📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 স্বাস্থ্য রক্ষা

📄 স্বাস্থ্য রক্ষা


ইবনু রজব বলেছেন, জনৈক বিদ্বান ১০০ বছর বয়স পার করেছিলেন, তখনও তার দেহ সুঠাম এবং বোধশক্তি সতেজ ছিল। একদিন তিনি খুব জোরে এক লাফ দিলেন। সেজন্য তাকে গালমন্দ করা হ'ল। কিন্তু তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, ছোটকালে এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে আমরা পাপ-পঙ্কিলতা থেকে রক্ষা করেছি, তাই বুড়োকালে আল্লাহ আমাদের জন্য সেগুলো রক্ষা করছেন। এর বিপরীতে জনৈক পূর্বসূরি ব্যক্তি এক বৃদ্ধকে মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেখে বললেন, এই লোকটা অবশ্যই দুর্বল। সে শৈশবে আল্লাহ্র হক নষ্ট করেছিল, তাই তার বার্ধক্যে আল্লাহ তাকে কষ্টে ফেলেছেন'।

টিকাঃ
৫৭. ইবনু রজব, জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, পৃঃ ১৮৬।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 দুনিয়ার বালা-মুছীবত থেকে মুক্তি

📄 দুনিয়ার বালা-মুছীবত থেকে মুক্তি


ইবরাহীম বিন আদহাম (রহঃ) বলেছেন, أَشَدُّ الْجِهَادِ جِهَادُ الْهَوَى، وَمَنْ مَنَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا فَقَدِ اسْتَرَاحَ مِنَ الدُّنْيَا وَبَلَائِهَا، وَكَانَ مَحْفُوظًا وَمُعَافَى مِنْ أَذَاهَا 'কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদই সবচেয়ে কঠিন জিহাদ। যে নিজের মনকে প্রবৃত্তির তাড়না থেকে হেফাযত করতে পারবে, সে দুনিয়া ও দুনিয়ার বালা-মুছীবত থেকে আরামে থাকবে। সে দুনিয়ার কষ্ট-ক্লেশ থেকেও রক্ষা পাবে'।

টিকাঃ
৫৮. হিলয়াতুল আওলিয়া ৮/১৮; শু'আবুল ঈমান, পৃঃ ৮৭৬।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণের প্রতিকার

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণের প্রতিকার


যে কুপ্রবৃত্তির শিকারে পরিণত হয়েছে, কুপ্রবৃত্তির থাবা থেকে বাঁচার জন্য তার মনের চিকিৎসা প্রয়োজন। তাতে করে আল্লাহ তা'আলা হয়তো তাকে দয়া করবেন এবং সৎলোকদের কাতারে তাকে শামিল করবেন। কুপ্রবৃত্তির চিকিৎসায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিম্নে আলোচনা করা হ'ল।-

এক. পূতপবিত্র মহামহিম আল্লাহ তা'আলার দিকে ফিরে যাওয়া এবং কুপ্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তাঁর নিকট দো'আ করা। নবী করীম (ছাঃ) ও পূর্বসূরিদের এটা ছিল নিয়মিত অভ্যাস।

কুতবা বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) এই বলে দো'আ করতেন, اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوْذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلَاقِ وَالْأَعْمَالِ وَالْأَهْوَاءِ 'হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ স্বভাব, আমল ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে'।

ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) খালিদ বিন ছাফওয়ান (রাঃ)-কে বললেন, সংক্ষেপে আমাকে কিছু নছীহত করুন। তিনি তখন বললেন, يَا أَمِيْرَ الْمُؤْمِنِينَ إِنَّ أَقْوَامًا غَرَّهُمْ سِتْرُ اللهِ، وَفَتَنَهُمْ حَسَنُ الثَّنَاءِ فَلَا يَغْلِبَنَّ جَهْلُ غَيْرِكَ بِكَ عِلْمَكَ بِنَفْسِكَ، أَعَاذَنَا اللهُ وَإِيَّاكَ أَنْ نَكُوْنَ بِالسِّتْرِ مَغْرُورِيْنَ وَبِثَنَاءِ النَّاسِ مَسْرُورِينَ وَعَمَّا افْتَرَضَ اللَّهُ عَلَيْنَا مُتَخَلِّفِينَ وَمُقَصِّرِينَ وَإِلَى الْأَهْوَاءِ مَائِلِينَ 'আমীরুল মুমিনীন! অনেক লোক আছে যারা আল্লাহপাক পাপ গোপন রাখবেন এই আশায় ধোঁকায় পতিত হয়, আবার অন্যদের মুখে নিজেদের প্রশংসা শুনেও তারা ফিত্নার শিকার হয়। কাজেই আপনার সম্বন্ধে অন্যের অজ্ঞতাপ্রসূত কথা যেন আপনার সম্বন্ধে আপনার নিজের জ্ঞানের উপর বিজয়ী না হয় (অর্থাৎ যে গুণ ও যোগ্যতা আপনার মধ্যে নেই বলে আপনার জানা অন্যেরা আপনার মধ্যে সেই গুণ ও যোগ্যতা আছে বলে আপনার মিথ্যা প্রশংসা করলে আপনি তাতে খুশী ও প্রলুব্ধ হবেন না)। মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে ও আপনাকে রক্ষা করেন- যাতে আমরা আল্লাহ্র পাপ গোপন রাখার কথা দ্বারা প্রতারিত না হই, অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে উৎফুল্ল না হই, আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর যা কিছু ফরয করেছেন তা পালনে পিছপা না হই বা কোন ত্রুটি না করি এবং খেয়ালি মন-মানসিকতার দিকে যেন ঝুঁকে না পড়ি'। একথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, أَعَاذَنَا اللهُ وَإِيَّاكَ مِنِ اتَّبَاعِ الْهَوَى 'আল্লাহ আমাদেরকে এবং তোমাকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে রক্ষা করুন'।

ইবরাহীম তাইমী (রহঃ) দো'আ করতেন আর বলতেন, اللَّهُمَّ اعْصِمْنِي بِكِتَابِكَ وَسُنَّةِ نَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم مَنِ اخْتِلَافِ فِي الْحَقِّ، وَمَنِ اتَّبَاعِ الْهَوَى بِغَيْرِ هُدًى مِنْكَ، وَمِنْ سُبُلِ الضَّلَالَةِ، وَمِنْ شُبُهَاتِ الْأُمُورِ، وَمِنَ الزَّيْنِ، وَاللَّبْسِ، وَالْخُصُوْمَاتِ হে আল্লাহ! আপনার কিতাব আল-কুরআন এবং আপনার নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর সুন্নাতের বরকতে আমাকে ন্যায় ও যথার্থ বিষয়ে মতভেদ, আপনার হেদায়াত ছেড়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ, গোমরাহী, সন্দেহজনক বিষয়াদি, অন্তরের বক্রতা, সন্দেহ ও বাক-বিতণ্ডা থেকে রক্ষা করুন'।

দুই. প্রবৃত্তির বিরোধী জিনিস দ্বারা অন্তর পূর্ণ রাখা :
আল্লাহ্র ভালবাসা অন্তরে ভরে রাখলে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের আমল করে গেলে এক সময় অন্তর সম্পূর্ণরূপে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত হয়ে যায়।

