📄 সংকীর্ণ জীবন ও মানুষের সঙ্গে শত্রুতা সৃষ্টির উপলক্ষ
মানুষের মাঝে যে হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা ও অনিষ্টতার প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়, তার মূলে রয়েছে প্রবৃত্তির অনুসরণ। সুতরাং যে তার প্রবৃত্তির বিরোধিতা করবে সে তার দেহ-মন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আরামে রাখবে। এতে সে নিজেও আরামে থাকবে এবং অন্যকেও স্বস্তিতে থাকতে দিবে। আর যে নিজের প্রবৃত্তির আনুগত্য করে সে অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। লোকদের সে ঘৃণা করে, লোকেরাও তাকে ঘৃণা করে।
ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেছেন, إقدعوا هذه النفوس عن شهواتها، فإنها طلاعة تنزع إلى شر غاية. إن هذا الحق ثقيل مرىء، وإن الباطل خفيف وبيء، وترك الخطيئة خير من معالجة التوبة. ورب نظرة زرعت شهوة، وشهوة ساعة أورثت حزنا طويلا - 'তোমরা তোমাদের মনগুলোকে লোভ-লালসা থেকে দূরে রাখো। কেননা তা কৌতূহলী। তা তোমাদেরকে চূড়ান্ত মন্দের দিকে ঠেলে দেয়। নিশ্চয়ই ন্যায় ও সত্য ভারী এবং চোখের সামনে সুস্পষ্ট। আর বাতিল হাল্কা ও ব্যাধিযুক্ত। পাপ পরিহার করা পাপ করার পর তওবা করার প্রবণতা থেকে অনেক উত্তম। আর অনেক দৃষ্টি মনে কামনা-বাসনার বীজ বপন করে। আর এক মুহূর্তের কামনা-বাসনা অনেক সময় দীর্ঘকালীন দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়'।
আবুবকর আল-ওয়ারাক বলেছেন, যখন প্রবৃত্তি জয়যুক্ত হয় তখন হৃদয় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর হৃদয় যখন অন্ধকার হয়ে যায় তখন মন সংকীর্ণ হয়ে যায়। মন যখন সংকীর্ণ হয়ে যায় তখন চরিত্র খারাপ হয়ে যায়। আর চরিত্র যখন খারাপ হয়ে যায় তখন সৃষ্টিকুল তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে, আবার সেও তাদের ঘৃণা করতে আরম্ভ করে'।
তারপর মানুষের বয়স বাড়তে বাড়তে যখন সে বার্ধক্যে উপনীত হয় তখন সে খেয়াল-খুশীর অনুসরণের কুফল হাতে নাতে পেয়ে থাকে। জনৈক কবি বলেছেন,
مَارِبُ كَانَتْ فِي الشَّبَابِ لِأَهْلِهَا عِذَابٌ فَصَارَتْ فِي الْمَشِيْبِ عَذَابًا
'যৌবনে যেসব কাজ-কর্ম ও প্রয়োজন পূরণ ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও মধুময়, বৃদ্ধকালে সেগুলোই আযাব-গযবে রূপান্তরিত হয়েছে'।
টিকাঃ
৩৪. আল-জাহিয, আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, পৃঃ ৪৫৪।
৩৫. যাম্মুল হাওয়া, পৃঃ ২৯।
৩৬. ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ, পৃঃ ৪৬।
📄 নিজের উপর শত্রুর খবরদারির সুযোগ তৈরী করে দেওয়া
শয়তান মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। আর তার সবচেয়ে হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু তার বিবেক-বুদ্ধি। সে তাকে ফেরেশতাসুলভ কল্যাণের পথের দিশা দেয়। কিন্তু কোন ব্যক্তি যখন তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে শুরু করে তখন সে নিজেকে নিজ হাতে শত্রুর কাছে সমর্পণ করে এবং তার বন্দিত্ব বরণ করে । এতে নিজের উপর নিজে সহনাতীত মুছীবত, দুর্ভাগ্যের বেড়ি, মন্দ ফায়ছালা এবং শত্রুদের হাসি-তামাশার সুযোগ তৈরী করে নেওয়া হয়।
বলা হয়, যখন তোমার উপর তোমার বিবেক জয়যুক্ত হয় তখন সে তোমার থাকে। আর তোমার প্রবৃত্তি যখন তোমার উপর জয়যুক্ত হয় তখন তা তোমার শত্রুর জন্য হয়ে যায়।
টিকাঃ
৩৭. ইবনু আব্দিল বার, বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মাজালিস, পৃঃ ১৭২।
📄 মানুষের দুর্নাম ও সমালোচনা কুড়ান
প্রবৃত্তির অনুসরণে মানুষের সমালোচনার পাত্র হ'তে হয়। কথিত আছে যে, হিশাম ইবনু আব্দুল মালিক তার জীবনে এই একটি মাত্র কবিতার লাইন ছাড়া কোন কবিতা বলেননি।
إِذَا أَنْتَ لَمْ تَعْصِ الْهَوَى قَادَكَ الْهَوَى
إِلَى بَعْضٍ مَا فِيْهِ عَلَيْكَ مَقَالُ
