📄 উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে আল্লাহর অবস্থান
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন- اللهُ تَعَالَى فَوْقَ الْعَرْشِ، وَلَا يَخْفَى عَلَيْهِ مِنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْءٌ - 'আল্লাহ তায়ালা আরশের ওপর রয়েছেন, কিন্তু তোমাদের কোনো আমলই তাঁর কাছে গোপন নয়। '৯০
ইমাম আবু আমর তালমনকি (রহ.) বলেন- إِنَّ أَهْلَ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ مُتَّفِقُونَ عَلَى أَنَّ اللَّهَ اسْتَوَى بِذَا تِهِ عَلَى عَرْشِهِ 'আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ঐকমত্যে, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আরশের ওপর সমাসীন।'৯১
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)ও এই মত ব্যক্ত করেছেন।৯২
হানাফি বিদ্বান ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (মৃ. ১৮১ হি.) (রহ.) বলেন- نَعْرِفُ رَبَّنَا فَوْقَ سَبْعِ سَمَوَاتِهِ عَلَى الْعَرْشِ 'আমরা জানি আমাদের রব সাত আকাশের ওপর আরশে রয়েছেন।'৯৩
ইমাম তিরমিজি (মৃ. ২৭৯ হি.) (রহ.) বলেন-'তিনি আরশের ওপর ঠিক সেভাবে রয়েছেন, যেভাবে নিজ কিতাব আল কুরআনে বর্ণনা করেছেন। তাঁর জ্ঞান, শক্তি ও শাসন সর্বত্র রয়েছে।'৯৪
ইমাম আবু জারআ আল রাজি (রহ.) বলেন-'তিনি আরশের ওপর রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান সর্বত্র।'৯৫
শাইখ মুহাম্মাদ বিন আবু জায়িদও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।৯৬
এই আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আরশের ওপরে রয়েছেন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন; তবে তাঁর জ্ঞান গোটা বিশ্ব জগতকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।
টিকাঃ
৯০. আত-তাওহিদ লিইবনু খুজাইমাহ : ২/৮৮৫; আল আসমা ওয়াস সিফাত লিল বায়হাকি : ৮৫২; ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/৫৫
৯১. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/১৮৯
৯২. প্রাগুক্ত: ৫/২৫৮
৯৩. প্রাগুক্ত: ৪/১৮১
৯৪. প্রাগুক্ত: ৫/৫০
৯৫. প্রাগুক্ত: ৫/৫০
৯৬. প্রাগুক্ত: ৪/১৮৯
📄 আল্লাহর বিশেষণসমূহের ব্যাখ্যা
যারা বলেন-আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান, তারা আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কিত আয়াত-হাদিসসমূহের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করেন। তারা বলেন-'ইসতিওয়া' বা ঊর্ধ্বে অবস্থান বিষয়টি মুতাশাবিহ বা দুর্বোধ্য। মুহকাম বা স্পষ্ট নয়। অথচ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদা হচ্ছে, আল্লাহর অবস্থান সুস্পষ্ট ও অকাট্য। কুরআন-হাদিস দ্বারা এর অকাট্যতা প্রমাণিত। তবে এর প্রকৃতি ও স্বরূপ অজ্ঞাত। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসীন এটা জ্ঞাত ও সুস্পষ্ট, কিন্তু তিনি কীভাবে আছেন, তাঁর অবস্থানের ধরন ও প্রকৃতি কী ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের বোধগম্য নয়।
হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহ তায়ালা প্রতিরাতে প্রথম আসমানে আসেন। কিন্তু তিনি কীভাবে আসেন, তা আমাদের জানা নেই; জানার প্রয়োজনও নেই। অজ্ঞাতকে অজ্ঞাত রেখে কোনোরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই তা বিশ্বাস করা মুমিনের কর্তব্য। নিম্নে এ সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আলিমদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো।
উম্মে সালামা (রা.) সূরা ত্ব-হার পাঁচ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন-
