📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ইস্তেঞ্জা

📄 ইস্তেঞ্জা


মলমূত্র ত্যাগের পর পবিত্রতা অর্জন করা ইসলামের অন্যতম বিধান। পবিত্রতা অর্জনের জন্য রাসূল ﷺ অধিকাংশ সময় শুধু পানি ব্যবহার করেছেন।১৩৮ আবার কখনো ব্যবহার করেছেন শুধু ঢেলা-কুলুখ। সাহাবিদেরও তিনি এমনটা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।১৩৯ কুলুখের পর পানি ব্যবহারের কথাও কিছু কিছু দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে।১৪০

এই তিন পদ্ধতিতে রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিরা পবিত্রতা অর্জন করেছেন। কিন্তু ইস্তেঞ্জার সময় 'ঢেলা-কুলুখ' ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁরা কখনো উঠে দাঁড়াননি। হাঁটাচলা, লাফালাফি, গলা খাঁকারি দেননি। প্রস্রাব বা পায়খানা উভয় ক্ষেত্রেই তাঁরা স্বাভাবিকভাবে বসে ঢেলা-কুলুখ, পানি অথবা দুটোই ব্যবহার করে পবিত্রতা অর্জন করেছেন, এটাই সুন্নত পদ্ধতি।

কিন্তু প্রস্রাব শেষে উঠে হাঁটাহাঁটি করা, লাফালাফি করা, ৪০ কদম হাঁটা ইত্যাদিকে আমরা সুন্নত মনে করি। অথচ তা আদৌ সুন্নত নয়। কেউ বলতে পারেন, ইস্তেঞ্জার পর এ রকম না করলে প্রস্রাব কাপড়ে লাগার আশঙ্কা থাকে। তাই নিশ্চিতভাবে পবিত্র হওয়ার জন্য এমন করা প্রয়োজন।

তাদের উদ্দেশ্যে বলব, প্রস্রাব কাপড়ে লাগার আশঙ্কায় এমন সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কোনো বিধান রাসূল ﷺ দেননি। এ ছাড়া আমরা মলত্যাগের সময়ও প্রস্রাব করি। তখন তো কেউ হাঁটাহাঁটি করি না। তাহলে শুধু প্রস্রাবের সময় কেন এমনটা করা জরুরি মনে করি?

এটা মূলত মনের ওয়াসওয়াসা কিংবা অভ্যাসগত কারণে করে থাকি।

তবে সব মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজনীয়তা সমান নয়, তাই একান্ত প্রয়োজন হলে মানুষের আড়ালে একটু হাঁটা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের সামনে কুলুখ হাতে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা, গল্প করা, মাটিতে জোরে জোরে পা মারা, বিশেষ অঙ্গ নাড়ানো, পায়চারি করা শুধু সুন্নত পরিপন্থি নয়; বরং তা ভদ্রতা, সভ্যতা, সুরুচি, লজ্জা ও পর্দারও বিপরীত। ইসলাম আমাদের এমন নির্লজ্জতা শিক্ষা দেয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কোনো গ্রন্থেও এমন নির্লজ্জ কাজের শিক্ষা পাওয়া যায় না। অথচ আমরা মাজহাবের নামে এসব করে যাচ্ছি।

টিকাঃ
১৩৮. মুসলিম, ১/২২৭: ২৭০; আবু দাউদ: ৪৩; তিরমিজি: ১৯; নাসায়ি : ৪৬
১৩৯. বুখারি : ১৫৬, মুসলিম: ২৬২, তিরমিজি: ১৬, আবু দাউদ: ৭
১৪০. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি, (প্রকাশক: উসামা খোন্দকার, আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ৪র্থ প্রকাশ, ২০১৩): পৃষ্ঠা-৪৭৬

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ধূমপান করা

📄 ধূমপান করা


ধূমপান করা যেসব জিনিস হারাম হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, তা সর্বাবস্থায় হারাম। আর যেসব জিনিস হারাম হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা নেই; বরং তা ইজতিহাদ ও কিয়াসের ওপর নির্ভরশীল, স্থান কাল পাত্রভেদে তার বিধানও পরিবর্তন হতে পারে।

