📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 সম্মিলিত মোনাজাত

📄 সম্মিলিত মোনাজাত


দুআ-মোনাজাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যেকোনো ভাষায়, যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর নিকট দুআ-মোনাজাত করা যায়। হাদিসে এর অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস নিয়ে উল্লেখ করা হলো।
নুমান ইবনে বাশির বলেন, নবি বলেছেন- 'দুআ বা প্রার্থনা হলো ইবাদত।'১২২
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল বলেছেন-'আল্লাহর কাছে দুআর চেয়ে সম্মানিত বস্তু আর কিছু নেই।'১২৩
সাওবান বলেন, রাসূল বলেছেন- 'দুআ ছাড়া আর কিছুই তাকদির বদলাতে পারে না। '১২৪
সালমান ফারসি (রা.) বলেন, রাসূল বলেছেন-'নিশ্চয়ই আল্লাহ লাজুক ও দয়াবান। কোনো মানুষ তাঁর কাছে হাত উঠালে তিনি তা খালি অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন। '১২৫
মালেক ইবনে ইয়াসার (রা.) বলেন, রাসূল বলেছেন-'তোমরা যখন আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন হাতের পেট দিয়ে চাইবে, পিঠ দিয়ে চাইবে না।'১২৬
রাসূল নিজেও বিভিন্ন সময়ে হাত উঠিয়ে দুআ করেছেন। ১২৭
হাবিব ইবনে মাসলামা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-'কিছু মানুষ একত্র হয়ে তাদের কেউ যদি দুআ করে, আর অন্যরা আমিন বলে, তাহলে আল্লাহ তাদের দুআ কবুল করেন। '১২৮
আবু উমামা বলেন, রাসূল -কে প্রশ্ন করা হলো- 'কোন দুআ সবচেয়ে বেশি কবুল হয়?' তিনি বললেন- 'রাতের শেষ অংশের দুআ এবং ফরজ নামাজের শেষের দুআ। ১২৯
প্রায় অর্ধশত সাহাবি থেকে মোনাজাতবিষয়ক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এই সব হাদিসে দুআর ফজিলত, হাত তুলে মোনাজাত, সম্মিলিত মোনাজাত ও সালাতের পরের মোনাজাত সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। দুআ-মোনাজাত সুন্নত। এটি একটি নেক আমল।
রাসূল -এর মোনাজাতের বাক্যাবলি, ঠোঁট নাড়ানোর অবস্থা, বসার অবস্থা, জোরে বা আস্তে বলা সবকিছুই হাদিসে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু ফরজ নামাজের পর রাসূল সম্মিলিত মোনাজাত করেছেন-এমন একটি বর্ণনাও হাদিসে পাওয়া যায় না। হাদিসের বর্ণনাগুলো থেকে জানা যায়, তিনি সর্বদা একা একা মোনাজাত করেছেন। সালাম ফেরানোর পর কখনো সাহাবিদের নিয়ে সম্মিলিত মোনাজাত করেননি।
নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত চালু হয়েছে কয়েকশো বছর আগে। রাসূলুল্লাহ ও সাহাবিদের যুগে এইরূপ মোনাজাতের প্রচলন ছিল না। এই জন্য অনেকে এটাকে বিদআত বলেন。
এ বিষয়টি নিয়েও আহলে হাদিস ও হানাফিরা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। কেউ ঢালাওভাবে সম্মিলিত মোনাজাতকে বিদআত বলে এর বিরোধিতা করছেন। আবার কেউ এটাকে ওয়াজিব মনে করে আঁকড়ে ধরে আছেন। মধ্যমপন্থা কারও মধ্যে নেই।
'আল্লাহর রাসূল যে কাজ করেননি, তা-ই বিদআত।' এটি একটি ভুল ধারণা। তিনি যা করেননি, তা সুন্নত পরিপন্থি; কিন্তু সুন্নত পরিপন্থি হলেই কোনো জিনিস বিদআত হয়ে যায় না; বরং অন্য দলিলের ভিত্তিতে তা জায়েজও হতে পারে। 'মুতাওয়াতির' পর্যায়ের হাদিস দ্বারা যে আমলের ভিত্তি প্রমাণিত, তা কী করে বিদআত হতে পারে?
