টির লক্ষণ।'১৭৮

এই হাদিসের সনদেও ঈসা ইবনে জারিয়া রয়েছেন। তাই এ হাদিসটিও পূর্বের হাদিসের মতো সমালোচিত। জাবির (রা.) ও উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস দুটিই যেহেতু সমালোচিত, তাই আমরা বলতে পারি-সে তিন রাতের রাকাত সংখ্যা উল্লেখপূর্বক পরিপূর্ণ সহিহ সনদে রাসূল ﷺ থেকে কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। তবে তিনি নিজ ঘরে কত রাকাত নামাজ পড়তেন, তা আয়িশা (রা.)-এর হাদিস থেকে জানা যায়।

টিকাঃ
১৭২. নাসায়ি: ১৬০৬, ইবনে খুজাইমা: ২২০৪, মুসনাদে আহমদ: ১৮৪০২
১৭৩. ইবনে খুজাইমা: ১০৭০, ফাতহুল বারি ৩/১২; উমদাতুল কারি, ৭/১৭৭
১৭৪. ইবনে হাজার, তাহজিবুত তাহজিব ৮/১৮৫; জাহাবি, মিজানুল ইতিদাল: ৫/৩৭৪-৩৭৫
১৭৫. জাহাবি, মিজানুল ইতিদাল ৫/৩১১; তুহফাতুল আহওয়াজি : ৩/২৩১
১৭৬. আসকালানি, আত-তালখিসুল হাবির: ২/৫১৫
১৭৭. তারাবির সালাত নিয়ে আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)-এর বিস্তারিত আলোচনা দলিল-প্রমাণসহ সামনে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
১৭৮. ইবনে হিব্বান: ২৫৪৯

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 তারাবি ও তাহাজ্জুদ একই নামাজ

📄 তারাবি ও তাহাজ্জুদ একই নামাজ


আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন- 'রমজান মাসে রাসূল ﷺ-এর নামাজ কীরূপ ছিল?' উত্তরে তিনি বললেন-'রাসূল ﷺ রমজানে ও রমজানের বাইরে ১১ রাকাতের বেশি নামাজ পড়তেন না। তিনি চার রাকাত নামাজ পড়তেন। তুমি তাঁর নামাজের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমায় প্রশ্ন করো না। এরপর আবার চার রাকাত নামাজ পড়তেন। সে চার রাকাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমায় প্রশ্ন করো না। অতঃপর তিনি তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন। '১৭৯

এই হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূল ﷺ কিয়ামুল লাইল তথা তারাবির নামাজ আট রাকাত পড়তেন। ২০ রাকাতের পক্ষের আলিমগণ বলেন-এই হাদিস তারাবির জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং তাহাজ্জুদের জন্য প্রযোজ্য। কেননা, হাদিসে রমজানের বাইরের কথাও উল্লেখ রয়েছে। যা দ্বারা বোঝা যায়, আয়িশা (রা.) তাহাজ্জুদের কথাই বলেছেন।

কিন্তু হাদিসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে দেখা যায়, আয়িশা (রা.) এখানে তাহাজ্জুদের কথা বোঝাননি, তারাবিকেই বুঝিয়েছেন। কেননা, আবু সালামা (রা.)-এর প্রশ্নের ধরন দেখে বোঝা যায়, তিনি রাসূল ﷺ-এর তারাবির নামাজ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল-'রমজান মাসে রাসূল ﷺ-এর নামাজ কীরূপ ছিল?' যেহেতু রমজান মাসে অতিরিক্ত একটি নামাজ রয়েছে, সে নামাজ সম্পর্কেই তিনি জানতে চেয়েছেন। তাহাজ্জুদ সম্পর্কে যদি তাঁর জানতে চাওয়া উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তাঁর প্রশ্নটা এ রকম হতো না; বরং তিনি বলতেন- ‘রাসূল ﷺ-এর কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ কীরূপ ছিল?

