📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 কখনো মন্দের সাথে জড়িত মন বা ব্যক্তিসত্তার দিকে প্রবৃত্তিকে সম্বন্ধ করে তার নিন্দা করা হয়েছে

📄 কখনো মন্দের সাথে জড়িত মন বা ব্যক্তিসত্তার দিকে প্রবৃত্তিকে সম্বন্ধ করে তার নিন্দা করা হয়েছে


আবু ইয়া'লা শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, الْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا 'অক্ষম-মূর্খ সেই ব্যক্তি যে নিজের মনকে তার প্রবৃত্তি বা প্রবৃত্তির কথামতো চলতে দেয়'।

টিকাঃ
৬. হাকেম, আহমাদ, ইবনু মাজাহ হা/৪২৬০; মিশকাত হা/৫২৮৯, সনদ যঈফ।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 কখনো অন্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবৃত্তির নিন্দা জানানো হয়েছে

📄 কখনো অন্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবৃত্তির নিন্দা জানানো হয়েছে


হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوْبِ كَالْحَصِيْرِ عُوْدًا عُوْدًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيْهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبِ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيْهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيْرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلاَ تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَالآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًا كَالْكُوزِ مُحَخّيًا لاَ يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ 'মানুষের মনে ফিত্না বা গোমরাহী এমনভাবে ঢেলে দেওয়া হয় যেমন করে খেজুরের মাদুর বা পাটি বুনতে একটা একটা করে পাতা ব্যবহার করা হয়। যে মনে ঐ ফিত্না অনুপ্রবেশ করে তাতে একটা কালো দাগ পড়ে যায়। আর যে মন তা প্রত্যাখ্যান করে তাতে একটা সাদা দাগ পড়ে। এভাবে মনগুলো দু'ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক. মসৃণ পাথরের মত সাদা মন, যাতে কোন ফিত্না বা পাপাচার আসমান-যমীন বিদ্যমান থাকা অবধি কোনই বিরূপ ক্রিয়া করতে পারবে না। দুই. কয়লার ন্যায় কালো মন, যা উপুড় করা পাত্রের মত, না সে কোন ন্যায়কে বোঝে, না অন্যায়কে স্বীকার করে। তার খেয়াল-খুশী বা কামনা-বাসনা তাকে যেভাবে পরিচালনা করে সেভাবেই কেবল সে পরিচালিত হয়'। এখানে খেয়াল-খুশীকে হৃদয়ের সাথে সম্বন্ধিত করা হয়েছে।

টিকাঃ
৭. মুসলিম হা/১৪৪; মিশকাত হা/৫৩৮০।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ হেতু একজন মানুষ কখন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণ হেতু একজন মানুষ কখন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য


প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একটি বিষয়। না সে তার থেকে আলাদা হ'তে পারে, না তাকে পরিত্যাগ করতে পারে। মহান আল্লাহ মানুষকে প্রবৃত্তি ও লালসার তাড়না দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তবে কি প্রবৃত্তি ও লালসার উদ্রেক যখনই হবে তখনই সেজন্য মানুষকে শাস্তি পোহাতে হবে? মানুষ কি তার হৃদয়-মন থেকে প্রবৃত্তি বের করে দিতে শরী'আতের দাবী অনুযায়ী বাধ্য? নাকি তার কিছু নিয়মনীতি ও সীমানা রয়েছে?

ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, 'খোদ প্রবৃত্তি ও লালসার জন্য কোন শাস্তি পোহাতে হবে না। বরং তার অনুসরণ ও তার কথামত কাজ করার দরুন শাস্তি পোহাতে হবে। সুতরাং মন প্রবৃত্তির পেছনে চলতে চাইবে আর ব্যক্তি মনকে তার থেকে বিরত রাখলে তখন তার এ বিরত রাখাই আল্লাহ্র ইবাদত ও নেক কাজ বলে গণ্য হবে'।

একজন সত্যবাদী মুসলিমের অবস্থাতো এটাই। তার মন সর্বদা তাকে এটা ওটা করতে হুকুম করবে আর সে বরাবর তা করতে অস্বীকার করবে এবং তার লালসার অপকারিতার শিকার হওয়া থেকে তাকে বিরত রাখবে। মন তাকে প্রবৃত্তির যেসব বিষয় লাভে উদ্বুদ্ধ করবে সেসব ক্ষেত্রে সে তার প্রতিপালকের মুখোমুখি দাঁড়ানোকে ভয় করবে। এমন মানুষ অবশ্যই ভাল প্রতিফল পাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى 'আর যে ব্যক্তি তার মালিকের সামনে (হাশরের ময়দানে) দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং (সেই ভয়ে নিজের) মনকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা' (নাযি'আত ৮০/৪০-৪১)।