الاسْتِوَاءُ غَيْرُ مَجْهُولٍ وَالْكَيْفُ غَيْرُ مَعْقُولٍ وَالْإِقْرَارُ بِهِ إِيمَانٌ وَالْجُحُودُ بِهِ كُفْرٌ 'সমাসীন হওয়া অজ্ঞাত নয়। তবে এর ধরন আমাদের বোধগম্য নয়। এটি স্বীকার করা ঈমান। আর অস্বীকার করা কুফরি। '৯৭
আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসীন হওয়ার হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (মৃ. ৮৫৫ হি.) বলেন- 'আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে, এই হাদিস ও এর অনুরূপ অন্য হাদিসের ওপর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ঈমান আনা ওয়াজিব। এ হাদিসগুলোর বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হবে। কিন্তু কেমন, কীরকম ইত্যাদি প্রশ্ন করা যাবে না। '৯৮
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন- مَنْ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ بِذَاتِهِ فِي كُلِّ مَكَانٍ فَهُوَ مُخَالِفٌ لِلْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ؛ وَاجْمَاعِ سَلَفِ الْأُمَّةِ وَايْمَتِهَا مَعَ مُخَالَفَتِهِ لِمَا فَطَرَ اللهُ عَلَيْهِ عِبَادَهُ؛ وَلِصَرِيحِ الْمَعْقُولِ وَلِلْأَدِلَّةِ الْكَثِيرَةِ 'যে ব্যক্তি বলে আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান, তার বক্তব্য কুরআন-হাদিসবিরোধী। সালফে সালেহিনদের ইজমাবিরোধী। অসংখ্য দলিল, স্পষ্ট যুক্তি ও মানব প্রকৃতিরও বিরোধী।'৯৯
ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম বলেন- 'ইমাম আওজায়ি, ইমাম মালেক ও ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.)-কে আমি আল্লাহর বিশেষণবিষয়ক হাদিসগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন-“এগুলো যেভাবে এসেছে, সেভাবেই চালিয়ে নাও। এর কোনো স্বরূপ ও প্রকৃতি অনুসন্ধান করো না।”'১০০
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর পুত্র বলেন- 'যেসব হাদিসে “আল্লাহ প্রত্যেক রাতে দুনিয়ার আসমানে আসেন, আল্লাহকে দেখা যাবে, আল্লাহ তাঁর পদ স্থাপন করেন” ইত্যাদি বর্ণনা রয়েছে, সে হাদিসগুলো সম্পর্কে আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন- "আমরা এগুলো বিশ্বাস করি, সত্য বলে স্বীকার করি; কিন্তু তিনি কীভাবে আসেন, কীভাবে পদ স্থাপন করেন, তার স্বরূপ সন্ধান করি না।”'১০১
ইমাম আবু হানিফাকে আল্লাহর অবতরণ করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন - يَنْزِلُ بِلا كَيْف -'কোনোরূপ পদ্ধতি ও স্বরূপ ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা অবতরণ করেন। '১০২
ইমাম মালেক (রহ.) বলেন- 'ইসতিওয়া বা অধিষ্ঠান পরিজ্ঞাত। এর পদ্ধতি বা স্বরূপ অজ্ঞাত। এ বিষয়ে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। প্রশ্ন করা বিদআত। '১০৩
এই আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট, 'ইসতিওয়া' শব্দটির অর্থ অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক, মুতাশাবিহাত, রূপক বা অজ্ঞাত বলে ইমামদের কেউ দাবি করেননি; বরং তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-'এ শব্দটির অর্থ জ্ঞাত। তবে এর স্বরূপ বা ব্যাখ্যা অজ্ঞাত। তাই আরবি ভাষায় অন্যান্য ক্ষেত্রে 'ইসতিওয়া আলা' যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রেও তারা একই অর্থে ব্যবহার করেছেন।
টিকাঃ
৯৭. ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি: ১৩/৪০৬; ফাতহুল কাদির: ২/২৪২
৯৮. বদরুদ্দিন আইনি, উমদাতুল কারি: ১৮/২৯৩
৯৯. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/১২৫
১০০. ফাতহুল বারি: ১৩/৪০৭
১০১. আরশিফুল মুলতাকা: (৩৯/১১১
১০২. বায়হাকি (৪৫৮ হি.), আল আসমা ওয়াস-সিফাত: ২/৩৭৮
