📄 শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর অভিমত
ভারত উপমহাদেশের যুগশ্রেষ্ঠ আলিম, মুজতাহিদ ও মুজাদ্দিদ হলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (মৃ. ১১৭৬ হি.)। তাকলিদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-'মুজতাহিদের ব্যাপারে এই বিশ্বাস থাকা উচিত, তাঁর থেকে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ দুটোই হতে পারে। তাই তাকলিদকৃত মাসয়ালার বিপরীতে যখনই সহিহ হাদিস পাওয়া যাবে, তাকলিদ ছেড়ে তা গ্রহণ করতে হবে।'৩৫
তিনি আরও বলেন- فإن بلغنَا حَدِيث عَنِ الرَّسُولِ الْمَعْصُومِ الَّذي فرض الله علينا طاعته بِسَنَد صالح يدل على خلاف مذهبه، وَتَرَكْنَا حَدِيثه، وَاتَّبَعْنَا ذَلِكَ التخمين فمن أظلم منا ، وَمَا عذرنا يَوْم يقوم الناس لرب العالمين
'মাজহাবি মতের বিপরীতে বিশুদ্ধ সনদে রাসূল -এর হাদিস পাওয়ার পরও আমরা যদি মুজতাহিদের অনুসরণ করি; হাদিসের অনুসরণ পরিত্যাগ করি, তাহলে আমাদের চেয়ে বড়ো জালিম আর কে হতে পারে? এমন হলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে (হাদিস না মানার) আমরা কী জবাব দেবো?'৩৬
তাঁর মতে, এক মাজহাবের লোকের জন্য অন্য মাজহাবের কোনো বিষয়ের ওপর আমল করা বৈধ। তিনি এর উদাহরণ দিয়ে বলেন- 'যদি হানাফি মাজহাবের কোনো লোক শপথ করে বলে, আমি অমুক মহিলাকে বিয়ে করলে সে তিন তালাক।৩৭ অতঃপর সে শাফেয়ি আলিমের নিকট ফতোয়া চাইলে তিনি বলেন-"তালাক হয়নি।" তাহলে এক্ষেত্রে তার জন্য শাফেয়ি মাজহাবের অনুসরণ করতে অসুবিধা নেই। কারণ, এর পক্ষেও বিরাটসংখ্যক সাহাবির মত রয়েছে। এই কথাগুলো উল্লেখ রয়েছে জামিউল ফতোয়া গ্রন্থে।'৩৮
টিকাঃ
৩৫. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ১/২১২-১১৩
৩৬. প্রাগুক্ত: ১/২৬৫-২৬৬
৩৭. হানাফি মাজহাবের মতে, এমতাবস্থায় বিয়ে করার সাথে সাথে স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে।
৩৮. আব্দুস শহীদ নাসীম অনূদিত মতবিরোধ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়, শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.), (প্রকাশনায়: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা, ৫ম প্রকাশ: ২০০৮), পৃষ্ঠা-১১১
📄 মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর অভিমত
তাকলিদ সম্পর্কে সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী (রহ.) (মৃ. ১৯৭৯ খ্রি.) বলেন-'আমার মতে, আলিমেদের সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিশুদ্ধ জ্ঞান হাসিলের চেষ্টা করা উচিত। এ গবেষণা কাজে অতীতের বড়ো বড়ো আলিমদের মতামত থেকেও সাহায্য নেওয়া উচিত। সকল পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে মতবিরোধপূর্ণ মাসয়ালাসমূহ বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে, অতীতের শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদগণের কার ইজতিহাদ কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। এভাবে যেটা সত্য বলে মনে হবে, সেটারই অনুসরণ করা উচিত।'৩৯
তিনি আরও বলেন-'যে ব্যক্তি নিজে খোদায়ি বিধান ও সুন্নতে রাসূল সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি রাখে না, তার জন্য ইমামের অনুসরণের বিকল্প নেই। বিজ্ঞ ইমামদের মধ্যে যার প্রতি তার আস্থা হয়, তাঁর প্রদর্শিত পন্থারই সে অনুসরণ করতে পারে। তবে কেউ যদি তাদের হুকুমদাতা মনে করে, বিশ্বাস করে-ইমামের প্রদর্শিত পথ থেকে দূরে যাওয়ার অর্থ হলো দ্বীন থেকে বিমুখ হওয়া। ফলে কোনো মাসয়ালায় সহিহ হাদিস ও কুরআনের বিপরীত আমল পাওয়া সত্ত্বেও তার অনুসরণে অবিচল থাকে, তাহলে এটা নিঃসন্দেহে শিরক হবে।'৪০
