📄 কখনো অন্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবৃত্তির নিন্দা জানানো হয়েছে
হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوْبِ كَالْحَصِيْرِ عُوْدًا عُوْدًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيْهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبِ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيْهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيْرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلاَ تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَالآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًا كَالْكُوزِ مُحَخّيًا لاَ يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ 'মানুষের মনে ফিত্না বা গোমরাহী এমনভাবে ঢেলে দেওয়া হয় যেমন করে খেজুরের মাদুর বা পাটি বুনতে একটা একটা করে পাতা ব্যবহার করা হয়। যে মনে ঐ ফিত্না অনুপ্রবেশ করে তাতে একটা কালো দাগ পড়ে যায়। আর যে মন তা প্রত্যাখ্যান করে তাতে একটা সাদা দাগ পড়ে। এভাবে মনগুলো দু'ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক. মসৃণ পাথরের মত সাদা মন, যাতে কোন ফিত্না বা পাপাচার আসমান-যমীন বিদ্যমান থাকা অবধি কোনই বিরূপ ক্রিয়া করতে পারবে না। দুই. কয়লার ন্যায় কালো মন, যা উপুড় করা পাত্রের মত, না সে কোন ন্যায়কে বোঝে, না অন্যায়কে স্বীকার করে। তার খেয়াল-খুশী বা কামনা-বাসনা তাকে যেভাবে পরিচালনা করে সেভাবেই কেবল সে পরিচালিত হয়'।⁷ এখানে খেয়াল-খুশীকে হৃদয়ের সাথে সম্বন্ধিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
৭. মুসলিম হা/১৪৪; মিশকাত হা/৫৩৮০।
📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ হেতু একজন মানুষ কখন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য
প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একটি বিষয়। না সে তার থেকে আলাদা হ'তে পারে, না তাকে পরিত্যাগ করতে পারে। মহান আল্লাহ মানুষকে প্রবৃত্তি ও লালসার তাড়না দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তবে কি প্রবৃত্তি ও লালসার উদ্রেক যখনই হবে তখনই সেজন্য মানুষকে শাস্তি পোহাতে হবে? মানুষ কি তার হৃদয়-মন থেকে প্রবৃত্তি বের করে দিতে শরী'আতের দাবী অনুযায়ী বাধ্য? নাকি তার কিছু নিয়মনীতি ও সীমানা রয়েছে?
ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, 'খোদ প্রবৃত্তি ও লালসার জন্য কোন শাস্তি পোহাতে হবে না। বরং তার অনুসরণ ও তার কথামত কাজ করার দরুন শাস্তি পোহাতে হবে। সুতরাং মন প্রবৃত্তির পেছনে চলতে চাইবে আর ব্যক্তি মনকে তার থেকে বিরত রাখলে তখন তার এ বিরত রাখাই আল্লাহ্র ইবাদত ও নেক কাজ বলে গণ্য হবে'।⁸
একজন সত্যবাদী মুসলিমের অবস্থাতো এটাই। তার মন সর্বদা তাকে এটা ওটা করতে হুকুম করবে আর সে বরাবর তা করতে অস্বীকার করবে এবং তার লালসার অপকারিতার শিকার হওয়া থেকে তাকে বিরত রাখবে। মন তাকে প্রবৃত্তির যেসব বিষয় লাভে উদ্বুদ্ধ করবে সেসব ক্ষেত্রে সে তার প্রতিপালকের মুখোমুখি দাঁড়ানোকে ভয় করবে। এমন মানুষ অবশ্যই ভাল প্রতিফল পাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى– 'আর যে ব্যক্তি তার মালিকের সামনে (হাশরের ময়দানে) দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং (সেই ভয়ে নিজের) মনকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা' (নাযি'আত ৮০/৪০-৪১)।
