📄 অজুর মাসনুন দুআ
হাদিস শরিফে অজুর দুআ ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন : রাসূল বলেছেন-'যে ব্যক্তি অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলেনি, তার অজু (পূর্ণাঙ্গ) হয়নি। '১৩০
অন্য হাদিসে এসেছে-'তোমাদের মধ্যে কেউ যদি উত্তমরূপে অজু করে এই দুআ পড়ে-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ -
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। "১৩১
তাহলে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। '১৩২
কোনো কোনো হাদিসে নিচের দুআটি বর্ণিত হয়েছে-
اللهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ
'হে আল্লাহ, আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। পবিত্রতা অর্জনকারীদের দলভুক্ত করুন।'১৩৩
ইমাম তাবারি বলেন, আলি (রা.) অজু শেষ করে এই দুআ পড়তেন- اللهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ
অজুতে এই দুআগুলো ছাড়া আর কোনো মাসনুন দুআ নেই। কিন্তু হাত ধোয়া, কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া, মুখ ধোয়া, মাথা মাসেহ করা, পা ধোয়া ইত্যাদির আলাদা আলাদা দুআ আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। অথচ এসব দুআর প্রত্যেকটিই বানোয়াট। এগুলোর কোনোটিই রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের থেকে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি, ইমাম নববি (মৃ. ৬৭৬ হি.) ও আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) এই দুআগুলোকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেছেন। ১৩৪
কেউ বলতে পারেন, এই দুআগুলো হাদিসে না থাকলে সমস্যা কী? দুআ তো দুআই। তা যেকোনো সময়, যেকোনো শব্দে করা যেতে পারে। এটা নাজায়েজ হওয়ার কী আছে।
কথাটি বাহ্যত সত্য। অর্থবহ যেকোনো শব্দ ও বাক্য দ্বারা যেকোনো সময় দুআ করা যায়, করা যায় অজুর সময়ও। এটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু সুন্নত মনে করে এসব দুআ পড়া, এসবের বিশেষ ফজিলত আছে বলে বিশ্বাস করা, রাসূল ﷺ ও সাহাবিরা এই আমল করেছেন বলে আমরাও করছি-এমন ধারণা করা নিতান্তই দূষণীয়, নাজায়েজ। কারণ, এর দ্বারা এমন আমলকে নবিজির সাথে সম্পৃক্ত করা হয়-যা তিনি আদৌ করেননি। এমনকী ক্ষেত্রবিশেষ এর দ্বারা সুন্নতকেও অবজ্ঞা করা হয়।
নিজ থেকে কোনো কিছু সুন্নতের মধ্যে বৃদ্ধি করার অর্থ হচ্ছে-রাসূল ﷺ যতটুকু শিখিয়েছেন, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি যতটুকু করেছেন, তা করা উত্তম। আমরা যদি আরেকটু বেশি করি, তাহলে তা অতি উত্তম। এ রকম চিন্তা করা খুবই অন্যায়। সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, সুন্নতের ভেতরেই রয়েছে প্রকৃত নিরাপত্তা। সুন্নতের বাইরে গেলেই বিদআত সৃষ্টি হয়।
একদিন সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব (রহ.) দেখলেন, এক ব্যক্তি ফজরের সুন্নতের পর আরও নফল পড়ছে। তিনি তাকে সুন্নতের অতিরিক্ত নফল পড়তে নিষেধ করলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তাকে আসরের পর নফল পড়তে দেখে নিষেধ করলেন। ১৩৫
এতে লোকটি তাকে বলল—'আল্লাহ কি নামাজ পড়ার জন্য আমাকে শাস্তি দেবেন?' তিনি বললেন—'না, তবে রাসূলের সুন্নত পরিপন্থি কাজের কারণে শাস্তি দেবেন।' ১৩৬
একবার আলি (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে ঈদগাহে ঈদের নামাজের পূর্বে নফল পড়তে দেখলেন। তিনি তাকে তা পড়তে নিষেধ করলেন। লোকটি বলল—'আল্লাহ কি নামাজ পড়ার জন্য আমাকে শাস্তি দেবেন?' তিনি বললেন—হ্যাঁ, রাসূলের সুন্নত পরিপন্থি কাজ করার কারণে তোমাকে শাস্তি দেবেন। ১৩৭
এ থেকে বোঝা যায়, সুন্নতের ভেতরে থাকা কতটা প্রয়োজনীয়। আর সুন্নতের বাইরে যাওয়া কতটা নিন্দনীয়।
টিকাঃ
১৩০. তিরমিজি: ২৫; আবু দাউদ: ১০১; ইবনে মাজাহ : ৩৯৭
১৩১. উচ্চারণ : আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু ও আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূলুহু।
১৩২. মুসলিম: ১/২১০ : ২৩৪, আবু দাউদ: ১৬৯
১৩৩. তিরমিজি: ৫৫। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
১৩৪. ফতওয়ায়ে ডক্তর হিসাম: ৫/৫; ফতওয়ায়ে ইয়াস আলুনাকা: ৭/১১
১৩৫. সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্য উঠা পর্যন্ত ফজরের সুন্নত দুই রাকাত নামাজ ছাড়া অন্য কোনো নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। অনুরূপ আসরের ফরজ আদায়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নফল নামাজ পড়া মাকরুহ।
১৩৬. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৪৭৫৫, দারেমি: ৪৫০
১৩৭. কাশ্মিরী, আরফুশ-শাজি: ৫৩৭