📄 চার ইমামের মতে আল্লাহর অবস্থান
ইমাম আবু হানিফা (মৃ. ১৫০ হি.) আল ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন-
نقر بِأَن الله تَعَالَى عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى من غير أن يكون لَهُ حَاجَة واستقرار عَلَيْهِ -
'আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ তায়ালা আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন এ অবস্থায় যে, আরশের প্রতি তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই এবং এর ওপর স্থির থাকারও কোনো প্রয়োজন নেই। '৮৪
তিনি আরও বলেন-
ان الله في السماء دون الأرض
'আল্লাহ তায়ালা আসমানে রয়েছেন, জমিনে নয়। ৮৫
ইমাম মালেক (রহ.) বলেন- اللهُ فِي السَّمَاءِ وَعِلْمُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ ؛ لَا يَخْلُو مِنْ عِلْمِهِ مَكَانٌ - 'আল্লাহ তায়ালা আসমানে রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। কোনো স্থানই তাঁর জ্ঞানশূন্য নয়। '৮৬
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন- إِنَّهُ عَلَى عَرْشِهِ فِي سَمَائِهِ يَقْرُبُ مِنْ خَلْقِهِ كَيْفَ شَاءَ - 'আল্লাহ তায়ালা তাঁর আরশে রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি যেভাবে ইচ্ছা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হন। '৮৭
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন- نحن نؤمن بأن الله على العرش كيف شاء - 'আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ তায়ালা নিজ ইচ্ছানুযায়ী আরশের ওপর রয়েছেন। '৮৮
তিনি আরও বলেন- إِنَّهُ مُسْتَوِ عَلَى الْعَرْشِ عَالِمٌ بِكُلِّ مَكَانٍ - 'আল্লাহ আরশের ওপর রয়েছেন আর তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। '৮৯
টিকাঃ
৮৪. বদরুদ্দিন (৭৩৩হি.), ইজাহদ দলিল, পৃষ্ঠা-৭৯
৮৫. সানাউল্লাহ, তাফসিরে মাজহারি: ৫/৬
৮৬. ইবনে তাইমিয়াহ, মাজমুউল ফাতওয়া: ৫/৫৩, ১৩৯
৮৭. প্রাগুক্ত: ৪/১৮১
৮৮. মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান, ইতিকাদুল আইম্যাতুল আরবাআ, পৃষ্ঠা-৬৫
৮৯. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/১৮১
📄 উলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে আল্লাহর অবস্থান
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন- اللهُ تَعَالَى فَوْقَ الْعَرْشِ، وَلَا يَخْفَى عَلَيْهِ مِنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْءٌ - 'আল্লাহ তায়ালা আরশের ওপর রয়েছেন, কিন্তু তোমাদের কোনো আমলই তাঁর কাছে গোপন নয়। '৯০
ইমাম আবু আমর তালমনকি (রহ.) বলেন- إِنَّ أَهْلَ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ مُتَّفِقُونَ عَلَى أَنَّ اللَّهَ اسْتَوَى بِذَا تِهِ عَلَى عَرْشِهِ 'আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ঐকমত্যে, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আরশের ওপর সমাসীন।'৯১
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)ও এই মত ব্যক্ত করেছেন।৯২
হানাফি বিদ্বান ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (মৃ. ১৮১ হি.) (রহ.) বলেন- نَعْرِفُ رَبَّنَا فَوْقَ سَبْعِ سَمَوَاتِهِ عَلَى الْعَرْشِ 'আমরা জানি আমাদের রব সাত আকাশের ওপর আরশে রয়েছেন।'৯৩
ইমাম তিরমিজি (মৃ. ২৭৯ হি.) (রহ.) বলেন-'তিনি আরশের ওপর ঠিক সেভাবে রয়েছেন, যেভাবে নিজ কিতাব আল কুরআনে বর্ণনা করেছেন। তাঁর জ্ঞান, শক্তি ও শাসন সর্বত্র রয়েছে।'৯৪
ইমাম আবু জারআ আল রাজি (রহ.) বলেন-'তিনি আরশের ওপর রয়েছেন। তাঁর জ্ঞান সর্বত্র।'৯৫
শাইখ মুহাম্মাদ বিন আবু জায়িদও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।৯৬
