📄 আল্লাহর সাথে থাকার ব্যাখ্যা
যারা বিশ্বাস করেন 'আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান,' তাদের সবচেয়ে বড়ো দলিল হচ্ছে-কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ সাথে থাকা সংবলিত আয়াতগুলো। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যারা তাঁকে ভয় করে এবং যারা সৎকর্মশীল, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।' সূরা নাহল: ১২৮ 'তুমি ভয় পেয়ো না, আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন।' সূরা তাওবা : ৪১ 'নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে রয়েছি, শুনি এবং দেখি।' সূরা ত্ব-হা: ৪৬
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنتُمْ -
'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, আল্লাহ তোমাদের সাথে রয়েছেন।' সূরা হাদিদ : ৪
কুরআনে যেহেতু আল্লাহ বান্দার সাথে থাকেন বলে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, তাই আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান।
তাদের এই ব্যাখ্যা আদৌ সঠিক নয়; বরং সম্পূর্ণ ভুল ও ভ্রান্তিতে ভরা। কারণ, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হচ্ছে-আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরত, জ্ঞান, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দ্বারা সৃষ্টির সাথে রয়েছেন; সত্তাগতভাবে সাথে নেই। আল্লাহ নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মুসা ও হারুন (আ.)- কে বললেন-
لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا اسْمَعُ وَأَرَى -
'ভয় পেয়ো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে রয়েছি, শুনি এবং দেখি।' সূরা ত্বহা : ৪৬
আল্লাহ যদি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান হতেন, তাহলে 'আমি তোমাদের সাথে রয়েছি' বলার পর 'আমি শুনি এবং দেখি' বলার প্রয়োজন ছিল না। এ কথা তখন বলাই উপযুক্ত, যখন কেউ বোঝাতে চায়—আমি দূরে থেকেও শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দিয়ে তোমার সাথে রয়েছি। তোমার সব কার্যকলাপ আমি দেখছি। তোমার কোনো কিছুই আমার জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই মনে করিও, আমি তোমার সাথেই রয়েছি।
সূরা হাদিদে 'তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন' বলার পরেই বলা হয়েছে—'তোমরা যা কিছু করো না কেন, আল্লাহ তা দেখছেন।' সূরা হাদিদ : ৪
সূরা মুজাদালায় 'তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে রয়েছেন' উল্লেখ করার পরই বলা হয়েছে—'আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।' সূরা মুজাদালাহ : ৭
আল কুরআনের যত জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বান্দার সাথে থাকার কথা বলেছেন, তার প্রায় সব জায়গাতেই একটু পর এমন শব্দ উল্লেখ করেছেন, যা তাঁর শক্তি প্রকাশক। আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে বান্দার সাথে থাকলে জবরদস্ত শক্তি প্রকাশ পায়—এমন শব্দ ব্যবহার নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়ত।
অতএব, কুরআন থেকেই স্পষ্ট প্রমাণিত, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে বান্দার সাথে নন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন; বরং জ্ঞান ও শক্তির দ্বারা তিনি বান্দার সাথে রয়েছেন। এখন এই ব্যাপারে আমরা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ইমামদের বক্তব্য দেখব, ইনশাআল্লাহ!
জনৈক মহিলা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন—'আপনার মাবুদ কোথায়, আপনি যাঁর ইবাদত করেন?' তিনি বললেন—'আসমানে রয়েছেন; জমিনে নন।' এ কথা শুনে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল—'আপনি কি আল্লাহর বাণী هُوَ مَعَكُمْ "তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন" আয়াতটি দেখেননি?