তিন. আলেম ও আল্লাহভীরুদের সাহচর্য গ্রহণ :
কবি ইবনু আব্দুল কাভী বলেছেন,
وَخَالِطٌ إِذَا خَالَطْتَ كُلَّ مُوَفِّقٍ + مِنَ الْعُلَمَاءِ أَهْلِ التَّقَى وَالتَّسَدُّدِ
يُفيدُكُ مِنْ عِلْمٍ وَيَنْهَاكَ عَنْ هَوَى + فَصَاحِبْهُ تُهْدَ مِنْ هُدَاهُ وَتَرْشُدْ
وَإِيَّاكَ وَالْهَمَّازَ إِنْ قُمْتَ عَنْهُ وَالْ + بَذِي فَإِنَّ الْمَرْءَ بِالْمَرْءِ يَقْتَدِي
وَلَا تَصْعَبِ الْحَمْقَى فَذُو الْجَهْلِ إِنْ يَرُمْ + صَلَاحًا لِشَيْءٍ يَا أَخَا الْحَزْمِ يُفْسِدْ
'যখন তুমি উঠাবসা করবেই তখন আল্লাহভীরু আলেম ও সঠিক পথের অনুসারী সৎ মানুষের সঙ্গে উঠাবসা করো। তাতে তুমি যেমন বিদ্যা দ্বারা উপকৃত হবে, তেমনি প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিবৃত্তি লাভ করবে। তুমি এমন মানুষের সঙ্গী হও। দেখবে তার সৎপথের দিশা থেকে তুমি দিশা লাভ করছ।

সাবধান! সাবধান!! অগোচরে নিন্দাকারী অশ্লীল ভাষীর ধারে কাছেও যাবে না। কেননা মানুষ মানুষের অনুসরণ করে। আর নির্বোধদের সাথে থাকতে যেয়ো না। কেননা হে সাবধানী বন্ধু! নির্বোধ যদি কোন ভাল কিছুও করতে চায় তবুও সে তা বিনষ্ট করে ফেলে'।

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) অনেকগুলো বিষয় উল্লেখ করেছেন যা অবলম্বন করলে আল্লাহ্র মর্যিতে যে কোন ব্যক্তি কুপ্রবৃত্তির ছোবল থেকে মুক্তি পাবে। তিনি বলেছেন, 'যদি প্রশ্ন তোলা হয়- যে কুপ্রবৃত্তির মাঝে ডুবে আছে সে কীভাবে তা থেকে মুক্তি পেতে পারে? উত্তরে বলা যায়, আল্লাহ্র সাহায্য ও সহায়তায় নিম্নের কাজগুলো তাকে মুক্তি দিতে পারে।-
প্রথম : কুপ্রবৃত্তি বা খেয়াল-খুশীর অনুসরণ না করতে মন থেকে পাকাপোক্ত সঙ্কল্প করা।
দ্বিতীয় : ধৈর্য-সহিষ্ণুতা অবলম্বন করা। যখন মনের মধ্যে প্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তখনই ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে হবে। ধৈর্য হারানো চলবে না।
তৃতীয় : যাতে এক্ষেত্রে ধৈর্য অবলম্বন করা যায় সেজন্য মানসিক শক্তি বাড়াতে হবে। বলবীর্যতা তো আসলে সময়মত ধৈর্যের সাথে টিকে থাকার নাম। আর বান্দা ধৈর্যের মাধ্যমে যে জীবন-জীবিকা লাভ করে তাই উত্তম।
চতুর্থ : কামনা-বাসনার অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে যে শুভ পরিণতি অপেক্ষা করছে তা ভেবে দেখা এবং ধৈর্যের দাওয়া দ্বারা আরোগ্য লাভ করা।
পঞ্চম : প্রবৃত্তির আনুগত্য করলে তাৎক্ষণিক স্বাদ হয়তো মিলবে। কিন্তু সেজন্য কী পরিমাণ খেসারত ও যন্ত্রণা পোহাতে হবে তা লক্ষ্য করা।
ষষ্ঠ : আল্লাহ তা'আলার নিকট তার অবস্থান আর মানুষের মনে তার যে জায়গা আছে তা বহাল রাখতে সচেষ্ট হওয়া। খেয়াল-খুশীমত চলা থেকে এটা তার জন্য অনেক উত্তম ও উপকারী।
সপ্তম : পাপের স্বাদ থেকে চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও পাপ থেকে দূরে থাকার স্বাদকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অষ্টম : সে যে তার প্রবৃত্তি নামক শত্রুকে পরাস্ত ও তাকে পদানত করতে পেরেছে সেজন্য আনন্দিত হওয়া। এজন্যও আনন্দিত হওয়া যে তার শত্রু নিজের ব্যর্থতার জন্য ক্রোধ ও দুঃখ-বেদনায় জর্জরিত হয়ে ফিরে গেছে। তার থেকে সে তার আশা পূরণ করতে পারেনি। আল্লাহ তা'আলাও চান বান্দা যেন তার শত্রুকে ক্ষুব্ধ ও রাগান্বিত করার মত আমল করে। আল্লাহ কুরআনে করীমে বলেছেন, وَلَا يَطَئُوْنَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلاَ يَنَالُوْنَ مِنْ عَدُوٌّ نَيْلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ 'এমন কোন স্থানে তারা যাবে, যেখানে যাওয়ায় কাফিরদের তাদের উপর ক্রোধ সৃষ্টি হবে এবং শত্রুদের কাছ থেকেও যুদ্ধলব্ধ গণীমত হিসাবে তারা কিছু লাভ করবে। মূলতঃ এর প্রতিটি কাজের বদলে তাদের জন্য নেক আমল লেখা হবে' (তওবা ৯/১২০)। প্রিয়জনের শত্রুকুলকে ক্ষেপিয়ে তোলা ও ক্ষুব্ধ করে তোলা সত্যিকারের মহব্বতের লক্ষণ।