বিড়ি-সিগারেট পরবর্তী যুগের আবিষ্কার। তাই কুরআন-হাদিসে এর বিধান বর্ণিত হয়নি। পূর্ববর্তী আলিমগণ এটাকে মাকরুহ মনে করতেন। তাদের অনেকে এতে অভ্যস্তও ছিলেন। সিলেট অঞ্চলের বড়ো বড়ো আলিমদের যারা ধূমপান মাকরুহ বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন; তাদের ইলম, আমল, দ্বীনদারি ও তাকওয়ার ব্যাপারে কোনোরূপ সন্দেহ করার সুযোগ নেই।

হাদিসে কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।১৫৪ কারণ, এর দুর্গন্ধে মানুষের কষ্ট হয়। এই কাজটি শরিয়তে মাকরুহ। সম্ভবত বিড়ি-সিগারটের দুর্গন্ধকে এর ওপর কিয়াস করে তারা ধূমপান করা মাকরুহ হওয়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা এর ক্ষতিকর দিকগুলো জানতেন না।

আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে আজ আমরা জানি, ধূমপান শুধু দুর্গন্ধের কারণ নয়; এর ফলে ব্যক্তি যক্ষ্মা, ফুসফুস ক্যান্সার, যৌনক্ষমতা হ্রাস, চেহারা ফ্যাকাসে, অকালে দাঁত নষ্ট, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি নানা ধরনের মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ শুধু ধূমপানের কারণে মারা যায়। তাই ধূমপান করা স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করার শামিল।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُم - 'তোমরা (কোনো পন্থায়) নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না।' সূরা নিসা : ২৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ 'তোমরা নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।' সূরা বাকারা: ১৯৫

রাসূল ﷺ বলেন- لَا ضَرَرَ وَلَا صِرَارَ 'অন্যের ক্ষতি করা যাবে না, নিজেও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া যাবে না।'১৫৫

সাদাপাতা, জর্দারও একই হুকুম। আমাদের শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মুসলিম জাতির গর্ব ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারকে একদিন ক্লাসে প্রশ্ন করা হয়েছিল- 'স্যার, জর্দা খাওয়ার হুকুম কী?' তিনি উত্তরে বললেন- 'বিড়ি-সিগারেটের যে হুকুম, জর্দারও একই হুকুম। অর্থাৎ হারাম।'

কেননা, এগুলো নেশাজাতীয় দ্রব্য। রাসূল ﷺ বলেন- كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ - 'নেশা সৃষ্টিকারী প্রত্যেক বস্তুই হারাম।'১৫৬

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা (খমর) বা মদকে হারাম করেছেন।১৫৭ যদিও খমরের সাধারণ অর্থ-মদ, কিন্তু সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যকেই খমর বলে। উমর (রা.) বলেন- الْخَمْرُ مَا خَمَرَ الْعَقَلَ - 'যেসব জিনিস বিবেক-বুদ্ধিকে আক্রান্ত করে ও দাবিয়ে রাখে, তা- ই হলো খমর।'১৫৮

কেউ কেউ বলেন-বিড়ি-সিগারেট মদের মতো নেশা সৃষ্টি করে না। তাই এটা হারাম নয়। তাদের এই যুক্তি সঠিক নয়। দুয়েকটি বিড়ি-সিগারেট খেলে নেশা হয় না ঠিক: কিন্তু কেউ যদি একসাথে ১০/১২টা সিগারেট খায়, একসাথে এক পাতা জর্দা খায়, তাহলে অবশ্যই সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে শরিয়ত প্রণেতার বক্তব্য হচ্ছে- مَا اسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيْلُهُ حَرَামٌ - 'যে জিনিসের বেশি পরিমাণ নেশাগ্রস্ত করে, তার স্বল্প ব্যবহারও হারাম।'১৫৯

তা ছাড়া বিড়ি-সিগারেট নিকৃষ্ট বস্তু। শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক নিকৃষ্ট বস্তু হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ - 'আর তিনি তাঁদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করে দেন। আর হারাম করেন নিকৃষ্ট ও অপবিত্র বস্তুসমূহ।' সূরা আ'রাফ: ১৫৭