টিকাঃ
৩৯. রাসায়েল ও মাসায়েল: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৩-১৪৪
৪০. প্রাগুক্ত
📄 শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি (রহ.)-এর অভিমত
শাইখ আলবানিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-'তাকলিদ হারাম হওয়ার দলিল কী?' তিনি উত্তরে বলেন-
لا أعلم دليلا على تحريم التقليد بل التقليد لا بد منه لمن لا علم عنده، وقد قال الله تعالى : ( فسئلوا أهل الذكر إن كنتم لا تعلمون) فهذه الآية جعلت المسلمين من العلم قسمين: ا. عالم وأوجب عليه أن يجيب السائل .. غير عالم وأوجب عليه أن يسأل العالم فلو كان رجلا من عامة الناس جاء لعالم فسأله فأجابه العالم فقد طبق هذا الرجل هذه الآية
'তাকলিদ হারাম হওয়ার কোনো দলিল আমার জানা নেই; বরং যে জানে না, তার তাকলিদ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "যদি তোমরা না জানো, তাহলে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞেস করো।" সূরা আম্বিয়া : ৭
এই আয়াতে ইলমের ভিত্তিতে মুসলমানদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে- ১. আলিম: প্রশ্নকারীর উত্তর দেওয়া তার জন্য ওয়াজিব ও ২. অজ্ঞ: আলিমকে জিজ্ঞেস করা তার জন্য ওয়াজিব।
সাধারণ মানুষের কেউ যদি কোনো আলিমের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে এবং আলিম জবাব দেওয়ার পর (সে অনুযায়ী আমল করে), তাহলে ব্যক্তি কুরআনের এ আয়াত অনুযায়ী কাজ করল।'৪১
টিকাঃ
৪১. আরশিফুল মুলতাকা আহলুল হাদিস: ১, ১/৩৬০
📄 শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.)-এর অভিমত
শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ বিন মুহাম্মাদ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন- أن يكون المقلد عامياً لا يستطيع معرفة الحكم بنفسه ففرضه التقليد؛ لقوله تعالى:{فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ}-
'মুকাল্লিদ একজন সাধারণ মানুষ। সে নিজ থেকে (শরিয়াহর) বিধিবিধান জানতে সক্ষম নয়। তাই তার কর্তব্য হচ্ছে তাকলিদ করা। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-"যদি তোমরা না জানো, তাহলে আহলে কিতাবদের জিজ্ঞেস করো।"'৪২
তিনি আরও বলেন-'যে ব্যক্তি সরাসরি উসুল দ্বারা সত্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম নয়, তার কর্তব্য হচ্ছে তাকলিদ করা।'৪৩
সারকথা
বিজ্ঞ আলিমদের কাছ থেকে আমরা যা জানলাম, তার সারকথা হচ্ছে- ১. সাধারণ ব্যক্তির জন্য কোনো না কোনো ইমামের তাকলিদ করা জরুরি। তবে নির্দিষ্ট কোনো মাজহাবের অনুসরণ জরুরি নয়; বরং যে মতের ওপর ব্যক্তির মনে প্রশান্তি অনুভূত হয়, সে মতের ওপর আমল করা উত্তম।
২. দলিল গ্রহণে সক্ষম আলিমের জন্য অনুসন্ধান ছাড়া কারও তাকলিদ করা জায়েজ নেই। তবে অনুসন্ধান করার সময় না পেলে তাকলিদ করা জায়েজ।
৩. সৎ ও দ্বীনি উদ্দেশ্যে এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাবে প্রত্যাবর্তন করা জায়েজ। তবে দুনিয়ার লোভে ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণার্থে মাজহাব পরিবর্তন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৪. এক মাজহাব অনুযায়ী আমল শুরুর পর অন্য মাজহাবের তাকলিদ করা জায়েজ।
৫. শক্তিশালী দলিল পাওয়ার পরও কেউ যদি ইমামের তাকলিদ করে, দলিলের ভিত্তিতে আমল না করে-তাহলে সে জালিম হিসেবে গণ্য হবে। আখিরাতে আল্লাহর দরবারে তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
টিকাঃ
৪২. আল উসুল মিন ইলমিল উসুল: ১/৮৭
৪৩. লিকাউল বাবে মাফতুউ: ৯৪/২২