📄 ফাতিমা (রাঃ)-এর পরিচয় ও জন্ম
ফাতিমা (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কনিষ্ঠা কন্যা। তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম ছিল উম্মু মুহাম্মদ। তাঁর মধ্যে চরিত্র-মাধুর্যের সব রকম গুণাবলী বিদ্যমান ছিল। তাঁর মাতার নাম খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ)। তিনি সারা জাহানের নারীদের সর্দার এবং জান্নাতেও তিনি হবেন নারীকুলের সর্দার। উপাধী হচ্ছে তাহিরা, মুতাহ্হারা, যাকিয়া, রাযিয়া, মারযিয়া এবং বতুল। (আল-ইসাবাহ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত লাভের পাঁচ বৎসর পূর্বে তাঁর জন্ম হয়েছে। এটা ছিল এক মুবারাক সময়। এ সময় কুরাইশগণ কাবা শরীফ পুনঃ নির্মাণে ব্যস্ত ছিল। (তাবক্বাত)
ইবনু সিরাজ আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান আলহাশিমীর রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করে বলেন: নবুওয়াতের প্রথম বর্ষে ফাতিমা (রাঃ)-এর জন্ম হয়েছে। আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন কাবা শরীফ পুনঃনির্মাণ কাজ চলছিল, সে সময় ফাতিমার (রাঃ) জন্ম হয়েছে। (আল-ইস্তিআব)
📄 বিবাহ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন ফাতিমার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাঁর নানান দিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। অনেকেই ফাতিমা (রাঃ)-কে বিয়ে করার জন্য আলী (রাঃ)-কে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু নিজের অভাব-অনটনের কথা চিন্তা করে তিনি ইতঃস্তত করেন যে, আবুবকর (রাঃ) এবং উমর (রাঃ)-এর পর আমার আর স্থান কোথায়। (ইসাবাহ)
এর পরও লোকেরা পীড়াপীড়ি করলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফাতিমা (রাঃ)-এর সাথে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ প্রস্তাব কবুল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা (রাঃ)-কে বলেন : আলী তোমার প্রতি আগ্রহী। তিনি চুপ থাকেন। এ চুপ থাকাও ছিল এক ধরনের সম্মতি। অবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রাঃ)-এর বিয়ের চার মাস পর দ্বিতীয় হিজরীর মুহাররাম মাসের প্রথম দিকে ফাতিমা (রাঃ)-কে আলী (রাঃ)-এর সাথে বিয়ে দেন। (উসুদুল গাবাহ)
অন্যান্য জীবনী লেখকদের বর্ণনা অনুযায়ী এ বিয়ে হয় উহুদ যুদ্ধের পর। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে আয়িশাকে (রাঃ) ঘরে তুলে আনার সাড়ে চার মাস পর এ বিয়ে হয় এবং সাড়ে সাত মাস পর আলী (রাঃ) ফাতিমাকে ঘরে তুলে নেন। (উসুদুল গাবাহ)
তখন ফাতিমা (রাঃ)-এর বয়স হয়েছিল ১৫ বছর সাড়ে চার মাস। আর আলী (রাঃ)-এর বয়স ছিল ২১ বছর সাড়ে পাঁচ মাস। (ইস্তিআব)
আলী (রাঃ) বয়সে ফাতিমা (রাঃ)-এর চেয়ে প্রায় ৬ বছরের বড় ছিলেন। বিয়ের জন্য আলী (রাঃ) তাঁর উট এবং অন্যান্য আসবাবপত্র বিক্রয় করেন। এসব বিক্রি করে চার শত ৮০ দিরহাম সংগৃহীত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: দুই তৃতীয়াংশ সুগন্ধি ইত্যাদির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ অন্যান্য কাজে ব্যয় কর। (তাবাক্বাত)
আলী (রাঃ) স্বয়ং নিজে বর্ণনা করেন: আমার এক দাসী ছিল, যাকে আমি আযাদ করে দেই। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ফাতিমা (রাঃ)-এর জন্য কেউ কি বিয়ের প্রস্তাব করেছে? আমি বললাম: জানি না। এরপর সে বললো, আপনি পয়গাম দিন, এতে বাধা কিসের? আমি বললাম, কিসের ভিত্তিতে? আমার তো কিছুই নেই। সে আবার বলে: না, আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাযির হন। বারবার দাসী বলায় আমি দরবারে হাযির হই। কিন্তু তাঁর প্রভাব ও ভীতি আমার উপর এমন ক্রিয়া করে যে, কিছুই বলার সাহস হয়নি। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। কিছু বলার ক্ষমতাই ছিল না আমার। কিন্তু তিনিই বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন: ফাতিমার (রাঃ) জন্য পয়গাম নিয়ে এসেছ? আমি বললাম, জি জনাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: মাহরানা আদায় করার মতো তোমার কাছে কিছু আছে? আমি বললাম, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি তোমাকে যে লৌহ বর্ম দিয়েছিলাম, তা কোথায়? তাই মাহরানা হিসেবে দাও। তার মূল্য চারশ দিরহামের বেশী ছিল না। বিয়ে হয়ে যায় এবং সেটাই মাহরানা হিসেবে দেওয়া হয়। (উসুদুল গাবাহ)
