📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ইফতিরাক বনাম ইখতিলাফ

📄 ইফতিরাক বনাম ইখতিলাফ


ইফতিরাক (الإفتراق) শব্দটি আরবি 'ফারক' থেকে গৃহীত। এর অর্থ-দলাদলি করা, বিভক্ত হওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি। এটি 'ইজতিমা' (الإِجْتِمَاعُ) তথা জামাত, ঐক্যের বিপরীত। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
'তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো। আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।' সূরা আলে ইমরান : ১০৩
ইফতিরাকের নিকটবর্তী আরেকটি শব্দ হলো ইখতিলাফ (الإِخْتِلَافُ)। এর অর্থ মতভেদ করা, মতানৈক্য করা, মতবিরোধ করা ইত্যাদি। ইখতিলাফ শরিয়তে নিষিদ্ধ বা নিন্দনীয় নয়; বরং তা অনেক সময় প্রশংসিত হয়, কিন্তু ইফতিরাক সর্বদা নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয়।
কুরআন-হাদিসে বহু জায়গায় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনৈক্য ও দলাদলি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ
'যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো দায়িত্ব তোমার নয়। তাদের বিষয় আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত।' সূরা আনআম : ১৫৯
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন-
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ -
'তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরও বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং মতভেদ করেছে। তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।' সূরা আলে ইমরান: ১০৫
কুরআনে আরও ইরশাদ হচ্ছে-
وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ -
'তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল।' সূরা রূম: ৩২
রাসূল সাহাবায়ে কেরামদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন-
عَلَيْكُمْ بِالجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالفُرْقَةَ -
'তোমরা জামাত (ঐক্য) আঁকড়ে ধরবে এবং দলাদলি ও বিচ্ছিন্নতা থেকে দূরে থাকবে।'১
রাসূল সাহাবাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে বলেন- 'আমার পরে অনেক ফিতনা দেখা দেবে। এ সময় যাকে দেখবে মুসলমানদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অথবা মুহাম্মাদ-এর উম্মতকে বিভক্ত করতে চাচ্ছে, সে যে-ই হোক তোমরা তাকে হত্যা করবে।'২
রাসূল আরও বলেন- 'পূর্ববর্তী উম্মতদের ব্যাধি তোমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। তা হলো হিংসা ও বিদ্বেষ। আর বিদ্বেষ হচ্ছে মুণ্ডনকারী। আমি বলব না তা মাথার চুল মুণ্ডন করে; বরং তা দ্বীন মুণ্ডন করে।'৩
এসব আয়াত-হাদিস থেকে বিভক্তি ও দলাদলির ভয়াবহতা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
ইখতিলাফ বা মতভেদ দুই ধরনের। আকিদাগত মতভেদ ও ফিকহি মতভেদ। সাহাবিদের যুগ থেকেই এ দুই ধরনের মতভেদ চলে আসছে। আকিদাগত মতভেদ নিন্দনীয় ও দূষণীয় হওয়ায় তারা তা বর্জন করেছেন। কারণ, এটি অপরিবর্তনীয় ও স্থির। এখানে ইজতিহাদ করে কুরআন ও হাদিসের বাইরে কোনো মত বা আকিদা আবিষ্কারের সুযোগ নেই; কিন্তু ফিকহি মতভেদ দূষণীয় ও নিন্দনীয় নয়। তাই তারা তা বর্জন করেননি, তা বর্জনীয় বলে গণ্য করেননি। এক্ষেত্রে তাঁরা নিজের মতের পক্ষে দলিল পেশ করতেন, কিন্তু অন্যের মতকে বাতিল করতেন না। সুন্নত-মুস্তাহাব, ফরজ-ওয়াজিব; এমনকী হালাল-হারাম নিয়ে মতভেদ করা সত্ত্বেও তাঁরা একে অন্যকে অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়ন করতেন না। নিজের মত গ্রহণের জন্য কাউকে বাধ্য করতেন না। তারা ভিন্নমতসহ পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখতেন।
অথচ আজ আমরা ফিকহি মতভেদ নিয়ে মারমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি। একে অন্যকে আক্রমণাত্মক কথা বলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ছি। ফিকহি দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে আহলে হাদিস ও মাজহাবি নামে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ছি।
যেসব মতভেদ নিয়ে আমরা শত্রুতায় লিপ্ত হচ্ছি-তা শুধু চার ইমামের যুগে ছিল না, সাহাবিদের যুগেও ছিল। সাহাবিদের সোনালি যুগ থেকেই সে মতবিরোধ শুরু হয়েছে। আজও চলছে। কিয়ামত পর্যন্ত তা চলমান থাকবে।
মতবিরোধ একটি মানবিক প্রকৃতি। মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই একটি কাজে দুজন মানুষ কখনো শতভাগ একমত হয় না; হতে পারে না। পরিবার থেকে রাষ্ট্র প্রত্যেক জায়গায় মতভেদ বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে মতভেদ বা মতবিরোধ দূষণীয় নয়। দূষণীয় হচ্ছে শরিয়াহর ছোটোখাটো বিষয়ে মতবিরোধ করে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়া। মতবিরোধকারী যখন শুধু নিজের মতকে হক মনে করে, অন্য মতকে মনে করে বাতিল, ভিন্নমতের অনুসারীদের ভাবে প্রতিপক্ষ, তখনই ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। দলাদলি শুরু হয়। মূলত ইসলামে কর্মের অমিল দূষণীয় নয়, কিন্তু মনের অমিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