এই নামাজকে আমরা যদি তাহাজ্জুদের জন্য নির্দিষ্ট করি, তাহলে প্রমাণ করতে হবে, রাসূল ﷺ রমজানে রাতের প্রথম অংশে তারাবি পড়েছেন। আর শেষাংশে পড়েছেন তাহাজ্জুদ; কিন্তু এ রকম কোনো দলিল পাওয়া যায় না। হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি একই নামাজে সারারাত কাটিয়ে দিয়েছেন।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল ﷺ ২০ রাকাত তারাবি পড়েছেন।’১৮০ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিসের সমালোচনা করে বলেন- فَإِسْنَادُهُ ضَعِيفٌ وَقَدْ عَارَضَهُ حَدِيثُ عَائِشَةَ هَذَا الَّذِي فِي الصَّحِيحَيْنِ مَعَ كَوْنِهَا أَعْلَمَ بِحَالِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلًا مِنْ غَيْرِهَا- ‘এই হাদিসের সনদ দুর্বল। এটি বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা (রা.)-এর হাদিসের বিপরীত। অথচ তিনিই নবি ﷺ-এর রাতের আমল সম্পর্কে অন্যের তুলনায় অধিক জ্ঞাত ছিলেন।’১৮১

উল্লেখ্য, আসকালানি (রহ.) ২০ রাকাতসংবলিত হাদিসের বিপরীতে আয়িশা (রা.)-এর হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, তিনিও এই হাদিসকে তারাবি নামাজের জন্য মনে করতেন।

হানাফি মাজহাবের একজন প্রখ্যাত আলিম হলেন, আল্লামা আনওয়ারশাহ কাশ্মীরী (রহ.)। তিনি দেওবন্দ মাদরাসার প্রাক্তন মুহতামিমও ছিলেন। তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আরফুশ-শাজি কিতাবে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন- ولا مناص من تسليم أن تراويحه كانت ثمانية ركعات - ‘এটা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই, রাসূল-এর তারাবির নামাজ ছিল আট রাকাত। ১৮২

আল্লামা কাশ্মিরী (রহ.) আরও বলেন- وَفي الصحاح صلاة تراويحه عليه الصلاة والسلام ثماني ركعات - 'সহিহ গ্রন্থসমূহে রয়েছে, রাসূল ﷺ-এর তারাবির নামাজ আট রাকাত ছিল।'১৮৩

আল্লামা ইবনে হুমামের বরাতে কাশ্মিরী (রহ.) বলেন- إن ثمانية ركعات سنة مؤكدة وثنتي عشر ركعة مستحبة - 'তারাবির নামাজ আট রাকাত হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আর ১২ রাকাত হচ্ছে মুস্তাহাব।'১৮৪

মিশকাত শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মিরআতুল মাফাতিহ প্রণেতা বলেন- إنما صلى التراويح في رمضان ثمان ركعات فقط، ولم يصل بأكثر منه - 'রাসূল ﷺ রমজান মাসে মাত্র আট রাকাত তারাবি নামাজ পড়েছেন, এর বেশি পড়েননি।'১৮৫

ইমাম সুয়ুতি (মৃ. ৯১১ হি.) বলেন-'রাসূল ﷺ তারাবির নামাজ ২০ রাকাত পড়েছেন বলে প্রমাণিত নয়।'১৮৬

সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী (রহ.) বলেন-'রাসূল ﷺ-এর তারাবির নামাজ ছিল আট রাকাত, ২০ রাকাত নয়।'১৮৭

বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হলেন মাওলানা আব্দুর রহিম (মৃ. ১৯৮৭ ইং)। তিনি 'হাদিস শরিফ'-এর ২য় খণ্ডে আয়িশা (রা.)-এর হাদিসটি উল্লেখ করে বলেন-'এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ তারাবি নামাজ মাত্র আট রাকাত পড়তেন।'১৮৮

এভাবে অনেক হানাফি বিদ্বানও রাসূল-এর তারাবির নামাজ আট রাকাত ছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন।