সুতরাং খেয়াল-খুশী মনে উদয় হ'লেই সেজন্য শাস্তি দেওয়া হবে না; সেটা কাজে পরিণত করা ব্যতীত। মানুষ যখন কোন পাপ কাজের বাসনা করবে এবং মনে মনে তা কামনা করবে, তারপর বাস্তবে তা রূপায়িত করবে তখন তার খেয়াল-খুশী ও কাজের উপর হিসাব গ্রহণ করা হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَى مُدْرِكُ ذَلِكَ لا مَحَالَةَ فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ وَالْأُذْنَانِ زِنَاهُمَا الإِسْتِمَاعُ وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْسُ وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ 'আদম সন্তানের জন্য ব্যভিচারের একাংশ নির্ধারিত আছে; যা সে অবশ্যই পাবে। চক্ষুদ্বয়ের যেনা হ'ল দৃষ্টি নিক্ষেপ করা। কর্ণদ্বয়ের যেনা হ'ল শ্রবণ করা, জিহ্বার যেনা হ'ল আলোচনা করা, হাতের যেনা হ'ল স্পর্শ করা এবং পায়ের যেনা হল এ কাজে পা চালানো, মন (যেনা করতে) গভীরভাবে কামনা করবে, তারপর যৌনাঙ্গ তা সম্পন্ন করার মাধ্যমে হয় তা সত্য প্রমাণ করবে, নয় তা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে মনের কামনাকে মিথ্যা প্রমাণ করবে'।

টিকাঃ
৮. মাজমূ' ফাতাওয়া ১০/৬৩৫।
৯. মুসলিম হা/২৬৫৭।

📘 প্রবৃত্তির অনুসরণ > 📄 প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণ সমূহ

📄 প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণ সমূহ


প্রবৃত্তির অনুসরণের পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। এসব কারণেই মানুষ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন তাদের খেয়াল-খুশীর পিছনে চলে? কেনই বা তারা সত্য ও সরল পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? এর পিছনে আসলে অনেক কারণ রয়েছে। যথা-

১. শৈশবকালে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত না হওয়া :
কখনো কখনো শিশু শৈশবে তার মাতা-পিতার কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভালবাসা ও আদর পেয়ে থাকে। তারা তার সকল প্রকার আগ্রহে সাড়া দিয়ে থাকে। সে যা চায় তারা তার নিকট তা হাযির করে। এক্ষেত্রে তারা হালাল-হারাম, বৈধ ও নিষিদ্ধের কোন বাছবিচার করে না। শিশু যদি ফজর ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে তাহ'লে তারা বলে, 'এখনো বোধবুদ্ধি হাল্কা আর ঘুমকাতুরে, ঠিক আছে ঘুমাক'। ছেলেটা যখন কোন খেলনার বায়না ধরে অমনি তারা তার ব্যবস্থা করে দেয়। তাতে কোন গান-বাজনা আছে কি-না কিংবা কোন নির্লজ্জ দৃশ্য আছে কি-না সেদিকে মোটেও ভ্রূক্ষেপ করে না। হয়তো দেখা যাচ্ছে কিশোর ছেলের জন্য রয়েছে একজন স্পেশাল ড্রাইভার, আবার কিশোরী মেয়ের জন্য রয়েছে অভ্যর্থনা কক্ষসহ খাছ কামরা। এভাবে একজন শিশু তার প্রবৃত্তি বা মর্যিমাফিক চলাফেরার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। সে যখন যা ইচ্ছা করে তাই পায় এবং করতে পারে। তাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দেয় না। আবার কোন নিষেধকারী প্রশাসনও নিষেধ করে না। এভাবে বল্লাহীন অবস্থায় চলতে চলতে যখন সে বয়ঃপ্রাপ্তির পর্যায়ে উপনীত হয় তখন তার লাগামহীন কামনা-বাসনা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। ঐ সকল মনোবাসনা ও কল্পনা বাস্তবায়নে তার প্রবৃত্তির পিছনে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যেন লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটতে থাকে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সময়গুলোতে এমনটা খুব ঘটে। ফলে এ ধরনের ছেলে-মেয়েরা বড় বড় অপরাধ এবং মারাত্মক জঘন্য কাজ করে বসে, অথচ তা থেকে তাদের দূরে রাখার ও প্রতিহত করার কোন উপায় থাকে না।

