📄 প্রশংসনীয় প্রবৃত্তি ও নিন্দনীয় প্রবৃত্তি
খেয়াল-খুশী মাত্রেই যেমন নিন্দনীয় নয়, তেমনি তার সবটাই প্রশংসনীয়ও নয়। এক্ষেত্রে বাড়াবাড়িটাই নিন্দনীয়। সুতরাং উপকার বয়ে আনা ও অপকার প্রতিরোধ করার উপর বেশী যা কিছু করা হবে তাই হবে নিন্দনীয়। এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কামনা-বাসনাও আছে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট প্রিয়। আর তা তখনই হবে যখন মন তাই কামনা করবে যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট প্রিয়।
আয়েশা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যে সমস্ত মহিলা নিজেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে বিয়ের জন্য তাঁর সামনে প্রস্তাব পেশ করত আমার মনের মধ্যে তাদের জন্য একরকম অস্বস্তি কাজ করত। আমি বলতাম, একজন মেয়ে মানুষ কি এভাবে নিজেকে দান করতে পারে? তারপর যখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেন, تُرْجِيْ مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ 'আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা নিজের কাছ থেকে দূরে রাখতে পার, আবার যাকে ইচ্ছা নিজের কাছে স্থান দিতে পার। যাকে তুমি দূরে রেখেছিলে তাকে যদি পুনরায় তুমি নিজের কাছে রাখতে চাও তাতেও তোমার কোন দোষ হবে না' (আহযাব ৩৩/৫১)। তখন আমি মনে মনে স্বগতোক্তি করলাম, আমার মনে হয় আমার প্রভু দ্রুতই আমার কামনার অনুকূলে সাড়া দিয়েছেন'।⁶⁴
নবী করীম (ছাঃ)ও কিছু কিছু জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করতেন। আল্লাহ তা'আলা তার আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে কুরআনের আয়াত নাযিল করতেন। এতে করে বুঝা যায়, মন যা কামনা করে তার কতক প্রশংসনীয়। নবী করীম (ছাঃ)-এর কামনার মধ্যে ছিল, বায়তুল মুক্বাদ্দাস থেকে কা'বার দিকে কিবলা পরিবর্তন করা। এর কারণ সম্পর্কে আলেমগণ বলেছেন নবী করীম (ছাঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার অনুসরণ করতে মনে মনে কামনা করতেন।⁶⁵
আবু বারযা নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, إِنَّ مَّا أَخْشَى عَلَيْكُمْ شَهَوَاتِ الْغَيِّ فِي بُطُونِكُمْ وَفُرُوْجِكُمْ وَمُضِلاتِ الْفِتَنِ 'আমি কেবলই তোমাদের ক্ষেত্রে তোমাদের পেট তথা পানাহার ও জননেন্দ্রিয়ের অবৈধ সম্ভোগ এবং শরী'আত বিরুদ্ধ কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার ভয় করি'।⁶⁶
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কিন্তু তাঁর উম্মতের জন্য সব রকম কামনার ভয় করেননি। বরং তিনি কেবল ভয় করেছেন পথভ্রষ্টকারী কামনা-বাসনার। কারণ কামনা-বাসনা কখনো কখনো পথভ্রষ্টকারী হয়ে থাকে। এরূপ কামনা-বাসনা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এবং দ্বীন-ধর্মকে বিনষ্ট করে দেয়। কিন্তু যে কামনা-বাসনা পথভ্রষ্ট করে না তাতে কোন দোষ নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তাই সে সম্পর্কে সতর্ক করেননি। কিন্তু নিন্দনীয় কামনা-বাসনাই অধিকহারে প্রচলিত। এজন্যই আমরা অনেক আয়াত, হাদীছ এবং পূর্বসূরি ছাহাবী, তাবেঈগণের ও তাঁদের পরবর্তীদের কথায় সাধারণভাবে কামনা-বাসনার নিন্দা দেখতে পাই। এখানে অবশ্যই ওগুলো দ্বারা নিন্দনীয় কামনা বুঝানো হয়েছে, সাধারণভাবে সব কামনা ও খেয়াল-খুশী নয়।
ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, 'কামনা-বাসনা ও লালসার অনুগামী লোকেরা বেশির ভাগই উপকার লাভের মাত্রা পর্যন্ত এসে থামে না; বরং সীমালংঘন করে। তাই সাধারণভাবে এর ক্ষতিকারিতার কারণেই কামনা ও লালসার নিন্দা করা হয়েছে। খুব কম লোকই এক্ষেত্রে ইনছাফ বজায় রাখতে পারে বা ইনছাফের পর্যায়ে এসে থামতে পারে। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁর গ্রন্থে যেখানেই কামনা বা প্রবৃত্তির কথা বলেছেন, সেখানেই তার নিন্দা করেছেন। হাদীছেও তা নিন্দনীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, ক্ষেত্র বিশেষে শর্তযুক্তভাবে তার প্রশংসা এসেছে'।⁶⁷
