📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 মতবিরোধপূর্ণ সব বিষয়ই সাহাবিদের আমল

📄 মতবিরোধপূর্ণ সব বিষয়ই সাহাবিদের আমল


মূলত যে সকল বিষয় নিয়ে মতভেদ করে একে অপরকে অবজ্ঞা করা হয়, তার সবগুলোই হাদিস বা সাহাবিদের আমল। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সহ অনেক সাহাবি থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত-
'রাসূল তিন সময় রফউল ইয়াদাইন করতেন। নামাজের শুরুতে, রুকু যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে দাঁড়িয়ে।'৫২
আবার আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত- 'রাসূল শুধু একবার রফউল ইয়াদাইন করতেন। আর তা করতেন নামাজের শুরুতে।'৫৩
এখন কেউ যদি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর হাদিসের ওপর আমল করেন, তাহলে তিনি একটা সুন্নতের ওপর আমল করলেন। আবার কেউ যদি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিসের ওপর আমল করেন, তাহলে তিনি আরেকটি সুন্নতের ওপর আমল করলেন। কিন্তু তিনি যদি একটির ওপর আমল করতে গিয়ে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত অন্য সুন্নতকে ঘৃণা বা অস্বীকার করেন, তাহলে তিনি মূলত রাসূল -এর হাদিসকেই ঘৃণা বা অস্বীকার করলেন।
শরিয়াহর এসব বিষয় নিয়ে সাহাবিদের যুগে মতবিরোধ ছিল। মতবিরোধ ছিল চার ইমামের যুগেও। তারা শুধু নিজের মতকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাই বলে অন্যের মতকে বর্জনীয় বলতেন না।
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন- 'দুই ঈদের তাকবির নিয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তার যে পদ্ধতিই তুমি গ্রহণ করো, তা উত্তম। তবে আমার দৃষ্টিতে সর্বোত্তম হলো-ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত পদ্ধতি। আর এটা আবু হানিফা (রহ.)-এর কথা।'৫৪ এভাবেই সকল ইমাম নিজের মত ব্যক্ত করেছেন।

টিকাঃ
৫২. সহিহ আবু দাউদ: ৭৪৫
৫৩. সহিহ আবু দাউদ: ৭৪৮
৫৪. আবদুর রহমান মুবারকপুরী (১৩৫৩হি.), তুহফাতুল আহওয়াজি, ৩/৭১; উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (১৪১৪হি.), মিরআতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ : ৫/৫২

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর বক্তব্য

📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর বক্তব্য


পূর্ববর্তী ইমামদের উদারতা, মহানুভবতা ও মনের প্রশস্ততা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন- 'ইমামগণ ইখতেলাফি দিকসমূহ আলোচনা করে বলে দিতেন, আমার মতে এটা উত্তম এবং অধিক গ্রহণযোগ্য। আবার কখনো বলতেন, আমি শুধু এতটুকু জানতে পেরেছি।
অতঃপর শুভবুদ্ধির অধিকারী দ্বীনের সেই খাদিমদের কাল অতিক্রান্ত হয়। তাঁদের পর এমন সব লোকের আগমন ঘটে, যারা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়ার কারণে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিবাদের ঝড় বইয়ে দেন। মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরেন। এ মতের অধিকারীদের নিজপক্ষ আর ওই মতের অধিকারীদের বিপক্ষ ভাবতে থাকেন। এভাবেই শুরু হয় ফেরকা-পুরস্তী। এতে করে মানুষের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহকিক ও চিন্তা-গবেষণার জজবা। তারা নিজ নিজ ইমামের মাজহাবকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরেন। আফসোস তাদের এই অবস্থার জন্য।'৫৫
ইখতেলাফি বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও হিংসা-বিদ্বেষ করা কতটুকু নিন্দনীয়, তা শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট। তাঁর সময়ের আলিমদের অবস্থা দেখে তিনি যদি এই মন্তব্য করেন, তাহলে বর্তমান আলিমদের অবস্থা দেখলে তিনি কী মন্তব্য করতেন, তা সহজেই অনুমেয়।

টিকাঃ
৫৫. মতবিরোধ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়, প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা-১০৯/১১০; মাকতাবাতুস- শামেলা: ১০৮/১০৯

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 মাওলানা তাকি উসমানির মন্তব্য