অপর এক বর্ণনা মতে একদল আনসার আলী (রাঃ)-কে উৎসাহিত করলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: কি ব্যাপার? তিনি আরয করলেন: আমি ফাতিমা (রাঃ)-কে বিয়ে করতে আগ্রহী। তিনি বললেন: আহলান মারহাবা। আলী (রাঃ) বাইরে এলে অপেক্ষমান আনসার দল জানতে চাইলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি জবাব দিয়েছেন? তিনি বললেন: আহলান মারহাবা ছাড়া কিছু বলেননি। তারা বললেন: রাসূলুল্লাহ -এর এতটুকুই বলা যথেষ্ট।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ বললেনঃ বিয়ের জন্য ওয়ালীমাও জরুরী। সা'আদ (রাযিঃ) বললেন, আমার কাছে একটা ভেড়া আছে, তা দিয়ে ওয়ালীমা করা যায়। আনসারদের একটা কাবীলাও সাধ্য অনুযায়ী ওয়ালীমার ব্যবস্থা করে। তদানুযায়ী খাদ্য পরিবেশন করা হয়। (তাবাক্বাত)
'আলী (রাযিঃ) রাসূলুল্লাহ -এর ঘর থেকে কিছুটা দূরে একটা ছোট ঘর ভাড়া নেন। রাসূল তাঁর দাসী উম্মু আইমানসহ ফাতিমা (রাযিঃ)-কে 'আলী (রাযিঃ)-এর ঘরে বিদায় দেন। বিদায়ের সময় তিনি বলেন: তুমি আমার সাথে দেখা করবে। এরপর তিনি 'আলী (রাযিঃ)-এর ঘরে যান। পানি চেয়ে নিয়ে ওযু করেন এবং তাঁর গায়ে ওযূর পানি ছিটিয়ে এ দু'আ করেন:
"اللهم بارك فيهما وبارك عليهما وبارك لهমা في نسلهমা"
“হে আল্লাহ! তাদেরকে বরকত দাও, তাদের ওপর বরকত নাযিল কর এবং তাদের বংশে বরকত দাও।” (তাবাক্বাত)
📄 মহরানা ও যৌতুক
'আলী (রাযিঃ) বলেন: আমি যখন বিয়ের পয়গাম নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করি, তখন মাহরানা আদায় করার মতো কিছুই ছিলো না আমার কাছে। আমি যখন এ নিয়ে চিন্তিত, তখন রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন: তুমি মাহরানা কি দেবে? আমি বললাম: আমার কাছে তো কিছুই নেই। তিনি বললেন: আমি তোমাকে যে লৌহ বর্মটি দিয়েছিলাম, তা কোথায়? আমি বললাম, তা আমার কাছে আছে। রাসূলুল্লাহ বললেন: তবে তাই মাহরানা হিসাবে দাও। মাহরানা হিসাবে আমি তাই ফাতিমা (রাযিঃ)-কে দেই। ইকরামা বলেন: লৌহ বর্মটির মূল্য ছিল মাত্র চার দিরহাম। (তাবাক্বাত)
বস্তুত এ বর্ণনায় লৌহ বর্মের মূল্য চার দিরহাম বলে উল্লেখ করা বর্ণনাকারীর ভুল। আসলে তা হবে চার'শত দিরহাম। অন্যান্য বর্ণনায় চারশত আশি দিরহাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সকলের একমত যে, ফাতিমা (রাযিঃ)-এর মাহরানা চার'শত আশি দিরহামের কম ছিল না।
ইকরামা (রাযিঃ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ তাঁর কন্যা ফাতিমা (রাযিঃ)-কে নিম্নোক্ত হাদিয়া দেন: নকশা করা খাট ১ (এক) টি, বালিশ ১(এক) টি- যার ভেতরে ছিল খেজুরের ছাল, পেয়ালা ১ (এক) টি, মশক ১(এক)টি।
অন্যান্য জীবন চরিতকারের বর্ণনা মতে- কাপড়ের বালিশ ১ (এক) টি- যাতে ভরা ছিল খেজুরের ছাল, চাক্কী ২(দু')টি, মশক ২(দু')টি এবং কলসী ২(দু') টি। (তাবাক্বাত)
📄 সন্তান
ফাতিমা (রাঃ)-এর গর্ভে ২টি পুত্র সন্তান ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন এবং ২টি কন্যা সন্তান- উম্মু কুলসূম ও যায়নাব (রাঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। (আল-ইস্তিআব)
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিচারে এরা সকলেই ইসলামের ইতিহাসে মাশহুর হয়ে আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের সকলকেই অত্যন্ত ভালবাসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যাদের মধ্যে কেবল ফাতিমা (রাঃ) এ গৌরব লাভ করেন যে, তাঁর মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বংশ টিকে আছে। (উসুদুল গাবাহ)
অন্য বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মুহসিন এবং রুকাইয়া নামেও তাঁর দু'সন্তান ছিলেন-(যারকানী)। যারা শৈশবেই মারা যান।