📄 শৈশবকালে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত না হওয়া
কখনো কখনো শিশু শৈশবে তার মাতা-পিতার কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভালবাসা ও আদর পেয়ে থাকে। তারা তার সকল প্রকার আগ্রহে সাড়া দিয়ে থাকে। সে যা চায় তারা তার নিকট তা হাযির করে। এক্ষেত্রে তারা হালাল-হারাম, বৈধ ও নিষিদ্ধের কোন বাছবিচার করে না। শিশু যদি ফজর ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে তাহ'লে তারা বলে, 'এখনো বোধবুদ্ধি হাল্কা আর ঘুমকাতুরে, ঠিক আছে ঘুমাক'। ছেলেটা যখন কোন খেলনার বায়না ধরে অমনি তারা তার ব্যবস্থা করে দেয়। তাতে কোন গান-বাজনা আছে কি-না কিংবা কোন নির্লজ্জ দৃশ্য আছে কি-না সেদিকে মোটেও ভ্রূক্ষেপ করে না। হয়তো দেখা যাচ্ছে কিশোর ছেলের জন্য রয়েছে একজন স্পেশাল ড্রাইভার, আবার কিশোরী মেয়ের জন্য রয়েছে অভ্যর্থনা কক্ষসহ খাছ কামরা। এভাবে একজন শিশু তার প্রবৃত্তি বা মর্যিমাফিক চলাফেরার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। সে যখন যা ইচ্ছা করে তাই পায় এবং করতে পারে। তাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দেয় না। আবার কোন নিষেধকারী প্রশাসনও নিষেধ করে না। এভাবে বল্লাহীন অবস্থায় চলতে চলতে যখন সে বয়ঃপ্রাপ্তির পর্যায়ে উপনীত হয় তখন তার লাগামহীন কামনা-বাসনা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। ঐ সকল মনোবাসনা ও কল্পনা বাস্তবায়নে তার প্রবৃত্তির পিছনে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটতে থাকে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সময়গুলোতে এমনটা খুব ঘটে। ফলে এ ধরনের ছেলে-মেয়েরা বড় বড় অপরাধ এবং মারাত্মক জঘন্য কাজ করে বসে, অথচ তা থেকে তাদের দূরে রাখার ও প্রতিহত করার কোন উপায় থাকে না।
অথচ ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে সেই ছেলেবেলা থেকেই প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত হ'তে প্রশিক্ষণ দিতেন। তাঁদের ছোটরা বড়দের সঙ্গে ছিয়াম, ছালাত, হজ্জ ইত্যাদি শারঈ ইবাদত-বন্দেগী পালনে চেষ্টা করতেন।
রুবাই বিনতে মু'আওবিয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আশুরার দিন ভোরে আনছারদের বসতিতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা দেওয়ান যে, مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ، وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ 'সকালে যে খেয়ে নিয়েছে সে যেন বাকি দিন না খেয়ে কাটায়, আর যে ছিয়াম পালনের অবস্থায় সকাল করেছে সে যেন ছিয়াম সম্পন্ন করে'। বর্ণনাকারী বলেন, فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعْبَةَ مِنَ الْعِهْنِ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ، حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الإِفْطَارِ 'এই ঘোষণা শুনে আমরা পরবর্তী সময়টুকু ছিয়ামে কাটালাম এবং আমাদের বাচ্চাদেরও ছিয়াম রাখালাম। তাদের জন্য আমরা এক প্রকার পশমী খেলনা যোগাড় করে রাখলাম। যখন তাদের কেউ খাবারের জন্য কেঁদে উঠছিল, তখনই আমরা তাদের সামনে ঐ খেলনা এগিয়ে দিচ্ছিলাম। ইফতার পর্যন্ত তারা এভাবেই পার করছিল'।
ছেলেমেয়েরা যা চায় তাই দিয়ে তাদের প্রতিপালনে শুধুই যে দ্বীন-ধর্মীয় ক্ষতি হয় তাই নয়; বরং তা তাদের জন্য জাগতিক ক্ষতিও ডেকে আনে। কখনো কখনো দেখা যায়, একটা পরিবারের উপর বালা-মুছীবত ও দুর্দশা নেমে আসে, যার ফলে তাদের ধন-সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং তাদের জীবন-জীবিকা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। কখনো আবার পরিবারের কর্তা মারা যায় সে সময় এই শিশু কীভাবে তার খাহেশ চরিতার্থ করবে? কোত্থেকে সে তার কামনা-বাসনা পূরণের ব্যবস্থা করবে?
