📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 তাকলিদের সংজ্ঞা

📄 তাকলিদের সংজ্ঞা


মুমিন সর্বদাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে। এই অনুসরণের জন্য কুরআন-হাদিস ও অন্যান্য শরয়ি ইলম যথেষ্ট পরিমাণ অর্জন করা জরুরি। যাতে নিজেই কুরআন-সুন্নাহ থেকে আহকাম বের করে তার ওপর আমল করতে পারে। আর যদি এই পরিমাণ জ্ঞান না থাকে, তাহলে এমন কারও অনুসরণ করবে, যার এসব বিষয়ের ওপর পূর্ণ দখল আছে। শরিয়তে এটাকেই তাকলিদ বলা হয়।
ফকিহদের বক্তব্য হচ্ছে- التَّقْلِيدُ بِأَنَّهُ الْعَمَلُ بِقَوْلِ مَنْ لَا يَعْرِفُ دَلِيْلَهُ 'যার দলিল জানা নেই, তার জন্য (অন্যের) উক্তির অনুসরণ করে আমল করার নাম তাকলিদ।'২৬
তাকলিদ দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা; ইমামের অনুসরণ করা নয়। তাই এই মানসিকতা নিয়ে তাকলিদ করতে হবে-যদি আমার ইমামের বিপরীতে কোনো সহিহ হাদিস পাই, তাহলে তাঁর অনুসরণ বাদ দিয়ে হাদিসের অনুসরণ করব।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সহ চার ইমামের বক্তব্য ছিল-
إِذَا صَحَ الْحَدِيثُ فَهُوَ مَذْهَبِي
'সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে সেটাই আমার মাজহাব।'২৭
ইমাম মালেক (মৃ. ১৭৯ হি.) বলেন-
إِذَا صَحَ الْحَدِيثُ فَخُذُوا بِهِ وَدَعُوا قَوْلِي
'সহিহ হাদিস পেলে সেটাকে আঁকড়ে ধরো এবং আমার মত পরিত্যাগ করো।'২৮
ইমাম শাফেয়ি (মৃ. ২০৪ হি.) বলেন-
إِذَا صَحَ الْحَدِيثُ خِلَافَ قَوْلِي فَاعْمَلُوا بِالْحَدِيثِ
'আমার কথার বিপরীতে সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে, তোমরা হাদিসের ওপরই আমল করো।'২৯
ইমামদের বক্তব্য থেকে জানা গেল, কোনো মাসয়ালায় ইমামের বিপরীতে সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে, তা অনুযায়ী আমল করাই তাঁর মাজহাব বলে বিবেচিত হবে। যেহেতু তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে- 'সহিহ হাদিসের ওপর আমল করাই আমার মাজহাব।'
তাকলিদের মূল উদ্দেশ্য কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা। ইমামের অনুসরণ করা উদ্দেশ্য নয়। তাই নির্দিষ্ট ইমাম বা মাজহাবের অনুসরণ করাও কারও জন্য জরুরি নয়; বরং ইমামদের মধ্য থেকে যার মতটি কুরআন-সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী মনে হবে, যার মতের ওপর হৃদয়ের প্রশান্তি অনুভূত হবে, তাঁর মতের ওপরই আমল করবে। এ বিষয়ে চার মাজহাবের প্রসিদ্ধ কিছু ইমামের মতামত আমরা এখানে উল্লেখ করব, ইনশাআল্লাহ!

টিকাঃ
২৬. তাফসিরে মানার: ১২/১৮২
২৭. ইবনু হাজার আসকালানি, তালখিসুর হাবির: ১/২০; আদ-দুররুল মুখতার: ১/৩৮৫
২৮. তাফসিরে কুরতুবি: ৫/২২৭
২৯. নাইলুল আওতার: ২/১১০

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 আল্লামা শামি (রহ.)-এর অভিমত

📄 আল্লামা শামি (রহ.)-এর অভিমত


ইমাম শামি (রহ.) বলেন-
وَقَدْ شَاعَ أَنَّ الْعَامِيَّ لَا مَذْهَبَ لَهُ - 'সাধারণ মানুষের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ কথা হলো, তাদের কোনো নির্দিষ্ট মাজহাব নেই।'৩০

টিকাঃ
৩০. ইবনে আবিদিন আশ-শামি (মৃ ১২৫২ হি.), হাশিয়াতু রুদ্দুল মুহতার: ১/৫২

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ইমাম ইবনে হুমাম (রহ.)-এর অভিমত

