📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের উপকারিতা
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) বলেছেন, أَفْضَلُ الْجِهَادِ جِهَادُ الْهَوَى 'কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদই সর্বোত্তম জিহাদ'। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন, أَشْجَعُ النَّاسِ أَشَدُّهُمْ مِنَ الْهَوَى امْتِنَاعًا ، وَمِنَ الْمُحَقَّرَاتِ تُنْتَجُ الْمُوْبِقَاتُ 'কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে যে যত বেশী বিরত থাকতে সক্ষম, সে তত বড় বীর পুরুষ। আর তুচ্ছ সব জিনিস থেকেই বড় বড় ধ্বংসাত্মক জিনিস জন্ম নেয়'।
অন্তরের রোগ-ব্যাধির প্রকৃত চিকিৎসা কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতার মধ্যে নিহিত। সাহল বিন আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, هَوَاكَ دَاؤُكَ، فَإِنْ خَالَفْتَهُ فَدَوَاؤُكَ 'তোমার কুপ্রবৃত্তি তোমার রোগ। তুমি যদি তার বিরোধিতা কর তাহ'লে সেটাই তোমার ঔষধ'।
টিকাঃ
৪৪. ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ঈয়্যাহ ৩/২৫১।
৪৫. ঐ ৩/২৫১।
৪৬. তাফসীরে কুরতুবী ১৬/১৪৪।
📄 জান্নাত লাভ
কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করে ইসলামী নিয়ম-নীতি অনুযায়ী জীবন-যাপনকারী মানুষ জান্নাত লাভ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَأَمَّا مَن طَغَى، وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى، وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى - 'সুতরাং যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং দুনিয়াবী জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে অবশ্যই জাহান্নام হবে তার আবাসস্থল। আর যে ব্যক্তি (কিয়ামতের দিন) তার মালিকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নিজের মনকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা' (নাযি'আত ৭৯/৩৭-৪১)।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার মনের সাথে যুদ্ধ করে এবং মনের চাওয়া-পাওয়ার বিরোধিতা করতে গিয়ে ধৈর্য ধারণ করে, সে কিয়ামতের দিন উত্তম প্রতিফল পাবে। জান্নাতে প্রবেশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন হবে তার প্রতিদান। এটা মূলতঃ মনের কামনা-বাসনার বিরোধিতায় ধৈর্য ধারণের প্রতিদান। মহান আল্লাহ বলেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوْا جَنَّةَ وَحَرِيْرًا 'আর তারা যে কঠোর ধৈর্য (সহিষ্ণুতা) প্রদর্শন করেছে তার পুরস্কার হিসাবে তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী পোশাক দান করবেন' (দাহর ৭৬/১২)।
📄 হাশর দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি
হাশর ময়দানে পার্থিব জীবনের প্রতিফল লাভের জন্য সকল প্রাণী একত্রিত হবে। সেখানে আল্লাহ্র রহমতের ছায়ায় স্থান না পেলে কঠিন দুর্দশায় পড়তে হবে। সেদিন সাত শ্রেণীর মানুষ আল্লাহ্র রহমতের ছায়া লাভ করবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ تَعَالَى فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَدْلٌ، وَشَابٌ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ - 'যেদিন আল্লাহ্র ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তা'আলা সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে তাঁর ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক (২) এমন যুবক যে আল্লাহ্র ইবাদতে জীবন অতিবাহিত করেছে (৩) এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে (৪) এমন দু'জন ব্যক্তি যারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালবেসে একত্রিত হয় এবং পৃথক হয় (৫) এমন ব্যক্তি যাকে কোন সুন্দরী ও অভিজাত নারী (ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য) আহ্বান করে, তখন সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি (৬) এমন ব্যক্তি যে গোপনে ছাদাক্বা করে কিন্তু তার বাম হাত জানতে পারে না যে তার ডান হাত কি ব্যয় করে (৭) এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুধারা প্রবাহিত করে'।
আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, 'পাঠক, আপনি যদি ভেবে দেখেন, যে ৭ জনকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর আরশের ছায়াতলে সেদিন আশ্রয় দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত কারো ছায়া থাকবে না তাহ'লে বুঝতে পারবেন যে, সে সাতজনই কিন্তু কুপ্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশীর বিরুদ্ধাচরণ হেতুই তা লাভ করেছে। কারণ একজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক তার কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ ব্যতীত ইনছাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। যে যুবক তার যৌবনের চাহিদার উপর আল্লাহ্র ইবাদতকে প্রাধান্য দেয় সে যদি তার যৌবনের কামনা-বাসনার বিপরীতে না দাঁড়াত তাহ'লে তার পক্ষে তা করা সম্ভব হ'ত না। যে