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) উত্তর দিলেন—
هُوَ كَمَا تَكْتُبُ إِلَى الرَّجُلِ : إِنِّي مَعَكَ وَأَنْتَ غَائِبٌ عَنْهُ 'তুমি যখন দূরে থেকে কারও কাছে চিঠি লিখে বলো, আমি তোমার সাথে রয়েছি।' (আল্লাহ তায়ালা সাথে রয়েছেন অর্থবোধক আয়াতটির বক্তব্যও অনুরূপ।) ১০৬
ইমাম বায়হাকি (মৃ. ৪৫৮ হি.) (রহ.) বলেন- إِنَّمَا أَرَادَ بِهِ بِعِلْمِهِ لَا بِذَا تِهِ 'তোমাদের সাথে থাকার দ্বারা তিনি নিজের জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন; সত্তাকে বোঝাননি। '১০৭
ইমাম আবু আমর তালমনকি (রহ.) বলেন-'আহলে সুন্নতের আলিমগণ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ আয়াতের ব্যাখ্যায় একমত হন-এর দ্বারা ইলম বা জ্ঞান বোঝানো হয়েছে। সত্তাগতভাবে আল্লাহর সাথে থাকা বোঝানো হয়নি। আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আকাশমণ্ডলীর ওপরে আরশে সমাসীন রয়েছেন। '১০৮
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলে- هُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ আয়াত দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান উদ্দেশ্য। '১০৯
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبَلِ الْوَرِيدِ - 'আমি তার শাহরগের চেয়েও নিকটে আছি।'
ইমাম বায়হাকি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন- وَإِنَّمَا أَرَادَ بِالْعِلْمِ وَالْقُدْرَةِ لَا قُرْبَ الْبُقْعَةِ 'এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা জ্ঞান ও শক্তি উদ্দেশ্য করেছেন। স্থানের নিকটবর্তী হওয়া উদ্দেশ্য করেননি। '১১০
আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (মৃ. ১৩৫৩ হি.) (রহ.) বলেন- 'ইলম দ্বারা আমি বান্দার শাহরগের চেয়েও নিকটে আছি। '১১১
তাফসিরে জালালাইন-এ বলা হয়েছে-'জ্ঞানের দ্বারা আমি তার শাহরগের চেয়েও নিকটে রয়েছি। '১১২ এবং 'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, জ্ঞানের দ্বারা তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন। '১১৩
আল্লামা ইবনে কাসির (মৃ. ৭৭৪ হি.) (রহ.) সূরা মুজাদালার ৭ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন-এই আয়াত দ্বারা জ্ঞানগত দিক থেকে আল্লাহর সাথে থাকা উদ্দেশ্য। এটিই উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত। এটি উদ্দেশ্য হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। ১১৪
هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا -
'তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।' এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদি বলেন-'বান্দার সঙ্গে আল্লাহর অবস্থান দ্বারা মূলত তাঁর সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়াকেই বোঝায়। '১১৫
মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহদের সবাই আল্লাহ সাথে থাকা, নিকটে থাকা, উপস্থিত থাকা ইত্যাদি আয়াত দ্বারা তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণশক্তি ইত্যাদিকে বুঝিয়েছেন। এই সব আয়াত দ্বারা 'আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান' কেউ বোঝেননি, বোঝাননি।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ (রহ.) প্রথম তিন/চার যুগের মুহাদ্দিস, ফকিহ ও বুজুর্গগণ কুরআন-হাদিসে উল্লিখিত আল্লাহর সকল বিশেষণের সরল অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা তার কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি।
কুরআন-হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা আরশের ওপর সমাসীন। তাঁরা আল্লাহর এই অবস্থানকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া সত্তাগতভাবে আরশে থাকা বুঝিয়েছেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সকল ইমাম ঐক্যবদ্ধভাবে মহান আল্লাহর বিশেষণগুলোকে বাহ্যিক অর্থে বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পূর্ববর্তী আলিমদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমানের কিছু আলিম বলে থাকেন-'আল্লাহ তায়ালা গুণগতভাবে যেমন আকাশে রয়েছেন, তেমনই জমিনেও রয়েছেন। আর সত্তাগতভাবে আল্লাহ আরশেও নেই, আকাশেও নেই, জমিনেও নেই, পাতালেও নেই।'১১৬
এই ধরনের বক্তব্য শুধু আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদাবিরাধী কথা নয়; বরং তা কুফরি আকিদাও বটে। এই রকম কথা দ্বারা পরোক্ষভাবে আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়।
টিকাঃ
১০৬. আল আসমা ওয়াস-সিফাত লিল বায়হাকি, (২/৩৩৭), উসুলুদ-দ্বীন ইনদাল ইমাম আবি হানিফা : (১/৩০৭)
১০৭. ইমাম বায়হাকি, আল ইতিকাদ, পৃষ্ঠা-১১৪; মাজমাউল ফাতাওয়া: ৫/১৯৫
১০৮. মাজমুউল ফাতাওয়া : ৩/২১৯
১০৯. প্রাগুক্ত: ৪/১৮১
১১০. আল আসমা ওয়াস-সিফাত লিল বায়হাকি: ২/৩৫৩
১১১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৯/৩০২
১১২. তাফসিরে জালালাইন: পৃষ্ঠা-৬৯০
১১৩. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৭১৯
১১৪. তাফসিরে ইবনে কাসির: ৮/৪২
১১৫. তাফহিমুল কুরআন, সূরা মুজাদালাহ : ৭
১১৬. বক্তব্য লিংক, www.youtube.com IslamicSalafi Manhaj আপলোড তারিখ: ৪/৪/২০১৬