📄 মানুষের দুর্নাম ও সমালোচনা কুড়ান
প্রবৃত্তির অনুসরণে মানুষের সমালোচনার পাত্র হ'তে হয়। কথিত আছে যে, হিশাম ইবনু আব্দুল মালিক তার জীবনে এই একটি মাত্র কবিতার লাইন ছাড়া কোন কবিতা বলেননি।
إِذَا أَنْتَ لَمْ تَعْصِ الْهَوَى قَادَكَ الْهَوَى
إِلَى بَعْضٍ مَا فِيْهِ عَلَيْكَ مَقَالُ
'যখন তুমি তোমার প্রবৃত্তির অবাধ্য হ'তে না পারবে তখন প্রবৃত্তি তোমাকে এমন কিছুর দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবে, যে জন্য তোমাকে অন্যের সমালোচনা শুনতে হবে'।
ইবনু আব্দিল বার বলেছেন, তিনি যদি إلى بعض ما فيه عليك مقال (কিছু সমালোচনামূলক কাজের দিকে পরিচালনা করার) স্থলে إلى كل ما فيه عليك مقال (সকল সমালোচনামূলক কাজের দিক পরিচালিত করার) কথা বলতেন, তাহ'লে সেটাই অধিক অর্থপূর্ণ ও সুন্দর হ'ত।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন,
إِذَا حَارَ أَمْرُكَ فِي مَعْنَيَيْنِ + وَأَعْيَاكَ حَيْثُ الْهَوَى وَالصَّوَابْ
فَدَعْ مَا هَوَيْتَ فَإِنَّ الْهَوَى + يَقُوْدُ النُّفُوْسَ إِلَى مَا يُعَابْ
‘যখন কোন বিষয়ের দু'ধরনের অর্থের কোনটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে তুমি দ্বিধান্বিত হয়ে পড় এবং কোনটা শরী'আতসম্মত সঠিক অর্থ আর কোনটা প্রবৃত্তির অনুসরণ তা নির্ণয়ে যদি তুমি অক্ষম হও, তাহ'লে তোমার প্রবৃত্তিরটা বাদ দাও। কেননা প্রবৃত্তি মনকে দূষণীয় পথে পরিচালিত করে'।
টিকাঃ
৩৮. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৯/৩৫২।
৩৯. বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মাজালিস, পৃঃ ১৭১।
৪০. ঐ, পৃঃ ১৭১।
📄 অপমান-অপদস্থতার কারণ
মানুষ প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে অপদস্থতার শিকার হ'তে হয়। ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেছেন,
وَمِنَ الْبَلَاءِ وَلِلْبَلَاءِ عَلَامَةٌ + أَنْ لَا تَرَى لَكَ عَنْ هَوَاكَ نُزُوْعُ
الْعَبْدُ عَبْدُ النَّفْسِ فِي شَهْوَاتِهَا + وَالْحُرُّ يَشْبَعُ مَرَّةً وَيَجُوعُ
'বালা-মুছীবতের কিছু লক্ষণ আছে। যেমন- তুমি তোমার খেয়াল-খুশীর খপ্পর থেকে বের হওয়ার কোন পথ খুঁজে পাবে না। যে লোভ-লালসার দাস সেই প্রকৃত দাস; আর যে কখনো তৃপ্ত, কখনো ক্ষুধার্ত সেই প্রকৃত স্বাধীন'।
জনৈক দার্শনিককে প্রবৃত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেছিলেন, প্রবৃত্তির আরবী هوى শব্দটি هَوَنٌ থেকে আগত। যার অর্থ অপমান-লাঞ্ছনা। আরবী هَوَانٌ থেকে ও বর্ণটি চুরি হয়ে গেছে। একজন কবিও এই অর্থে পংক্তি রচনা করেছেন-
نُوْنُ الْهَوَانِ مِنَ الْهَوَى مَسْرُوْقَةٌ + فَإِذَا هَوَيْتَ فَقَدْ لَقِيْتَ هَوَانَا
هَوَانٌ (অপমান) থেকে نون চুরি/লুপ্ত হয়ে هَوَى (প্রবৃত্তি) হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যখন প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে তখন অপমানের শিকার হবে।
আরেক কবি বলেছেন,
وَلَقَدْ رَأَيْتُ مَعَاشِرًا جَمَحَتْ بِهِمْ + تِلْكَ الطَّبِيعَةُ نَحْوَ كُلِّ تَبَارِ
تَهْوَى نُفُوْسُهُمْ هَوَى أَجْسَامِهِمْ + شُغْلاً بِكُلِّ دَنَاءَةٍ وَصَغَارِ
تَبِعُوا الْهَوَى فَهَوَى بِهِمْ وَكَذَا الْهَوَى + مِنْهُ الْهَوَانُ بِأَهْلِهِ فَحَذَارِ
فَانْظُرْ بِعَيْنِ الْحَقِّ لَا عَيْنَ الْهَوَى + فَالْحَقُّ لِلْعَيْنِ الْجَلِيَّةِ عَارِ
قَادَ الْهَوَى الْفُجَّارَ فَانْقَادُوْا لَهُ + وَأَبَتْ عَلَيْهِ مَقَادَةُ الْأَبْرَارِ