ডাক্তার জাকির নায়েক এক লেকচারে বলেছেন- 'বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৪০০ আলিম বিড়ি-সিগারেট খাওয়া হারাম হওয়ার ব্যাপারে ফতোয়া দিয়েছেন।'১৬০

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) বলেন- 'ধূমপান সম্পর্কে হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। প্রায় হাজার বছর পর এটির উদ্ভব হয়েছে। তাই প্রথমদিকে আলিমগণ এটা নিয়ে কিছুটা মতভেদ করেছেন। কেউ স্বাভাবিকভাবে বৈধ বলেছেন। আবার কেউ কেউ দুর্গন্ধ ইত্যাদির দিকে লক্ষ রেখে মাকরুহ বলেছেন; কিন্তু সময়ের আবর্তনে ধূমপানের অপকারিতাগুলো যখন স্পষ্ট হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সকল আলিম এটাকে হারাম বলেছেন। এটা একটা পাপ এবং বড়ো গুনাহের কাজ।'১৬১

আলিমদের অনেকে সাদাপাতা ও জর্দা খান। এগুলো খাওয়াকে তারা জায়েজ মনে করেন। অথচ ওপরের দলিলগুলো দ্বারা এগুলো খাওয়া হারাম বলে স্পষ্ট প্রমাণিত। ধূমপান, সাদাপাতা, তামাক, জর্দা সন্দেহাতীতভাবে হারাম প্রমাণিত হওয়ার পরও যারা পূর্ববর্তী আলিমদের দোহাই দিয়ে মাকরুহ ফতোয়া দেন, এগুলোকে হালাল রাখার অপচেষ্টা করেন, তাদের উদ্দেশ্যে রাসূল ﷺ বলেছেন- يَشْرَبُ نাসٌ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا ‘(ভবিষ্যতে) আমার উম্মতের কিছু লোক মদ্য পান করবে, কিন্তু তারা এর অন্য নাম দেবে।’১৬২

এ হাদিসের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হচ্ছে বিড়ি-সিগারেট, সাদাপাতা, জর্দা ইত্যাদি। এগুলোকে মদ বলা হয় না সত্য, কিন্তু এসবের মাঝে পূর্ণ মাত্রায় মাদকতা বিদ্যমান।

অতএব, ধূমপান, তামাক, সাদাপাতা, জর্দা ইত্যাদি মাদকের অর্ন্তভুক্ত। পূর্ববর্তী আলিমগণ যদি এগুলোর ক্ষতিকর দিক জানতেন, জানতেন এসবে মাদকতা আছে, তাহলে তারা কখনোই মাকরুহ ফতোয়া দিয়ে এগুলোকে হালকাভাবে দেখতেন না। তাই তাদের ফতোয়াকে সম্মান জানিয়ে আমাদের জন্য এসব বস্তু ত্যাগ করা জরুরি।

টিকাঃ
১৫৪. মুসলিম: ৫৬৪; সিলসিলায়ে সহিহা লিল আলবানি: ২৩৮৯
১৫৫. ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; সিলসিলায়ে সহিহা: ২৫০
১৫৬. বুখারি: ৪৩৪৪, মুসলিম: ২০০২
১৫৭. সূরা মায়েদা : ৯০
১৫৮. নাওয়াদিরুল উসূল: ৩/২৫০
১৫৯. আবু দাউদ: ৩৬৮১, তিরমিজি: ১৮৬৫
১৬০. www.Youtube.com/Ajad Feni আপলোড তারিখ-৯/৪/২০১৭
১৬১. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, জিজ্ঞাসা, ও জবাব ৩য় খণ্ড: পৃষ্ঠা-৯১-৯২
১৬২. নাসায়ি: ৫৬৫৮, ইবনে মাজাহ : ৩৩৮৫

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া

📄 জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া


জানাজা নামাজে রাসূল ﷺ-এর সূরা ফাতিহা পড়ার কথা কোনো সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়নি। ২৮৮ তবে সাহাবিদের সূরা ফাতিহা পড়ার কথা একাধিক সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়।

