📄 উগ্রপন্থা নয়, মধ্যমপন্থাই কাম্য
কুরআনের সকল বক্তব্য সুস্পষ্ট না হলেও, মানুষের হিদায়াতের জন্য যা জানা জরুরি, আল্লাহ তায়ালা তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় কুরআনে বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও আলিমদের মধ্যে মতবিরোধের কারণ হলো-
এক. কেউ যখন কুরআনি সত্য নিজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে প্রবৃত্ত হয় এবং কুরআনের সীমা অতিক্রম করে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করে, তখন মতের পার্থক্য ও মতবিরোধিতা দেখা দেয়।
দুই. মানুষ যখন এমন ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে ফতোয়াবাজি শুরু করে-যার দায়িত্ব আল্লাহ এবং রাসূল তার ওপর অর্পণ করেননি-ফলে ফিতনা-ফ্যাসাদের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়।
কিছু আহলে হাদিস ও হানাফি এই দুইটি কাজে খুব দক্ষ। তারা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সহিহ হাদিসকে জয়িফ আর জয়িফ হাদিসকে সহিহ বানিয়ে ফেলে। তাদের কাছে নিজের পক্ষের সবগুলো হাদিস সহিহ আর বিপক্ষের সবগুলো জয়িফ।
উদাহরণ হিসেবে ঈদের নামাজের তাকবিরসংক্রান্ত হাদিসের কথা বলা যায়। ঈদের নামাজের অতিরিক্ত তাকবির সংখ্যা নিয়ে বর্ণিত সব হাদিসই কমবেশি দুর্বল। নির্দিষ্ট সংখ্যার কোনো হাদিসই পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ সনদে নবিজি থেকে বর্ণিত হয়নি; কিন্তু সাহাবিদের আমল থেকে ১৩, ১২, ৯ ও ৬ তাকবিরের হাদিসগুলো আবার বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে।৫১
এক্ষেত্রে কিছু আহলে হাদিস ১২ তাকবিরের সব হাদিসকে সহিহ আর ছয় তাকবিরের সব হাদিসকে জয়িফ আখ্যায়িত করেন। আবার কিছু হানাফি শুধু ছয় তাকবিরের হাদিসগুলোকে সহিহ আর ১২ তাকবিরের হাদিসগুলো জয়িফ বলে বর্ণনা করেন।
তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়েও একই অবস্থা। আহলে হাদিসগণ বলে, উমর (রা.) কর্তৃক আট রাকাত তারাবি প্রমাণিত। ২০ রাকাতের হাদিস দুর্বল। আর হানাফিগণ বলে, তারাবি সম্পর্কে আট রাকাতের কোনো হাদিস নেই। ২০ রাকাতই উমর (রা.) কর্তৃক প্রমাণিত।
বিপরীত পক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে এভাবেই আমরা হাদিসের নামে জালিয়াতি করে যাচ্ছি। মূলত ইসলাম মানার চেয়ে আমরা ব্যক্তিপূজারি ও প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে উঠছি। তাই সংকীর্ণ মনের ঊর্ধ্বে উঠে বিপরীত মতকে সমর্থন করার সৎ সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيْلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِيْنَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيْلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ
'প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। কারণ, তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে ফেলবে। যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কেননা, তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।' সূরা ছোয়াদ: ২৬
টিকাঃ
৫১. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার রচিত হাদিসের আলোকে সালাতুল ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর' বইটি দেখুন।
📄 মতবিরোধপূর্ণ সব বিষয়ই সাহাবিদের আমল
মূলত যে সকল বিষয় নিয়ে মতভেদ করে একে অপরকে অবজ্ঞা করা হয়, তার সবগুলোই হাদিস বা সাহাবিদের আমল। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সহ অনেক সাহাবি থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত-
'রাসূল তিন সময় রফউল ইয়াদাইন করতেন। নামাজের শুরুতে, রুকু যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে দাঁড়িয়ে।'৫২
আবার আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত- 'রাসূল শুধু একবার রফউল ইয়াদাইন করতেন। আর তা করতেন নামাজের শুরুতে।'৫৩
এখন কেউ যদি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর হাদিসের ওপর আমল করেন, তাহলে তিনি একটা সুন্নতের ওপর আমল করলেন। আবার কেউ যদি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিসের ওপর আমল করেন, তাহলে তিনি আরেকটি সুন্নতের ওপর আমল করলেন। কিন্তু তিনি যদি একটির ওপর আমল করতে গিয়ে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত অন্য সুন্নতকে ঘৃণা বা অস্বীকার করেন, তাহলে তিনি মূলত রাসূল -এর হাদিসকেই ঘৃণা বা অস্বীকার করলেন।
