📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 বিদআতের পরিচয়

📄 বিদআতের পরিচয়


বিদআত শব্দটি আরবি ‘বাদাআ’ ক্রিয়া থেকে গঠিত। এর অর্থ নব উদ্ভাবিত বিষয়। প্রখ্যাত আরবি অভিধান প্রণেতা আল্লামা ইবনে মনজুর (মৃ. ৭১১ হি.) বলেন- ‘ধর্মের পূর্ণতার পর যা উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং যা কিছু নবসৃষ্ট-তার সবই বিদআত।’১৪১

অন্যভাবে বলা যায়, পূর্বনমুনা ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করাকে বিদআত বলে। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ
'(কোনো নমুনা ছাড়াই) তিনি আকাশ ও জমিনসমূহের স্রষ্টা।'১৪২

শরিয়াহর পরিভাষায়-যে জ্ঞান, মত, কর্ম বা অবস্থা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয় এবং যা রাসূল ﷺ, সাহাবা, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগে ছিল না, এমন নব উদ্ভাবিত বিষয় ইবাদত হিসেবে পালন করার নাম বিদআত।

বিদআতের প্রকার: নব উদ্ভাবিত কর্ম তিন ভাগে বিভক্ত।

এক. ইবাদতজাতীয় কর্ম, যা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হিসেবে সওয়াবের আশায় পালন করা হয়। শরিয়াহর বিদআত বলতে এ প্রকারের বিদআতই উদ্দেশ্য। এই ধরনের বিদআত হারাম, প্রত্যাখ্যাত। কেননা, ধর্মীয় যাবতীয় কর্মকাণ্ড কুরআন-সুন্নাহর ওপর নির্ভরশীল। নবি ﷺ বলেন-
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَةٌ
'যে আমার দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু উদ্ভাবন করল যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।'১৪৩

দুই. 'মুআমালাত' বা জাগতিক বিষয়ে নব উদ্ভাবিত কর্ম, যা সব ধর্মের লোকেরা করে থাকে। যতক্ষণ তা নাজায়েজ হওয়ার দলিল পাওয়া না যাবে, ততক্ষণ তা মুবাহ ও জায়েজ।

নীতিগতভাবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ইবাদতের ক্ষেত্রে আসল হচ্ছে- 'না'। অর্থাৎ কোনো ইবাদতই বৈধ নয়। শুধু সেই ইবাদত বৈধ, যা কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা-কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। আর মুআমালাত বা জাগতিক বিষয়ের ক্ষেত্রে আসল হচ্ছে-'হ্যাঁ'। অর্থাৎ দুনিয়ার সব কাজকর্মই বৈধ। শুধু সেটি করা অবৈধ, যা শরিয়াহর দলিল দ্বারা হারাম ও নিষিদ্ধ বলে প্রমাণিত।

বর্তমান সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, একটি বিষয় নিয়ে দুই পক্ষ তর্ক-বিতর্ক করে একে অন্যের কাছে দলিল দাবি করে। অথচ এ মূলনীতি অনুসারে ইবাদতের ক্ষেত্রে যিনি কর্মটি অস্বীকার করবেন, তার দলিল উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই; বরং যিনি কর্মটি প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন, তার জন্য দলিল উপস্থাপন করা জরুরি। যেমন: ইল্লাল্লাহ জিকির। কেউ এ জিকির জায়েজ বা সুন্নত বললে তাকে দলিল ও প্রমাণ দেখাতে হবে। আর কেউ অস্বীকার করলে তার জন্য অস্বীকার করাই যথেষ্ট। তার দলিল দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।

আর মুআমালাত বা জাগতিক বিষয়ে যিনি হালাল বলবেন, তার দলিল উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই; কিন্তু যিনি হারাম বলবেন, তাকে দলিল দ্বারা হারাম প্রমাণ করতে হবে। যেমন: শার্ট-প্যান্ট পরা। কেউ যদি এটিকে জায়েজ বলেন-তার দলিল দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু হারাম বললে তাকে দলিল দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। হারাম হওয়ার দলিল না দেওয়া পর্যন্ত তা জায়েজ বলে গণ্য হবে।