📄 মাওলানা তাকি উসমানির মন্তব্য


শাইখুল ইসলাম মাওলানা তাকি উসমানি (হাফি.) মাজহাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন- 'ইমাম ও মুজতাহিদগণের ইজতিহাদগত মতপার্থক্যকে অতিরঞ্জন করে পেশ করা মারাত্মক অপরাধ। কেননা, তাঁদের অধিকাংশ মতপার্থক্যই হচ্ছে উত্তম ও অধিক উত্তমবিষয়ক। যেমন: ধরুন রুকুর সময় হাত তোলা হবে কি না। বুক বরাবর হাত বেঁধে দাঁড়াতে হবে, নাকি নাভি বারাবর। আমিন মৃদুস্বরে বলা হবে, না উচ্চৈঃস্বরে ইত্যাদি ক্ষেত্রে উভয় অবস্থার বৈধতা সম্পর্কে কোনো মুজতাহিদেরই দ্বিমত নেই। মতপার্থক্য শুধু এই নিয়ে, এ দুয়ের মধ্যে কোনটি উত্তম। সুতরাং ইমামগণের এই সাধারণ মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি করা এবং উম্মাহর মাঝে অনৈক্য ও অসম্প্রীতির বীজ বপন করা কোনোক্রমেই অনুমোদনযোগ্য নয়।'
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (মৃ. ১৬১ হি.)-এর বরাতে তিনি আরও বলেন- 'মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে কাউকে তোমার মতের বিপরীত আমল করতে দেখলে তাকে বাধা দিয়ো না।'৫৬
তিনি আরও বলেন- 'মুকাল্লিদের পক্ষেও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে তাকলিদ বর্জনকারীকে গালমন্দ করা উচিত নয়। কেননা, এ ধরনের ইখতেলাফ ও মতভিন্নতা গোড়া থেকেই চলে আসছে। সুতরাং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে পরস্পরকে গোমরাহ, ফাসিক, বিদআতি, ওহাবি ইত্যাদি বলা এবং গিবত ও দোষচর্চার মাধ্যমে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো চরম গর্হিত কাজ।'৫৭

টিকাঃ
৫৬. আল্লামা তাকি উসমানি, মাজহাব কি ও কেন? (অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ, প্রকাশনায়, মোহাম্মদী লাইব্রেরি, ঢাকা, তা বি.), পৃষ্ঠা-১৩৬, ১৫৮
৫৭. প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা-৯৬-৯৭

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 বিভক্তি, দলাদলি ও হিংসা-বিদ্বেষ

