📄 মাওলানা তাকি উসমানির মন্তব্য
শাইখুল ইসলাম মাওলানা তাকি উসমানি (হাফি.) মাজহাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন- 'ইমাম ও মুজতাহিদগণের ইজতিহাদগত মতপার্থক্যকে অতিরঞ্জন করে পেশ করা মারাত্মক অপরাধ। কেননা, তাঁদের অধিকাংশ মতপার্থক্যই হচ্ছে উত্তম ও অধিক উত্তমবিষয়ক। যেমন: ধরুন রুকুর সময় হাত তোলা হবে কি না। বুক বরাবর হাত বেঁধে দাঁড়াতে হবে, নাকি নাভি বারাবর। আমিন মৃদুস্বরে বলা হবে, না উচ্চৈঃস্বরে ইত্যাদি ক্ষেত্রে উভয় অবস্থার বৈধতা সম্পর্কে কোনো মুজতাহিদেরই দ্বিমত নেই। মতপার্থক্য শুধু এই নিয়ে, এ দুয়ের মধ্যে কোনটি উত্তম। সুতরাং ইমামগণের এই সাধারণ মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি করা এবং উম্মাহর মাঝে অনৈক্য ও অসম্প্রীতির বীজ বপন করা কোনোক্রমেই অনুমোদনযোগ্য নয়।'
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (মৃ. ১৬১ হি.)-এর বরাতে তিনি আরও বলেন- 'মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে কাউকে তোমার মতের বিপরীত আমল করতে দেখলে তাকে বাধা দিয়ো না।'৫৬
তিনি আরও বলেন- 'মুকাল্লিদের পক্ষেও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে তাকলিদ বর্জনকারীকে গালমন্দ করা উচিত নয়। কেননা, এ ধরনের ইখতেলাফ ও মতভিন্নতা গোড়া থেকেই চলে আসছে। সুতরাং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে পরস্পরকে গোমরাহ, ফাসিক, বিদআতি, ওহাবি ইত্যাদি বলা এবং গিবত ও দোষচর্চার মাধ্যমে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো চরম গর্হিত কাজ।'৫৭
টিকাঃ
৫৬. আল্লামা তাকি উসমানি, মাজহাব কি ও কেন? (অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ, প্রকাশনায়, মোহাম্মদী লাইব্রেরি, ঢাকা, তা বি.), পৃষ্ঠা-১৩৬, ১৫৮
৫৭. প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা-৯৬-৯৭
📄 বিভক্তি, দলাদলি ও হিংসা-বিদ্বেষ
শরিয়াহর ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে মতবিরোধ করে এক দল অপর দলকে গোমরাহ, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি ফতোয়া দেওয়া এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়া অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। সাহাবি-তাবেয়িগণ সুন্নাহ-মুস্তাহাব, ফরজ-ওয়াজিব এমনকী হারাম-হালাল নিয়েও মতবিরোধ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতের ওপর আমল করেছেন, কিন্তু কেউ কাউকে নিজের মতের ওপর আমল করতে বাধ্য করেননি। বিপরীত মতের আমলকে বাতিলও বলেননি; বরং প্রয়োজনে নিজ মতের ওপর আমল ত্যাগ করে অন্য মতের ওপর আমল করেছেন। যেমন : একবার ইমাম শাফেয়ি আবু হানিফা (রহ.)-এর কবরের কাছাকাছি কোথাও ফজরের নামাজ আদায় করেন। এ সময় তিনি আবু হানিফা (রহ.)-এর সম্মানার্থে নামাজে দুআ কুনুত পড়েননি। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-'আমি অনেক সময় ইরাকিদের (আবু হানিফার) মাজহাব অনুযায়ী আমল করি।'৫৮
মাওলানা তাকি উসমানি বলেন- 'ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন-“ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফজরের নামাজে দুআ কুনুত পড়তেন না। তাই আমি আজ তাঁর আদব রক্ষা করতে চাই।" অনেকের মতে, “সেদিন তিনি উচ্চৈঃস্বরে বিসমিল্লাহও পড়েননি। কেননা, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অনুচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ পড়তেন।""৫৯