সুতরাং খেয়াল-খুশী মনে উদয় হ'লেই সেজন্য শাস্তি দেওয়া হবে না; সেটা কাজে পরিণত করা ব্যতীত। মানুষ যখন কোন পাপ কাজের বাসনা করবে এবং মনে মনে তা কামনা করবে, তারপর বাস্তবে তা রূপায়িত করবে তখন তার খেয়াল-খুশী ও কাজের উপর হিসাব গ্রহণ করা হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَى مُدْرِكُ ذَلِكَ لا مَحَالَةَ فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ وَالْأُذْنَانِ زِنَاهُمَا الإِسْتِمَاعُ وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْسُ وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ 'আদম সন্তানের জন্য ব্যভিচারের একাংশ নির্ধারিত আছে; যা সে অবশ্যই পাবে। চক্ষুদ্বয়ের যেনা হ'ল দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। কর্ণদ্বয়ের যেনা হ'ল শ্রবণ করা, জিহ্বার যেনা হ'ল আলোচনা করা, হাতের যেনা হ'ল স্পর্শ করা এবং পায়ের যেনা হল এ কাজে পা চালানো, মন (যেনা করতে) গভীরভাবে কামনা করবে, তারপর যৌনাঙ্গ তা সম্পন্ন করার মাধ্যমে হয় তা সত্য প্রমাণ করবে, নয় তা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে মনের কামনাকে মিথ্যা প্রমাণ করবে'।⁹
টিকাঃ
৮. মাজমূ' ফাতাওয়া ১০/৬৩৫।
৯. মুসলিম হা/২৬৫৭।
📄 প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণ সমূহ
প্রবৃত্তির অনুসরণের পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। এসব কারণেই মানুষ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন তাদের খেয়াল-খুশীর পিছনে চলে? কেনই বা তারা সত্য ও সরল পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? এর পিছনে আসলে অনেক কারণ রয়েছে। যথা-
📄 শৈশবকালে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত না হওয়া
কখনো কখনো শিশু শৈশবে তার মাতা-পিতার কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভালবাসা ও আদর পেয়ে থাকে। তারা তার সকল প্রকার আগ্রহে সাড়া দিয়ে থাকে। সে যা চায় তারা তার নিকট তা হাযির করে। এক্ষেত্রে তারা হালাল-হারাম, বৈধ ও নিষিদ্ধের কোন বাছবিচার করে না। শিশু যদি ফজর ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে তাহ'লে তারা বলে, 'এখনো বোধবুদ্ধি হাল্কা আর ঘুমকাতুরে, ঠিক আছে ঘুমাক'। ছেলেটা যখন কোন খেলনার বায়না ধরে অমনি তারা তার ব্যবস্থা করে দেয়। তাতে কোন গান-বাজনা আছে কি-না কিংবা কোন নির্লজ্জ দৃশ্য আছে কি-না সেদিকে মোটেও ভ্রূক্ষেপ করে না। হয়তো দেখা যাচ্ছে কিশোর ছেলের জন্য রয়েছে একজন স্পেশাল ড্রাইভার, আবার কিশোরী মেয়ের জন্য রয়েছে অভ্যর্থনা কক্ষসহ খাছ কামরা। এভাবে একজন শিশু তার প্রবৃত্তি বা মর্যিমাফিক চলাফেরার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। সে যখন যা ইচ্ছা করে তাই পায় এবং করতে পারে। তাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দেয় না। আবার কোন নিষেধকারী প্রশাসনও নিষেধ করে না। এভাবে বল্লাহীন অবস্থায় চলতে চলতে যখন সে বয়ঃপ্রাপ্তির পর্যায়ে উপনীত হয় তখন তার লাগামহীন কামনা-বাসনা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। ঐ সকল মনোবাসনা ও কল্পনা বাস্তবায়নে তার প্রবৃত্তির পিছনে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটতে থাকে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সময়গুলোতে এমনটা খুব ঘটে। ফলে এ ধরনের ছেলে-মেয়েরা বড় বড় অপরাধ এবং মারাত্মক জঘন্য কাজ করে বসে, অথচ তা থেকে তাদের দূরে রাখার ও প্রতিহত করার কোন উপায় থাকে না।