টিকাঃ
১৭৯. বুখারি: ১১৪৭, ২০১৩, মুসলিম: ৭৩৮, তিরমিজি: ৪৩৯, আবু দাউদ: ১৩৪১, নাসায়ি : ১৬৯৭, ইবনে খুজাইমা: ৪৯
১৮০. ইবনু আবদুল বার, আল-ইস্তিজকার, ২/৭০; আলবানি, সালাতুত-তারাহিহ : পৃষ্ঠা-৭৬
১৮১. আসকালানি, ফাতহুল বারি: ৪/২৫৪
১৮২. আরফুশ-শাজি: ৮০৬
১৮৩. প্রাগুক্ত: ৪৩৯
১৮৪. প্রাগুক্ত: ৮০৬
১৮৫. মিরআতুল মাফাতিহ: ৪/৩২১
১৮৬. আল মাউসুআতুল ফিকহিয়‍্যাহ, ২/১৫৫
১৮৭. সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী, রাসায়েল ও মাসায়েল: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫২
১৮৮. মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, হাদিস শরিফ, ২য় খণ্ড, (খাইরুন প্রকাশনী, ঢাকা, ১৩ প্রকাশ: ২০০৮), পৃষ্ঠা-২১৮

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 উমর (রা.) কর্তৃক প্রচলিত তারাবি

📄 উমর (রা.) কর্তৃক প্রচলিত তারাবি


উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো-রাসূল ﷺ-এর তারাবির নামাজ আট রাকাত ছিল, ২০ রাকাত নয়। আয়িশা (রা.)-এর হাদিস থেকে এটাও প্রমাণ হয়, তারাবি ও তাহাজ্জুদ একই নামাজ। দুটি ভিন্ন দুই নামাজ নয়। এ কারণেই ইমাম বুখারি (রহ.) হাদিসটি তারাবি অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ করেছেন তাহাজ্জুদের অধ্যায়েও। এ থেকে বোঝা যায়, তিনিও এই নামাজকে একই নামাজ মনে করতেন। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (মৃ. ১৩৫৩ হি.) (রহ.) বলেন-
ولم يثبت في رواية من الروايات أنه صلى التরাويح والتهجد على حدة في رمضان بل طول التরাويح
'রমজান মাসে রাসূল ﷺ তারাবি ও তাহাজ্জুদ আলাদা আলাদা পড়েছেন-এমনটি কোনো বর্ণনা দ্বারাই প্রমাণিত নয়। তবে তারাবির নামাজ (তাহাজ্জুদের তুলনায়) দীর্ঘ হতো।'১৮৯

তিনি আরও বলেন-'রাসূল ﷺ-এর যুগে তারাবি ও তাহাজ্জুদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।'১৯০

আয়িশা (রা.)-এর হাদিসে আমরা দেখেছি, আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রা.) রাসূল ﷺ-এর রমজান মাসের নামাজ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। যদি তারাবি ও তাহাজ্জুদ ভিন্ন হতো, তাহলে আয়িশা (রা.) বলতেন-রাসূল ﷺ এত রাকাত তারাবি এবং এত রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তেন; কিন্তু তিনি উভয় নামাজের মধ্যে পার্থক্য না করে বললেন-'রাসূল ﷺ রমজানে ও রমজানের বাইরে ১১ রাকাতের বেশি পড়তেন না।'

তা ছাড়া রাসূল ﷺ রমজানে রাতের প্রথম অংশে তারাবি পড়েছেন, শেষ অংশে তাহাজ্জুদ পড়েছেন-এমন কোনো বর্ণনাও পাওয়া যায় না। হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি একই নামাজে সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছেন; তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা কোনো নামাজ পড়েননি।