ইমাম মালেক (রহ.)-এর ফতোয়া হচ্ছে- 'ক্ষৌরকার্য করার পর অজু করার প্রয়োজন নেই।' ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (মৃ. ২৪১ হি.) বলেছেন-'ক্ষৌরকার্য ও নকসির৬০ পরে অজু করতে হবে।' ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো-'ইমামের শরীর থেকে যদি রক্ত বের হয় আর তিনি অজু না করে নামাজ পড়ান, তাহলে আপনি কি তার পেছনে নামাজ পড়বেন?' জবাবে তিনি বললেন-
كيف لا أصلي خلف سعيد بن المسيب ومالك -
'আমি মালেক ও সাঈদ ইবনে মুসাইয়ি্যবের পেছনে নামাজ না পড়ে কীভাবে থাকতে পারি?'৬১
একবার খলিফা হারুনুর রশিদ হিজামা৬২ অবস্থায় ঈদের সালাতের ইমামতি করলেন। হিজামা করার কারণে খলিফার শরীর থেকে রক্ত পড়ছিল। হানাফি মাজহাব মতে, শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে অজু নষ্ট হয়ে যায়। আর মালেকি মাজহাব মতে, অজু নষ্ট হয় না। তখন তাঁর পেছনে মুক্তাদি ছিলেন হানাফি মাজহাবের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম কাজি আবু ইউসুফ ও মালেকি মাজহাবের ইমাম মালেক (রহ.)। খলিফা নিজেও হানাফি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তিনি এই দুই ফকিহের কোনো একজনকে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করার মনস্থ করলেন। তিনি জানতেন, ইমাম আবু ইউসুফকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি ফতোয়া দেবেন, অজু নষ্ট হয়ে গেছে। এতে হাজার হাজার মানুষকে ডিঙিয়ে তার জন্য অজু করা হবে অনেক কষ্টকর। তাই তিনি কৌশলে ইমাম মালেক (রহ.)-এর কাছে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম মালেক (রহ.) উত্তরে বললেন-'অজু নষ্ট হয়নি, আপনি নামাজ পড়ান।' খলিফা এমতাবস্থায় নামাজের ইমামতি করলেন。
পরবর্তী সময়ে জনৈক ব্যক্তি ইমাম আবু ইউসুফকে জিজ্ঞেস করল-'আপনার মতে তো রক্ত বের হলে অজু নষ্ট হয়ে যায়। তাহলে আপনি কেন খলিফার পেছনে নামাজ পড়লেন?' উত্তরে তিনি বললেন-'সুবহানাল্লাহ! আমিরুল মুমিনিন নামাজ পড়াচ্ছেন আর আমি তাঁর পেছনে নামাজ পড়ব না?'
তিনি আরও বললেন-
يُرِيدُ بِذَلِكَ أَنَّ تَرْكَ الصَّلَاةِ خَلْفَ وَلَاةِ الْأُمُورِ مِنْ فِعْلِ أَهْلِ الْبِدَعِ
'খলিফার পেছনে নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকা হচ্ছে বিদআতিদের কাজ।'৬৩
মাওলানা তাকি উসমানি বলেন-'ফিতনা ও অনৈক্য রোধের উদ্দেশ্যে বিপরীত মতের ওপর আমল করার সুযোগ থাকলে, তা-ই করা উত্তম। যেমন-ইবনে মাসউদ (রা.) একবার সফরে চার রাকাত ফরজ পড়লেন। তাঁকে বলা হলো, উসমান সফরে কসর পড়েননি বলে আপনি আপত্তি করেছিলেন। এখন দেখছি আপনি নিজেই চার রাকাত পড়ছেন। ইবনে মাসউদ তাদের বুঝিয়ে বললেন- দেখ, এখানে এর বিপরীত করাটা ফিতনার কারণ হতো।'৬৪ অথচ সফরে কসর করা (ফরজ নামাজ চার রাকাতের স্থলে দুই রাকাত পড়া) ওয়াজিব।
হারাম-হালাল ও ফরজ-ওয়াজিব নিয়ে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একে অন্যের পেছনে নামাজ পড়েছেন। ইতিহাসে এ রকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এতে তাঁরা নামাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেননি।
টিকাঃ