এই আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে আরশের ওপরে রয়েছেন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান নন; তবে তাঁর জ্ঞান গোটা বিশ্ব জগতকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।
টিকাঃ
৯০. আত-তাওহিদ লিইবনু খুজাইমাহ : ২/৮৮৫; আল আসমা ওয়াস সিফাত লিল বায়হাকি : ৮৫২; ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/৫৫
৯১. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/১৮৯
৯২. প্রাগুক্ত: ৫/২৫৮
৯৩. প্রাগুক্ত: ৪/১৮১
৯৪. প্রাগুক্ত: ৫/৫০
৯৫. প্রাগুক্ত: ৫/৫০
৯৬. প্রাগুক্ত: ৪/১৮৯
📄 আল্লাহর বিশেষণসমূহের ব্যাখ্যা
যারা বলেন-আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান, তারা আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কিত আয়াত-হাদিসসমূহের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করেন। তারা বলেন-'ইসতিওয়া' বা ঊর্ধ্বে অবস্থান বিষয়টি মুতাশাবিহ বা দুর্বোধ্য। মুহকাম বা স্পষ্ট নয়। অথচ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদা হচ্ছে, আল্লাহর অবস্থান সুস্পষ্ট ও অকাট্য। কুরআন-হাদিস দ্বারা এর অকাট্যতা প্রমাণিত। তবে এর প্রকৃতি ও স্বরূপ অজ্ঞাত। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসীন এটা জ্ঞাত ও সুস্পষ্ট, কিন্তু তিনি কীভাবে আছেন, তাঁর অবস্থানের ধরন ও প্রকৃতি কী ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের বোধগম্য নয়।
হাদিস থেকে জানা যায়, আল্লাহ তায়ালা প্রতিরাতে প্রথম আসমানে আসেন। কিন্তু তিনি কীভাবে আসেন, তা আমাদের জানা নেই; জানার প্রয়োজনও নেই। অজ্ঞাতকে অজ্ঞাত রেখে কোনোরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই তা বিশ্বাস করা মুমিনের কর্তব্য। নিম্নে এ সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আলিমদের বক্তব্য তুলে ধরা হলো।
উম্মে সালামা (রা.) সূরা ত্ব-হার পাঁচ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন-
الاسْتِوَاءُ غَيْرُ مَجْهُولٍ وَالْكَيْفُ غَيْرُ مَعْقُولٍ وَالْإِقْرَارُ بِهِ إِيمَانٌ وَالْجُحُودُ بِهِ كُفْرٌ 'সমাসীন হওয়া অজ্ঞাত নয়। তবে এর ধরন আমাদের বোধগম্য নয়। এটি স্বীকার করা ঈমান। আর অস্বীকার করা কুফরি। '৯৭
আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসীন হওয়ার হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (মৃ. ৮৫৫ হি.) বলেন- 'আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে, এই হাদিস ও এর অনুরূপ অন্য হাদিসের ওপর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ঈমান আনা ওয়াজিব। এ হাদিসগুলোর বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হবে। কিন্তু কেমন, কীরকম ইত্যাদি প্রশ্ন করা যাবে না। '৯৮
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন- مَنْ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ بِذَاتِهِ فِي كُلِّ مَكَانٍ فَهُوَ مُخَالِفٌ لِلْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ؛ وَاجْمَاعِ سَلَفِ الْأُمَّةِ وَايْمَتِهَا مَعَ مُخَالَفَتِهِ لِمَا فَطَرَ اللهُ عَلَيْهِ عِبَادَهُ؛ وَلِصَرِيحِ الْمَعْقُولِ وَلِلْأَدِلَّةِ الْكَثِيرَةِ 'যে ব্যক্তি বলে আল্লাহ তায়ালা সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান, তার বক্তব্য কুরআন-হাদিসবিরোধী। সালফে সালেহিনদের ইজমাবিরোধী। অসংখ্য দলিল, স্পষ্ট যুক্তি ও মানব প্রকৃতিরও বিরোধী।'৯৯
ওয়ালিদ ইবনে মুসলিম বলেন- 'ইমাম আওজায়ি, ইমাম মালেক ও ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.)-কে আমি আল্লাহর বিশেষণবিষয়ক হাদিসগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললেন-“এগুলো যেভাবে এসেছে, সেভাবেই চালিয়ে নাও। এর কোনো স্বরূপ ও প্রকৃতি অনুসন্ধান করো না।”'১০০