নুমান বিন বশির (রা.) বলেন-'আমরা রাসূল ﷺ-এর সাথে ২৩ রমজান রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ (আনুমানিক রাত ৮টা থেকে ১০/১১টা) পর্যন্ত সালাত আদায় করেছি। এরপর সালাত আদায় করেছি ২৫ রমজান অর্ধরাত (আনুমানিক ৮টা থেকে ১২টা) পর্যন্ত। এরপর তিনি আমাদের নিয়ে ২৭ রমজান নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি আমাদের এত দীর্ঘ সময় নামাজ পড়ালেন, মনে হচ্ছিল, হয়তো আমরা ফালাহ (আনুমানিক রাত ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত) পাব না। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা সাহরিকে ফালাহ বলতাম। '১৯১

এই হাদিস থেকে জানা যায়, রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে ২৭তম রাতে সারা রাত তারাবি পড়েছিলেন; এমনকী এতে সাহাবিরা সাহরি ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-তারাবি ও তাহাজ্জুদ যদি পৃথক নামাজ হয়, তাহলে ওই রাতে রাসূল কখন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েছিলেন? কেননা, তাহাজ্জুদ পড়া নবিজির ওপর ফরজ ছিল। এ থেকেও বোঝা যায়, তারাবি ও তাহাজ্জুদ একই নামাজ। একই নামাজ হওয়ার কারণেই তিনি আলাদাভাবে তাহাজ্জুদ পড়া প্রয়োজন মনে করেননি।

উমর (রা.) সাহাবিদের তারাবির নামাজ পড়তে দেখে বললেন-'তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাকো, তা ওই অংশের চেয়ে উত্তম, যে অংশে তোমরা নামাজ পড়ো। এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন। কেননা, তখন লোকেরা রাতের প্রথম অংশে সালাত আদায় করত। '১৯২

উমর (রা.)-এর কথা থেকেও বোঝা যায়, উভয় নামাজ একই। এজন্য তিনি তারাবির নামাজ রাতের প্রথম অংশে না পড়ে শেষরাতে পড়াকে উত্তম বলেছেন।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) বলেন-'রাসূল একাকী তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল (তারাবি) আদায় করতেন। '১৯৩ তিনি আরও বলেন-'তারাবি আর কিয়ামুল লাইল একই। '১৯৪ মূলত কিয়ামুল লাইল, সালাতুল লাইল, তারাবি, তাহাজ্জুদ সব একই নামাজ। এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত যেকোনো নফল নামাজ পড়াকে কিয়ামুল লাইল বলে।

উমর (রা.) তাঁর খিলাফত আমলে আট রাকাত তারাবির সূচনা করেছিলেন। ইমাম মালিক (রহ.) মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ থেকে ও সাইব ইবনে ইয়াজিদ থেকে বর্ণনা করেন-
أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً -
'উমর (রা.) উবাই ইবনে কাব ও তামিম দারিকে নির্দেশ দিলেন, যাতে তাঁরা লোকদের নিয়ে (বিতরসহ) ১১ রাকাত তারাবি পড়ে। ১৯৫

এই হাদিসের সনদ সহিহ। আট রাকাতের দাবিদাররা এ হাদিসের ভিত্তিতেই তারাবি নামাজ আট রাকাত পড়ে থাকেন। এ সম্পর্কে শাইখ আলবানি সালাতুত তারাবি গ্রন্থে লিখেছেন- 'তারাবি নামাজ আট রাকাত আঁকড়ে ধরা ওয়াজিব। এর বেশি পড়া বিদআত।' ১৯৬

সম্ভবত ১৪০০ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি তারাবি নামাজ আট রাকাতের বেশি পড়া বিদআত বলেছেন। তাঁর ইজতিহাদকে আমরা সম্মান করি, কিন্তু তাঁর এই ইজতিহাদ মেনে নেওয়া যায় না। কেননা, তা সহিহ হাদিসবিরোধী। রাসূল ﷺ বলেছেন- صَلَاةُ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى- 'রাতের নামাজ হচ্ছে দুই রাকাত দুই রাকাত করে। ১৯৭

এ হাদিসে রাসূল ﷺ রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেননি। যদি রাসূল আট রাকাত তারাবি পড়তেন বলে এর বেশি পড়া বিদআত হয়, তাহলে তারাবি নামাজ তিন দিনের বেশি জামাতে পড়াও বিদআত। কেননা, নবি তিন দিনের বেশি জামাতে তারাবি পড়েননি।