৫৮. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, আল ইনসাফ ফি বায়ানে আসবাবিল ইখতিলাফ : ১১০
৫৯. আল্লামা তাকি উসমানি, মাজহাব কি ও কেন? পৃষ্ঠা-১৫২
৬০. গরমের তাপে নাক দিয়ে যে রক্ত বের হয় তাকে নকসি বলে।
৬১. আল ইনসাফ ফী বায়ানে আসবাবিল ইখতিলাফ: ১০৯-১১০
৬২. 'কাপিং'-এর মাধ্যমে শরীর থেকে রক্ত বের করে চিকিৎসা করাকে হিজামা বলা হয়। প্রাচীনকালে এটি খুব জনপ্রিয় চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল。
৬৩. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী, আরফুশ: শাজি-১/৭১
৬৪. মাওলানা তাকি উসমানি, অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ, মাজহাব কি ও কেন? পৃষ্ঠা-৯৪
📄 চার মাজহাব কি চারটি ফেরকা
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না (দলাদলি করো না)।' সূরা আলে ইমরান: ১০৩
কিছু আহলে হাদিস এই আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করে বলেন-'আল্লাহ তায়ালা দলাদলি করতে নিষেধ করেছেন। চার মাজহাব চারটা দল, তাই মাজহাব মানা যাবে না। একেকটা মাজহাব একেকটা ফেরকা ইত্যাদি।'
তাদের এই যুক্তি সঠিক নয়। আর যদি সঠিক বলে মেনেও নিই, তাহলে আহলে হাদিসও একটা ফেরকা। কেননা, তাদের মধ্যেও একাধিক মাজহাব রয়েছে। যেমন: শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ বলেছেন- 'আমি ১৮ বছরের গবেষণায় (মুকিম অবস্থায়) কুরবানিতে সাত নাম হয় এমন কোনো হাদিস পাইনি।'৬৫ ড. আসাদুল্লাহ আল গালিব ও মুজাফফর বিন মুহসিনও ফতোয়া দিয়েছেন-'মুকিম অবস্থায় একটা গরু দ্বারা সাত নাম দেওয়া জায়েজ নেই।'৬৬
আবার শাইখ মতিউর রহমান মাদানি বলেছেন-'মুকিম ও সফর উভয় অবস্থায় যে সাত নাম জায়েজ, ১৪ বৎসরের সালফে সালেহিনদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।' যারা ভাগে কুরবানি নাজায়েজ মনে করেন, তাদের প্রতিবাদ করে মুফতি কাজি ইবরাহিম বলেন-'তাদের এই ফতোয়া ডেমেইজ। একই গরুতে সাতজন অংশ নিতে পারে বলে মুসলিম শরিফে স্পষ্ট হাদিস রয়েছে।৬৭
শাইখ মুজাফফর বিন মুহসিন সহিহ হাদিসের কষ্টিপাথরে ঈদের তাকবির নামে একটি বই লিখেছেন। উক্ত বইয়ে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, ঈদের ছয় তাকবিরের সব হাদিস জয়িফ, ১২ তাকবিরের হাদিসগুলো সহিহ।
অপরপক্ষে শাইখ আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া বলেছেন- 'রাসূল ﷺ থেকে এই ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস নেই। আর ৬ তাকবির ও ১২ তাকবির দুটোই সাহাবায়ে কেরাম থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত।৬৮ এখানেই আহলে হাদিস আলিমদের মধ্যে চারটা মাজহাব তৈরি হয়ে গেছে।
আরবের তিনজন প্রসিদ্ধ আলিম-শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমিন ও শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বাজ (রহ.)। তাঁদের মাসয়ালাগত পার্থক্য নিয়ে রিয়াদের প্রসিদ্ধ আলিম ড. সাদ আল বুরাইক একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম الإيجاز في بعض ما اختلف فيه الألباني وابن عثيمين و ابن باز (আলবানি ও ইবনে উসাইমিন ও ইবনে বাজের মধ্যে মাসয়ালাগত মতভেদসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা)। তাঁদের মধ্যে মতভেদ হওয়া প্রায় ৪০০ মাসয়ালা তিনি এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।