অথচ ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে সেই ছেলেবেলা থেকেই প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত হ'তে প্রশিক্ষণ দিতেন। তাঁদের ছোটরা বড়দের সঙ্গে ছিয়াম, ছালাত, হজ্জ ইত্যাদি শারঈ ইবাদত-বন্দেগী পালনে চেষ্টা করতেন।

রুবাই বিনতে মু'আওবিয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আশুরার দিন ভোরে আনছারদের বসতিতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা দেওয়ান যে, مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ، وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ 'সকালে যে খেয়ে নিয়েছে সে যেন বাকি দিন না খেয়ে কাটায়, আর যে ছিয়াম পালনের অবস্থায় সকাল করেছে সে যেন ছিয়াম সম্পন্ন করে'। বর্ণনাকারী বলেন, فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ، وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا، وَنَجْعَلُ لَهُمُ اللُّعْبَةَ مِنَ الْعِهْنِ، فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ، حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الإِفْطَارِ 'এই ঘোষণা শুনে আমরা পরবর্তী সময়টুকু ছিয়ামে কাটালাম এবং আমাদের বাচ্চাদেরও ছিয়াম রাখালাম। তাদের জন্য আমরা এক প্রকার পশমী খেলনা যোগাড় করে রাখলাম। যখন তাদের কেউ খাবারের জন্য কেঁদে উঠছিল, তখনই আমরা তাদের সামনে ঐ খেলনা এগিয়ে দিচ্ছিলাম। ইফতার পর্যন্ত তারা এভাবেই পার করছিল'।

ছেলেমেয়েরা যা চায় তাই দিয়ে তাদের প্রতিপালনে শুধুই যে দ্বীন-ধর্মীয় ক্ষতি হয় তাই নয়; বরং তা তাদের জন্য জাগতিক ক্ষতিও ডেকে আনে। কখনো কখনো দেখা যায়, একটা পরিবারের উপর বালা-মুছীবত ও দুর্দশা নেমে আসে, যার ফলে তাদের ধন-সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং তাদের জীবন-জীবিকা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। কখনো আবার পরিবারের কর্তা মারা যায় সে সময় এই শিশু কীভাবে তার খাহেশ চরিতার্থ করবে? কোত্থেকে সে তার কামনা-বাসনা পূরণের ব্যবস্থা করবে?

তারপর জীবনের এক পর্যায়ে যখন কিশোর ছেলে জীবনযুদ্ধের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে এবং তার অনেক প্রয়োজন দেখা দেয় তখন সে হয়তো দেখতে পায়, তার পরিবার তার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে পারছে না। বিশেষ করে যখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, বিয়েশাদী করে ঘর-সংসার গড়তে ইচ্ছে করে তখন সে হয়তো একটা নির্দিষ্ট কাজ করতে চায়, কিন্তু তার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

অনুরূপভাবে যে কিশোরী মেয়ে বিলাসিতা ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, হয়ত তার বিয়ে এমন লোকের সাথে হয়েছে অর্থবিত্তে যে তার সমপর্যায়ের নয়। এজন্য সে অসন্তুষ্ট হয় আর রাগে-দুঃখে সবসময় হাহুতাশ করে। এমনও হয় যে, সে তার স্বামীকে ফকীর-মিসকীন বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তার জীবনটা দ্বন্দ্ব-ফাসাদ আর ঝগড়াঝাটিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। যাতে তার আত্মিক সুখ এবং স্বামীর সঙ্গে তার সুখ বিনষ্ট হয়।

২. প্রবৃত্তি পূজারীদের সঙ্গে উঠাবসা ও তাদের সাহচর্য লাভ :
একে অপরের সাথে উঠাবসা করলে এবং দীর্ঘদিন কারো সাহচর্যে থাকলে পারস্পরিক ভালবাসা ও সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং যে প্রবৃত্তির পূজারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে উঠাবসা করে এবং তাদের সাহচর্যে থাকে সে তাদের দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে যদি সে দুর্বল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হয় এবং তার মধ্যে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই যে কোন ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা থাকে। এ কারণেই সালাফে ছালেহীন বিদ'আতী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করতে নিষেধ করতেন।

আবু কিলাবা (রহঃ) বলেছেন, لا تجالسوا أهل الأهواء ولا تجادلوهم فإني لا آمن أن يغمسوكم في الضلالة أو يلبسوا عليكم في الدين بعض ما لبس عليهم 'তোমরা খেয়াল-খুশী ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের সঙ্গে উঠাবসা করো না এবং তাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ো না। কেননা আমার ভয় হয় যে, তারা তোমাদেরকে গোমরাহীর মধ্যে ডুবিয়ে দিতে পারে অথবা দ্বীনের কোন কোন বিষয়ে তোমাদেরকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিতে পারে; যেমনটা তারা নিজেরা দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার'।

