📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 মাসয়ালাসংক্রান্ত কিছু হাদিস উসমান (রা.)-এর জানা ছিল না

📄 মাসয়ালাসংক্রান্ত কিছু হাদিস উসমান (রা.)-এর জানা ছিল না


বিধবার নিজ ঘরে ইদ্দত১২ পালনসংক্রান্ত হাদিস উসমান (রা.)-এর জানা ছিল না। আবু সাইদ খুদরি (রা.) তাঁকে বললেন ফুরাইআ (রা.)-এর স্বামী মারা গেলে রাসূল তাকে বললেন-
امكثي فِي بَيْتِكِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ - ১৭
'ইদ্দত পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তোমার (স্বামীর) ঘরেই অবস্থান করো।'১৩ অতঃপর উসমান (রা.)-এ হাদিস গ্রহণ করলেন।

টিকাঃ
১২. ইদ্দত শব্দের অর্থ গণনা করা। স্বামীর মৃত্যুর পর কিংবা তালাকের পর একটি নির্দিষ্ট সময় স্ত্রীকে অন্যত্র বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে হয়, তাকে ইদ্দত বলে। স্বামীর মৃত্যু হলে ইদ্দত ৪ মাস ১০ দিন, স্ত্রী তালাক হলে ইদ্দত তিন হায়েজ। আর গর্ভবতী হলে ইদ্দত সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত।
১৩. আবু দাউদ: ২৩০০, নাসায়ি ৩৫২৮, ইবনে মাজাহ : ৩৯৬২

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 বিধবার ইদ্দতকালসংক্রান্ত হাদিস আলি (রা.)-এর জানা ছিল না

📄 বিধবার ইদ্দতকালসংক্রান্ত হাদিস আলি (রা.)-এর জানা ছিল না


আলি ও ইবনে আব্বাস (রা.) মনে করতেন, স্ত্রী লোকের দুই ইদ্দত১৪ একত্র হলে দীর্ঘতম ইদ্দত পালন করতে হয়। পরে তাঁদের জানানো হলো, সুবাইআ (রা.)-এর গর্ভাবস্থায় তাঁর স্বামী সাদ ইবনে খাওলা মারা গেলে রাসূল বললেন- 'তাঁর ইদ্দত হচ্ছে সন্তান প্রসব পর্যন্ত।'১৫
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন- 'সাহাবিদের থেকে এরূপ ঘটনার সংখ্যা অগণিত। আর সাহাবি ছাড়া অন্যদের থেকে বর্ণিত এরূপ ঘটনার সংখ্যা হাজার হাজার, যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।'১৬
উম্মাহর মধ্যে উল্লিখিত সাহাবিগণই হলেন সর্বাধিক জ্ঞানী, ফকিহ, বুদ্ধিমান ও তাকওয়ার অধিকারী। তাঁদেরই যদি কিছু হাদিস অজানা থাকে, তাহলে পরবর্তীদের হাদিস অজানা থাকা বিচিত্র কিছু নয়।

টিকাঃ
১৪. এখানে দুই ইদ্দত বলতে সন্তান প্রসবের ইদ্দত ও স্বামীর মৃত্যুর ফলে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য পালিত ইদ্দতকে বোঝানো হয়েছে।
১৫. বুখারি: ৪৯০৯, ৫৩১৯; মুসলিম: ১৪৮৫
১৬. ইবনে তাইমিয়া, রাফউল মালাম, পৃষ্ঠা-১৭