অতএব, শুধু মাসয়ালাগত পার্থক্য থাকলেই যদি দল হয়ে যায়, তাহলে আহলে হাদিসের মধ্যেও অসংখ্য দল রয়েছে। আর 'আহলে হাদিস' নাম দিয়ে আলাদা মসজিদ তৈরি করা নিঃসন্দেহে ফেরকাবাজি। এ রকম উগ্রপন্থা অবলম্বন না করলে আহলে হাদিস ও মাজহাব কোনোটাই এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, ইমামদের গবেষণা ও কর্মপন্থায় যে মতবিরোধ ও ভিন্নতা রয়েছে, তা কুরআনে বর্ণিত নিন্দিত মতবিরোধ নয়।
মূলত ফেরকাবাজি হচ্ছে, গুরুত্বহীন মতবিরোধকে গুরুত্ব দিয়ে মৌলিক বিরোধে রূপান্তর করা। তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়া। নিজেদের মত ও পন্থাকে মূল দ্বীন ঘোষণা করে অন্যদের কাফির, ফাসেক ও গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করা। নিজেদের নামাজ ও মসজিদ পৃথক করে নেওয়া। নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বদলে হানাফি, মালেকি, সালাফি, আহলে হাদিস বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করা। বর্তমানে এ কাজগুলো উভয় দলের উগ্রপন্থিরা ভালোভাবে করে যাচ্ছেন।
ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে যারা এ রকম করে, তারা মূলত দ্বীনের মূলে কুঠারাঘাত করে। যদি এরূপ ফেরকাবাজি না করে গুরুত্বহীন বিষয়কে গুরুত্বহীন থাকতে দেওয়া হয়, তাহলে ফিকহি মাসায়েলের দিক থেকে ভিন্ন মতের অনুসারী হয়েও আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকা যায়। যারা শরিয়াহর এসব ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন, ফতোয়াবাজি করেন, আমরা অবশ্যই তাদের নিন্দা করতে পারি; কিন্তু কিছু লোকের বাড়াবাড়ির কারণে চার মাজহাব ও আহলে হাদিসের সবার নিন্দা করতে পারি না।
টিকাঃ
৬৫. বক্তব্য লিংক, www.youtube.com/Tawhid Media, আপলোড তারিখ, ২৭/৭/২০১৯
৬৬. প্রাগুক্ত
৬৭. প্রাগুক্ত
৬৮. বক্তব্য লিংক, www.Youtube.com/Bangla Islamic learning আপলোড তারিখ: ২৪/৫/২০২০
📄 একটি প্রশ্ন ও তার জবাব
ইসলাম এসেছে ঐক্যের পয়গাম নিয়ে; কিন্তু অজ্ঞতা, মূর্খতা, কুসংস্কার ও গোঁড়ামির কারণে আজ তা মতবিরোধ ও ঝগড়া-বিবাদের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কোনো সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তি যদি কোনো মাসয়ালা নিয়ে দলিলভিত্তিক পর্যালোচনা করেন, আর তা কোনো মাজহাবের বিপরীত চলে যায়, তাহলে কিছু মাজহাবি ভাই তার সমালোচনা করে বলেন- 'ইমাম আবু হানিফা কি ভুল করেছেন? সারাজীবন যা আমল করে এলাম, সব কি ভুল ছিল?' আবার কেউ আরও একধাপ এগিয়ে বলেন- 'তুমি কি আবু হানিফার চেয়ে বড়ো আলিম হয়ে গেছ?' এ রকম অযৌক্তিক কথাবার্তা প্রায় সময়ই শোনা যায়।
যারা এসব বলেন, তারা মূলত হিংসা-বিদ্বেষের কারণেই বলে থাকেন। তিনটি কারণে তাদের এ কথাবার্তা গ্রহণযোগ্য নয়-
এক. আমাদের সমাজে যেসব আমল প্রচলিত, তার সব যে ইমাম আবু হানিফা বা তাঁর ছাত্রদের ফতোয়ার অনুগামী, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। শাহ ওয়লিউল্লাহ (রহ.) বলেন-'হানাফিদের কিছু লোক মনে করে, ফিকাহ ও ফতোয়ার গ্রন্থাবলিতে যত টীকা-টিপ্পনী ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রয়েছে, তার সবই আবু হানিফার কিংবা সাহাবাইন (ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু ইউসুফ)-এর মতামত। মূল জিনিস আর তাখরিজের মধ্যে তাঁরা কোনো পার্থক্য করে না। দেখবে, হানাফিদের তাখরিজের মধ্যে রয়েছে স্ববিরোধী অনেক কথা। আরও দেখবে, এমন অনেক তাখরিজ যার একটি অন্যটিকে রহিত করে দেয়।'৬৯