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَوْفٍ، قَالَ: صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ: لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ
তালহা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর পেছনে জানাজার সালাত আদায় করলাম। তিনি তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন। (সালাত শেষে) তিনি বললেন-আমি সূরা ফাতিহা পাঠ করেছি, যাতে লোকেরা জানতে পারে, এটাও সুন্নত।'২৮৯

অন্য বর্ণনায় আছে-
إِنَّهُ مِنَ السُّنَّةِ، أَوْ مِنْ تَمَامِ السُّنَّةِ 'এটাও সুন্নত। অথবা তা সুন্নতকে পূর্ণতা দানকারী।'২৯০

ইমাম তিরমিজি এই হাদিসকে হাসান (গ্রহণযোগ্য) আখ্যায়িত করে বলেন- 'একদল সাহাবি ও কিছু আলিম এ হাদিসের ওপর আমল করেছেন। জানাজা নামাজে প্রথম তাকবির বলার পর সূরা ফাতিহা পড়া তাঁরা পছন্দ করেছেন।' ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ ও ইমাম ইসহাক (রহ.) এ মতটি গ্রহণ করেছেন।

একদল আলিমের মতে, জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে না। কেননা, এটা হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা, নবির প্রতি দরুদ এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ। এটি ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) ও কুফাবাসী আলিমদের অভিমত। ২৯১

ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, এটিও একটি ইখতেলাফি বিষয়। সাহাবিদের যুগ থেকে এ নিয়ে মতবিরোধ চলে আসছে। উভয় মতের ওপর উম্মাহর এক বিরাট অংশের আমলও বিদ্যমান রয়েছে। আল্লামা ইবনে বাত্তাল বলেন-'আবু উমামা, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, হাসান ইবনে আলি, ইবনে জুবাইর, মিসওয়ার ইবনে মাখরামা (রা.) ও হাসান বসরি (রহ.) জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। আবার উমর, আলি, ইবনে উমর, আবু হুরায়রা (রা.), আতা, তাউস, সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব, ইবনে সিরিন, ইবনে জুবাইর ও ইমাম শাবি জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন না। তাঁরা সূরা ফাতিহা পড়া অপছন্দ করতেন। '২৯২

ইমাম মুহাম্মাদ বলেন- وَبِهَذَا نَأْخُذُ ، لَا قِرَاءَةَ عَلَى الْجَنَازَةِ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ 'আমাদের মতে, জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা নেই। এটি ইমাম আবু হানিফারও অভিমত।'২৯৩

অন্যদিকে শাইখ বিন বাজ জানাজা সালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব বলেছেন। ২৯৪

ইমাম আবু হানিফা আরও বলেন-'সূরা ফাতিহা একান্ত পড়তে চাইলে সানা হিসেবে পড়া যায়। তবে সূরা ফাতিহা পড়ার বিষয়টি যেহেতু রাসূল থেকে বর্ণিত নেই, তাই না পড়াই উত্তম।'

সূরা ফাতিহা পাঠকারীদের বোঝা উচিত-জানাজা নামাজে ফাতিহা পড়া জরুরি হলে অবশ্যই রাসূল ﷺ তা নিয়মিত পাঠ করতেন। সহিহ হাদিসেও তা বর্ণিত হতো। যেভাবে ফরজ নামাজে সূরা ফাতিহা পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।
আবার যারা সূরা ফাতিহা পড়েন না, তাদেরও বোঝা উচিত-অনেক সাহাবি ফাতিহা পড়েছেন। ইবনে আব্বাস তা সুন্নতও বলেছেন। যা থেকে বোঝা যায়, নবিজি মাঝেমধ্যে সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন। আর যদি না পাঠ করেন, তাহলেও তা পাঠ করার সুযোগ রয়েছে। কেননা, জানাজার নামাজে শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করতে বলা হয়েছে। আর প্রশংসার জন্য সূরা ফাতিহা-ই সর্বোত্তম। অতএব, তা পাঠ করা দোষের কিছু নয়। ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সূরা ফাতিহা পাঠকে উত্তম বলেছেন। ২৯৫