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 মতবিরোধের কারণ

📄 মতবিরোধের কারণ


উপর্যুক্ত প্রমাণাদি থেকে সুস্পষ্ট হলো, আহকামসংক্রান্ত সকল হাদিস কারও জানা ছিল না। জানা থাকা সম্ভবও নয়। অতএব, ব্যক্তি যত বড়ো আলিম বা জ্ঞানী হোক না কেন, তাঁর বর্ণিত ফতোয়ার বিপরীতে সহিহ হাদিস পাওয়া গেলে তার ওপর আমল করতে হবে। ফতোয়া প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
ইমামের হাদিস অজানা থাকতে পারে না, তাঁর ভুলও হতে পারে না-আমাদের এই ধারণা আদৌ সত্য নয়। কেননা, রাসূল বলেছেন-
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَائِينَ التَّوَّابُوْنَ
‘প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তওবাকারী।’১৭
এই হাদিসের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, মানুষ মানেই ভুলকারী। কেউ ভুলের উর্ধ্বে নয়। ইমামগণ গভীর জ্ঞানের অধিকারী হলেও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাই আদম সন্তান হিসেবে ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বা দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তারাও ভুলের শিকার হতে পারেন।
তবে সর্বজনস্বীকৃত কথা হলো, কোনো ইমাম ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নতের খেলাফ কোনো কাজ করেননি। কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী ফতোয়া দেননি। রাসূল ﷺ-এর অনুসরণ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে তাঁরা সবাই একমত। এ ব্যাপারেও তাঁরা একমত- ‘আমার মাজহাবের বিপরীতে সহিহ হাদিস পেলে তার ওপর আমল করতে হবে। আমার মত প্রত্যাখ্যান করতে হবে।’
কুরআন-হাদিস থেকে মাসয়ালা বের করতে গিয়ে বিভিন্ন কারণে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) রাফউল মালাম গ্রন্থে ইমামদের মতবিরোধ করার বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। আমি তা থেকে কয়েকটি পাঠকের সমীপে তুলে ধরছি।
এক. ইমামদের মধ্যে মতবিরোধের প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে, তাঁর কাছে হাদিসটি পৌছেনি। আর যার কাছে হাদিস পৌঁছেনি, তাকে সব হাদিস জানতে বাধ্য করা যায় না। হাদিস না জানার কারণে তিনি কুরআনের আয়াতের প্রকাশ্য বক্তব্য, অন্য হাদিস, কিয়াসের চাহিদা অথবা ইসতিসহাব (কোনো বস্তুর মৌল গুণ) অনুসারে রায় প্রদান করেছেন। তার এই রায় অজানা হাদিসের অনুকূলেও হতে পারে, আবার প্রতিকূলেও যেতে পারে; কিন্তু অন্য ইমামের কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে বিধায় তিনি উক্ত হাদিস অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। যার ফলে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
আমাদের সমাজে অনেকেই বলেন-ইমাম আবু হানিফা জানতেন না, এমন হাদিস তোমরা জেনে ফেলেছ? তোমরা কি ইমাম আবু হানিফার চেয়েও বড়ো হয়ে গেছ? ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই মূলত তারা এমন কথা বলেন। সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ!
দুই. হাদিসটি ইমামের কাছে পৌঁছেছে, কিন্তু নানা কারণে হাদিসটিকে তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। হয়তো হাদিস বর্ণনাকারী ইমামের নিকট মাজহুল, অপরিচিত, মিথ্যা বর্ণনাকারী অথবা দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী হিসেবে অভিযুক্ত ছিলেন। হয়তো সনদের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়ে হাদিসটি তার কাছে পৌঁছেনি। বিচ্ছিন্ন সনদে পৌঁছার কারণে তিনি তা গ্রহণ করেননি, কিন্তু অন্য ইমামের কাছে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা মুত্তাসিল সনদে হাদিসটি পৌঁছেছে। তাই তিনি তা গ্রহণ করেছেন। ফলে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।
তিন. হাদিস বর্ণনাকারীর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে এক ইমাম এক রকম জানেন। অন্য ইমাম জানেন আরেক রকম। তাঁকে জানার ওপর নির্ভর করে তাঁরা তাঁর হাদিসের মান নির্ণয় করেছেন। এতে একজন তাঁর হাদিস গ্রহণ করেছেন, অন্যজন বর্জন করেছেন। ফলে হাদিস জানার পরও তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে।
চার. খবরে ওয়াহিদ (মুতাওয়াতির কিংবা মাশহুর নয় এমন হাদিস)-এর বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী হলেও তাঁর হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে কতক ইমাম আলাদা কিছু শর্ত জুড়ে দেন, কিন্তু অন্য ইমামরা তার বিরোধিতা করেন। ফলে মতভেদের উদ্ভব হয়।
পাঁচ. হাদিসটি ইমামের কাছে পৌঁছেছে। রাসূলের হাদিস বলেও তা তাঁর কাছে প্রমাণিত, কিন্তু তিনি হাদিসটি ভুলে গেছেন।
ছয়. ইমামদের একজন হাদিসের চাহিদা বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। অন্যজন জ্ঞাত ছিলেন। ফলে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে।
সাত. ইমাম হাদিস সম্পর্কে জ্ঞাত; কিন্তু তিনি মনে করেন, হাদিসটি এ উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়নি; অন্য উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে অন্য ইমাম হাদিসটিকে এ উদ্দেশ্যেই নিয়েছেন, ফলে মতপার্থক্য হয়েছে।
আট. এক ইমাম হাদিসটিকে কোনো এক মাসয়ালার দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। অথচ তাঁর বিপক্ষের দলিল প্রমাণ করে, হাদিসটি উক্ত মাসয়ালার দলিল নয়। তাই অন্য ইমাম সে মাসয়ালার দলিল হিসেবে এই হাদিস গ্রহণ করেননি, ফলে মতভেদ হয়েছে।
নয়. হাদিসটির বিপক্ষে এমন কিছু দলিল রয়েছে, যা প্রমাণ করে হাদিসটি দুর্বল কিংবা রহিত হয়ে গেছে অথবা ব্যাখ্যা করে হাদিসকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তাই এক ইমাম এ হাদিসকে গ্রহণ করেননি, কিন্তু অন্য ইমামের কাছে এর বিপক্ষের দলিলগুলোকে দ্বান্দ্বিক মনে হয়নি। এজন্য তিনি হাদিসটি গ্রহণ করেছেন, ফলে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
দশ. ইমাম কোন দলিলের ভিত্তিতে হাদিসের ওপর আমল বর্জন করেছেন, তা আমাদের জানা নেই। পরবর্তী ইমামগণও তাঁর হাদিস বর্জনের কারণ জানতে পারেননি। ফলে তাঁরা যে দলিল পেয়েছেন, সে অনুযায়ীই ফতোয়া দিয়েছেন。
ইমাম হিসাম ইবনে ইউসুফ (রহ.)-কে (মৃ. ২১৫ হি.) প্রশ্ন করা হলো-'ইমাম আবু হানিফার সাথে আপনার এত মতপার্থক্য কেন?' তিনি উত্তরে বললেন-'ইমাম আবু হানিফার সাথে আমাদের মতপার্থক্যের কারণ হচ্ছে, আবু হানিফা এমন জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন, যা আমরা অর্জন করতে পারিনি। তিনি তাঁর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দিয়ে যা বুঝতেন, আমরা তা বুঝতে পারিনি। আর না বোঝার কারণে আমরা তাঁর মতানুসারে ফতোয়া দিইনি।'১৮

টিকাঃ
১৭. ইবনে মাজাহ: ৪২৫১
১৮. আবু হানিফা, আল ফিকহুল আকবার, পৃষ্ঠা-১৫৯; ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, আল-ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা, (প্রকাশক: উসামা খোন্দকার, আস-সুন্নাহ পাবলিকেশনস, ঝিনাইদহ, ২০১৪ খ্রি.) পৃষ্ঠা-২৯৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px