আবার আমরা যারা সম্মিলিত মোনাজাত করি, তাদের জানা জরুরি-যে সময় ও যে স্থানগুলোতে রাসূল দুআ-মোনাজাতে হাত উঠিয়েছেন বলে প্রমাণিত, সেখানে হাত ওঠানো সুন্নত। যেমন: আরাফার মাঠে, ইসতিসকার দুআয়, যুদ্ধের শুরুতে, বিশেষ আবেগের মুহূর্তে ইত্যাদি। আর যে সময় ও স্থানে তিনি হাত উঠাননি বলে প্রমাণিত, সেখানে হাত না ওঠানোই সুন্নত। যেমন : ইস্তিঞ্জার আগে ও পরে, কাপড় পরিধান ও খোলার সময়, অজুর পরে, মসজিদে গমনের পথে, মসজিদে প্রবেশের সময়, মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়, আজানের পরে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে, নতুন চাঁদ দেখার সময়, ইফতারের সময় ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে হাত না উঠিয়ে দুআ করাই সুন্নত।
সালাত ফরজ হয়েছে মক্কায়। শুধু মাদানি জীবনের ১০ বছর হিসাব করলেও রাসূল প্রায় ১৮,০০০ ওয়াক্তের বেশি ফরজ সালাত আদায় করেছেন। তন্মধ্যে এক ওয়াক্ত সালাতেও তিনি মুসল্লিদের নিয়ে সম্মিলিত মোনাজাত করেননি। ইসলামের প্রথম চার খলিফা : আবু বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.) ও আলি (রা.)-এর শাসনামল ছিল প্রায় ৪০ বছর। এই ৪০ বছরে তাদের কেউ একবারের জন্যও নামাজ শেষে মুসল্লিদের নিয়ে সম্মিলিত মোনাজাত করেননি। তাঁরা সর্বদা একা একা দুআ করেছেন। তাই একা একা দুআ করাই সুন্নত।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ইসলামের প্রথম ৫০ বছরে রাসূল ও তাঁর চার সহচর যে আমলটি একবারও করেননি, আমরা প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর প্রতিনিয়ত সেই আমলটি করছি। আবার তা করা সুন্নত নয়; বরং জরুরি মনে করছি।
যে কাজ রাসূল করেননি, করতে নিষেধও করেননি-তা করা জায়েজ হতে পারে; কিন্তু তা কখনোই সুন্নত বা সুন্নতের চেয়ে উত্তম হতে পারে না। সে কাজকে রীতিতে পরিণত করা যায় না। তিনি যে কর্ম যেভাবে যতটুকু করেছেন, আমাদের জন্য সেভাবে ততটুকু করাই সুন্নত। তিনি যে কাজ যেভাবে যতটুকু বর্জন করেছেন, সে কাজ সেভাবে ততটুকু বর্জন করাই সুন্নত। কর্মে, বর্জনে, পদ্ধতিতে বা প্রকৃতিতে তাঁর রীতির বাইরে যাওয়া সুন্নত পরিপন্থি। সুন্নত পরিপন্থি কোনো কাজকে দ্বীনের অংশ মনে করা, সওয়াবের কাজ মনে করা, রীতিতে পরিণত করা বিদআত।
রাসূল জীবনে যা এক দিনও করেননি, তা যদি গুরুত্বের সাথে নিয়মিত পালন করা হয়, কেউ না করলে তাকে তিরস্কার করা হয়, এটাকে দ্বীনের অংশ মনে করে রীতিতে পরিণত করা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা বিদআতে পরিণত হবে।
আমাদের সমাজে 'সম্মিলিত মোনাজাত'-কে মূলত গুরুত্বপূর্ণ আমল মনে করা হয়, মনে করা হয়-এটা হানাফি মাজহাবের আমল। অথচ ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর ছাত্ররা ফরজ নামাজের পর কখনো সম্মিলিত মোনাজাত করেননি। এ রকম কোনো রীতিও চালু করেননি।
তবে সম্মিলিত মোনাজাতকে যদি গুরুত্বহীন মনে করে মাঝেমধ্যে তা করা হয়, মাঝেমধ্যে ইচ্ছাকৃত ত্যাগ করা হয়, কেউ না করলে তাকে তিরস্কার না করা হয়, তাহলে আশা করি তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে না।

