📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 অপমান-অপদস্থতার কারণ

📄 অপমান-অপদস্থতার কারণ


মানুষ প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে অপদস্থতার শিকার হ'তে হয়। ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেছেন,
وَمِنَ الْبَلَاءِ وَلِلْبَلَاءِ عَلَامَةٌ + أَنْ لَا تَرَى لَكَ عَنْ هَوَاكَ نُزُوْعُ
الْعَبْدُ عَبْدُ النَّفْسِ فِي شَهْوَاتِهَا + وَالْحُرُّ يَشْبَعُ مَرَّةً وَيَجُوعُ
'বালা-মুছীবতের কিছু লক্ষণ আছে। যেমন- তুমি তোমার খেয়াল-খুশীর খপ্পর থেকে বের হওয়ার কোন পথ খুঁজে পাবে না। যে লোভ-লালসার দাস সেই প্রকৃত দাস; আর যে কখনো তৃপ্ত, কখনো ক্ষুধার্ত সেই প্রকৃত স্বাধীন'।

জনৈক দার্শনিককে প্রবৃত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেছিলেন, প্রবৃত্তির আরবী هوى শব্দটি هَوَنٌ থেকে আগত। যার অর্থ অপমান-লাঞ্ছনা। আরবী هَوَانٌ থেকে ও বর্ণটি চুরি হয়ে গেছে। একজন কবিও এই অর্থে পংক্তি রচনা করেছেন-
نُوْنُ الْهَوَانِ مِنَ الْهَوَى مَسْرُوْقَةٌ + فَإِذَا هَوَيْتَ فَقَدْ لَقِيْتَ هَوَانَا
هَوَانٌ (অপমান) থেকে نون চুরি/লুপ্ত হয়ে هَوَى (প্রবৃত্তি) হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যখন প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে তখন অপমানের শিকার হবে।

আরেক কবি বলেছেন,
وَلَقَدْ رَأَيْتُ مَعَاشِرًا جَمَحَتْ بِهِمْ + تِلْكَ الطَّبِيعَةُ نَحْوَ كُلِّ تَبَارِ
تَهْوَى نُفُوْسُهُمْ هَوَى أَجْسَامِهِمْ + شُغْلاً بِكُلِّ دَنَاءَةٍ وَصَغَارِ
تَبِعُوا الْهَوَى فَهَوَى بِهِمْ وَكَذَا الْهَوَى + مِنْهُ الْهَوَانُ بِأَهْلِهِ فَحَذَارِ
فَانْظُرْ بِعَيْنِ الْحَقِّ لَا عَيْنَ الْهَوَى + فَالْحَقُّ لِلْعَيْنِ الْجَلِيَّةِ عَارِ
قَادَ الْهَوَى الْفُجَّارَ فَانْقَادُوْا لَهُ + وَأَبَتْ عَلَيْهِ مَقَادَةُ الْأَبْرَارِ

(১) আমি অনেক জনগোষ্ঠীকে দেখেছি আদত-অভ্যাস তাদেরকে সকল প্রকার ধ্বংসের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।
(২) তাদের দেহের চাহিদার অনুকূলে তাদের মন সবরকম নিকৃষ্ট ও হীন কাজ বেছে নিয়েছে।
(৩) তারা প্রবৃত্তির অনুগত হয়েছে, ফলে তা তাদেরকে পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনুরূপভাবে প্রবৃত্তি তার অনুসারীকে লাঞ্ছনার শিকার বানিয়ে ছাড়ে। সুতরাং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে সাবধান থাক।
(৪) সত্য ও ন্যায়ের চোখ দিয়ে দেখ, প্রবৃত্তির চোখ দিয়ে দেখো না। কেননা দিব্যদৃষ্টির সামনে সত্য ঢাকা পড়ে না।
(৫) প্রবৃত্তি পাপাচারীদের পরিচালনা করে; ফলে তারা তার অনুগত হয়ে যায়। কিন্তু সৎ লোকেরা তার অনুগত হয়ে চলতে রাযী নয়।

টিকাঃ
৪১. ইবনু আসাকির, তারীখু মাদীনাতি দিমাশক ৩২/৪৬৮।
৪২. তাফসীরে কুরতুবী ১৬/১৬৮।
৪৩. ইবনুল জাওযী, আত-তাবছিরাহ ১/১৫৫।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের উপকারিতা

📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের উপকারিতা


ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) বলেছেন, أَفْضَلُ الْجِهَادِ جِهَادُ الْهَوَى 'কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদই সর্বোত্তম জিহাদ'। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন, أَشْجَعُ النَّاسِ أَشَدُّهُمْ مِنَ الْهَوَى امْتِنَاعًا ، وَمِنَ الْمُحَقَّرَاتِ تُنْتَجُ الْمُوْبِقَاتُ 'কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে যে যত বেশী বিরত থাকতে সক্ষম, সে তত বড় বীর পুরুষ। আর তুচ্ছ সব জিনিস থেকেই বড় বড় ধ্বংসাত্মক জিনিস জন্ম নেয়'।

অন্তরের রোগ-ব্যাধির প্রকৃত চিকিৎসা কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতার মধ্যে নিহিত। সাহল বিন আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, هَوَاكَ دَاؤُكَ، فَإِنْ خَالَفْتَهُ فَدَوَاؤُكَ 'তোমার কুপ্রবৃত্তি তোমার রোগ। তুমি যদি তার বিরোধিতা কর তাহ'লে সেটাই তোমার ঔষধ'।