নবম : প্রবৃত্তির বিরোধিতা করলে দুনিয়াতেও সম্মান মিলবে, আখিরাতেও সম্মান মিলবে, প্রকাশ্যেও ইযযত লাভ হবে, গোপনেও ইযযত লাভ হবে। পক্ষান্তরে প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে সর্বত্রই ধ্বংস ডেকে আনবে, প্রকাশ্যেও সে অপদস্থ হবে অপ্রকাশ্যেও অপদস্থ হবে। এসব কথা মনে করে এবং জেনে বুঝে সকলকে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে বরং বিরোধিতায় সচেষ্ট হ'তে হবে।

টিকাঃ
৫৯. তিরমিযী হা/৩৫৯১; মিশকাত হা/২৪৭১, সনদ ছহীহ।
৬০. হিলয়াতুল আওলিয়া ৮/১৮।
৬১. ঐ, ৪/২১২।
৬২. আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ ৩/৩০৪।
৬৩. রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৭১-৪৭২।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 প্রশংসনীয় প্রবৃত্তি ও নিন্দনীয় প্রবৃত্তি

📄 প্রশংসনীয় প্রবৃত্তি ও নিন্দনীয় প্রবৃত্তি


খেয়াল-খুশী মাত্রেই যেমন নিন্দনীয় নয়, তেমনি তার সবটাই প্রশংসনীয়ও নয়। এক্ষেত্রে বাড়াবাড়িটাই নিন্দনীয়। সুতরাং উপকার বয়ে আনা ও অপকার প্রতিরোধ করার উপর বেশী যা কিছু করা হবে তাই হবে নিন্দনীয়। এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কামনা-বাসনাও আছে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট প্রিয়। আর তা তখনই হবে যখন মন তাই কামনা করবে যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট প্রিয় ।

আয়েশা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যে সমস্ত মহিলা নিজেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে বিয়ের জন্য তাঁর সামনে প্রস্তাব পেশ করত আমার মনের মধ্যে তাদের জন্য একরকম অস্বস্তি কাজ করত। আমি বলতাম, একজন মেয়ে মানুষ কি এভাবে নিজেকে দান করতে পারে? তারপর যখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেন, تُرْجِيْ مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِي إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ 'তুমি তোমার স্ত্রীদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করলে তাদের মধ্য থেকে কাউকে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখতে পার, আবার যাকে ইচ্ছা নিজের কাছে স্থান দিতে পার। যাকে তুমি দূরে রেখেছিলে তাকে যদি পুনরায় তুমি নিজের কাছে রাখতে চাও তাতেও তোমার কোন দোষ হবে না' (আহযাব ৩৩/৫১)। তখন আমি মনে মনে স্বগতোক্তি করলাম, আমার মনে হয় আমার প্রভু দ্রুতই আমার কামনার অনুকূলে সাড়া দিয়েছেন'।