📄 বিভক্তি, দলাদলি ও হিংসা-বিদ্বেষ


শরিয়াহর ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে মতবিরোধ করে এক দল অপর দলকে গোমরাহ, পথভ্রষ্ট ইত্যাদি ফতোয়া দেওয়া এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়া অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। সাহাবি-তাবেয়িগণ সুন্নাহ-মুস্তাহাব, ফরজ-ওয়াজিব এমনকী হারাম-হালাল নিয়েও মতবিরোধ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতের ওপর আমল করেছেন, কিন্তু কেউ কাউকে নিজের মতের ওপর আমল করতে বাধ্য করেননি। বিপরীত মতের আমলকে বাতিলও বলেননি; বরং প্রয়োজনে নিজ মতের ওপর আমল ত্যাগ করে অন্য মতের ওপর আমল করেছেন। যেমন : একবার ইমাম শাফেয়ি আবু হানিফা (রহ.)-এর কবরের কাছাকাছি কোথাও ফজরের নামাজ আদায় করেন। এ সময় তিনি আবু হানিফা (রহ.)-এর সম্মানার্থে নামাজে দুআ কুনুত পড়েননি। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-'আমি অনেক সময় ইরাকিদের (আবু হানিফার) মাজহাব অনুযায়ী আমল করি।'৫৮
মাওলানা তাকি উসমানি বলেন- 'ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন-“ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফজরের নামাজে দুআ কুনুত পড়তেন না। তাই আমি আজ তাঁর আদব রক্ষা করতে চাই।" অনেকের মতে, “সেদিন তিনি উচ্চৈঃস্বরে বিসমিল্লাহও পড়েননি। কেননা, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অনুচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ পড়তেন।""৫৯
ইমাম মালেক (রহ.)-এর ফতোয়া হচ্ছে- 'ক্ষৌরকার্য করার পর অজু করার প্রয়োজন নেই।' ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (মৃ. ২৪১ হি.) বলেছেন-'ক্ষৌরকার্য ও নকসির৬০ পরে অজু করতে হবে।' ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো-'ইমামের শরীর থেকে যদি রক্ত বের হয় আর তিনি অজু না করে নামাজ পড়ান, তাহলে আপনি কি তার পেছনে নামাজ পড়বেন?' জবাবে তিনি বললেন-
كيف لا أصلي خلف سعيد بن المسيب ومالك -
'আমি মালেক ও সাঈদ ইবনে মুসাইয়ি‍্যবের পেছনে নামাজ না পড়ে কীভাবে থাকতে পারি?'৬১
একবার খলিফা হারুনুর রশিদ হিজামা৬২ অবস্থায় ঈদের সালাতের ইমামতি করলেন। হিজামা করার কারণে খলিফার শরীর থেকে রক্ত পড়ছিল। হানাফি মাজহাব মতে, শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে অজু নষ্ট হয়ে যায়। আর মালেকি মাজহাব মতে, অজু নষ্ট হয় না। তখন তাঁর পেছনে মুক্তাদি ছিলেন হানাফি মাজহাবের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম কাজি আবু ইউসুফ ও মালেকি মাজহাবের ইমাম মালেক (রহ.)। খলিফা নিজেও হানাফি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তিনি এই দুই ফকিহের কোনো একজনকে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করার মনস্থ করলেন। তিনি জানতেন, ইমাম আবু ইউসুফকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি ফতোয়া দেবেন, অজু নষ্ট হয়ে গেছে। এতে হাজার হাজার মানুষকে ডিঙিয়ে তার জন্য অজু করা হবে অনেক কষ্টকর। তাই তিনি কৌশলে ইমাম মালেক (রহ.)-এর কাছে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম মালেক (রহ.) উত্তরে বললেন-'অজু নষ্ট হয়নি, আপনি নামাজ পড়ান।' খলিফা এমতাবস্থায় নামাজের ইমামতি করলেন。
পরবর্তী সময়ে জনৈক ব্যক্তি ইমাম আবু ইউসুফকে জিজ্ঞেস করল-'আপনার মতে তো রক্ত বের হলে অজু নষ্ট হয়ে যায়। তাহলে আপনি কেন খলিফার পেছনে নামাজ পড়লেন?' উত্তরে তিনি বললেন-'সুবহানাল্লাহ! আমিরুল মুমিনিন নামাজ পড়াচ্ছেন আর আমি তাঁর পেছনে নামাজ পড়ব না?'
তিনি আরও বললেন-
يُرِيدُ بِذَلِكَ أَنَّ تَرْكَ الصَّلَاةِ خَلْفَ وَلَاةِ الْأُمُورِ مِنْ فِعْلِ أَهْلِ الْبِدَعِ
'খলিফার পেছনে নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকা হচ্ছে বিদআতিদের কাজ।'৬৩
মাওলানা তাকি উসমানি বলেন-'ফিতনা ও অনৈক্য রোধের উদ্দেশ্যে বিপরীত মতের ওপর আমল করার সুযোগ থাকলে, তা-ই করা উত্তম। যেমন-ইবনে মাসউদ (রা.) একবার সফরে চার রাকাত ফরজ পড়লেন। তাঁকে বলা হলো, উসমান সফরে কসর পড়েননি বলে আপনি আপত্তি করেছিলেন। এখন দেখছি আপনি নিজেই চার রাকাত পড়ছেন। ইবনে মাসউদ তাদের বুঝিয়ে বললেন- দেখ, এখানে এর বিপরীত করাটা ফিতনার কারণ হতো।'৬৪ অথচ সফরে কসর করা (ফরজ নামাজ চার রাকাতের স্থলে দুই রাকাত পড়া) ওয়াজিব।
হারাম-হালাল ও ফরজ-ওয়াজিব নিয়ে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একে অন্যের পেছনে নামাজ পড়েছেন। ইতিহাসে এ রকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এতে তাঁরা নামাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেননি।

টিকাঃ
৫৮. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, আল ইনসাফ ফি বায়ানে আসবাবিল ইখতিলাফ : ১১০
৫৯. আল্লামা তাকি উসমানি, মাজহাব কি ও কেন? পৃষ্ঠা-১৫২
৬০. গরমের তাপে নাক দিয়ে যে রক্ত বের হয় তাকে নকসি বলে।
৬১. আল ইনসাফ ফী বায়ানে আসবাবিল ইখতিলাফ: ১০৯-১১০
৬২. 'কাপিং'-এর মাধ্যমে শরীর থেকে রক্ত বের করে চিকিৎসা করাকে হিজামা বলা হয়। প্রাচীনকালে এটি খুব জনপ্রিয় চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল。
৬৩. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী, আরফুশ: শাজি-১/৭১
৬৪. মাওলানা তাকি উসমানি, অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ, মাজহাব কি ও কেন? পৃষ্ঠা-৯৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px