অথচ ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে সেই ছেলেবেলা থেকেই প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত হ'তে প্রশিক্ষণ দিতেন। তাঁদের ছোটরা বড়দের সঙ্গে ছিয়াম, ছালাত, হজ্জ ইত্যাদি শারঈ ইবাদত-বন্দেগী পালনে চেষ্টা করতেন।
রুবাই বিনতে মু'আওবিয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আশুরার দিন ভোরে আনছারদের বসতিতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা দেওয়ান যে, مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ، وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ 'সকালে যে খেয়ে নিয়েছে সে যেন বাকি দিন না খেয়ে কাটায়, আর যে ছিয়াম পালনের অবস্থায় সকাল করেছে সে যেন ছিয়াম সম্পন্ন করে'। বর্ণনাকারী বলেন, فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعْبَةَ مِنَ الْعِهْنِ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ، حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الإِفْطَارِ 'এই ঘোষণা শুনে আমরা পরবর্তী সময়টুকু ছিয়ামে কাটালাম এবং আমাদের বাচ্চাদেরও ছিয়াম রাখালাম। তাদের জন্য আমরা এক প্রকার পশমী খেলনা যোগাড় করে রাখলাম। যখন তাদের কেউ খাবারের জন্য কেঁদে উঠছিল, তখনই আমরা তাদের সামনে ঐ খেলনা এগিয়ে দিচ্ছিলাম। ইফতার পর্যন্ত তারা এভাবেই পার করছিল'।¹⁰
ছেলেমেয়েরা যা চায় তাই দিয়ে তাদের প্রতিপালনে শুধুই যে দ্বীন-ধর্মীয় ক্ষতি হয় তাই নয়; বরং তা তাদের জন্য জাগতিক ক্ষতিও ডেকে আনে। কখনো কখনো দেখা যায়, একটা পরিবারের উপর বালা-মুছীবত ও দুর্দশা নেমে আসে, যার ফলে তাদের ধন-সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং তাদের জীবন-জীবিকা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। কখনো আবার পরিবারের কর্তা মারা যায় সে সময় এই শিশু কীভাবে তার খাহেশ চরিতার্থ করবে? কোত্থেকে সে তার কামনা-বাসনা পূরণের ব্যবস্থা করবে?
তারপর জীবনের এক পর্যায়ে যখন কিশোর ছেলে জীবনযুদ্ধের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে এবং তার অনেক প্রয়োজন দেখা দেয় তখন সে হয়তো দেখতে পায়, তার পরিবার তার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে পারছে না। বিশেষ করে যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, বিয়েশাদী করে ঘর-সংসার গড়তে ইচ্ছে করে তখন সে হয়তো একটা নির্দিষ্ট কাজ করতে চায়, কিন্তু তার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
অনুরূপভাবে যে কিশোরী মেয়ে বিলাসিতা ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, হয়ত তার বিয়ে এমন লোকের সাথে হয়েছে অর্থবিত্তে যে তার সমপর্যায়ের নয়। এজন্য সে অসন্তুষ্ট হয় আর রাগে-দুঃখে সবসময় হাহুতাশ করে। এমনও হয় যে, সে তার স্বামীকে ফকীর-মিসকীন বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তার জীবনটা দ্বন্দ্ব-ফাসাদ আর ঝগড়াঝাটিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। যাতে তার আত্মিক সুখ এবং স্বামীর সঙ্গে তার সুখ বিনষ্ট হয়।¹¹
টিকাঃ
১০. বুখারী হা/১৯৬০; মুসলিম হা/১১৩৬।
১১. অথচ ছোটবেলা থেকে দ্বীনী পরিবেশে নিয়ন্ত্রিত কামনার মাঝে বাস করলে ছেলেমেয়ে উভয়েরই পরিণত বয়সে জীবন এত জটিল হয় না। আল্লাহই সবকিছুর মালিক, তিনি যেন সবাইকে সঠিক বুঝ দান করেন। -অনুবাদক।