মুজাহিদ (রহঃ) বলেছেন, 'তোমরা প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে উঠাবসা করো না'। কায়স ইবনু ইবরাহীম থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।

৩. আল্লাহ ও পরকাল সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাব :
যে মানুষ তার মালিকের যথাযথ কদর করে না সে তো তাকে ক্রুদ্ধ করা, তাঁর নাফরমানী করা কিংবা তাঁর হুকুমের অন্যথা করার কোনই পরোয়া করবে না। তার অন্তরে তো আল্লাহ তা'আলার প্রতি সম্মান ও ভক্তি-শ্রদ্ধা বলে কিছুই নেই। এরূপ লোকদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعاً قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ 'আসলে এই লোকগুলো আল্লাহ তা'আলার সেভাবে মূল্যায়নই করেনি যেভাবে তাঁর মূল্যায়ন করা উচিত ছিল। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানগুলো (একে একে) ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে থাকবে। পবিত্র ও মহান তিনি, ওরা তাঁর সাথে যা কিছু শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে' (যুমার ৩৯/৬৭)।

৪. প্রবৃত্তির অনুসারীদের প্রতি অন্যদের কর্তব্য পালন না করা:
লোকেরা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধে ভীষণ উদাসীনতা ও গাফলতি করে। ফলে প্রবৃত্তির অনুসারীদের খেয়াল-খুশী লাগামছাড়া হয়ে যায়। সে তার খেয়াল-খুশী চরিতার্থ করতে মোটেও পরোয়া করে না। এভাবে খেয়াল-খুশী তার মনের উপর জেঁকে বসে এবং তার আচার-আচরণের উপর কর্তৃত্ব করে। এজন্যই ইসলাম সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের কথা বলেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلْتَكُنْ مِّنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ 'তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে ডাকবে; সত্য ও ন্যায়ের আদেশ দিবে, আর অসত্য ও অন্যায় কাজ থেকে (তাদের) বিরত রাখবে। সত্যিকার অর্থে ওরাই হচ্ছে সফলকাম' (আলে ইমরান ৩/১০৪)।

আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন, ادْعُ إِلِى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ (মানব জাতিকে) প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ দ্বারা আহ্বান কর এবং এমন এক পদ্ধতিতে তাদের সঙ্গে যুক্তিতর্ক কর, যা সবচাইতে উৎকৃষ্ট' (নাহল ১৬/১২৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন, وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلاً بَلِيْعًاً 'আর আপনি তাদেরকে উপদেশ দিন এবং তাদেরকে আপনি মনকাড়া ওজস্বী ভাষায় কথা শুনান' (নিসা ৪/৬৩)।

যখন বেশির ভাগ লোেক অন্যায়-অবৈধ কাজ থেকে নিষেধ করতে অভ্যস্ত হবে, তখন প্রবৃত্তির অনুসারীদের বেপরওয়া হওয়ার পথে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।

৫. দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা এবং ঝোঁক :
যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালবাসে, দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং পরকালের কথা ভুলে যায়, দুনিয়া তার সামনে যত কিছুর স্বপ্ন দেখায় তা সব লাভের জন্য সে তীরবেগে ছুটে যায়। এমনকি তা আল্লাহ্র বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হ'লেও সে তার পরোয়া করে না। আর এটাই তো সরাসরি প্রবৃত্তির অনুসরণ। আমাদের মালিক এই কারণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُوْنَ لِقَاءَنَا وَرَضُوْا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّواْ بِمَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آيَاتِنَا غَافِلُونَ، أُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُواْ يَكْسِبُوْنَ 'যারা (মৃত্যুর পর) আমার সাথে সাক্ষাতের প্রত্যাশা করে না, যারা এ পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং এখানকার সবকিছু নিয়েই তৃপ্তিবোধ করে, (সর্বোপরি) যারা আমার নিদর্শনাবলী থেকে অমনোযোগী থাকে, তারাই হচ্ছে ঐসব লোক, যাদের নিশ্চিত ঠিকানা হবে জাহান্নামের আগুন; এ হচ্ছে তাদের সেই কর্মফল, যা তারা দুনিয়ার জীবনে অর্জন করেছিল' (ইউনুস ১০/৭-৮)।