১০৩. তাফসিরে কুরতুবি: ১/২৫৪; তাফসিরে মাজহারি: ৫/৬
📄 ইসতিওয়া শব্দের ব্যাখ্যা
আমাদের দেশীয় হানাফিদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ আরশে সমাসীন নন। এটি প্রমাণ করতে গিয়ে তারা যুক্তি দিয়ে বলেন- 'যদি সত্তাগতভাবে আল্লাহর অবস্থান আরশের ওপরে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা আরশের মুখাপেক্ষী হয়ে যান। অথচ আল্লাহ কোনো স্থানের মুখাপেক্ষী নন।'
তাদের এ কথার জবাব হচ্ছে-আরবি 'ইসতিওয়া' শব্দটি ঊর্ধ্বে অবস্থানকে বোঝায়। কোনো জিনিসের সাথে সংযুক্তভাবে ওপরে অবস্থানকে বোঝায় না। হাদিসেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে রাসূল বললেন- حَتَّى تَسْتَوِيَ الشَّمْسُ عَلَى رَأْسِكَ كَالرُّمْحِ ، فَإِذَا اسْتَوَتْ عَلَى رَأْسِكَ كَالرُّمْحِ فَدَعِ الصَّلَاةَ -
'(সালাত বৈধ হবে) যতক্ষণ না সূর্য তোমার মাথার ওপর তিরের মতো ইসতিওয়া বা ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। আর যখন তোমার মাথার ওপরে তিরের মতো ইসতিওয়া বা ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে, তখন সালাত পরিত্যাগ করবে।' ১০৪
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। আমরা চেয়ারের ওপর ঠেস দিয়ে বসি। নিচ থেকে চেয়ার সরিয়ে নিলে আমরা নিশ্চিত পড়ে যাব। কারণ, এ অবস্থায় আমরা চেয়ারের মুখাপেক্ষী। আরশের ওপর আল্লাহর অবস্থান, চেয়ারের ওপর আমাদের অবস্থানের বিপরীত। তিনি আরশে ঠেস দিয়ে বসে নেই; বরং আরশের ঊর্ধ্বে শূন্যে অবস্থান করছেন। তাই তিনি আরশের মুখাপেক্ষী নন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন- 'যদি তাঁর আরশের ওপর উপবেশন করার প্রয়োজনীয়তা থাকত, তাহলে আরশ সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? কাজেই আল্লাহ তায়ালা এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র। '১০৫
টিকাঃ
১০৪. আস-সুনানুল কুবরা: ২/৬৩৯, ৪৩৮৭: ইবনে মাজাহ : ১/৩৯৭, ১২৫২
১০৫. বদরুদ্দিন: ৭৩৩ হি., ইজাহুদ দলিল: পৃষ্ঠা-৭৯
📄 আল্লাহর সাথে থাকার ব্যাখ্যা
যারা বিশ্বাস করেন 'আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান,' তাদের সবচেয়ে বড়ো দলিল হচ্ছে-কুরআনে বর্ণিত আল্লাহ সাথে থাকা সংবলিত আয়াতগুলো। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যারা তাঁকে ভয় করে এবং যারা সৎকর্মশীল, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।' সূরা নাহল: ১২৮ 'তুমি ভয় পেয়ো না, আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন।' সূরা তাওবা : ৪১ 'নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে রয়েছি, শুনি এবং দেখি।' সূরা ত্ব-হা: ৪৬
وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنتُمْ -
'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, আল্লাহ তোমাদের সাথে রয়েছেন।' সূরা হাদিদ : ৪
কুরআনে যেহেতু আল্লাহ বান্দার সাথে থাকেন বলে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, তাই আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান।
তাদের এই ব্যাখ্যা আদৌ সঠিক নয়; বরং সম্পূর্ণ ভুল ও ভ্রান্তিতে ভরা। কারণ, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হচ্ছে-আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরত, জ্ঞান, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দ্বারা সৃষ্টির সাথে রয়েছেন; সত্তাগতভাবে সাথে নেই। আল্লাহ নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মুসা ও হারুন (আ.)- কে বললেন-
لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا اسْمَعُ وَأَرَى -