📄 ইমাম ইবনে হুমাম (রহ.)-এর অভিমত


ইমাম ইবনে হুমাম (রহ.)-এর উক্তি উদ্ধৃত করে ইবনে আবিদিন আশ-শামি (রহ.) বলেন-
إِنْ أَخَذَ الْعَامِيُّ بِمَا يَقَعُ فِي قَلْبِهِ أَنَّهُ أَصْوَبُ أَوْلَى، وَعَلَى هَذَا اسْتَفْتَى مُجْتَهِدَيْنِ فَاخْتَلَفَا عَلَيْهِ الْأَوْلَى أَنْ يَأْخُذَ بِمَا يَمِيلُ إِلَيْهِ قَلْبُهُ مِنْهُمَا. وَعِنْدِي أَنَّهُ لَوْ أَخَذَ بِقَوْلِ الَّذِي لَا يَمِيلُ إِلَيْهِ جَازَ؛ لِأَنَّ مَيْلَهُ وَعَدَمَهُ سَوَاءٌ، وَالْوَاجِبُ عَلَيْهِ تَقْلِيدُ مُجْتَهِدٍ وَقَدْ فَعَلَ -
'যে মতকে ব্যক্তির কাছে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মনে হবে, সে মতের ওপর আমল করাই সাধারণ মানুষের জন্য উত্তম। যদি একই ব্যাপারে দুইজন মুজতাহিদ ভিন্ন ভিন্ন ফতোয়া দেন, তাহলে যে ফতোয়ার প্রতি তার মন আকৃষ্ট হবে, তার ওপর আমল করাই উত্তম বিবেচিত হবে। আমার মতে, যে ফতোয়ার ওপর তার মন আকৃষ্ট হয়নি; ব্যক্তি যদি সে মতের ওপরও আমল করে, তাহলেও তা জায়েজ হবে। কেননা, তার মন আকৃষ্ট হওয়া কিংবা না হওয়া উভয়ই সমান। তার জন্য শুধু মুজতাহিদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। আর তা তো সে করেছেই।'৩১

টিকাঃ
৩১. প্রাগুক্ত

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 আল্লামা শুরুনবুলালি (রহ.)-এর অভিমত

📄 আল্লামা শুরুনবুলালি (রহ.)-এর অভিমত


আল্লামা শুরুনবুলালি (রহ.) বলেন-
أَنَّهُ لَيْسَ عَلَى الْإِنْسَانِ الْتِزَامُ مَذْهَبٍ مُعَيَّنٍ، وَأَنَّهُ يَجُوزُ لَهُ الْعَمَلُ بِمَا يُخَالِفُ مَا عَمِلَهُ عَلَى مَنْ هَبِهِ مُقَلِدًا فِيْهِ غَيْرَ إِمَامِهِ مُسْتَجْمِعًا شُرُوطَهُ
'মানুষের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মাজহাবের অনুসরণ জরুরি নয়। নিজ মাজহাবের শর্তাবলি পালন সাপেক্ষ আংশিক মাসয়ালায় অন্য ইমামের মতের ওপর আমল করাও জায়েজ আছে।'
তিনি আরও বলেন-
إِنَّ لَهُ التَّقْلِيدُ بَعْدَ الْعَمَلِ كَمَا إِذَا صَلَّى ظَانَّا صِحَّتَهَا عَلَى مَنْ هَبِهِ ثُمَّ تَبَيَّنَ بُطَلَانُهَا فِي مَذْهَبِهِ وَصِحَّتُهَا عَلَى مَذْهَبِ غَيْرِهِ فَلَهُ تَقْلِيدُهُ. وَيَجْتَزِي بِتِلْكَ الصَّلَاةِ عَلَى مَا قَالَ فِي الْبَزَّازِيَّةِ: إِنَّهُ رُوِيَ عَنْ أَبِي يُوسُفَ أَنَّهُ صَلَّى الْجُمُعَةَ مُغْتَسِلًا مِنْ الْحَمَّامِ ثُمَّ أُخْبِرَ بِفَارَةٍ مَيِّتَةٍ فِي بِئْرِ الْحَمَّامِ فَقَالَ نَأْخُذُ بِقَوْلِ إِخْوَانِنَا مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ «إِذَا بَلَغَ الْمَاءُ قُلَتَيْنِ لَمْ يَحْمِلْ خَبَثًا -
'নিজ মাজহাবের ওপর আমল করার পরও অন্য মাজহাবের তাকলিদ করা যেতে পারে। যেমন: কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ার সময় ধারণা করল, এ নামাজ তার মাজহাবে শুদ্ধ; কিন্তু পরে জানতে পারল, এই নামাজ তার মাজহাব মতে শুদ্ধ হয়নি। তবে অন্য মাজহাব মতে শুদ্ধ হয়েছে, তাহলে সে অন্য মাজহাবের তাকলিদ করে নেবে। এতেই তার নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে।
ফতোয়ায়ে বাজজাজিয়াতে ইমাম আবু ইউসুফ সম্পর্কে বর্ণিত আছে, একবার তিনি হাম্মামখানার পানি দিয়ে গোসল করে জুমার নামাজ পড়লেন। পরে তাঁকে জানানো হলো, হাম্মামের কূপে মরা ইঁদুর পড়েছিল। তিনি বললেন-কোনো সমস্যা নেই। আজ আমরা মদিনার ভাইদের মতানুযায়ী আমল করব। পানির পরিমাণ দুই কল্লি (বড়ো মটকা) বা তার বেশি হলে তা নাপাক হয় না।'৩৪

টিকাঃ
৩৪. আদ-দুররুল মুখতার: ১/৭৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px