📄 প্রবৃত্তির সংজ্ঞা
প্রবৃত্তির আভিধানিক অর্থ : আরবী هَوًى শব্দটি هَوِی ক্রিয়ার ধাতু। আভিধানিক অর্থ হ'ল, কোন কিছুকে ভালবাসা, কাম্য বস্তু পাওয়ার প্রবল বাসনা।২
[বাংলা অভিধানে هوی (হাওয়া)-এর প্রতিশব্দ প্রবৃত্তি, খেয়াল-খুশী, নিয়ম ছাড়া ব্যাপার, স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালী, অযৌক্তিক ইচ্ছা, কামনা, বাসনা, কুপ্রবৃত্তি, ভোগের পথ ইত্যাদি।৩ এই পুস্তকে هَوى শব্দের প্রতিশব্দ অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবৃত্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে কামনা-বাসনা ও খেয়াল-খুশী গ্রহণ করা হয়েছে।-অনুবাদক]
পরিভাষায় هوى বা প্রবৃত্তি : উপভোগ্য জিনিসের প্রতি শরী'আতের কোন অনুমোদন ছাড়াই মনের যে ঝোঁক তৈরী হয় তাকে هوى বা প্রবৃত্তি বলে।৪ ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, 'কাঙ্ক্ষিত জিনিসের প্রতি মনের ঝোঁককে هوى বা প্রবৃত্তি বলে'। এই ঝোঁক মানুষের মাঝে তার অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সৃষ্ট হয়েছে। কেননা তার যদি খাদ্য, পানীয় ও বিবাহ-শাদীর প্রতি ঝোঁক ও আকর্ষণ না থাকত, তাহ'লে সে খানা-পিনা, বিয়ে-শাদী কোনটাই করত না। সুতরাং প্রবৃত্তি মনের চাহিদার প্রতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। যেমন করে ক্রোধ অপ্রীতিকর জিনিস থেকে তাকে বিরত রাখে।৫
টিকাঃ
২. আল-মুগরাব ফী তারতীবিল মু'রাব ২/৩৯২।
৩. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান।
৪. জুরজানী, আত-তা'রীফাত, পৃঃ ৩২০।
৫. ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৬৯।
📄 প্রবৃত্তির অনুসরণে নিষেধাজ্ঞা
শরী'আতের প্রমাণাদি দ্বিধাহীনভাবে প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করে। কুরআন-হাদীছে এসব প্রমাণ নানাভাবে নানা আঙ্গিকে বিধৃত হয়েছে। যেমন-
📄 কখনো প্রবৃত্তির অনুসরণ নিঃশর্তভাবে নিষেধ করা হয়েছে
আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُواْ 'ন্যায়বিচার করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না' (নিসা ৪/১৩৫)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَا دَاوُوْدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلُّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ 'হে দাউদ! আমি তোমাকে এই যমীনে আমার খলীফা (শাসক) বানালাম। অতএব তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার করো এবং কখনো খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, তেমন করলে তা তোমাকে আল্লাহ্র রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে' (ছোয়াদ ৩৮/২৬)।
📄 কখনো কাফির ও পথভ্রষ্টদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءِ الَّذِيْنَ كَذَّبُوْا بِآيَاتِنَا وَالَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِالْآخِرَةِ وَهُمْ بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُوْنَ 'হে রাসূল! তুমি ঐ সকল লোকের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে না যারা আমার আয়াত সমূহকে অস্বীকার করে, যারা পরকালে অবিশ্বাস করে এবং তারা অন্য কিছুকে তাদের মালিকের সমকক্ষ মনে করে' (আন'আম ৬/১৫০)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে কাফিরদের বলতে বলেছেন, قُل لَّا أَتَّبِعُ أَهْوَاءَكُمْ قَدْ ضَلَلْتُ إِذَا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُهْتَدِينَ 'হে রাসূল! তুমি বল, আমি তো তোমাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করি না। যদি আমি তা করি তাহ'লে আমি তখন অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাব এবং সত্যানুসারী দলের মাঝে থাকব না' (আন'আম ৬/৫৬)।
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّواْ مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيراً وَضَلُّواْ عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ 'তোমরা সেসব জাতির খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, যারা আগেভাগেই পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং তারা অনেক লোককে পথহারা করে দিয়েছে আর তারা নিজেরাও সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে' (মায়েদাহ ৫/৭৭)।
অন্যত্র তিনি বলেন, فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ 'সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেসব বিধি-বিধান নাযিল করেছেন তুমি তার ভিত্তিতে তাদের মধ্যে বিচার-ফায়ছালা কর এবং এ বিচারের সময় তোমার নিকট যে সত্য দ্বীন এসেছে তা থেকে সরে গিয়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবে না' (মায়েদাহ ৫/৪৮)।
তিনি নবী করীম (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, فَلِذَلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ (হে নবী!) তুমি মানুষকে এ দ্বীনের দিকে ডাকতে থাক এবং এর উপরেই অবিচল থাকো, যেভাবে তোমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর ওদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবে না' (শূরা ৪২/১৫)।
তিনি বলেন, وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطاً 'তুমি এমন কোন ব্যক্তির আনুগত্য করবে না যার হৃদয়-মনকে আমরা আমাদের স্মরণ থেকে উদাসীন করে দিয়েছি, আর সে তার প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে শুরু করেছে এবং তার কাজকর্ম সীমালংঘনমূলক' (কাহফ ১৮/২৮)।
এসব আয়াতে মহান আল্লাহ কাফির-মুশরিকদের সাথে খেয়াল-খুশীর সম্পর্ক যোগ করেছেন। কেননা তাদের খেয়াল-খুশী সত্য হ'তে বিচ্যুত। পক্ষান্তরে মুমিনদের খেয়াল-খুশী তেমন নয়। কাফিরদের কামনা-বাসনা পুরোটাই বাতিল তথা অন্যায়ের উপর কেন্দ্রীভূত। অপরদিকে মুমিনদের কামনা-বাসনা উন্নত হ'তে হ'তে এক সময় তা আল্লাহ তা'আলার হুকুম মাফিক হয়ে যায় এবং নবী করীম (ছাঃ) আনীত দ্বীন বা জীবন বিধানের অনুগামী হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তার মন যখন কোন দিকে ঝুঁকে পড়ে তখন তা সুন্নাত ও আনুগত্য বলে গণ্য হয়, নিদেনপক্ষে তা মুবাহ হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, أَفَمَنْ كَانَ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّهِ كَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوْءُ عَمَلِهِ وَاتَّبَعُوْا أَهْوَاءَهُمْ 'যে ব্যক্তি তার মালিকের পক্ষ থেকে আসা সুস্পষ্ট নিদর্শনের উপর রয়েছে তার সাথে এমন লোকদের তুলনা কীভাবে হবে যাদের চোখের সামনে তাদের মন্দ কাজগুলো শোভনীয় করে রাখা হয়েছে এবং তারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে' (মুহাম্মাদ ৪৭/১৪)।