টিকাঃ
১২২. তিরমিজি: ২৯৬৯, আবু দাউদ: ১৪৭৯, ইবনে মাজাহ : ৩৮২৮
১২৩. তিরমিজি: ৩৩৭০, ইবনে মাজাহ : ৩৮২৯
১২৪. তিরমিজি: ২১৩৯, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ: ২৯৮৬৭, মিশকাতুল মাসাবিহ: ৪৯২৫
১২৫. তিরমিজি: ৩৫৫৬
১২৬. আবু দাউদ: ১৪৮৬, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ: ২৯৪০৫, মিশকাতুল মাসাবিহ: ২২৪২, সিলসিলাতুস-সাহিহা : ৫৯৫
১২৭. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৩২৪৮, মুসনদে আহমদ: ১৩১৮৭
১২৮. তাবারানি, আল মুজামুল কাবির : ৩৫৩৬; আল মুসতাদরাক, ৫৪৭৮; শাইখ আলবানি হাদিসটিকে জইফ বলেছেন-সিলসিলাতুজ-জইফা: ৫৯৬৮; জইফ তারগিব ও তারহিব: ২৭২
১২৯. তিরমিজি : ৩৪৯৯; নাসায়ি, কুবরা : ৯৮৫৬; মিশকাতুল মাসাবিহ : ৯৬৮; হাদিসটি হাসান।