'যখন তুমি তোমার প্রবৃত্তির অবাধ্য হ'তে না পারবে তখন প্রবৃত্তি তোমাকে এমন কিছুর দিকে চালিয়ে নিয়ে যাবে, যে জন্য তোমাকে অন্যের সমালোচনা শুনতে হবে'।
ইবনু আব্দিল বার বলেছেন, তিনি যদি إلى بعض ما فيه عليك مقال (কিছু সমালোচনামূলক কাজের দিকে পরিচালনা করার) স্থলে إلى كل ما فيه عليك مقال (সকল সমালোচনামূলক কাজের দিক পরিচালিত করার) কথা বলতেন, তাহ'লে সেটাই অধিক অর্থপূর্ণ ও সুন্দর হ'ত।
ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন,
إِذَا حَارَ أَمْرُكَ فِي مَعْنَيَيْنِ + وَأَعْيَاكَ حَيْثُ الْهَوَى وَالصَّوَابْ
فَدَعْ مَا هَوَيْتَ فَإِنَّ الْهَوَى + يَقُوْدُ النُّفُوْسَ إِلَى مَا يُعَابْ
‘যখন কোন বিষয়ের দু'ধরনের অর্থের কোনটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে তুমি দ্বিধান্বিত হয়ে পড় এবং কোনটা শরী'আতসম্মত সঠিক অর্থ আর কোনটা প্রবৃত্তির অনুসরণ তা নির্ণয়ে যদি তুমি অক্ষম হও, তাহ'লে তোমার প্রবৃত্তিরটা বাদ দাও। কেননা প্রবৃত্তি মনকে দূষণীয় পথে পরিচালিত করে'।
টিকাঃ
৩৮. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৯/৩৫২।
৩৯. বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মাজালিস, পৃঃ ১৭১।
৪০. ঐ, পৃঃ ১৭১।
📄 অপমান-অপদস্থতার কারণ
মানুষ প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে অপদস্থতার শিকার হ'তে হয়। ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেছেন,
وَمِنَ الْبَلَاءِ وَلِلْبَلَاءِ عَلَامَةٌ + أَنْ لَا تَرَى لَكَ عَنْ هَوَاكَ نُزُوْعُ
الْعَبْدُ عَبْدُ النَّفْسِ فِي شَهْوَاتِهَا + وَالْحُرُّ يَشْبَعُ مَرَّةً وَيَجُوعُ
'বালা-মুছীবতের কিছু লক্ষণ আছে। যেমন- তুমি তোমার খেয়াল-খুশীর খপ্পর থেকে বের হওয়ার কোন পথ খুঁজে পাবে না। যে লোভ-লালসার দাস সেই প্রকৃত দাস; আর যে কখনো তৃপ্ত, কখনো ক্ষুধার্ত সেই প্রকৃত স্বাধীন'।
জনৈক দার্শনিককে প্রবৃত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ'লে তিনি বলেছিলেন, প্রবৃত্তির আরবী هوى শব্দটি هَوَنٌ থেকে আগত। যার অর্থ অপমান-লাঞ্ছনা। আরবী هَوَانٌ থেকে ও বর্ণটি চুরি হয়ে গেছে। একজন কবিও এই অর্থে পংক্তি রচনা করেছেন-
نُوْنُ الْهَوَانِ مِنَ الْهَوَى مَسْرُوْقَةٌ + فَإِذَا هَوَيْتَ فَقَدْ لَقِيْتَ هَوَانَا
هَوَانٌ (অপমান) থেকে نون চুরি/লুপ্ত হয়ে هَوَى (প্রবৃত্তি) হয়ে গেছে। সুতরাং তুমি যখন প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে তখন অপমানের শিকার হবে।
আরেক কবি বলেছেন,
وَلَقَدْ رَأَيْتُ مَعَاشِرًا جَمَحَتْ بِهِمْ + تِلْكَ الطَّبِيعَةُ نَحْوَ كُلِّ تَبَارِ
تَهْوَى نُفُوْسُهُمْ هَوَى أَجْسَامِهِمْ + شُغْلاً بِكُلِّ دَنَاءَةٍ وَصَغَارِ
تَبِعُوا الْهَوَى فَهَوَى بِهِمْ وَكَذَا الْهَوَى + مِنْهُ الْهَوَانُ بِأَهْلِهِ فَحَذَارِ
فَانْظُرْ بِعَيْنِ الْحَقِّ لَا عَيْنَ الْهَوَى + فَالْحَقُّ لِلْعَيْنِ الْجَلِيَّةِ عَارِ
قَادَ الْهَوَى الْفُجَّارَ فَانْقَادُوْا لَهُ + وَأَبَتْ عَلَيْهِ مَقَادَةُ الْأَبْرَارِ
(১) আমি অনেক জনগোষ্ঠীকে দেখেছি আদত-অভ্যাস তাদেরকে সকল প্রকার ধ্বংসের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।
(২) তাদের দেহের চাহিদার অনুকূলে তাদের মন সবরকম নিকৃষ্ট ও হীন কাজ বেছে নিয়েছে।
(৩) তারা প্রবৃত্তির অনুগত হয়েছে, ফলে তা তাদেরকে পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনুরূপভাবে প্রবৃত্তি তার অনুসারীকে লাঞ্ছনার শিকার বানিয়ে ছাড়ে। সুতরাং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে সাবধান থাক।
(৪) সত্য ও ন্যায়ের চোখ দিয়ে দেখ, প্রবৃত্তির চোখ দিয়ে দেখো না। কেননা দিব্যদৃষ্টির সামনে সত্য ঢাকা পড়ে না।
(৫) প্রবৃত্তি পাপাচারীদের পরিচালনা করে; ফলে তারা তার অনুগত হয়ে যায়। কিন্তু সৎ লোকেরা তার অনুগত হয়ে চলতে রাযী নয়।
টিকাঃ
৪১. ইবনু আসাকির, তারীখু মাদীনাতি দিমাশক ৩২/৪৬৮।
৪২. তাফসীরে কুরতুবী ১৬/১৬৮।
৪৩. ইবনুল জাওযী, আত-তাবছিরাহ ১/১৫৫।