হাদীছে যে কামনার নিন্দা করা হয়নি তা যেমন ইতিপূর্বে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে, তেমনি হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আছ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত হাদীছেও এসেছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হ'তে পারবে না যে পর্যন্ত না তার কামনা-বাসনা আমি যে দ্বীন নিয়ে এসেছি তার অনুগত হয়'।⁶⁸
হাদীছ হ'তে বুঝা যায়, কিছু কামনা প্রশংসনীয়। আর তা হ'ল সেসব কামনা যেগুলো শরী'আতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে দিন বদর যুদ্ধ হ'ল, সেদিন বন্দীদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-কে বলেছিলেন, مَا تَرَوْنَ فِي هَؤُلَاءِ الْأُسَارَى 'এসব বন্দীদের বিষয়ে আপনাদের অভিমত কী'? তখন আবুবকর (রাঃ) বলেছিলেন, يَا نَبِيَّ اللَّهِ هُمْ بَنُو الْعَمِّ وَالْعَشِيْرَةِ أَرَى أَنْ تَأْخُذَ مِنْهُمْ فِدْيَةً فَتَكُوْنُ لَنَا قُوَّةً عَلَى الْكُفَّارِ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُمْ لِلْإِسْلَامِ 'হে আল্লাহ্র নবী! তারা তো আমাদেরই চাচাত ভাই ও জ্ঞাতি লোক। আমি মনে করি, মুক্তিপণ নিয়ে আপনি ওদের ছেড়ে দিন। মুক্তিপণের অর্থ কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি জোগাবে। আর এ লোকগুলোকেও আল্লাহ ভবিষ্যতে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় দিতে পারেন'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পুনরায় বললেন, مَا تَرَى يَا ابْنَ الْخَطَّابِ 'হে খাত্ত্বাবের সন্তান ওমর! তোমার অভিমত কী'? আমি বললাম, لا وَاللَّهِ يَا رَسُوْلَ اللهِ مَا أَرَى الَّذِى رَأَى أَبُو بَكْرٍ وَلَكِنِّي أَرَى أَنْ تُمَكِّنَّا فَنَضْرِبَ أَعْنَاقَهُمْ فَتُمَكِّنَ عَلِيًّا مِنْ عَقِيلٍ فَيَضْرِبَ عُنُقَهُ وَتُمَكِّنِّى مِنْ فُلانٍ نَسِيْبًا لِعُمَرَ - فَأَضْرِبَ عُنُقَهُ فَإِنَّ هَؤُلاَءِ أَئِمَّةُ الْكُفْرِ وَصَنَادِيدُهَا فَهَوِيَ رَسُوْلُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا قَالَ أَبُو بَكْرٍ وَلَمْ يَهْوَ مَا قُلْتُ - 'না, আল্লাহ্র কসম! আবুবকর যেমন ভাবছেন আমি তা মনে করি না। বরং আমার সিদ্ধান্ত এই যে, আপনি ওদেরকে আমাদের হাতে দিন, আমরা ওদের গর্দান উড়িয়ে দেই। আকীলকে দিন আলীর হাতে সে তার গর্দান উড়িয়ে দিক। আমার হাতে দিন অমুককে (ওমরের বংশীয়) আমি তার ঘাড় নামিয়ে দেই। এসব লোক তো কাফিরদের বড় বড় নেতা। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবুবকরের ইচ্ছেমত কাজ করলেন। আমি যা বললাম সে মত অনুযায়ী করলেন না'।⁶⁹
দেখুন দয়াল নবী (ছাঃ) আবুবকর (রাঃ)-এর কথা ও ইচ্ছার দিকে ঝুঁকলেন। কারণ এতে তিনি ইসলামের কল্যাণ দেখেছিলেন। এটা ছিল প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত। নবী করীম (ছাঃ) নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে ওমর (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তকে সঠিক আখ্যা দিয়ে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল।
টিকাঃ
৬৪. বুখারী হা/৪৭৮৮।
৬৫. তাফসীরে তাবারী ২/২২ পৃঃ।
৬৬. আহমাদ হা/১৯৭৮৮; ছহীহ তারগীব হা/৫২, সনদ ছহীহ।
৬৭. রওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৬৯ (ঈষৎ পরিবর্তন সহ)।
৬৮. নববী, শারহুস সুন্নাহ; মিশকাত হা/১৬৭, আলবানী, সনদ যঈফ।
৬৯. মুসলিম হা/১৭৬৩; ইবনু হিব্বান হা/৪৭৯৩।
📄 শেষ কথা