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর পুত্র বলেন- 'যেসব হাদিসে “আল্লাহ প্রত্যেক রাতে দুনিয়ার আসমানে আসেন, আল্লাহকে দেখা যাবে, আল্লাহ তাঁর পদ স্থাপন করেন” ইত্যাদি বর্ণনা রয়েছে, সে হাদিসগুলো সম্পর্কে আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন- "আমরা এগুলো বিশ্বাস করি, সত্য বলে স্বীকার করি; কিন্তু তিনি কীভাবে আসেন, কীভাবে পদ স্থাপন করেন, তার স্বরূপ সন্ধান করি না।”'১০১
ইমাম আবু হানিফাকে আল্লাহর অবতরণ করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন - يَنْزِلُ بِلا كَيْف -'কোনোরূপ পদ্ধতি ও স্বরূপ ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা অবতরণ করেন। '১০২
ইমাম মালেক (রহ.) বলেন- 'ইসতিওয়া বা অধিষ্ঠান পরিজ্ঞাত। এর পদ্ধতি বা স্বরূপ অজ্ঞাত। এ বিষয়ে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। প্রশ্ন করা বিদআত। '১০৩
এই আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট, 'ইসতিওয়া' শব্দটির অর্থ অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক, মুতাশাবিহাত, রূপক বা অজ্ঞাত বলে ইমামদের কেউ দাবি করেননি; বরং তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-'এ শব্দটির অর্থ জ্ঞাত। তবে এর স্বরূপ বা ব্যাখ্যা অজ্ঞাত। তাই আরবি ভাষায় অন্যান্য ক্ষেত্রে 'ইসতিওয়া আলা' যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রেও তারা একই অর্থে ব্যবহার করেছেন।
টিকাঃ
৯৭. ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি: ১৩/৪০৬; ফাতহুল কাদির: ২/২৪২
৯৮. বদরুদ্দিন আইনি, উমদাতুল কারি: ১৮/২৯৩
৯৯. মাজমুউল ফাতাওয়া: ৫/১২৫
১০০. ফাতহুল বারি: ১৩/৪০৭
১০১. আরশিফুল মুলতাকা: (৩৯/১১১
১০২. বায়হাকি (৪৫৮ হি.), আল আসমা ওয়াস-সিফাত: ২/৩৭৮
১০৩. তাফসিরে কুরতুবি: ১/২৫৪; তাফসিরে মাজহারি: ৫/৬
📄 ইসতিওয়া শব্দের ব্যাখ্যা
আমাদের দেশীয় হানাফিদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ আরশে সমাসীন নন। এটি প্রমাণ করতে গিয়ে তারা যুক্তি দিয়ে বলেন- 'যদি সত্তাগতভাবে আল্লাহর অবস্থান আরশের ওপরে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আল্লাহ তায়ালা আরশের মুখাপেক্ষী হয়ে যান। অথচ আল্লাহ কোনো স্থানের মুখাপেক্ষী নন।'
তাদের এ কথার জবাব হচ্ছে-আরবি 'ইসতিওয়া' শব্দটি ঊর্ধ্বে অবস্থানকে বোঝায়। কোনো জিনিসের সাথে সংযুক্তভাবে ওপরে অবস্থানকে বোঝায় না। হাদিসেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে রাসূল বললেন- حَتَّى تَسْتَوِيَ الشَّمْسُ عَلَى رَأْسِكَ كَالرُّمْحِ ، فَإِذَا اسْتَوَتْ عَلَى رَأْسِكَ كَالرُّمْحِ فَدَعِ الصَّلَاةَ -
'(সালাত বৈধ হবে) যতক্ষণ না সূর্য তোমার মাথার ওপর তিরের মতো ইসতিওয়া বা ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। আর যখন তোমার মাথার ওপরে তিরের মতো ইসতিওয়া বা ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে, তখন সালাত পরিত্যাগ করবে।' ১০৪
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। আমরা চেয়ারের ওপর ঠেস দিয়ে বসি। নিচ থেকে চেয়ার সরিয়ে নিলে আমরা নিশ্চিত পড়ে যাব। কারণ, এ অবস্থায় আমরা চেয়ারের মুখাপেক্ষী। আরশের ওপর আল্লাহর অবস্থান, চেয়ারের ওপর আমাদের অবস্থানের বিপরীত। তিনি আরশে ঠেস দিয়ে বসে নেই; বরং আরশের ঊর্ধ্বে শূন্যে অবস্থান করছেন। তাই তিনি আরশের মুখাপেক্ষী নন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন- 'যদি তাঁর আরশের ওপর উপবেশন করার প্রয়োজনীয়তা থাকত, তাহলে আরশ সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? কাজেই আল্লাহ তায়ালা এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র। '১০৫
টিকাঃ
১০৪. আস-সুনানুল কুবরা: ২/৬৩৯, ৪৩৮৭: ইবনে মাজাহ : ১/৩৯৭, ১২৫২
১০৫. বদরুদ্দিন: ৭৩৩ হি., ইজাহুদ দলিল: পৃষ্ঠা-৭৯