উমর (রা.) তাঁর খিলাফত আমলের শুরুর দিকে আট রাকাত তারাবির নির্দেশ দিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর খিলাফত আমলেই ২০ রাকাত তারাবি আদায় করা হতো। এ সংক্রান্ত সহিহ ও হাসান অনেক হাদিস রয়েছে। সাইব ইবনে ইয়াজিদ বলেন-'উমর (রা.) রমজান মাসে লোকদের উবাই ইবনে কাব ও তামিমে দারি (রা.)-এর ইমামতিতে ২১ রাকাতের (বিতরসহ) ওপর একত্র করেন। '১৯৮

ইমাম বায়হাকি (রহ.) ইয়াজিদ ইবনে খুসাইফা সূত্রে সাইব ইবনে ইয়াজিদ থেকে বর্ণনা করেন-
كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً
'তাঁরা (সাহাবিরা) উমর (রা.)-এর যুগে রমজান মাসে ২০ রাকাত (তারাবি) পড়তেন। '১৯৯

দুটি হাদিসের সনদই বিশুদ্ধ। ইমাম বুখারি-মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। সাহাবি, তাবেয়ি ও সালফে সালেহিনদের মধ্যে ২০ রাকাত তারাবিই প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইবনে আব্দুল বার (মৃ. ৪৬৩ হি.) ২০ রাকাতের হাদিসকে প্রাধান্য দিয়ে বলেন-
وَهُوَ قَوْلُ جُمْهُورِ الْعُلَمَاءِ وَبِهِ قَالَ الْكُوفِيُّونَ وَالشَّافِعِيُّ وَاكْثَرُ الْفُقَهَاءِ
'জমহুর আলিমের মতে, তারাবি নামাজ ২০ রাকাত। কুফাবাসী, ইমাম শাফেয়ি ও অধিকাংশ ফকিহদের এটাই মত।'২০০

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন- فَإِنَّهُ قَدْ ثَبَتَ أَنَّ أَبِي بْنِ كَعْبٍ كَانَ يَقُومُ بِالنَّاسِ عِشْرِينَ رَكْعَةً فِي قِيَامِ رَمَضَانَ
'এটা প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কাব (রা.) লোকদের নিয়ে ২০ রাকাত কিয়ামু রমজান তথা তারাবির সালাত আদায় করতেন। '২০১

উসমান, আলি ও ইবনে মাসউদ (রা.) সহ অধিকাংশ সাহাবি ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন। ২০২
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম সুফিয়ান সাওরি, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক, ইবনে তাইমিয়া (রহ.) সহ জমহুর আলিমের মতও এটাই। ২০৩

বিশিষ্ট তাবেয়ি, ফকিহ ও মুহাদ্দিস আতা (মৃ. ১১৪ হি.) (রহ.) বলেন- أَدْرَكْتُ النَّاسَ وَهُمْ يُصَلُّونَ ثَلَاثًا وَعِشْرِينَ رَكْعَةً بِالْوِتْرِ - 'আমি লোকদের বিতরসহ ২৩ রাকাত সালাত আদায় করতে দেখেছি।'২০৪

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বীয় ওস্তাদ হাম্মাদ (রহ.) থেকে এবং তিনি প্রসিদ্ধ তাবেয়ি ফকিহ ইবরাহিম নাখায়ি (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন- أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ - 'লোকেরা রমজান মাসে পাঁচ তারবিহা তথা ২০ রাকাত সালাত আদায় করত।'২০৫

এ দুটো আসারই সহিহ সনদে বর্ণিত। এ থেকে বোঝা যায়, উমর (রা.)-এর পরবর্তী সময় সাহাবি ও তাবেয়িদের মধ্যে ২০ রাকাত তারাবির প্রচলন হয়েছিল।

ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেন- 'উমর (রা.), আলি (রা.) ও অন্য সাহাবায়ে কেরাম থেকে যা বর্ণিত, অধিকাংশ আহলে ইলমই তা মেনে চলেন। অর্থাৎ তারা ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন।'২০৬

ইমাম নববি বলেন- فَصَلَاةُ التَّرَاوِيحِ سُنَّةٌ بِإِجْمَاعِ الْعُلَمَاءِ وَمَنْ هَبْنَا أَنَّهَا عِشْرُونَ رَكْعَةً بِعَشْرِ تَسْلِيمَاتٍ وَتَجُوزُ مُنْفَرِدًا وَجَمَاعَةً - 'আলিমদের ঐকমত্যে তারাবির সালাত সুন্নত। আমাদের মতে, এর রাকাত সংখা ২০, যা ১০ সালামে আদায় করা হবে। তা একাকী ও জামাতে দুভাবেই আদায় করা জায়েজ।'২০৭

শাইখ বিন বাজ বলেন- وقد صلى الصحابة رضي الله عنهم فى عهد عمر رضي الله عنه ثلاثا - وعشرين ركعة 'উমর (রা.)-এর যুগে সাহাবিরা ২০ রাকাত সালাত আদায় করতেন।'২০৮

'পিস পাবলিকেশন্স' কর্তৃক প্রকাশিত রাসূল ﷺ-এর প্র্যাক্টিক্যাল নামাজ বইটিতেও বলা হয়েছে-'সুতরাং ২০ রাকাতের অভিন্ন মত গ্রহণ করাই যুক্তিসংগত।'২০৯

কোনো কোনো হাদিসে আবার বিতরসহ ৪১ রাকাত বা তার চেয়েও বেশি তারাবি পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। ২১০

টিকাঃ
১৮৯. আরফুশ-শাজি: ৮০৬
১৯০. প্রাগুক্ত
১৯১. নাসায়ি: ১৬০৬, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ: ৭৬৯৬
১৯২. বুখারি: ২০১০; মালেক, আল মুয়াত্তা: ২৪১
১৯৩. আল ফিকহুল আকবার : বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা, (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদহ, ২০১৪), পৃষ্ঠা-৩৬১
১৯৪. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, জিজ্ঞাসা ও জবাব: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ০০
১৯৫. মালেক, আল মুয়াত্তা : ৩৭৯; শরহে মাআনিল আছার: ১৭৪০; মিরকাতুল মাফাতিহ : ১৩০২, বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ২/৬৯৮
১৯৬. আলবানি, সালাতুত তারাবিহ: পৃষ্ঠা-৮৬
১৯৭. বুখারি: ৪৭২, মুসলিম: ৭৪৯, আবু দাউদ: ১৩২৬
১৯৮. আবদুর রাজ্জাক, আল মুসান্নাফ: ৭৭৩০, উমদাতুল কারি: ১১/১২৭
১৯৯. বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ২/৬৯৮; উমদাতুল কারি, ৫/২৬৭; মিরকাতুল মাফাতিহ, ৩/৩৭১
২০০. ইবনে আবদুল বার, আল ইসতিযকার : ২/৭০
২০১. মাজমুউল ফতওয়া: ২৩/১১২
২০২. আইনি, উমদাতুল কারি: ৭/১৭৮
২০৩. ইবনে আবদুল বার, আল ইসত্যিকার, ২/৭ ইবনে কুদামা, আল মুগনি : ১/৪৫৭
২০৪. মুসান্নাফে আবি শায়বা : ৭৬৮৮; মুহাম্মদ নাসর আল মারওয়াজি (২৯৪ হি.), মুখতাসারু কিয়ামুল লাইল: ২২১; আল ইসতিজকার: ২/৭০
২০৫. আবু ইউসুফ, কিতাবুল আসার: ২১১
২০৬. তিরমিজি: ৮০৬
২০৭. আল মাজমুউ: ৪/৩১
২০৮. মাজমুউ ফতওয়া ইবনে বাজ: ১১/৩৩৫
২০৯. মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম আত-তুওয়াইজিরি, রাসূল ﷺ-এর প্র্যাক্টিক্যাল নামাজ, (পিস পাবলিকেশন-ঢাকা, ২০১৩), পৃষ্ঠা-২২২
২১০. ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফতওয়া: ২২/২৭২; মাজমুউ ফতওয়া ইবনে বাজ, ১৫/১৯