টিকাঃ
৪৪. ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ঈয়্যাহ ৩/২৫১।
৪৫. ঐ ৩/২৫১।
৪৬. তাফসীরে কুরতুবী ১৬/১৪৪।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 জান্নাত লাভ

📄 জান্নাত লাভ


কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করে ইসলামী নিয়ম-নীতি অনুযায়ী জীবন-যাপনকারী মানুষ জান্নাত লাভ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَأَمَّا مَن طَغَى، وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى، وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى - 'সুতরাং যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং দুনিয়াবী জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে অবশ্যই জাহান্নام হবে তার আবাসস্থল। আর যে ব্যক্তি (কিয়ামতের দিন) তার মালিকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নিজের মনকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা' (নাযি'আত ৭৯/৩৭-৪১)।

সুতরাং যে ব্যক্তি তার মনের সাথে যুদ্ধ করে এবং মনের চাওয়া-পাওয়ার বিরোধিতা করতে গিয়ে ধৈর্য ধারণ করে, সে কিয়ামতের দিন উত্তম প্রতিফল পাবে। জান্নাতে প্রবেশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন হবে তার প্রতিদান। এটা মূলতঃ মনের কামনা-বাসনার বিরোধিতায় ধৈর্য ধারণের প্রতিদান। মহান আল্লাহ বলেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوْا جَنَّةَ وَحَرِيْرًا 'আর তারা যে কঠোর ধৈর্য (সহিষ্ণুতা) প্রদর্শন করেছে তার পুরস্কার হিসাবে তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী পোশাক দান করবেন' (দাহর ৭৬/১২)।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 হাশর দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি

📄 হাশর দিবসের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি


হাশর ময়দানে পার্থিব জীবনের প্রতিফল লাভের জন্য সকল প্রাণী একত্রিত হবে। সেখানে আল্লাহ্র রহমতের ছায়ায় স্থান না পেলে কঠিন দুর্দশায় পড়তে হবে। সেদিন সাত শ্রেণীর মানুষ আল্লাহ্র রহমতের ছায়া লাভ করবে।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ تَعَالَى فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَدْلٌ، وَشَابٌ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ - 'যেদিন আল্লাহ্র ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন আল্লাহ তা'আলা সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে তাঁর ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক (২) এমন যুবক যে আল্লাহ্র ইবাদতে জীবন অতিবাহিত করেছে (৩) এমন ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে (৪) এমন দু'জন ব্যক্তি যারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালবেসে একত্রিত হয় এবং পৃথক হয় (৫) এমন ব্যক্তি যাকে কোন সুন্দরী ও অভিজাত নারী (ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য) আহ্বান করে, তখন সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি (৬) এমন ব্যক্তি যে গোপনে ছাদাক্বা করে কিন্তু তার বাম হাত জানতে পারে না যে তার ডান হাত কি ব্যয় করে (৭) এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুধারা প্রবাহিত করে'।

আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, 'পাঠক, আপনি যদি ভেবে দেখেন, যে ৭ জনকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর আরশের ছায়াতলে সেদিন আশ্রয় দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত কারো ছায়া থাকবে না তাহ'লে বুঝতে পারবেন যে, সে সাতজনই কিন্তু কুপ্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশীর বিরুদ্ধাচরণ হেতুই তা লাভ করেছে। কারণ একজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক তার কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ ব্যতীত ইনছাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। যে যুবক তার যৌবনের চাহিদার উপর আল্লাহ্র ইবাদতকে প্রাধান্য দেয় সে যদি তার যৌবনের কামনা-বাসনার বিপরীতে না দাঁড়াত তাহ'লে তার পক্ষে তা করা সম্ভব হ'ত না। যে ব্যক্তির মন মসজিদের সাথে যুক্ত থাকে, দুনিয়ার নানা স্বাদ-আহ্লাদ ও উপভোগের জায়গায় যাওয়া বাদ না দিলে তার পক্ষে কোনক্রমেই মসজিদে যাওয়া সম্ভব হ'ত না। বাম হাতকে না জানিয়ে ডান হাতে দানকারী যদি তার মনস্কামনার উপর জোর খাটাতে না পারে তাহ'লে তার পক্ষেও এমন দান করা কখনই সম্ভব হয় না। যাকে কোন সুন্দরী বংশীয় মহিলা কুকর্মের প্রতি আহ্বান জানায় এবং আল্লাহ্র ভয়ে সে তা না করে, সে তো তার ইন্দ্রিয় সম্ভোগের সুযোগ প্রত্যাখ্যানের ফলেই এমনটা করতে সক্ষম হয়। আর যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর ভয়ে তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে মূলতঃ নিজ কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতাই তাকে ঐ স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দানের গরম তাপ, ঘাম ও দুর্বিষহ অবস্থায় তাদের উপর প্রভাব খাটানোর কোনই সুযোগ থাকবে না। অথচ কুপ্রবৃত্তির পূজারীরা সেদিন উত্তাপ আর ঘামে জর্জরিত হবে। আর হাশরের ময়দানে এহেন অবস্থার পর তারা প্রবৃত্তির কারাগারে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকবে'।

টিকাঃ
৪৭. হিলয়াতুল আওলিয়া ৯/২৬৮।
৪৮. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইসতিযকার ২/৩৬৪।
৪৯. বুখারী হা/১৪২৩; মুসলিম হা/১০৩১।
৫০. রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃঃ ৪৮৫-৪৮৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00