তারপর জীবনের এক পর্যায়ে যখন কিশোর ছেলে জীবনযুদ্ধের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে এবং তার অনেক প্রয়োজন দেখা দেয় তখন সে হয়তো দেখতে পায়, তার পরিবার তার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে পারছে না। বিশেষ করে যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, বিয়েশাদী করে ঘর-সংসার গড়তে ইচ্ছে করে তখন সে হয়তো একটা নির্দিষ্ট কাজ করতে চায়, কিন্তু তার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
অনুরূপভাবে যে কিশোরী মেয়ে বিলাসিতা ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, হয়ত তার বিয়ে এমন লোকের সাথে হয়েছে অর্থবিত্তে যে তার সমপর্যায়ের নয়। এজন্য সে অসন্তুষ্ট হয় আর রাগে-দুঃখে সবসময় হাহুতাশ করে। এমনও হয় যে, সে তার স্বামীকে ফকীর-মিসকীন বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তার জীবনটা দ্বন্দ্ব-ফাসাদ আর ঝগড়াঝাটিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। যাতে তার আত্মিক সুখ এবং স্বামীর সঙ্গে তার সুখ বিনষ্ট হয়।
টিকাঃ
১০. বুখারী হা/১৯৬০; মুসলিম হা/১১৩৬।
১১. অথচ ছোটবেলা থেকে দ্বীনী পরিবেশে নিয়ন্ত্রিত কামনার মাঝে বাস করলে ছেলেমেয়ে উভয়েরই পরিণত বয়সে জীবন এত জটিল হয় না। আল্লাহই সবকিছুর মালিক, তিনি যেন সবাইকে সঠিক বুঝ দান করেন। -অনুবাদক।
📄 প্রবৃত্তি পূজারীদের সঙ্গে উঠাবসা ও তাদের সাহচর্য লাভ
একে অপরের সাথে উঠাবসা করলে এবং দীর্ঘদিন কারো সাহচর্যে থাকলে পারস্পরিক ভালবাসা ও সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যে প্রবৃত্তির পূজারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে উঠাবসা করে এবং তাদের সাহচর্যে থাকে সে তাদের দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি সে দুর্বল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হয় এবং তার মধ্যে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই যে কোন ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা থাকে। এ কারণেই সালাফে ছালেহীন বিদ'আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করতে নিষেধ করতেন।
আবু কিলাবা (রহঃ) বলেছেন, لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم فإني لا آمن أن يغمسوكم في الضلالة أو يلبسوا عليكم في الدين بعض ما لبس عليهم 'তোমরা খেয়াল-খুশী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে উঠাবসা করো না এবং তাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ো না। কেননা আমার ভয় হয় যে, তারা তোমাদেরকে গোমরাহীর মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারে অথবা দ্বীনের কোন কোন বিষয়ে তোমাদেরকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিতে পারে; যেমনটা তারা নিজেরা দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার'।
মুজাহিদ (রহঃ) বলেছেন, 'তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করো না'। কায়স ইবনু ইবরাহীম থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।
টিকাঃ
১২. দারেমী হা/৩৯১, সনদ ছহীহ; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ, পৃঃ ৯১।
১৩. আল-মালাতী, আত-তামবীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃঃ ৮৬।
১৪. হিলয়াতুল আওলিয়া ৪/২২২।
📄 আল্লাহ ও পরকাল সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাব
যে মানুষ তার মালিকের যথাযথ কদর করে না সে তো তাকে ক্রুদ্ধ করা, তাঁর নাফরমানী করা কিংবা তাঁর হুকুমের অন্যথা করার কোনই পরোয়া করবে না। তার অন্তরে তো আল্লাহ তা'আলার প্রতি সম্মান ও ভক্তি-শ্রদ্ধা বলে কিছুই নেই। এরূপ লোকদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعاً قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ 'আসলে এই লোকগুলো আল্লাহ তা'আলার সেভাবে মূল্যায়নই করেনি যেভাবে তাঁর মূল্যায়ন করা উচিত ছিল। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানগুলো (একে একে) ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে থাকবে। পবিত্র ও মহান তিনি, ওরা তাঁর সাথে যা কিছু শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে' (যুমার ৩৯/৬৭)।
📄 প্রবৃত্তির অনুসারীদের প্রতি অন্যদের কর্তব্য পালন না করা
লোকেরা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধে ভীষণ উদাসীনতা ও গাফলতি করে। ফলে প্রবৃত্তির অনুসারীদের খেয়াল-খুশী লাগামছাড়া হয়ে যায়। সে তার খেয়াল-খুশী চরিতার্থ করতে মোটেও পরোয়া করে না। এভাবে খেয়াল-খুশী তার মনের উপর জেঁকে বসে এবং তার আচার-আচরণের উপর কর্তৃত্ব করে। এজন্যই ইসলাম সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কথা বলেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلْتَكُنْ مِّنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ 'তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে ডাকবে; সত্য ও ন্যায়ের আদেশ দিবে, আর অসত্য ও অন্যায় কাজ থেকে (তাদের) বিরত রাখবে। সত্যিকার অর্থে ওরাই হচ্ছে সফলকাম' (আলে ইমরান ৩/১০৪)।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন, ادْعُ إِلِى سَبَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ (মানব জাতিকে) প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ দ্বারা আহ্বান কর এবং এমন এক পদ্ধতিতে তাদের সঙ্গে যুক্তিতর্ক কর, যা সবচাইতে উৎকৃষ্ট' (নাহল ১৬/১২৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন, وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلاً بَلِيْعًاً 'আর আপনি তাদেরকে উপদেশ দিন এবং তাদেরকে আপনি মনকাড়া ওজস্বী ভাষায় কথা শুনান' (নিসা ৪/৬৩)।
যখন বেশির ভাগ লোেক অন্যায়-অবৈধ কাজ থেকে নিষেধ করতে অভ্যস্ত হবে, তখন প্রবৃত্তির অনুসারীদের বেপরওয়া হওয়ার পথে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।