আমরাও দেখতে পাই, সমাজে প্রচলিত অনেক ইবাদত হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না। এ রকম দুয়েকটা ইবাদত ও আমল নিয়ে সামনে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
দুই. নবি-রাসূল ছাড়া আর কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। মুজতাহিদের কথা ও কাজ যেমন সঠিক হতে পারে, তেমনি ভুলও হতে পারে। এ নিয়ে হাদিসে স্পষ্ট বক্তব্যও রয়েছে।৭০ সুতরাং ইমাম আবু হানিফার ভুল হতে পারে না, এমন বিশ্বাস আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদা বিরোধী।
শাইখ ইজুদ্দিন আব্দুস সালাম (রহ.)-এর বরাতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলেন- 'চার মাজহাবের আবির্ভাব ঘটলে লোকেরা হিদায়াতের আসল উৎস থেকে মুখ ফিরিয়ে ইমামদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাঁদের কোনো বক্তব্য দুর্বল ও দলিলবিহীন হলেও ভাবটা এমন, যেন মুজতাহিদরা মুজতাহিদ নন, আল্লাহর রাসূল। তাদের কাছে ওহি নাজিল হয়। এটা সত্য ও হকের পথ নয়, নির্ঘাত অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির পথ।'৭১
তিন. ইমামদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের এই ধারণা রাখতে হবে, এসব বিদ্বান নিশ্চয় কোনো দলিলের ভিত্তিতে ফতোয়া দিয়েছেন। মনগড়া দেননি। আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে হয়তো আমরা সেই দলিল বের করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি আমার ইমামের মতের পক্ষে দলিল পাইনি; কিন্তু অন্য মতের পক্ষে দলিল পেয়েছি। এ অবস্থায় আমি কার অনুসরণ করব? আমার ইমামের, না অন্য দলিলের? হানাফি বিদ্বানদের কাছ থেকেই আমরা এর উত্তর জানব।
মাসয়ালা-মাসায়েল গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি আরোপ করেছেন ইমাম আবু হানিফা (রহ.)। তিনি বলেছেন- 'যে ব্যক্তি আমার দলিল জানে না, তার জন্য আমার বক্তব্য বা মাজহাব অনুসারে ফতোয়া দেওয়া উচিত নয়।' ইমাম জুফার বলেন-'আমি শুনেছি, আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন-
لا يحل لمن يفتي من كتبي أن يفتي حتى يعلم من أين قلت -
"কোন দলিলের ভিত্তিতে আমার মত গ্রহণ করেছি, তা না জানা পর্যন্ত আমার বই থেকে ফতোয়া দেওয়া কারও জন্য বৈধ নয়।"৭১
কিছু আলিম বলেন- 'ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর এ উক্তি তার বেলায় প্রযোজ্য, যিনি ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখেন। সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়।' এখন প্রশ্ন হচ্ছে-কতটুকু দক্ষতা অর্জন করলে ব্যক্তি ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করবে? এই ব্যাপারে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) বলেন-
إِنَّمَا يتم فِيمَن لَهُ ضرب من الاجْتِهَادِ وَلَو فِي مَسْأَلَة وَاحِدَة -
'এ উক্তি তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা একটি মাসয়ালার ক্ষেত্রে হলেও ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখে।'৭৩