৬. কাঙ্ক্ষিত বৈধ জিনিস লাভে বেশী তৎপরতা দেখানো :
মানুষের মন যখন কোন বৈধ জিনিস কামনা করে তখনই সে তা পেতে অনেক সময় দ্রুত ধাবিত হয়। কিন্তু জ্ঞানী-গুণীরা এরূপ কাঙ্ক্ষিত বৈধ জিনিস থেকেও তাদের শিষ্যদের নিষেধ করতেন।

একবার খালাফ ইবনু খলীফা আহওয়াযের শাসনকর্তা সুলায়মান ইবনু হাবীব ইবনুল মুহাল্লাবের সাথে দেখা করেন। তখন তাঁর নিকট বদর নাম্নী এক দাসী ছিল। সে ছিল অত্যন্ত রূপসী ও গুণবতী। সুলায়মান খালাফকে বললেন, এই দাসীকে তোমার দেখতে কেমন লাগছে? খালাফ বললেন, হে আমীর, আল্লাহ আপনার ভাল করুন, আমার এ দু'চোখ তার চেয়ে সুন্দরী নারী কখনো দেখেনি। তিনি বললেন, তুমি এর হাত ধরে নিয়ে যাও। খালাফ বললেন, আমি যখন আমীরকে তাকে ভালোবাসতে দেখেছি, তখন আমার পক্ষে তাকে নিয়ে যাওয়া শোভনীয় নয়। শাসনকর্তা তখন বললেন, আরে রাখ, আমি তাকে ভালবাসলেও তুমি তাকে নিয়ে যাও। এতে করে আমার প্রবৃত্তি বুঝতে পারবে, আমি তার উপর জয়যুক্ত হ'তে পেরেছি।”

এভাবে ধৈর্য-সহিষ্ণুতায় অভ্যস্ত হওয়ার মানসে মনকে কিছু কিছু বৈধ জিনিস থেকে বঞ্চিত করার মাঝেও বিশেষ কল্যাণ রয়েছে। বিশেষ করে মনের ঝোঁক ও প্রবৃত্তি যখন হারামের দিকে ধাবিত হয় তখন তো মুবাহ পরিত্যাগ করাই বাঞ্ছনীয়। এরূপ ক্ষেত্রে মুবাহ বা বৈধ বিষয়ে বরাবর অভ্যস্ত হয়ে উঠলে অনেক সময় ব্যক্তির মন হারামের সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে।

৭. প্রবৃত্তির অনুসরণের পরিণাম সম্পর্কে অজ্ঞতা :
কোন কিছুর পরিণতি সম্পর্কে মানুষের জানা না থাকলে তার দ্বারা সেটা বারবার হ'তে পারে। কু-প্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশীর অনেক রকম ক্ষতি ও অনিষ্টতা রয়েছে। সেগুলো জানা থাকলে খেয়াল-খুশীর অনুসারী লোকটি হয়তো তা প্রতিহত করতে পারত। আহমাদ ইবনুল কাসেম আত-ত্বাবারাণী কবিতায় বলেছেন,
سَأَحْذَرُ مَا يُخَافُ عَلَيَّ مِنْهُ + وَأَتْرُكُ مَا هَوَيْتُ لِمَا خَشِيْتُ
'আমার থেকে যা হওয়ার ভয় হয় আমি তা থেকে অবশ্যই সাবধান থাকব। আর যা আমি ভয় করি তার কারণে আমি আমার কামনা-বাসনার জিনিস বর্জন করি'।

টিকাঃ
১০. বুখারী হা/১৯৬০; মুসলিম হা/১১৩৬।
১১. অথচ ছোটবেলা থেকে দ্বীনী পরিবেশে নিয়ন্ত্রিত কামনার মাঝে বাস করলে ছেলেমেয়ে উভয়েরই পরিণত বয়সে জীবন এত জটিল হয় না। আল্লাহই সবকিছুর মালিক, তিনি যেন সবাইকে সঠিক বুঝ দান করেন। -অনুবাদক।
১২. দারেমী হা/৩৯১, সনদ ছহীহ; আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ, পৃঃ ৯১।
১৩. আল-মালাতী, আত-তামবীহ ওয়ার রাদ্দ, পৃঃ ৮৬।
১৪. হিলয়াতুল আওলিয়া ৪/২২২।
১৫. ইবনুল জাওযী, যাম্মুল হাওয়া, পৃঃ ২৬।
১৬. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাঙ্ক ৭/৩৭২।
১৭. আল-মাওয়ার্দী, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃঃ ২১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00