নবী করীম (ছাঃ)ও কিছু কিছু জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করতেন। আল্লাহ তা'আলা তার আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে কুরআনের আয়াত নাযিল করতেন। এতে করে বুঝা যায়, মন যা কামনা করে তার কতক প্রশংসনীয়। নবী করীম (ছাঃ)-এর কামনার মধ্যে ছিল, বায়তুল মুক্বাদ্দাস থেকে কা'বার দিকে কিবলা পরিবর্তন করা। এর কারণ সম্পর্কে আলেমগণ বলেছেন নবী করীম (ছাঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার অনুসরণ করতে মনে মনে কামনা করতেন।

আবু বারযা নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, إِنَّ مَّا أَخْشَى عَلَيْكُمْ شَهَوَاتِ الْغَيِّ فِي بُطُونِكُمْ وَفُرُوْجِكُمْ وَمُضِلاتِ الْفِتَنِ 'আমি তোমাদের ব্যাপারে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা কেবলই তোমাদের ক্ষেত্রে তোমাদের পেট তথা পানাহার ও জননেন্দ্রিয়ের অবৈধ সম্ভোগ এবং শরী'আত বিরুদ্ধ কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার ভয় করি'।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কিন্তু তাঁর উম্মতের জন্য সব রকম কামনার ভয় করেননি। বরং তিনি কেবল ভয় করেছেন পথভ্রষ্টকারী কামনা-বাসনার। কারণ কামনা-বাসনা কখনো কখনো পথভ্রষ্টকারী হয়ে থাকে। এরূপ কামনা-বাসনা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এবং দ্বীন-ধর্মকে বিনষ্ট করে দেয়। কিন্তু যে কামনা-বাসনা পথভ্রষ্ট করে না তাতে কোন দোষ নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তাই সে সম্পর্কে সতর্ক করেননি। কিন্তু নিন্দনীয় কামনা-বাসনাই অধিকহারে প্রচলিত। এজন্যই আমরা অনেক আয়াত, হাদীছ এবং পূর্বসূরি ছাহাবী, তাবেঈগণের ও তাঁদের পরবর্তীদের কথায় সাধারণভাবে কামনা-বাসনার নিন্দা দেখতে পাই। এখানে অবশ্যই ওগুলো দ্বারা নিন্দনীয় কামনা বুঝানো হয়েছে, সাধারণভাবে সব কামনা ও খেয়াল-খুশী নয়।

ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, 'কামনা-বাসনা ও লালসার অনুগামী লোকেরা বেশির ভাগই উপকার লাভের মাত্রা পর্যন্ত এসে থামে না; বরং সীমালংঘন করে। তাই সাধারণভাবে এর ক্ষতিকারিতার কারণেই কামনা ও লালসার নিন্দা করা হয়েছে। খুব কম লোকই এক্ষেত্রে ইনছাফ বজায় রাখতে পারে বা ইনছাফের পর্যায়ে এসে থামতে পারে। এজন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁর গ্রন্থে যেখানেই কামনা বা প্রবৃত্তির কথা বলেছেন, সেখানেই তার নিন্দা করেছেন। হাদীছেও তা নিন্দনীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, ক্ষেত্র বিশেষে শর্তযুক্তভাবে তার প্রশংসা এসেছে'।

হাদীছে যে কামনার নিন্দা করা হয়নি তা যেমন ইতিপূর্বে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে, তেমনি হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আছ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত হাদীছেও এসেছে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হ'তে পারবে না যে পর্যন্ত না তার কামনা-বাসনা আমি যে দ্বীন নিয়ে এসেছি তার অনুগত হয়'।