'ভয় পেয়ো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে রয়েছি, শুনি এবং দেখি।' সূরা ত্বহা : ৪৬
আল্লাহ যদি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান হতেন, তাহলে 'আমি তোমাদের সাথে রয়েছি' বলার পর 'আমি শুনি এবং দেখি' বলার প্রয়োজন ছিল না। এ কথা তখন বলাই উপযুক্ত, যখন কেউ বোঝাতে চায়—আমি দূরে থেকেও শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দিয়ে তোমার সাথে রয়েছি। তোমার সব কার্যকলাপ আমি দেখছি। তোমার কোনো কিছুই আমার জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই মনে করিও, আমি তোমার সাথেই রয়েছি।
সূরা হাদিদে 'তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন' বলার পরেই বলা হয়েছে—'তোমরা যা কিছু করো না কেন, আল্লাহ তা দেখছেন।' সূরা হাদিদ : ৪
সূরা মুজাদালায় 'তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তিনি তাদের সাথে রয়েছেন' উল্লেখ করার পরই বলা হয়েছে—'আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।' সূরা মুজাদালাহ : ৭
আল কুরআনের যত জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বান্দার সাথে থাকার কথা বলেছেন, তার প্রায় সব জায়গাতেই একটু পর এমন শব্দ উল্লেখ করেছেন, যা তাঁর শক্তি প্রকাশক। আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে বান্দার সাথে থাকলে জবরদস্ত শক্তি প্রকাশ পায়—এমন শব্দ ব্যবহার নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়ত।
অতএব, কুরআন থেকেই স্পষ্ট প্রমাণিত, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে বান্দার সাথে নন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন; বরং জ্ঞান ও শক্তির দ্বারা তিনি বান্দার সাথে রয়েছেন। এখন এই ব্যাপারে আমরা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ইমামদের বক্তব্য দেখব, ইনশাআল্লাহ!
জনৈক মহিলা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন—'আপনার মাবুদ কোথায়, আপনি যাঁর ইবাদত করেন?' তিনি বললেন—'আসমানে রয়েছেন; জমিনে নন।' এ কথা শুনে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল—'আপনি কি আল্লাহর বাণী هُوَ مَعَكُمْ "তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন" আয়াতটি দেখেননি?
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) উত্তর দিলেন—
هُوَ كَمَا تَكْتُبُ إِلَى الرَّجُلِ : إِنِّي مَعَكَ وَأَنْتَ غَائِبٌ عَنْهُ 'তুমি যখন দূরে থেকে কারও কাছে চিঠি লিখে বলো, আমি তোমার সাথে রয়েছি।' (আল্লাহ তায়ালা সাথে রয়েছেন অর্থবোধক আয়াতটির বক্তব্যও অনুরূপ।) ১০৬
ইমাম বায়হাকি (মৃ. ৪৫৮ হি.) (রহ.) বলেন- إِنَّمَا أَرَادَ بِهِ بِعِلْمِهِ لَا بِذَا تِهِ 'তোমাদের সাথে থাকার দ্বারা তিনি নিজের জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন; সত্তাকে বোঝাননি। '১০৭
ইমাম আবু আমর তালমনকি (রহ.) বলেন-'আহলে সুন্নতের আলিমগণ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ আয়াতের ব্যাখ্যায় একমত হন-এর দ্বারা ইলম বা জ্ঞান বোঝানো হয়েছে। সত্তাগতভাবে আল্লাহর সাথে থাকা বোঝানো হয়নি। আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আকাশমণ্ডলীর ওপরে আরশে সমাসীন রয়েছেন। '১০৮
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলে- هُوَ مَعَكُمْ أَيْنَمَا كُنْتُمْ আয়াত দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান উদ্দেশ্য। '১০৯
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبَلِ الْوَرِيدِ - 'আমি তার শাহরগের চেয়েও নিকটে আছি।'