(১) আমি অনেক জনগোষ্ঠীকে দেখেছি আদত-অভ্যাস তাদেরকে সকল প্রকার ধ্বংসের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।
(২) তাদের দেহের চাহিদার অনুকূলে তাদের মন সবরকম নিকৃষ্ট ও হীন কাজ বেছে নিয়েছে।
(৩) তারা প্রবৃত্তির অনুগত হয়েছে, ফলে তা তাদেরকে পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনুরূপভাবে প্রবৃত্তি তার অনুসারীকে লাঞ্ছনার শিকার বানিয়ে ছাড়ে। সুতরাং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে সাবধান থাক।
(৪) সত্য ও ন্যায়ের চোখ দিয়ে দেখ, প্রবৃত্তির চোখ দিয়ে দেখো না। কেননা দিব্যদৃষ্টির সামনে সত্য ঢাকা পড়ে না।
(৫) প্রবৃত্তি পাপাচারীদের পরিচালনা করে; ফলে তারা তার অনুগত হয়ে যায়। কিন্তু সৎ লোকেরা তার অনুগত হয়ে চলতে রাযী নয়।
টিকাঃ
৪১. ইবনু আসাকির, তারীখু মাদীনাতি দিমাশক ৩২/৪৬৮।
৪২. তাফসীরে কুরতুবী ১৬/১৬৮।
৪৩. ইবনুল জাওযী, আত-তাবছিরাহ ১/১৫৫।
📄 প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের উপকারিতা
ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ) বলেছেন, أَفْضَلُ الْجِهَادِ جِهَادُ الْهَوَى 'কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদই সর্বোত্তম জিহাদ'। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন, أَشْجَعُ النَّاسِ أَشَدُّهُمْ مِنَ الْهَوَى امْتِنَاعًا ، وَمِنَ الْمُحَقَّرَاتِ تُنْتَجُ الْمُوْبِقَاتُ 'কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে যে যত বেশী বিরত থাকতে সক্ষম, সে তত বড় বীর পুরুষ। আর তুচ্ছ সব জিনিস থেকেই বড় বড় ধ্বংসাত্মক জিনিস জন্ম নেয়'।
অন্তরের রোগ-ব্যাধির প্রকৃত চিকিৎসা কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতার মধ্যে নিহিত। সাহল বিন আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, هَوَاكَ دَاؤُكَ، فَإِنْ خَالَفْتَهُ فَدَوَاؤُكَ 'তোমার কুপ্রবৃত্তি তোমার রোগ। তুমি যদি তার বিরোধিতা কর তাহ'লে সেটাই তোমার ঔষধ'।
টিকাঃ
৪৪. ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শার'ঈয়্যাহ ৩/২৫১।
৪৫. ঐ ৩/২৫১।
৪৬. তাফসীরে কুরতুবী ১৬/১৪৪।
📄 জান্নাত লাভ
কুপ্রবৃত্তির বিরোধিতা করে ইসলামী নিয়ম-নীতি অনুযায়ী জীবন-যাপনকারী মানুষ জান্নাত লাভ করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَأَمَّا مَن طَغَى، وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى، وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى - 'সুতরাং যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং দুনিয়াবী জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে অবশ্যই জাহান্নام হবে তার আবাসস্থল। আর যে ব্যক্তি (কিয়ামতের দিন) তার মালিকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নিজের মনকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা' (নাযি'আত ৭৯/৩৭-৪১)।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার মনের সাথে যুদ্ধ করে এবং মনের চাওয়া-পাওয়ার বিরোধিতা করতে গিয়ে ধৈর্য ধারণ করে, সে কিয়ামতের দিন উত্তম প্রতিফল পাবে। জান্নাতে প্রবেশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন হবে তার প্রতিদান। এটা মূলতঃ মনের কামনা-বাসনার বিরোধিতায় ধৈর্য ধারণের প্রতিদান। মহান আল্লাহ বলেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوْا جَنَّةَ وَحَرِيْرًا 'আর তারা যে কঠোর ধৈর্য (সহিষ্ণুতা) প্রদর্শন করেছে তার পুরস্কার হিসাবে তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী পোশাক দান করবেন' (দাহর ৭৬/১২)।