টিকাঃ
২৮৮. তিরমিজিতে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। (হা ১০২৬।) ইমাম তিরমিজি (রহ.) নিজেই হাদিসটিকে মুনকার ও আপত্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
২৮৯. বুখারি : ১৩৩৫, আবু দাউদ : ৩১৯৮
২৯০. তিরমিজি: ১০২৭
২৯১. তিরমিজি: ১০২৭
২৯২. ইবনু বাত্তাল, শরহে সহিহুল বুখারি: ৩/৩১৬
২৯৩. মুয়াত্তা মালেক: ৩১১
২৯৪. মাজমুউ ফাতওয়া বিন বাজ: ১৩/১৪৩
২৯৫. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, জিজ্ঞাসা ও জবাব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮২

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 সালাতে হাত বাঁধার বিধান

📄 সালাতে হাত বাঁধার বিধান


সালাতে হাত বাঁধা নিয়ে আজ মুসলমানরা চরম বিতর্কে লিপ্ত। কেউ বলে নাভির নিচে হাত বাঁধা সুন্নত। আবার কেউ বুকে হাত বাঁধাকে সুন্নত বলে। অথচ হাত বাঁধার স্থান উল্লেখসহ রাসূল ﷺ থেকে একটা হাদিসও পরিপূর্ণ সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) সালাতের মধ্যে হাত বাঁধার বিধান বইটিতে সনদভিত্তিক হাদিসের পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, স্থান উল্লেখবিষয়ক সব হাদিসই দুর্বল। তবে স্থান উল্লেখ ছাড়া বাম হাতের ওপর ডান হাত রাখার হাদিস সংখ্যা ১২টির বেশি। এর মধ্যে আটটি হাদিস সন্দেহাতীতভাবে সহিহ।

এর মধ্যে কোনো হাদিসে ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরতে বলা হয়েছে কিংবা বাম হাতের ওপর ডান হাত রাখতে বলা হয়েছে।৩২১ কোনো হাদিসে বাম হাতের পিঠ, কবজি ও বাহুর ওপর ডান হাত রাখার কথা বর্ণিত হয়েছে।৩২২ কোনো হাদিসে বাম হাতের কবজির কাছে ডান হাত রাখার কথা বলা হয়েছে। আবার কোনো হাদিসে ডান হাত বাম হাতের বাহুর ওপর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।৩২৩

এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ইমাম বলেন-'ডান হাতের ওপর বাম হাত রাখাই মূলত ইবাদত। যে স্থানেই হাত রাখুক সুন্নত আদায় হবে। হাত রাখার স্থান নির্ধারণের বিষয়টি সম্পূর্ণ মুসল্লির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তবে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, নাভির নিচে হাত বাঁধা উত্তম।

ইমাম আহমদ (রহ.) বুকে হাত রাখাকে মাকরুহ বলেছেন। তিনি বলেন- أسفل السرة بقليل ويكره أن يجعلهما على الصدر 'নাভির সামান্য নিচে (হাত রাখবে)। তবে বুকের ওপর রাখা মাকরুহ।'৩২৪

ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, বুকের নিচে ও নাভির ওপরে হাত রাখবে।৩২৫

ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, দেহের পাশে হাত ঝুলিয়ে রাখবে। অবশ্য তাঁর এ মতের পক্ষে স্পষ্ট কোনো হাদিস নেই। তবে কিছু সাহাবি ও তাবেয়ি এর ওপর আমল করেছেন বলে জানা যায়। তাঁদের মধ্যে (সাহাবি) আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.), (তাবেয়ি) হাসান বসরি, ইবরাহিম নাখায়ি ও ইবনে সিরিন (রহ.) অন্যতম।৩২৬

সালাতে হাত রাখার ব্যাপারে ইমাম নববি (রহ.) চারটি মত উল্লেখ করেছে- ১. নাভির ওপরে এবং বুকের নিচে রাখা। ২. নাভির নিচে রাখা। ৩. বিষয়টি মুসল্লির ইচ্ছাধীন। ৪. হস্তদ্বয় ঝুলিয়ে রাখা।৩২৭