ইমাম বায়হাকি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন- وَإِنَّمَا أَرَادَ بِالْعِلْمِ وَالْقُدْرَةِ لَا قُرْبَ الْبُقْعَةِ 'এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা জ্ঞান ও শক্তি উদ্দেশ্য করেছেন। স্থানের নিকটবর্তী হওয়া উদ্দেশ্য করেননি। '১১০
আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (মৃ. ১৩৫৩ হি.) (রহ.) বলেন- 'ইলম দ্বারা আমি বান্দার শাহরগের চেয়েও নিকটে আছি। '১১১
তাফসিরে জালালাইন-এ বলা হয়েছে-'জ্ঞানের দ্বারা আমি তার শাহরগের চেয়েও নিকটে রয়েছি। '১১২ এবং 'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, জ্ঞানের দ্বারা তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন। '১১৩
আল্লামা ইবনে কাসির (মৃ. ৭৭৪ হি.) (রহ.) সূরা মুজাদালার ৭ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন-এই আয়াত দ্বারা জ্ঞানগত দিক থেকে আল্লাহর সাথে থাকা উদ্দেশ্য। এটিই উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত। এটি উদ্দেশ্য হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই। ১১৪
هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا -
'তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।' এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদি বলেন-'বান্দার সঙ্গে আল্লাহর অবস্থান দ্বারা মূলত তাঁর সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়াকেই বোঝায়। '১১৫
মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহদের সবাই আল্লাহ সাথে থাকা, নিকটে থাকা, উপস্থিত থাকা ইত্যাদি আয়াত দ্বারা তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণশক্তি ইত্যাদিকে বুঝিয়েছেন। এই সব আয়াত দ্বারা 'আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান' কেউ বোঝেননি, বোঝাননি।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ (রহ.) প্রথম তিন/চার যুগের মুহাদ্দিস, ফকিহ ও বুজুর্গগণ কুরআন-হাদিসে উল্লিখিত আল্লাহর সকল বিশেষণের সরল অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা তার কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি।
কুরআন-হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা আরশের ওপর সমাসীন। তাঁরা আল্লাহর এই অবস্থানকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া সত্তাগতভাবে আরশে থাকা বুঝিয়েছেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সকল ইমাম ঐক্যবদ্ধভাবে মহান আল্লাহর বিশেষণগুলোকে বাহ্যিক অর্থে বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পূর্ববর্তী আলিমদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমানের কিছু আলিম বলে থাকেন-'আল্লাহ তায়ালা গুণগতভাবে যেমন আকাশে রয়েছেন, তেমনই জমিনেও রয়েছেন। আর সত্তাগতভাবে আল্লাহ আরশেও নেই, আকাশেও নেই, জমিনেও নেই, পাতালেও নেই।'১১৬
এই ধরনের বক্তব্য শুধু আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদাবিরাধী কথা নয়; বরং তা কুফরি আকিদাও বটে। এই রকম কথা দ্বারা পরোক্ষভাবে আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়।
টিকাঃ
১০৬. আল আসমা ওয়াস-সিফাত লিল বায়হাকি, (২/৩৩৭), উসুলুদ-দ্বীন ইনদাল ইমাম আবি হানিফা : (১/৩০৭)
১০৭. ইমাম বায়হাকি, আল ইতিকাদ, পৃষ্ঠা-১১৪; মাজমাউল ফাতাওয়া: ৫/১৯৫
১০৮. মাজমুউল ফাতাওয়া : ৩/২১৯
১০৯. প্রাগুক্ত: ৪/১৮১
১১০. আল আসমা ওয়াস-সিফাত লিল বায়হাকি: ২/৩৫৩
১১১. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৯/৩০২
১১২. তাফসিরে জালালাইন: পৃষ্ঠা-৬৯০
১১৩. প্রাগুক্ত: পৃষ্ঠা-৭১৯
১১৪. তাফসিরে ইবনে কাসির: ৮/৪২
১১৫. তাফহিমুল কুরআন, সূরা মুজাদালাহ : ৭
১১৬. বক্তব্য লিংক, www.youtube.com IslamicSalafi Manhaj আপলোড তারিখ: ৪/৪/২০১৬