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 অজুর মাসনুন দুআ

📄 অজুর মাসনুন দুআ


হাদিস শরিফে অজুর দুআ ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন : রাসূল বলেছেন-'যে ব্যক্তি অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলেনি, তার অজু (পূর্ণাঙ্গ) হয়নি। '১৩০
অন্য হাদিসে এসেছে-'তোমাদের মধ্যে কেউ যদি উত্তমরূপে অজু করে এই দুআ পড়ে-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ -
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। "১৩১
তাহলে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। '১৩২
কোনো কোনো হাদিসে নিচের দুআটি বর্ণিত হয়েছে-
اللهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ
'হে আল্লাহ, আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। পবিত্রতা অর্জনকারীদের দলভুক্ত করুন।'১৩৩
ইমাম তাবারি বলেন, আলি (রা.) অজু শেষ করে এই দুআ পড়তেন- اللهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ، وَاجْعَلْنِي مِنَ المُتَطَهِّرِينَ
অজুতে এই দুআগুলো ছাড়া আর কোনো মাসনুন দুআ নেই। কিন্তু হাত ধোয়া, কুলি করা, নাকে পানি দেওয়া, মুখ ধোয়া, মাথা মাসেহ করা, পা ধোয়া ইত্যাদির আলাদা আলাদা দুআ আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। অথচ এসব দুআর প্রত্যেকটিই বানোয়াট। এগুলোর কোনোটিই রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের থেকে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি, ইমাম নববি (মৃ. ৬৭৬ হি.) ও আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) এই দুআগুলোকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেছেন। ১৩৪
কেউ বলতে পারেন, এই দুআগুলো হাদিসে না থাকলে সমস্যা কী? দুআ তো দুআই। তা যেকোনো সময়, যেকোনো শব্দে করা যেতে পারে। এটা নাজায়েজ হওয়ার কী আছে।
কথাটি বাহ্যত সত্য। অর্থবহ যেকোনো শব্দ ও বাক্য দ্বারা যেকোনো সময় দুআ করা যায়, করা যায় অজুর সময়ও। এটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু সুন্নত মনে করে এসব দুআ পড়া, এসবের বিশেষ ফজিলত আছে বলে বিশ্বাস করা, রাসূল ﷺ ও সাহাবিরা এই আমল করেছেন বলে আমরাও করছি-এমন ধারণা করা নিতান্তই দূষণীয়, নাজায়েজ। কারণ, এর দ্বারা এমন আমলকে নবিজির সাথে সম্পৃক্ত করা হয়-যা তিনি আদৌ করেননি। এমনকী ক্ষেত্রবিশেষ এর দ্বারা সুন্নতকেও অবজ্ঞা করা হয়।
নিজ থেকে কোনো কিছু সুন্নতের মধ্যে বৃদ্ধি করার অর্থ হচ্ছে-রাসূল ﷺ যতটুকু শিখিয়েছেন, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি যতটুকু করেছেন, তা করা উত্তম। আমরা যদি আরেকটু বেশি করি, তাহলে তা অতি উত্তম। এ রকম চিন্তা করা খুবই অন্যায়। সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, সুন্নতের ভেতরেই রয়েছে প্রকৃত নিরাপত্তা। সুন্নতের বাইরে গেলেই বিদআত সৃষ্টি হয়।
একদিন সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব (রহ.) দেখলেন, এক ব্যক্তি ফজরের সুন্নতের পর আরও নফল পড়ছে। তিনি তাকে সুন্নতের অতিরিক্ত নফল পড়তে নিষেধ করলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তাকে আসরের পর নফল পড়তে দেখে নিষেধ করলেন। ১৩৫
এতে লোকটি তাকে বলল—'আল্লাহ কি নামাজ পড়ার জন্য আমাকে শাস্তি দেবেন?' তিনি বললেন—'না, তবে রাসূলের সুন্নত পরিপন্থি কাজের কারণে শাস্তি দেবেন।' ১৩৬
একবার আলি (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে ঈদগাহে ঈদের নামাজের পূর্বে নফল পড়তে দেখলেন। তিনি তাকে তা পড়তে নিষেধ করলেন। লোকটি বলল—'আল্লাহ কি নামাজ পড়ার জন্য আমাকে শাস্তি দেবেন?' তিনি বললেন—হ্যাঁ, রাসূলের সুন্নত পরিপন্থি কাজ করার কারণে তোমাকে শাস্তি দেবেন। ১৩৭
এ থেকে বোঝা যায়, সুন্নতের ভেতরে থাকা কতটা প্রয়োজনীয়। আর সুন্নতের বাইরে যাওয়া কতটা নিন্দনীয়।

টিকাঃ
১৩০. তিরমিজি: ২৫; আবু দাউদ: ১০১; ইবনে মাজাহ : ৩৯৭
১৩১. উচ্চারণ : আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু ও আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূলুহু।
১৩২. মুসলিম: ১/২১০ : ২৩৪, আবু দাউদ: ১৬৯
১৩৩. তিরমিজি: ৫৫। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
১৩৪. ফতওয়ায়ে ডক্তর হিসাম: ৫/৫; ফতওয়ায়ে ইয়াস আলুনাকা: ৭/১১
১৩৫. সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্য উঠা পর্যন্ত ফজরের সুন্নত দুই রাকাত নামাজ ছাড়া অন্য কোনো নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। অনুরূপ আসরের ফরজ আদায়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নফল নামাজ পড়া মাকরুহ।
১৩৬. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৪৭৫৫, দারেমি: ৪৫০
১৩৭. কাশ্মিরী, আরফুশ-শাজি: ৫৩৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px