শরিয়াহর এসব বিষয় নিয়ে সাহাবিদের যুগে মতবিরোধ ছিল। মতবিরোধ ছিল চার ইমামের যুগেও। তারা শুধু নিজের মতকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাই বলে অন্যের মতকে বর্জনীয় বলতেন না।
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন- 'দুই ঈদের তাকবির নিয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তার যে পদ্ধতিই তুমি গ্রহণ করো, তা উত্তম। তবে আমার দৃষ্টিতে সর্বোত্তম হলো-ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত পদ্ধতি। আর এটা আবু হানিফা (রহ.)-এর কথা।'৫৪ এভাবেই সকল ইমাম নিজের মত ব্যক্ত করেছেন।
টিকাঃ
৫২. সহিহ আবু দাউদ: ৭৪৫
৫৩. সহিহ আবু দাউদ: ৭৪৮
৫৪. আবদুর রহমান মুবারকপুরী (১৩৫৩হি.), তুহফাতুল আহওয়াজি, ৩/৭১; উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (১৪১৪হি.), মিরআতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ : ৫/৫২
📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর বক্তব্য
পূর্ববর্তী ইমামদের উদারতা, মহানুভবতা ও মনের প্রশস্ততা শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন- 'ইমামগণ ইখতেলাফি দিকসমূহ আলোচনা করে বলে দিতেন, আমার মতে এটা উত্তম এবং অধিক গ্রহণযোগ্য। আবার কখনো বলতেন, আমি শুধু এতটুকু জানতে পেরেছি।
অতঃপর শুভবুদ্ধির অধিকারী দ্বীনের সেই খাদিমদের কাল অতিক্রান্ত হয়। তাঁদের পর এমন সব লোকের আগমন ঘটে, যারা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়ার কারণে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিবাদের ঝড় বইয়ে দেন। মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরেন। এ মতের অধিকারীদের নিজপক্ষ আর ওই মতের অধিকারীদের বিপক্ষ ভাবতে থাকেন। এভাবেই শুরু হয় ফেরকা-পুরস্তী। এতে করে মানুষের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহকিক ও চিন্তা-গবেষণার জজবা। তারা নিজ নিজ ইমামের মাজহাবকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরেন। আফসোস তাদের এই অবস্থার জন্য।'৫৫
ইখতেলাফি বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও হিংসা-বিদ্বেষ করা কতটুকু নিন্দনীয়, তা শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট। তাঁর সময়ের আলিমদের অবস্থা দেখে তিনি যদি এই মন্তব্য করেন, তাহলে বর্তমান আলিমদের অবস্থা দেখলে তিনি কী মন্তব্য করতেন, তা সহজেই অনুমেয়।
টিকাঃ
৫৫. মতবিরোধ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়, প্রাগুক্ত; পৃষ্ঠা-১০৯/১১০; মাকতাবাতুস- শামেলা: ১০৮/১০৯
📄 মাওলানা তাকি উসমানির মন্তব্য
শাইখুল ইসলাম মাওলানা তাকি উসমানি (হাফি.) মাজহাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন- 'ইমাম ও মুজতাহিদগণের ইজতিহাদগত মতপার্থক্যকে অতিরঞ্জন করে পেশ করা মারাত্মক অপরাধ। কেননা, তাঁদের অধিকাংশ মতপার্থক্যই হচ্ছে উত্তম ও অধিক উত্তমবিষয়ক। যেমন: ধরুন রুকুর সময় হাত তোলা হবে কি না। বুক বরাবর হাত বেঁধে দাঁড়াতে হবে, নাকি নাভি বারাবর। আমিন মৃদুস্বরে বলা হবে, না উচ্চৈঃস্বরে ইত্যাদি ক্ষেত্রে উভয় অবস্থার বৈধতা সম্পর্কে কোনো মুজতাহিদেরই দ্বিমত নেই। মতপার্থক্য শুধু এই নিয়ে, এ দুয়ের মধ্যে কোনটি উত্তম। সুতরাং ইমামগণের এই সাধারণ মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি করা এবং উম্মাহর মাঝে অনৈক্য ও অসম্প্রীতির বীজ বপন করা কোনোক্রমেই অনুমোদনযোগ্য নয়।'
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (মৃ. ১৬১ হি.)-এর বরাতে তিনি আরও বলেন- 'মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে কাউকে তোমার মতের বিপরীত আমল করতে দেখলে তাকে বাধা দিয়ো না।'৫৬
তিনি আরও বলেন- 'মুকাল্লিদের পক্ষেও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে তাকলিদ বর্জনকারীকে গালমন্দ করা উচিত নয়। কেননা, এ ধরনের ইখতেলাফ ও মতভিন্নতা গোড়া থেকেই চলে আসছে। সুতরাং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে পরস্পরকে গোমরাহ, ফাসিক, বিদআতি, ওহাবি ইত্যাদি বলা এবং গিবত ও দোষচর্চার মাধ্যমে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো চরম গর্হিত কাজ।'৫৭
টিকাঃ
৫৬. আল্লামা তাকি উসমানি, মাজহাব কি ও কেন? (অনুবাদক: আবু তাহের মিসবাহ, প্রকাশনায়, মোহাম্মদী লাইব্রেরি, ঢাকা, তা বি.), পৃষ্ঠা-১৩৬, ১৫৮
৫৭. প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা-৯৬-৯৭