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 কোয়ানটিটি বনাম কোয়ালিটি

📄 কোয়ানটিটি বনাম কোয়ালিটি


উপরোল্লিখিত হাদিস, দলিল ও মতামতগুলো নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করে আমরা বলতে পারি, রাসূল ﷺ আট রাকাত তারাবি পড়েছেন। উমর (রা.)-এর খিলাফত আমলে প্রথমে আট রাকাত, পরে ২০ রাকাত তারাবির প্রচলন হয়।

রাসূল ﷺ দীর্ঘ সময় ধরে তারাবির নামাজ পড়তেন। উমর (রা.)-এর খিলাফত আমলেও জামাতের সাথে দীর্ঘ সময় তারাবির নামাজ পড়া হতো। তাঁরা রাত ৮/৯ টা থেকে ৩/৪টা পর্যন্ত প্রায় ৬/৭ ঘণ্টা তারাবি পড়তেন।

তারাবির নামাজ আট রাকাতের পক্ষে যেমন বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে, তেমনি সহিহ হাদিস রয়েছে ২০ রাকাতের পক্ষেও। এই দুই ধরনের বিপরীতমুখী হাদিসের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে মুহাদ্দিসগণ বলেন-প্রথম প্রথম দীর্ঘ সময় নিয়ে আট রাকাত তারাবি পড়া হতো। পরে সময়ের পরিমাণ ঠিক রেখে রাকাত ও বিশ্রাম সংখ্যা বাড়ানো হয়। কেননা, ৬/৭ ঘণ্টায় ৮ রাকাত নামাজ পড়ার বদলে বিশ রাকাত পড়া ছিল সহজতর।'২১১

ইমাম বায়হাকি (রহ.) বলেন-'এ দুটি বর্ণনার মধ্যে এভাবে সমন্বয় করা যায়-তাঁরা প্রথমে ১১ রাকাত পড়তেন; পরবর্তী সময়ে ২০ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। '২১২

ইবনে হাজার আসকালানি (মৃ. ৮৫২ হি.) (রহ.) বলেন- وَالْجَمْعُ بَيْنَ هَذِهِ الرِّوَايَاتِ مُمْكِنٌ بِاخْتِلَافِ الْأَحْوَالِ وَيُحْتَمَلُ أَنَّ ذَلِكَ الاخْتِلَافَ بِحَسَبِ تَطْوِيلِ الْقِرَاءَةِ وَتَخْفِيفِهَا فَحَيْثُ يُطِيلُ الْقِرَاءَةَ تَقِلُّ الزَّكَعَاتُ وَبِالْعَكْسِ وَبِذَلِكَ جَزَمَ الدَّاوُدِيُّ وَغَيْرُهُ 'এই বর্ণনাগুলোর মাঝে অবস্থার ভিন্নতার ভিত্তিতে সমন্বয় করা সম্ভব। সম্ভবত এই ভিন্নতা ছিল কিরাত দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত করার বিবেচনায়। অর্থাৎ, কিরাত দীর্ঘ হলে রাকাত কম হতো। রাকাত বেশি হলে কিরাত সংক্ষিপ্ত হতো। ইমাম দাউদি ও অন্যরা এ মতকে চূড়ান্ত সাব্যস্ত করেছেন। '২১৩

ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন- أن التراويح كانت أولا إحدى عشرة ركعة، وكانوا يطيلون القراءة فثقل عليهم فخففوا القراءة وزادوا في عدد الركعات فكانوا يصلون عشرين ركعة ، ثم خففوا القراءة وجعلوا الركعات ستا وثلاثين 'তারাবির নামাজ প্রথমে (বিতরসহ) ১১ রাকাত ছিল। তাঁরা কিরাত লম্বা করতেন। ফলে (দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা) তাঁদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ল। তাই তাঁরা কিরাত ছোটো করে রাকাত সংখ্যা বাড়ালেন এবং ২০ রাকাত তারাবি পড়া আরম্ভ করলেন। তাঁদের কেউ কেউ কিরাতকে আরও সংক্ষিপ্ত করলেন এবং ৩৬ রাকাত তারাবি পড়া শুরু করলেন। '২১৪

এইভাবে তাঁরা পরস্পরবিরোধী হাদিসের মধ্যে সমন্বয় করেছেন। একটিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যটিকে বাতিল বা ভুল বলেননি। উমর (রা.) কর্তৃক আট রাকাত ও ২০ রাকাত তারাবির দুটি বর্ণনাই ইমাম মালেক (রহ.) মুয়াত্তা গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন, কিন্তু তিনি এ দুই মতের কোনোটাই গ্রহণ না করে নিজে মসজিদে নববিতে ৩৬ রাকাত তারাবির ইমামতি করেছেন। ২১৫

নবিজির হাদিস, সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহিনদের আমল নিয়ে পর্যালোচনা করলে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁদের কাছে রাকাত সংখ্যার কোনো গুরুত্ব ছিল না। গুরুত্ব ছিল না আট রাকাত বা ২০ রাকাতের। তারাবির রাকাত সংখ্যা যদি গুরুত্বপূর্ণ হতো, তাহলে যে তিন দিন রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে জামাতে তারাবি পড়েছিলেন, সে তিন দিনের রাকাত সংখ্যা সহিহ সনদে অবশ্যই বর্ণিত হতো; কিন্তু একজন সাহাবিও রাকাত সংখ্যা উল্লেখ করে হাদিস বর্ণনা করেননি। সে নামাজের ধীরস্থিরতা ও কিয়াম কত লম্বা ছিল, তা তাঁদের প্রত্যেকেই গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন।

অতএব, কেউ যদি আট রাকাতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। আর অন্যজন ব্যয় করেন ২০ রাকাতে এক ঘণ্টা, তাহলে ২০ রাকাতের থেকে আট রাকাত নামাজই উত্তম হবে। আবার কেউ যদি আট রাকাতে ৩০ মিনিট ব্যয় করেন। অন্যজন ২০ রাকাতে ব্যয় করেন এক ঘণ্টা, তাহলে আট রাকাত থেকে ২০ রাকাত নামাজই উত্তম হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً - 'তিনি জীবন-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন এটা পরীক্ষা করার জন্য, তোমাদের কার থেকে কার আমল উত্তম।' সূরা মুলক: ২

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা উত্তম (اَحْسَنُ) শব্দ ব্যবহার করেছেন। বেশি (اَكْرُ) শব্দ ব্যবহার করেননি। তাই ইবাদতে সংখ্যার গুরুত্ব না দিয়ে সৌন্দর্যের গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কোয়ানটিটির বদলে কোয়ালিটির প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু তা না করে শুধু কোয়ানটিটি দেখছি। কে কত রাকাত পড়ল, তা নিয়ে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করছি। অথচ কার নামাজ কতটুকু শুদ্ধ হলো, কার নামাজ কতটুকু সুন্দর হলো-তা নিয়ে কোনো আলিমের মাথাব্যথা নেই, কোনো ফতোয়া নেই।

টিকাঃ
২১১. ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফতওয়া: ২২/২৭২, ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, আল-ফিকহুল আকবার বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা, (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদহ, ২০১৪): পৃষ্ঠা-৩৬৩
২১২. বায়হাকি, আস সুনানুল কুবরা: ২/৪৯৬
২১৩. ফাতহুল বারি: ৪/২৫৩
২১৪. শরহে জারকানি: ২৪৫: সাইয়্যেদ সাবিক, ফিকহুস সুন্নাহ: ১/২০৬
২১৫. ইবনে কুদামা, আল মুগনি: ১/৪৫৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px