টিকাঃ
১. তিরমিজি: ২১৬৫
২. নাসায়ি: ৪০২০
৩. তিরমিজি: ২৫১০

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ইস্তেঞ্জা

📄 ইস্তেঞ্জা


মলমূত্র ত্যাগের পর পবিত্রতা অর্জন করা ইসলামের অন্যতম বিধান। পবিত্রতা অর্জনের জন্য রাসূল ﷺ অধিকাংশ সময় শুধু পানি ব্যবহার করেছেন।১৩৮ আবার কখনো ব্যবহার করেছেন শুধু ঢেলা-কুলুখ। সাহাবিদেরও তিনি এমনটা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।১৩৯ কুলুখের পর পানি ব্যবহারের কথাও কিছু কিছু দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে।১৪০

এই তিন পদ্ধতিতে রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবিরা পবিত্রতা অর্জন করেছেন। কিন্তু ইস্তেঞ্জার সময় 'ঢেলা-কুলুখ' ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁরা কখনো উঠে দাঁড়াননি। হাঁটাচলা, লাফালাফি, গলা খাঁকারি দেননি। প্রস্রাব বা পায়খানা উভয় ক্ষেত্রেই তাঁরা স্বাভাবিকভাবে বসে ঢেলা-কুলুখ, পানি অথবা দুটোই ব্যবহার করে পবিত্রতা অর্জন করেছেন, এটাই সুন্নত পদ্ধতি।

কিন্তু প্রস্রাব শেষে উঠে হাঁটাহাঁটি করা, লাফালাফি করা, ৪০ কদম হাঁটা ইত্যাদিকে আমরা সুন্নত মনে করি। অথচ তা আদৌ সুন্নত নয়। কেউ বলতে পারেন, ইস্তেঞ্জার পর এ রকম না করলে প্রস্রাব কাপড়ে লাগার আশঙ্কা থাকে। তাই নিশ্চিতভাবে পবিত্র হওয়ার জন্য এমন করা প্রয়োজন।

তাদের উদ্দেশ্যে বলব, প্রস্রাব কাপড়ে লাগার আশঙ্কায় এমন সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কোনো বিধান রাসূল ﷺ দেননি। এ ছাড়া আমরা মলত্যাগের সময়ও প্রস্রাব করি। তখন তো কেউ হাঁটাহাঁটি করি না। তাহলে শুধু প্রস্রাবের সময় কেন এমনটা করা জরুরি মনে করি?

এটা মূলত মনের ওয়াসওয়াসা কিংবা অভ্যাসগত কারণে করে থাকি।

তবে সব মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজনীয়তা সমান নয়, তাই একান্ত প্রয়োজন হলে মানুষের আড়ালে একটু হাঁটা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের সামনে কুলুখ হাতে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা, গল্প করা, মাটিতে জোরে জোরে পা মারা, বিশেষ অঙ্গ নাড়ানো, পায়চারি করা শুধু সুন্নত পরিপন্থি নয়; বরং তা ভদ্রতা, সভ্যতা, সুরুচি, লজ্জা ও পর্দারও বিপরীত। ইসলাম আমাদের এমন নির্লজ্জতা শিক্ষা দেয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কোনো গ্রন্থেও এমন নির্লজ্জ কাজের শিক্ষা পাওয়া যায় না। অথচ আমরা মাজহাবের নামে এসব করে যাচ্ছি।

টিকাঃ
১৩৮. মুসলিম, ১/২২৭: ২৭০; আবু দাউদ: ৪৩; তিরমিজি: ১৯; নাসায়ি : ৪৬
১৩৯. বুখারি : ১৫৬, মুসলিম: ২৬২, তিরমিজি: ১৬, আবু দাউদ: ৭
১৪০. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি, (প্রকাশক: উসামা খোন্দকার, আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ৪র্থ প্রকাশ, ২০১৩): পৃষ্ঠা-৪৭৬