আমার কাছে এটাই গ্রহণযোগ্য ও ইনসাফপূর্ণ কথা। তাই একটি মাসয়ালা নিয়েও কেউ যদি গবেষণা করতে পারে, তাহলে ওই মাসয়ালায় নিজ ইমামের দলিল ও অন্য মতের দলিলের মধ্যে যেটা তার কাছে কুরআন-সুন্নাহর বেশি নিকটবর্তী মনে হবে, সেটার ওপর আমল করবে।
মাওলানা তাকি উসমানি (হাফি.) ইমাম হুমামের বরাত দিয়ে বলেন-'যদি মাজহাব পরিপন্থি কোনো হাদিস পাওয়া যায়, তাহলে হাদিসটির ওপরই আমল করতে হবে। আর এটা তার নিজস্ব মাজহাব বলে বিবেচিত হবে। কেননা, ইমাম আবু হানিফা বলেছেন- “আমার ফতোয়ার বিপরীত কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে সেটাই আমার মাজহাব।”'৭৪
ইমাম হিশাম ইবনে ইউসুফকে (মৃ. ২১৫ হি.) প্রশ্ন করা হলো- 'ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সাথে আপনার এত মতপার্থক্য কেন?' জবাবে তিনি বললেন- 'ইমাম আবু হানিফার সাথে আমাদের মতপার্থক্যের কারণ হচ্ছে-আবু হানিফা এমন জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন, যা আমরা অর্জন করতে পারিনি। তিনি তাঁর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দিয়ে যা বুঝতেন, আমরা তা বুঝতে পারিনি। আর না বুঝে তাঁর মতানুসারে ফতোয়া দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।'৭৫
এ কারনেই ইমাম হিশাম অনেক বিষয়ে ইমাম আজমের বিপরীত ফতোয়া দিতেন। ইমাম আজমের দলিল না জানা অবস্থায় তাঁর কাছে যখন অন্য দলিল জোরালো প্রমাণিত হতো, তখন তিনি উক্ত দলিল অনুসারেই ফতোয়া দিতেন।
ইমাম আবু ইউসুফ (মৃ. ১৮২ হি.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (মৃ. ১৮২ হি.) প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাসয়ালায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু তাঁরা কেউ নিজেকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর চেয়ে বড়ো জ্ঞানী ভাবেননি। মাজহাব থেকেও বের হয়ে যাননি। ইমাম হিশাম এ কথাও বলেননি, আবু হানিফা (রহ.)-এর মাসয়ালার কোনো দলিল নেই। অতএব, এটা ভুল। আবার এটাও বলেননি, আমার জ্ঞান কম, তাই নিজের দলিল বাদ দিয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়ার ওপর আমল করি; বরং তিনি নিজের দুর্বলতা উল্লেখ করে নিজের দলিলের ওপর ফতোয়া দিয়েছেন।
ইমাম হিশাম ইবনে ইউসুফ (রহ.)-এর কথা থেকে স্পষ্ট, যদি কেউ নিজ ইমামের দলিল জানতে না পারে; তবে অন্য মতের দলিল লাভ করে, তাহলে তাকে নিজ ইমামের প্রতি সুধারণা রেখে দলিলভিত্তিক ফতোয়ার ওপর আমল করতে হবে। দলিল পাওয়ার পরও সে যদি ইমামের অন্ধ অনুসরণ করে, তাহলে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর ভাষ্যমতে, সে সবচেয়ে বড়ো জালিম হিসেবে গণ্য হবে। এজন্য আল্লাহর দরবারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।৭৬
টিকাঃ
৬৯. দেহলভি, ফি বায়ানে আসবাবিল ইখতিলাফ: ৯২
৭০. বুখারি: ৭৩৫২
৭১. দেহলভি, ফি বায়ানে আসবাবিল ইখতিলাফ: ১০০
৭২. উসুলুদ-দ্বীন ইন্দাল ইমাম আবি হানিফা : ১/৬
৭৩. দেহলভি, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ১/২৬৪
৭৪. মাজহাব কি ও কেন? পৃষ্ঠা-২১৬
৭৫. আবু হানিফা, আল ফিকহুল আকবার, পৃষ্ঠা-: ১৫৯; ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, আল ফিকহুল আকবার। বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৯৫
৭৬. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ১/২৬৮