ব্যক্তির মন মসজিদের সাথে যুক্ত থাকে, দুনিয়ার নানা স্বাদ-আহ্লাদ ও উপভোগের জায়গায় যাওয়া বাদ না দিলে তার পক্ষে কোনক্রমেই মসজিদে যাওয়া সম্ভব হ'ত না। বাম হাতকে না জানিয়ে ডান হাতে দানকারী যদি তার মনস্কামনার উপর জোর খাটাতে না পারে তাহ'লে তার পক্ষেও এমন দান করা কখনই সম্ভব হয় না। যাকে কোন সুন্দরী বংশীয় মহিলা কুকর্মের প্রতি আহ্বান জানায় এবং আল্লাহ্র ভয়ে সে তা না করে, সে তো তার ইন্দ্রিয় সম্ভোগের সুযোগ প্রত্যাখ্যানের ফলেই এমনটা করতে সক্ষম হয়। আর যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর ভয়ে তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে মূলতঃ নিজ কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতাই তাকে ঐ স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দানের গরম তাপ, ঘাম ও দুর্বিষহ অবস্থায় তাদের উপর প্রভাব খাটানোর কোনই সুযোগ থাকবে না। অথচ কুপ্রবৃত্তির পূজারীরা সেদিন উত্তাপ আর ঘামে জর্জরিত হবে। আর হাশরের ময়দানে এহেন অবস্থার পর তারা প্রবৃত্তির কারাগারে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকবে'।
টিকাঃ
৪৭. হিলয়াতুল আওলিয়া ৯/২৬৮।
৪৮. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইসতিযকার ২/৩৬৪।
৪৯. বুখারী হা/১৪২৩; মুসলিম হা/১০৩১।
৫০. রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৮৫-৪৮৬।
📄 উচ্চমর্যাদা লাভ
হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) বলেছেন, ،المروءة ترك الشهوات وعصيان الهوى فاتباع الهوى يزمن المروءة ومخالفته تنعشها 'পৌরুষ হ'ল কামনা-বাসনা বর্জন এবং কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতার নাম। কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ পৌরুষকে ব্যাধিগ্রস্ত করে দেয়, আর তার বিরোধিতায় পৌরুষ সুস্থ-সবল থাকে'। মুহাল্লাব বিন আবু ছাফরাকে বলা হ'ল, 'কীভাবে আপনি এত উচ্চমর্যাদা লাভ করলেন'? উত্তরে তিনি বলেন, 'বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা অবলম্বন এবং প্রবৃত্তির বিরোধিতার মাধ্যমে'।
জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, 'বিদ্বানদের মধ্যে সেই বেশী মহৎ, যে তার দ্বীন সাথে নিয়ে দুনিয়ার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচে এবং কামনা-বাসনার উপর তার কর্তৃত্ব মযবৃত করে'। আবু আলী আদ-দাক্কাক বলেছেন, من ملك شهوته في حال شبيبته أعزه الله تعالى في حال كهولته 'যে ব্যক্তি তার যৌবনে তার কামনা-বাসনার উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পেরেছে, বার্ধক্যে আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মান দান করবেন'।
কবি ইবনু আব্দিল কাভী বলেছেন,
فَمَنْ هَجَرَ اللَّذَّاتِ نَالَ الْمُنَى وَمَنْ + أَكَبَّ عَلَى اللَّذَّاتِ عَضَ عَلَى الْيَدِ
وَفِي قَمْعِ أَهْوَاءِ النُّفُوسِ اعْتِرَازُهَا + وَفِي نَيْلِهَا مَا تَشْتَهِيْ ذُلُّ سَرْمَدِ
وَلَا تَشْتَغِلْ إِلَّا بِمَا يُكْسِبُ الْعُلَا + وَلَا تُرْضِ النَّفْسَ النَّفِيسَةَ بِالرَّدِي
وَفِي خَلْوَةِ الْإِنْسَانِ بِالْعِلْمِ أُنْسُهُ + وَيَسْلَمُ دِيْنُ الْمَرْءِ عِنْدَ التَّوَحُدِ
وَيَسْلَمُ مِنْ قِيْلٍ وَقَالَ وَمِنْ أَذَى + جَلِيْسٍ وَمِنْ وَاشٍ بَغِيْضٍ وَحُسَّدِ
فَكُنْ حِلْسَ بَيْتٍ فَهْوَ سِتْرٌ لِعَوْرَةٍ + وَحِرْزُ الْفَتَى عَنْ كُلِّ غَاوِ وَمُفْسِدِ
وَخَيْرُ جَلِيْسِ الْمَرْءِ كُتُبٌ تُفِيدُهُ + عُلُوْمًا وَآدَابًا وَعَقْلاً مُؤَيِّدِ
'যে স্বাদ-আহ্লাদ ত্যাগ করেছে সে আশা পূরণ করতে পেরেছে। আর যে স্বাদ-আহ্লাদের মাঝে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সে অনুশোচনায় হাত কামড়ে ধরেছে। মনের কামনা-বাসনাকে দমন করাতেই তার সম্মান নিহিত রয়েছে। কিন্তু মন যা চায় তাই জোগাতে থাকলে এক সময় চিরস্থায়ী লাঞ্ছনায় ডুবে যেতে হবে। কাজেই উচ্চমর্যাদা অর্জিত হয় এমন কাজ বাদে অন্য কোন কাজে মশগুল হয়ো না। মূল্যবান জীবনটাকে নিকৃষ্ট জিনিসের মাঝে সন্তুষ্ট থাকতে দিও না। একান্তে বিদ্যাচর্চা মানুষের জন্য বন্ধুত্ব বয়ে আনে আর একাকীত্বের মাঝেই মানুষের দ্বীন-ধর্ম-নিরাপদ থাকে। সে সমালোচনা, খারাপ সঙ্গীর কষ্টদান এবং বিদ্বেষপরায়ণ নিন্দুক ও হিংসুকের হিংসা থেকে রক্ষা পায়। সুতরাং তুমি সর্বদা তোমার ঘরে অবস্থান কর। এটাই তো তোমার গোপনীয়তার জন্য হবে পর্দা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টাচারী ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টিকারী থেকে (তরুণের) রক্ষাকবচ। উপকারী বই-পুস্তকই তো মানুষের উত্তম সঙ্গী । যা তাকে বিদ্যা-বুদ্ধি ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়'।
টিকাঃ
৫১. রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৭৭-৪৭৮।
৫২. ইবনু আবিদ্দুনিয়া, আল-আকলু ও ফাযলুহু, পৃঃ ৯২।
৫৩. যাম্মুল হাওয়া, পৃঃ ২৭।
৫৪. রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৮৩।
৫৫. আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ ৩/৩০৩-৩০৪ ।