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 ধূমপান করা

📄 ধূমপান করা


ধূমপান করা যেসব জিনিস হারাম হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, তা সর্বাবস্থায় হারাম। আর যেসব জিনিস হারাম হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে স্পষ্ট বর্ণনা নেই; বরং তা ইজতিহাদ ও কিয়াসের ওপর নির্ভরশীল, স্থান কাল পাত্রভেদে তার বিধানও পরিবর্তন হতে পারে।

বিড়ি-সিগারেট পরবর্তী যুগের আবিষ্কার। তাই কুরআন-হাদিসে এর বিধান বর্ণিত হয়নি। পূর্ববর্তী আলিমগণ এটাকে মাকরুহ মনে করতেন। তাদের অনেকে এতে অভ্যস্তও ছিলেন। সিলেট অঞ্চলের বড়ো বড়ো আলিমদের যারা ধূমপান মাকরুহ বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন; তাদের ইলম, আমল, দ্বীনদারি ও তাকওয়ার ব্যাপারে কোনোরূপ সন্দেহ করার সুযোগ নেই।

হাদিসে কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।১৫৪ কারণ, এর দুর্গন্ধে মানুষের কষ্ট হয়। এই কাজটি শরিয়তে মাকরুহ। সম্ভবত বিড়ি-সিগারটের দুর্গন্ধকে এর ওপর কিয়াস করে তারা ধূমপান করা মাকরুহ হওয়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা এর ক্ষতিকর দিকগুলো জানতেন না।

আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে আজ আমরা জানি, ধূমপান শুধু দুর্গন্ধের কারণ নয়; এর ফলে ব্যক্তি যক্ষ্মা, ফুসফুস ক্যান্সার, যৌনক্ষমতা হ্রাস, চেহারা ফ্যাকাসে, অকালে দাঁত নষ্ট, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি নানা ধরনের মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ শুধু ধূমপানের কারণে মারা যায়। তাই ধূমপান করা স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করার শামিল।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُم - 'তোমরা (কোনো পন্থায়) নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না।' সূরা নিসা : ২৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ 'তোমরা নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।' সূরা বাকারা: ১৯৫

রাসূল ﷺ বলেন- لَا ضَرَرَ وَلَا صِرَارَ 'অন্যের ক্ষতি করা যাবে না, নিজেও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া যাবে না।'১৫৫

সাদাপাতা, জর্দারও একই হুকুম। আমাদের শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মুসলিম জাতির গর্ব ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারকে একদিন ক্লাসে প্রশ্ন করা হয়েছিল- 'স্যার, জর্দা খাওয়ার হুকুম কী?' তিনি উত্তরে বললেন- 'বিড়ি-সিগারেটের যে হুকুম, জর্দারও একই হুকুম। অর্থাৎ হারাম।'

কেননা, এগুলো নেশাজাতীয় দ্রব্য। রাসূল ﷺ বলেন- كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ - 'নেশা সৃষ্টিকারী প্রত্যেক বস্তুই হারাম।'১৫৬

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা (খমর) বা মদকে হারাম করেছেন।১৫৭ যদিও খমরের সাধারণ অর্থ-মদ, কিন্তু সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যকেই খমর বলে। উমর (রা.) বলেন- الْخَمْرُ مَا خَمَرَ الْعَقَلَ - 'যেসব জিনিস বিবেক-বুদ্ধিকে আক্রান্ত করে ও দাবিয়ে রাখে, তা- ই হলো খমর।'১৫৮

কেউ কেউ বলেন-বিড়ি-সিগারেট মদের মতো নেশা সৃষ্টি করে না। তাই এটা হারাম নয়। তাদের এই যুক্তি সঠিক নয়। দুয়েকটি বিড়ি-সিগারেট খেলে নেশা হয় না ঠিক: কিন্তু কেউ যদি একসাথে ১০/১২টা সিগারেট খায়, একসাথে এক পাতা জর্দা খায়, তাহলে অবশ্যই সে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে শরিয়ত প্রণেতার বক্তব্য হচ্ছে- مَا اسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيْلُهُ حَرَামٌ - 'যে জিনিসের বেশি পরিমাণ নেশাগ্রস্ত করে, তার স্বল্প ব্যবহারও হারাম।'১৫৯