খেয়াল-খুশী বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা একটি আয়াসসাধ্য কষ্টকর ব্যাপার। এ সংগ্রামে দেহ-মন উভয়কে কষ্টের বোঝা বইতে হয়। তবে এ সংগ্রামের পরিণাম হয় খুবই সুন্দর এবং ফলাফল হয় খুবই মর্যাদার। তাই প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া থেকে দুর্বলচেতা অসুস্থ মন-মানসিকতার লোকেরা ছাড়া আর কেউ-ই পিছপা হয় না। কবি আবুল আতাহিয়া বলেন,
أَشَدُّ الْجِهَادِ جِهَادُ الْهَوَى + وَمَا كَرَّمَ المَرْءَ إِلَّا التَّقَى
'কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদই (সংগ্রাম) সবচেয়ে কঠিন জিহাদ। আর তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতিই কেবল মানুষকে মহিমান্বিত করে'।
আরেক কবি বলেছেন,
صَبَرْتُ عَلَى الْأَيَّامِ حَتَّى تَوَلَّتِ + وَأَلْزَمْتُ نَفْسِي صَبْرَهَا فَاسْتَمَرَّتِ
وَمَا النَّفْسُ إِلا حَيْثُ يَجْعَلُهَا الْفَتَى + فَإِنْ أُطْمِعَتْ تَاقَتْ وَإِلا تَسَلَّتِ
'আমি কালের কুটিলচক্রের শিকার হয়ে বিপদে ধৈর্য ধরেছি। ফলে এক সময় বিপদ কেটে গেছে। আমি আমার মনকে ধৈর্যের উপর অবিচল রেখেছি, ফলে সে ধৈর্য ধারণ করেই গেছে।
আসলে মন তো সেখানেই থাকে যেখানে মানুষ তাকে রাখে। যদি মনের সামনে লোভ ধরিয়ে দেওয়া হয় তাহ'লে সে লোভের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। নতুবা সে শান্ত থাকে'।⁷⁰
প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার সবচেয়ে বড় আলামত হ'ল পার্থিব জীবনের সাজসজ্জা ও চাকচিক্য থেকে দূরে থাকা। মালিক বিন দীনার (রহঃ) বলেন, مَنْ تَبَاعَدَ مِنْ زُهْرَةِ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَذَلِكَ الْغَالِبُ لِهَوَاهُ 'যে ব্যক্তি দুনিয়াবী জীবনের চাকচিক্য ও আড়ম্বর থেকে দূরে থাকবে, সেই তার কামনা-বাসনাকে পরাস্ত কারী হবে'।⁷¹
প্রবৃত্তি সব মানুষের মধ্যেই অনুপ্রবেশ করে। শুধুই নাদান-মূর্খ কিংবা শিশুদের মধ্যেই নয়; বরং আলেম-ওলামা, বিদ্বান, বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকলের মধ্যেই তা প্রবেশ করে। জনৈক বিজ্ঞজন বলেছেন, অভিজ্ঞ জ্ঞানী-গুণীজনেরও পরামর্শ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে তার সিদ্ধান্ত যাতে প্রবৃত্তির প্রেক্ষিতে না হয় সেজন্য'।⁷²
সুতরাং কারো জন্য এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, আমি তো আমার প্রবৃত্তির অনুসরণ করি না, সুতরাং প্রবৃত্তির নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কুরআন-হাদীছে যেসব কথা এসেছে তা আমার বেলায় প্রযোজ্য নয়। মানছুর আল-ফকীহ বলেছেন,
إِنَّ الْمَرَائِيَ لَا تُرِيْكَ + خُدُوْشَ وَجْهِكَ فِي صَدَاهَا
وَكَذَاكَ نَفْسُكَ لا تُرِيْكَ + عُيُوْبَ نَفْسِكَ فِي هَوَاهَا
'আয়না জংধরা বা ময়লাযুক্ত হ'লে তাতে তোমার মুখের দোষ ধরা পড়বে না। অনুরূপভাবে প্রবৃত্তির মাঝে মজে থাকলে তুমি তোমার নিজের ভিতরকার দোষ-ত্রুটি দেখতে পাবে না'।⁷³
বরং যিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, ধার্মিক ও সবচেয়ে বড় বিদ্বান বলে পরিচিত তাঁর মধ্যেও কখনো কখনো প্রবৃত্তি অনুপ্রবেশ করে। তাই মহামহিম আল্লাহ তা'আলার নিকট আমাদের প্রার্থনা তিনি যেন প্রবৃত্তির উপায়-উপকরণ থেকে আমাদের হেফাযত করেন। নিকৃষ্ট আচার-আচরণ থেকে আমাদের ফিরিয়ে রাখেন এবং আমাদেরকে ভাল কাজের তাওফীক দেন। আর আল্লাহ তা'আলা করুণা ও শান্তি বর্ষণ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাঁর পরিবারবর্গ, সঙ্গী-সাথীদের সকলের উপর।
سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك وأتوب إليك،
اللهم اغفر لي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب
***
টিকাঃ
৭০. যামুল হাওয়া, পৃঃ ১৪৩।
৭১. হিলয়াতুল আওলিয়া ২/৩৬৪।
৭২. বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মাজালিস, পৃঃ ১৭১।
৭৩. আবু উবায়েদ আল-বিকরী, ফাছলুল মাকাল ফি শারহি কিতাবুল আমছাল, পৃঃ ২৭৫।