ইমাম তিরমিজি (রহ.) ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরার বর্ণনাসংবলিত একটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন- 'সাহাবি, তাবেয়ি ও পরবর্তী যুগের আলিমগণ এ হাদিসের ওপর আমল করেছেন। তাঁরা বলেছেন-সালাতের মধ্যে মুসল্লি ডান হাত বাম হাতের ওপর রাখবে। কারও মতে, হাত দুটি নাভির ওপরে রাখবে। আবার কারও মতে, তা রাখবে নাভির নিচে। বিষয়টি তাদের মতে প্রশস্ত।৩২৮

ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর মতে, হাত রাখা সুন্নত। রাখার স্থানটি প্রশস্ত। নাভির ওপরে বা নিচে রাখা যেতে পারে। বুকের ওপরে হাত রাখার কোনো মত তিনিও উল্লেখ করেননি। মূলত বুকে হাত বাঁধার মতটি প্রাচীন মুহাদ্দিস ও ফকিহদের মধ্যে পাওয়া যায় না। ফকিহদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বুকে হাত বাঁধার বিষয়টি প্রথম হিজরি সপ্তম শতকের হানাফি ফকিহরা গ্রহণ করেন। তাঁরা বলেন-'মহিলাদের জন্য বুকের ওপর হাত রাখা উত্তম। কারণ, এটা তাদের আবরু রক্ষার জন্য বেশি উপযোগী।'৩২৯

এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের প্রায় ৬০০ বছর পর পুরুষ ও মহিলার নামাজের পার্থক্য আবিষ্কার হয়েছে। আর তা কিছু আলিমের গবেষণামাত্র। সরাসরি হাদিস দিয়ে তা প্রমাণিত নয়।

উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে আমরা হাত রাখার তিনটি পদ্ধতির কথা জানতে পারি। যথা-
১. তালুর ওপর তালু রাখা।
২. কবজির ওপর তালু রাখা। এই দুই পদ্ধতিতে হাত রাখলে নাভির নিচে বা ওপরে রাখা যায়।
৩. বাম হাতের তালু, কবজি ও বাহুর ওপর ডান হাত রাখা। বাহু বলতে কনুই থেকে মধ্যমা আঙুলের শেষ পর্যন্ত বোঝায়। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে বুকে বা বুকের নিচে হাত রাখা যায়।

মুসল্লির এই তিন পদ্ধতির যেকোনোটি অবলম্বনের সুযোগ রয়েছে। কারণ, হাত রাখার বিষয়টি শরিয়তে প্রশস্ত। শুধু নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য শরিয়তে প্রশস্ত বিষয়কে সংকীর্ণ করার অধিকার কারও নেই। এ ছাড়া এ তিনটি পদ্ধতিই সুন্নত নির্দেশিত ও সমর্থিত। এর কোনো একটিকে গ্রহণ করে অন্যগুলো বাতিল বলা উচিত নয়; বরং সম্ভব হলে একটার ওপর অবিচল না থেকে, সময়ের ভিন্নতায় সবগুলোর ওপর আমল করা উত্তম।

টিকাঃ
৩২১. মুসনাদে আহমদ : ১৮৮৫০, কুবরা লিল বায়হাকি : ২৩২৪, ইবনে হিব্বান : ১৭৭০
৩২২. আবু দাউদ : ৭২৭
৩২৩. বুখারি : ৭৪০
৩২৪. ইবনুল কাইয়্যিম, বাদাইউল ফাওয়াইদ : ৩/৯১
৩২৫. ইমাম নববি, মাজমুউ: ৩/৩১০
৩২৬. ইবনুল মুনজির, আল আউসাত: ১২৮৭
৩২৭. নববি, শরহে মুসলিম: ৪/১১৪
৩২৮. তিরমিজি: ২৫২
৩২৯. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সালাতের মধ্যে হাত বাঁধার বিধান, (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদহ, ২০১৭), পৃষ্ঠা-৮৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px