📄 সাধারণ অবস্থা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে আবু আইউব আনসারীর (রাঃ) গৃহে অবস্থান করেন। ফাতিমা (রাঃ)-এর বিয়ে হলে তিনি আলী (রাঃ)-কে একটা ঘর নিতে বলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গৃহ থেকে কিছুটা দূরে একটা ঘর ভাড়া করেন। এই ঘরেই ফাতিমা (রাঃ)-কে তুলে নেন। তুলে নেয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমাকে (রাঃ) দেখতে যান। কথা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রিয় কন্যাকে বলেন: আমি তোমাকে কাছে রাখতে চাই। ফাতিমা (রাঃ) আরয করলেন আপনি হারিস ইবনু নুমান (রাঃ)-কে বললে তিনি আমাদের থাকার জন্য একটা ঘর দিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: কন্যা! হারিস ইবনু নুমান (রাঃ)-কে এমন কথা বলতে আমার লজ্জা হয়। হারিস (রাঃ) এ সম্পর্কে জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাযির হয়ে বলেন: আমি জানতে পেলাম যে, আপনি ফাতিমা (রাঃ)-কে নিকটে কোন গৃহে রাখতে চান। আমার সমস্ত ঘর হাযির। আপনি ফাতিমা (রাঃ)-কে ডেকে পাঠান। আমার জানমাল আল্লাহ-রাসূলের জন্য কুরবান। আল্লাহর কসম! আপনি যে জিনিস আমার কাছ থেকে নিবেন, তা আপনার কাছে থাকা আমার নিজের কাছে থাকার চেয়ে আমার কাছে বেশি প্রিয় হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তুমি ঠিক বলেছ। আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন। তোমার প্রতি রহমত নাযিল করুন। এরপর ফাতিমা (রাঃ)-কে হারিস ইবনু নুমানের (রাঃ) গৃহে স্থানান্তরিত করেন। (তাবাক্বাত)
একবার আলী (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে এমন কিছু আচরণ হয়, যা ফাতিমা (রাঃ) সহ্য করতে পারেননি। তিনি বিষণ্ণ মনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাযির হন। আলী (রাঃ)ও পিছনে পিছনে গমন করেন। তিনি গিয়ে এমন স্থানে দাঁড়ান, যেখান থেকে তাঁদের উভয়ের কথা শুনতে পারেন। ফাতিমা (রাঃ) আলী (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে ক্রোধের অভিযোগ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: কন্যা! আমি যা বলছি, মনোযোগ দিয়ে শুন। এমন কথা কাটাকাটি কোন নারী-পুরুষ আছে, যাদের মধ্যে কখনো কোন মনোমালিন্য হয় না? আর পুরুষ সমস্ত কাজ নারীর ইচ্ছা অনুযায়ী করবে, তাকে কিছুই বলবে না? (তাবাক্বাত)
আলী (রাঃ)-এর উপর এ নীতিগত জবাবের এমন প্রভাব পড়েছিল যে, এরপর তিনি এমন কোন কাজ করেননি, যাতে ফাতিমা (রাঃ)-এর মন বিষণ্ণ হতে পারে। আলী (রাঃ) নিজেই বলেন: আমি ফাতিমা (রাঃ)-এর উপর যে কড়াকড়ি করতাম, তা থেকে নিবৃত্ত থাকি। আমি স্ত্রীকে বলি, আল্লাহর কসম! ভবিষ্যতে আমি এমন কোন কাজ করবো না, যাতে তোমার কষ্ট হয় বা তোমার মনে আঘাত লাগে।
pারিবারিক বিষয় নিয়ে আলী (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ)-এর মধ্যে কখনো মনোমালিন্য হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনিভাবে আপোষ করাতেন। তাদের মধ্যে আপোষ করে তিনি এক অস্বাভাৱিক আনন্দ বোধ করতেন। আর একবার এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রাঃ)-এর ঘরে যান। এ সময় তাঁর চেহারায় দুঃখের কিছু ছাপ স্পষ্ট ছিল। তিনি উভয়ের মধ্যে আপোষ করিয়ে দেন। তিনি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন তাঁর চেহারা ছিল প্রফুল্ল। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনি যখন ঘরে যান, তখন আপনার চেহারা ছিল বিবর্ণ, আর এখন হাশি-খুশি! তিনি বললেন: আমি দু'ব্যক্তির মধ্যে আপোষ করিয়ে দিয়েছি, যারা আমার অতি প্রিয়। (তাবাক্বাত)
আবূ জাহালের ভাই ইবনু হিশাম ইবনু মুগীরা আলী (রাঃ)-কে বলেন- তুমি আবু জাহালের কন্যা গোরাকে বিয়ে কর। রাসূলুল্লাহ 'রআলী (রাযিঃ)-এর ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে পেরে তাঁর কাছে এটা অসহ্য লাগল [ফাতিমা (রাযিঃ) নিজেই কথাটি রাসূলুল্লাহ -কে জানান]। রাসূলুল্লাহ মাসজিদে গমন করেন এবং মিম্বরে দাঁড়িয়ে তাঁর অসন্তুষ্টি প্রকাশ কর নিম্নোক্ত খুতবাহ্ পাঠ করেন:
"وانی لست احرم حلالا ولا احل حراما ولكن والله لا تجتمع بنت رسول الله وبنت عدو الله مكانا واحدا أبدا"
আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করতে চাই না। কিন্তু আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং আল্লাহর দুশমনের কন্যা একসথানে মিলিত হতে পার না। (মুসলিম [ইসলামীক সেন্টার, হাঃ ৬১২৮]) রাসূলুল্লাহ -এর এ খুতবাহ্ এতটা ক্রিয়া করেছে যে, 'আলী (রাযিঃ) ফাতিমার জীবদ্দশায় আর কোন বিয়ে করেননি। (ইস্তিআব)
📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন কথা
ফাতিমা (রাঃ)-এর ২৯ বৎসর বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু ফাতিমা (রাঃ)-কে অত্যন্ত ভালবাসতেন, তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইনতিকালে ফাতিমা (রাঃ) অত্যন্ত ব্যথিত হন। আয়িশা সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের আগে আমি তাঁর পাশে বসা ছিলাম। এ সময় ফাতিমা (রাঃ) আসেন। তাঁর চলার ভঙ্গি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চলার ভঙ্গির সাথে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-মারহাবা ইয়া বিনতু (কন্যা খোশ আমদেদ) বলে তাকে ডান দিকে বা বাম দিকে বসান। এরপর তাঁর কানে কিছু বললে তিনি কাঁদতে শুরু করেন। এরপর আবার কানে কানে কিছু বললে তিনি হাসতে শুরু করেন। আমি বড় অবাক হলাম এবং ফাতিমা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না। ইতঃপূর্বে হাসি-কান্না এক সাথে দেখিনি। ফাতিমা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: আমি কিছুতেই আমার পিতার গোপন তথ্য ফাঁস করবো না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের পর আমি ফাতিমা (রাঃ)-কে পুনরায় জিজ্ঞাসা করি যে, সেদিন হাসি-কান্নার কারণ কি ছিল? তিনি বললেন: যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাই আমি বলছি। প্রথমবার তিনি বলেছিলেন যে, জিবরাইল আলাইহিস সালাম ইতঃপূর্বে বৎসরে একবার কুরআন শরীফ শুনাতেন। এ বছর তিনি দু'বার শুনিয়েছেন। এ থেকে মনে হয়, আমার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। এতে আমি দুঃখিত হই এবং কাঁদতে থাকি। এরপর তিনি বললেন: আমার আহলি বাইতের মধ্যে সর্ব প্রথম তুমি আমার সাথে মিলিত হবে এবং তুমি জান্নাতে নারীদের সর্দার- এটা কি তোমার পছন্দ নয়, এটা শুনে আমি হাসতে থাকি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পূর্বে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ফাতিমা (রাঃ) নিরাশ হয়ে বলেন হায়! আমার পিতার অস্থিরতা! সম্বিৎ ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আজকের পর তোমার পিতাকে আর অস্থির হতে হবে না। (তাবাক্বাত)
📄 মৃত্যুকালীন অবস্থা
ফাতিমা (রাঃ)-এর আরও তিন বোন ছিলেন, তাঁরাও যৌবনেই বিদায় নেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর ৬ মাস পর ১১ হিজরীর তৃতীয় রমাযানে ২৯ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। ইন্না লিল্লহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। (ইস্তিআব)
তাঁর মৃত্যু-পীড়া সম্পর্কে ইতিহাসে কিছুই উল্লেখ নেই। অবশ্য এটা জানা যায় যে, কোন কঠিন পীড়ায় তাঁর ইন্তিকাল হয়নি। ফলে মৃত্যুর আগে তাঁকে অনেক দিন শয্যাশায়ী থাকতে হয়নি। উম্মু সালমা (রাঃ) বলেন, ফাতিমা (রাঃ)-এর ওফাতের সময় আলী (রাঃ) ঘরে ছিলেন না। ফাতিমা (রাঃ) আমাকে ডেকে পানির ব্যবস্থা করার জন্য বলেন। তিনি বলেন- আমি গোসল করবো। আমি পানির ব্যবস্থা করে কাপড় বের করে তাঁকে দেই। তিনি ভালরূপে গোসল করে কাপড় পরলেন। এরপর বললেন : বিছানা পেতে দিন, আমি শোবো। আমি বিছানা পেতে দেই। তিনি কেবলামুখী হয়ে শুলেন। আমাকে বললেন: বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি গোসল করেছি, তাই পুনরায় গোসল করার দরকার নেই। আমার দেহ খোলারও আর কোন প্রয়োজন নেই। এর পরই তিনি ইন্তিকাল করেন। আলী (রাঃ) ঘরে ফিরে এলে আমি তাঁকে এ ঘটনা জানালাম। তিনি তাঁকে পুনরায় গোসল না করিয়ে দাফন করেন। (তাবাক্বাত)
তাঁর জানাযায় খুব কম লোকেরই অংশ গ্রহণের সুযোগ হয়েছে। এর কারণ এই যে, রাতের বেলা তাঁর ইন্তিকাল হয়েছে আর আলী (রাঃ) তাঁর ওয়াসিয়ত অনুযায়ী রাতের বেলাতেই তাঁকে দাফন করেন। (উসুদুল গাবাহ)
তাবক্বাত গ্রন্থে এ রিওয়ায়াতটি বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। আলী (রাঃ) দাফন-কাফন শেষে ঘরে এলে তিনি তখন অত্যন্ত বিষণ্ণ ছিলেন। শোক-দুঃখের আতিশয্যে তিনি এ কবিতা আবৃত্তি করেন:
-আমি দেখছি, আমার মধ্যে দুনিয়ার অনেক রোগ ঢুকেছে। আর দুনিয়াবাসী যতক্ষণ দুনিয়ায় আছে, সে তো রুগীই। এক স্থানে মিলিত হওয়ার পর বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ জরুরী। বিচ্ছেদের বাইরের যে সময় তা তো খুবই স্বল্প। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর ফাতিমা (রাঃ)-এর বিচ্ছেদ এ কথারই প্রমাণ যে, বন্ধু চিরদিন থাকে না। (দুররুল মানসূর)