তিন. জাগতিক ও ধর্মীয় উভয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট নব উদ্ভাবিত বিষয়। সাধারণত তা হয় ইবাদত পালনের জাগতিক উপকরণ ও মাধ্যম। যেমন: জাকাত আদায়ের জন্য মুদ্রা, হজ আদায়ের জন্য পরিবহন, ইলম শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। কুরআন-হাদিস শিক্ষা করা ফরজ। এই ফরজ আদায়ের জন্য মাদরাসা একটি উপকরণ। হজ করা ফরজ। এ ফরজ আদায়ের উপকরণ হলো বাহন।

ইলম শিক্ষা করা, হজ করা ইবাদত; কিন্তু মাদরাসায় পড়া, বাহন ব্যবহার করা ইবাদত নয়। কেউ যদি এগুলোকে ইবাদত মনে করে, তাহলে তা বিদআত হবে। আর যদি এগুলোকে ইবাদত মনে না করে মূল ইবাদত (হজ ও ইলম অর্জন) আল্লাহর জন্য করে, তাহলে উপকরণ হিসেবে এগুলোও সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সওয়াবও পাওয়া যাবে।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এটিকে 'সুন্নতে হাসানা' বলে আখ্যায়িত করেছেন।১৪৪

মোটকথা, নব উদ্ভাবিত সবকিছুই বিদআত, কিন্তু বিদআত মানেই নিষিদ্ধ নয়। এ সম্পর্কে ইমাম গাজালি (মৃ. ৫০৫ হি.) বলেন-
وإنما المحذور ارتكاب بدعة تراغم سنة مأثورة -
'কেবল যে বিদআত সুন্নতকে বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়।'১৪৫

টিকাঃ
১৪১. ইবনেমনজুর, লিসানুল আরব: ৮/৬
১৪২. সূরা বাকারা: ১১৭; সূরা আনআম: ১০১
১৪৩. বুখারি: ২৬৯৭, মুসলিম: ১৭১৮
১৪৪. এহইয়াউস সুনান: পৃ ১২৪
১৪৫. গাজালি, এহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ২/৩০৫

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 বিদআতের পরিণতি ও বিদআত থেকে বাঁচার উপায়

📄 বিদআতের পরিণতি ও বিদআত থেকে বাঁচার উপায়


বিদআতের পরিণতি খুব ভয়াবহ। বিদআত সম্পর্কে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসূল ﷺ বলেছেন-
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
'তোমরা নিত্য-নতুন বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।'১৪৬

রাসূল ﷺ আরও বলেছেন-
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَةٌ
'যে ব্যক্তি এমন কোনো কর্ম করল, যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত।'১৪৭

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন-'তোমরা অবশ্যই ইলম অর্জন করো। আর খবরদার! কখনো বিদআতে লিপ্ত হয়ো না।'১৪৮

রাসূল ﷺ বলেছেন-'কিয়ামতের দিন আমি হাউজে কাউসারে তোমাদের অপেক্ষায় থাকব। কিছু লোককে আমার কাছে আসতে বাধা দেওয়া হবে। আমি বলব-“হে আমার প্রতিপালক! এরা তো আমার সাহাবি।" তখন বলা হবে-
إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ
"আপনি জানেন না আপনার পরে তারা কী কী বিদআত সৃষ্টি করেছে।”১৪৯

অতএব, বিদআত থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। বিদআত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। মানুষ যখন সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যায়, তখনই সে বিদআতি কার্যকলাপে লিপ্ত হয়।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন-'প্রতিবছরই মানুষ কিছু বিদআত উদ্ভাবন করবে, আর কিছু সুন্নাহ মেরে ফেলবে। একপর্যায়ে পৃথিবীতে শুধু বিদআতই বেঁচে থাকবে, আর সুন্নাহসমূহ বিলীন হয়ে যাবে।'১৫০

ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এ বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট, বিদআত ও সুন্নাহ কখনো একত্র হতে পারে না। এ দুটির একটি অন্যটির বিপরীত। তাই মানুষ যতক্ষণ সুন্নাহকে লালন করবে, ততক্ষণ সে বিদআত থেকে বেঁচে থাকবে। সুন্নাহ থেকে দূরে গেলেই বিদআত তাকে গ্রাস করবে। তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে হবে। বিদআত ত্যাগ করতে হবে। পরিত্যাগ করতে হবে তাও, যা বিদআত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

টিকাঃ
১৪৬. আবু দাউদ: ৪৬০৭
১৪৭. মুসলিম : ১৭১৮
১৪৮. দারেমি: ১৪৫
১৪৯. বুখারি: ৪৬২৫, মুসলিম: ২২৯৭
১৫০. তাবরানি, মুজামুল কাবির: ১০৬১০

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 সুন্নাহ ও বিদআত একসাথে মিশ্রিত হলে করণীয়

📄 সুন্নাহ ও বিদআত একসাথে মিশ্রিত হলে করণীয়


আমাদের সমাজে এমন কিছু আমল প্রচলিত, যা জায়েজ ও বিদআত দুটোই হতে পারে। যেমন: ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত করা। অজুর মধ্যখানে দুআ পড়া। এগুলো বিদআত নাকি জায়েজ, তা সন্দেহযুক্ত। কখন জায়েজ হবে আর কখন বিদআত, তা আমরা ইতঃপূর্বে সবিস্তারে আলোচনা করেছি। অধিকাংশ আলিম এগুলোকে সর্বাবস্থায় বিদআত বলেছেন। কেননা, এসব জায়েজ কর্ম মানুষকে বিদআতের দিকে আকৃষ্ট করে। আবার কেউ কেউ এগুলোকে সুন্নত ও মুস্তাহাবও বলে থাকেন।

কোনো জায়েজ আমলকে জোর করে সুন্নাহের অন্তর্ভুক্ত করার দ্বারা মূলত প্রকৃত সুন্নাহকে ছোটো করা হয়। এমন সন্দেহযুক্ত বিষয় সুন্নাহ হলেও তা পরিত্যাগ করাই উত্তম। কেননা, রাসূল ﷺ বলেছেন- 'হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে অনেক সন্দেহযুক্ত বিষয়। যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে, সে তাঁর দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহযুক্ত বিষয়ে লিপ্ত হবে, তার উদাহরণ ওই রাখালের মতো, যে তার পশুপাল বাদশাহর সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়। অচিরেই সেগুলোর সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।১৫১

এ হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, যেসব জিনিস বিদআত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তা পরিত্যাগ করাই উত্তম। হানাফি মাজহাবের প্রখ্যাত ইমাম আল্লামা সারাখসি (মৃ. ৪৮৩ হি.) (রহ.) বলেন-
وَمَا تَرَدَّدَ بَيْنَ الْبِدْعَةِ وَالسُّنَّةِ تَرَكَهُ لِأَنَّ تَرْكَ الْبِدْعَةِ لَا زِمْ وَأَدَاءَ السُّنَّةِ غَيْرُ لَازِمٍ -
'যে কাজটি বিদআত ও সুন্নত উভয়টি হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তা বর্জন করতে হবে। কেননা, বিদআত বর্জন করা জরুরি; কিন্তু সুন্নত পালন জরুরি নয়।১৫২

অন্যত্র তিনি বলেন-'যে কাজ মুবাহ ও বিদআত উভয়টি হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তা পরিহার করতে হবে। কারণ, বিদআত পরিহার করা ওয়াজিব। তদ্রূপ যা বিদআত ও সুন্নত উভয়টি হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তা-ও পরিহার করতে হবে।'১৮৩

টিকাঃ
১৫১. বুখারি: ৫২
১৫২. সারাখসি, আল মাবসুত : ২/৮০; কামালুদ্দিন ইবনু হুমাম, ফাতহুল কাদির : ১/৫২১
১৮৩. সারাখসি, আল মাবসুত: ৩/১৯৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px