হাদীছ হ'তে বুঝা যায়, কিছু কামনা প্রশংসনীয়। আর তা হ'ল সেসব কামনা যেগুলো শরী'আতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে দিন বদর যুদ্ধ হ'ল, সেদিন বন্দীদের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-কে বলেছিলেন, مَا تَرَوْنَ فِي هَؤُلَاءِ الْأُسَارَى 'এসব বন্দীদের বিষয়ে আপনাদের অভিমত কী'? তখন আবুবকর (রাঃ) বলেছিলেন, يَا نَبِيَّ اللَّهِ هُمْ بَنُو الْعَمِّ وَالْعَشِيْرَةِ أَرَى أَنْ تَأْخُذَ مِنْهُمْ فِدْيَةً فَتَكُوْنُ لَنَا قُوَّةً عَلَى الْكُفَّارِ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُمْ لِلْإِسْلَامِ 'হে আল্লাহ্র নবী! তারা তো আমাদেরই চাচাত ভাই ও জ্ঞাতি লোক। আমি মনে করি, মুক্তিপণ নিয়ে আপনি ওদের ছেড়ে দিন। মুক্তিপণের অর্থ কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি জোগাবে। আর এ লোকগুলোকেও আল্লাহ ভবিষ্যতে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় দিতে পারেন'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পুনরায় বললেন, مَا تَرَى يَا ابْنَ الْخَطَّابِ 'হে খাত্ত্বাবের সন্তান ওমর! তোমার অভিমত কী'? আমি বললাম, لا وَاللَّهِ يَا رَسُوْلَ اللهِ مَا أَرَى الَّذِى رَأَى أَبُو بَكْرٍ وَلَكِنِّي أَرَى أَنْ تُمَكِّنَّا فَنَضْرِبَ أَعْنَاقَهُمْ فَتُمَكِّنَ عَلِيًّا مِنْ عَقِيلٍ فَيَضْرِبَ عُنُقَهُ وَتُمَكِّنِّى مِنْ فُلانٍ نَسِيْبًا لِعُمَرَ - فَأَضْرِبَ عُنُقَهُ فَإِنَّ هَؤُلاَءِ أَئِمَّةُ الْكُفْرِ وَصَنَادِيدُهَا فَهَوِيَ رَسُوْلُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا قَالَ أَبُو بَكْرٍ وَلَمْ يَهْوَ مَا قُلْتُ - 'না, আল্লাহ্র কসম! আবুবকর যেমন ভাবছেন আমি তা মনে করি না। বরং আমার সিদ্ধান্ত এই যে, আপনি ওদেরকে আমাদের হাতে দিন, আমরা ওদের গর্দান উড়িয়ে দেই। আকীলকে দিন আলীর হাতে সে তার গর্দান উড়িয়ে দিক। আমার হাতে দিন অমুককে (ওমরের বংশীয়) আমি তার ঘাড় নামিয়ে দেই। এসব লোক তো কাফিরদের বড় বড় নেতা। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবুবকরের ইচ্ছেমত কাজ করলেন। আমি যা বললাম সে মত অনুযায়ী করলেন না'।

দেখুন দয়াল নবী (ছাঃ) আবুবকর (রাঃ)-এর কথা ও ইচ্ছার দিকে ঝুঁকলেন। কারণ এতে তিনি ইসলামের কল্যাণ দেখেছিলেন। এটা ছিল প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত। নবী করীম (ছাঃ) নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও পরবর্তীতে ওমর (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তকে সঠিক আখ্যা দিয়ে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল।

টিকাঃ
৬৪. বুখারী হা/৪৭৮৮।
৬৫. তাফসীরে তাবারী ২/২২ পৃঃ।
৬৬. আহমাদ হা/১৯৭৮৮; ছহীহ তারগীব হা/৫২, সনদ ছহীহ।
৬৭. রওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৬৯ (ঈষৎ পরিবর্তন সহ)।
৬৮. নববী, শারহুস সুন্নাহ; মিশকাত হা/১৬৭, আলবানী, সনদ যঈফ।
৬৯. মুসলিম হা/১৭৬৩; ইবনু হিব্বান হা/৪৭৯৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00