তা ছাড়া বিড়ি-সিগারেট নিকৃষ্ট বস্তু। শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক নিকৃষ্ট বস্তু হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ - 'আর তিনি তাঁদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ হালাল করে দেন। আর হারাম করেন নিকৃষ্ট ও অপবিত্র বস্তুসমূহ।' সূরা আ'রাফ: ১৫৭

ডাক্তার জাকির নায়েক এক লেকচারে বলেছেন- 'বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৪০০ আলিম বিড়ি-সিগারেট খাওয়া হারাম হওয়ার ব্যাপারে ফতোয়া দিয়েছেন।'১৬০

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) বলেন- 'ধূমপান সম্পর্কে হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। প্রায় হাজার বছর পর এটির উদ্ভব হয়েছে। তাই প্রথমদিকে আলিমগণ এটা নিয়ে কিছুটা মতভেদ করেছেন। কেউ স্বাভাবিকভাবে বৈধ বলেছেন। আবার কেউ কেউ দুর্গন্ধ ইত্যাদির দিকে লক্ষ রেখে মাকরুহ বলেছেন; কিন্তু সময়ের আবর্তনে ধূমপানের অপকারিতাগুলো যখন স্পষ্ট হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সকল আলিম এটাকে হারাম বলেছেন। এটা একটা পাপ এবং বড়ো গুনাহের কাজ।'১৬১

আলিমদের অনেকে সাদাপাতা ও জর্দা খান। এগুলো খাওয়াকে তারা জায়েজ মনে করেন। অথচ ওপরের দলিলগুলো দ্বারা এগুলো খাওয়া হারাম বলে স্পষ্ট প্রমাণিত। ধূমপান, সাদাপাতা, তামাক, জর্দা সন্দেহাতীতভাবে হারাম প্রমাণিত হওয়ার পরও যারা পূর্ববর্তী আলিমদের দোহাই দিয়ে মাকরুহ ফতোয়া দেন, এগুলোকে হালাল রাখার অপচেষ্টা করেন, তাদের উদ্দেশ্যে রাসূল ﷺ বলেছেন- يَشْرَبُ نাসٌ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا ‘(ভবিষ্যতে) আমার উম্মতের কিছু লোক মদ্য পান করবে, কিন্তু তারা এর অন্য নাম দেবে।’১৬২

এ হাদিসের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হচ্ছে বিড়ি-সিগারেট, সাদাপাতা, জর্দা ইত্যাদি। এগুলোকে মদ বলা হয় না সত্য, কিন্তু এসবের মাঝে পূর্ণ মাত্রায় মাদকতা বিদ্যমান।

অতএব, ধূমপান, তামাক, সাদাপাতা, জর্দা ইত্যাদি মাদকের অর্ন্তভুক্ত। পূর্ববর্তী আলিমগণ যদি এগুলোর ক্ষতিকর দিক জানতেন, জানতেন এসবে মাদকতা আছে, তাহলে তারা কখনোই মাকরুহ ফতোয়া দিয়ে এগুলোকে হালকাভাবে দেখতেন না। তাই তাদের ফতোয়াকে সম্মান জানিয়ে আমাদের জন্য এসব বস্তু ত্যাগ করা জরুরি।

টিকাঃ
১৫৪. মুসলিম: ৫৬৪; সিলসিলায়ে সহিহা লিল আলবানি: ২৩৮৯
১৫৫. ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; সিলসিলায়ে সহিহা: ২৫০
১৫৬. বুখারি: ৪৩৪৪, মুসলিম: ২০০২
১৫৭. সূরা মায়েদা : ৯০
১৫৮. নাওয়াদিরুল উসূল: ৩/২৫০
১৫৯. আবু দাউদ: ৩৬৮১, তিরমিজি: ১৮৬৫
১৬০. www.Youtube.com/Ajad Feni আপলোড তারিখ-৯/৪/২০১৭
১৬১. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, জিজ্ঞাসা, ও জবাব ৩য় খণ্ড: পৃষ্ঠা-৯১-৯২
১৬২. নাসায়ি: ৫৬৫৮, ইবনে মাজাহ : ৩৩৮৫

📘 প্রচলিত মানহাজ 📄 জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া

📄 জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া


জানাজা নামাজে রাসূল ﷺ-এর সূরা ফাতিহা পড়ার কথা কোনো সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়নি। ২৮৮ তবে সাহাবিদের সূরা ফাতিহা পড়ার কথা একাধিক সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়।

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَوْفٍ، قَالَ: صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَا بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ: لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ
তালহা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- 'আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর পেছনে জানাজার সালাত আদায় করলাম। তিনি তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন। (সালাত শেষে) তিনি বললেন-আমি সূরা ফাতিহা পাঠ করেছি, যাতে লোকেরা জানতে পারে, এটাও সুন্নত।'২৮৯

অন্য বর্ণনায় আছে-
إِنَّهُ مِنَ السُّنَّةِ، أَوْ مِنْ تَمَامِ السُّنَّةِ 'এটাও সুন্নত। অথবা তা সুন্নতকে পূর্ণতা দানকারী।'২৯০

ইমাম তিরমিজি এই হাদিসকে হাসান (গ্রহণযোগ্য) আখ্যায়িত করে বলেন- 'একদল সাহাবি ও কিছু আলিম এ হাদিসের ওপর আমল করেছেন। জানাজা নামাজে প্রথম তাকবির বলার পর সূরা ফাতিহা পড়া তাঁরা পছন্দ করেছেন।' ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ ও ইমাম ইসহাক (রহ.) এ মতটি গ্রহণ করেছেন।

একদল আলিমের মতে, জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে না। কেননা, এটা হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা, নবির প্রতি দরুদ এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ। এটি ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) ও কুফাবাসী আলিমদের অভিমত। ২৯১

ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, এটিও একটি ইখতেলাফি বিষয়। সাহাবিদের যুগ থেকে এ নিয়ে মতবিরোধ চলে আসছে। উভয় মতের ওপর উম্মাহর এক বিরাট অংশের আমলও বিদ্যমান রয়েছে। আল্লামা ইবনে বাত্তাল বলেন-'আবু উমামা, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, হাসান ইবনে আলি, ইবনে জুবাইর, মিসওয়ার ইবনে মাখরামা (রা.) ও হাসান বসরি (রহ.) জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। আবার উমর, আলি, ইবনে উমর, আবু হুরায়রা (রা.), আতা, তাউস, সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিব, ইবনে সিরিন, ইবনে জুবাইর ও ইমাম শাবি জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন না। তাঁরা সূরা ফাতিহা পড়া অপছন্দ করতেন। '২৯২

ইমাম মুহাম্মাদ বলেন- وَبِهَذَا نَأْخُذُ ، لَا قِرَاءَةَ عَلَى الْجَنَازَةِ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ 'আমাদের মতে, জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা নেই। এটি ইমাম আবু হানিফারও অভিমত।'২৯৩

অন্যদিকে শাইখ বিন বাজ জানাজা সালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব বলেছেন। ২৯৪

ইমাম আবু হানিফা আরও বলেন-'সূরা ফাতিহা একান্ত পড়তে চাইলে সানা হিসেবে পড়া যায়। তবে সূরা ফাতিহা পড়ার বিষয়টি যেহেতু রাসূল থেকে বর্ণিত নেই, তাই না পড়াই উত্তম।'

সূরা ফাতিহা পাঠকারীদের বোঝা উচিত-জানাজা নামাজে ফাতিহা পড়া জরুরি হলে অবশ্যই রাসূল ﷺ তা নিয়মিত পাঠ করতেন। সহিহ হাদিসেও তা বর্ণিত হতো। যেভাবে ফরজ নামাজে সূরা ফাতিহা পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।
আবার যারা সূরা ফাতিহা পড়েন না, তাদেরও বোঝা উচিত-অনেক সাহাবি ফাতিহা পড়েছেন। ইবনে আব্বাস তা সুন্নতও বলেছেন। যা থেকে বোঝা যায়, নবিজি মাঝেমধ্যে সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন। আর যদি না পাঠ করেন, তাহলেও তা পাঠ করার সুযোগ রয়েছে। কেননা, জানাজার নামাজে শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করতে বলা হয়েছে। আর প্রশংসার জন্য সূরা ফাতিহা-ই সর্বোত্তম। অতএব, তা পাঠ করা দোষের কিছু নয়। ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সূরা ফাতিহা পাঠকে উত্তম বলেছেন। ২৯৫

টিকাঃ
২৮৮. তিরমিজিতে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল জানাজা নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করতেন। (হা ১০২৬।) ইমাম তিরমিজি (রহ.) নিজেই হাদিসটিকে মুনকার ও আপত্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
২৮৯. বুখারি : ১৩৩৫, আবু দাউদ : ৩১৯৮
২৯০. তিরমিজি: ১০২৭
২৯১. তিরমিজি: ১০২৭
২৯২. ইবনু বাত্তাল, শরহে সহিহুল বুখারি: ৩/৩১৬
২৯৩. মুয়াত্তা মালেক: ৩১১
২৯৪. মাজমুউ ফাতওয়া বিন বাজ: ১৩/১৪৩
২৯৫. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, জিজ্ঞাসা ও জবাব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮২

ফন্ট সাইজ
15px
17px