📄 যান্ নূরাইন
উসমান (রাযিঃ) এ বিবাহ্রে ফলশ্রুতিতে একটি বিশেষ খিতাবে (উপাধিতে) ভূষিত হলেন আর তা হল যুন্-নূরাইন- অর্থাৎ দুই নূরের অধিকারী। এ দুই নূর হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কন্যা। 'উসমান (রাযিঃ) পর পর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কন্যাকে বিয়ে করার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তিনি ছাড়া কোন ব্যক্তির নাবীর দু'কন্যার স্বামী হওয়ার সৌভাগ্য কারো ভাগ্যে ঘটেনি। এ ব্যাপারে তিনি একক এবং অন্যান্য বহু দিকের ন্যায় এ দিক দিয়েও তিনি বিশেষ ফাযীলাত এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।
📄 স্বামীর মর্যাদা সম্পর্কে স্ত্রীর গৌরবানুভূতি
আদর্শ স্ত্রীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা তাদের স্বামীদের উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন দেখতে এবং তাদের গুণগান শুনতে অভিলাষী হন এবং তাদের গৌরব বোধ করে থাকেন। রাসূল-কন্যা উম্মু কুলসূম (রাযিঃ) মধ্যেও আদর্শ নারী চরিত্রের এ বৈশিষ্ট্য পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান ছিল।
এক দিনের কথা। উম্মু কুলসুম (রাযিঃ)-এর মনে এ কৌতূহল জাগ্রত হল আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ﷺ-এর নিকট তাঁর স্বামীর আসন কোথায়- বিশেষ করে তাঁর ছোট বোন ফাতিমা (রাযিঃ)-এর স্বামী 'আলী (রাযিঃ)-এর মুকাবিলায়।
যেমন মনে হওয়া তেমনি তিনি তাঁর সম্মানিত পিতা রাসূল ﷺ-এর দরবারে গিয়ে হাজির হয়ে আরয করলেন: আব্বাজান! অনুমতি পেলে আমি আপনার খিদমাতে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। স্নেহপ্রবণ পিতা মুচকি হেসে বললেন: হ্যাঁ বেটি, নিশ্চয়, বল- তোমার প্রশ্নটা কি?
লজ্জাবনত বদনে, বিনয়-নম্র বচনে উন্মু কুলসূম (রাযিঃ) আরয করলেন, আমার মনে কৌতূহল জেগেছে এই কথা জানতে যে, আমার স্বামী উসমান (রাঃ) এবং ফাতিমার (রাঃ) স্বামী আলী (রাঃ) এর দু'জনের মধ্যে কার মর্তবা শ্রেষ্ঠতর কার মর্যাদা উচ্চতর?
প্রশ্নটা ছিল যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সূক্ষ্মতাত্বিক। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া সাধারণতঃ সুকঠিন। বিশেষ করে যখন এর সাথে কন্যার ভাবাবেগ, স্বামীর প্রতি অনুরাগ-ভক্তি এবং গৌরববোধ জড়িত। কিন্তু সমগ্র বিশ্বের পথ প্রদর্শক ও শিক্ষক রূপে যার আগমন ঘটেছিল এবং মানব প্রকৃতি সম্পর্কে যার জ্ঞান ছিল অত্যন্ত প্রখর তাঁর পক্ষে এর সন্তোষজনক উত্তরদান কঠিন ছিল না। তিনি ক্ষণিকের জন্য খামোশ থেকে পরক্ষণেই উত্তর দিলেন :
প্রিয় কন্যা! তোমার এই কথা শুনে খুশী হওয়া উচিত যে, তোমার স্বামী উসমান (রাঃ) ঐ সব ভাগ্যবান ব্যক্তিদের অন্যতম যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অন্তর দিয়ে ভালবাসে এবং আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে অনুরূপ ভালবাসেন।
তারপর তিনি বললেন :
আমি যখন বেহেশতে ভ্রমণরত ছিলাম তখন দেখতে পেলাম তোমার স্বামীর বালাখানা সব চেয়ে প্রশস্ত, সব চেয়ে উচ্চ- আমার অন্য কোন সাহাবীর জন্য এর চাইতে প্রশস্ততর ও উচ্চতর বালাখানা আর একটাও দেখতে পেলাম না। তাঁর এই বিশেষ মর্যাদা এজন্যই দেয়া হবে যে, কিছু লোক তাঁকে হত্যা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠবে আর সেদিন উসমান (রাঃ) সবর এবং শুকরিয়ার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
📄 গুণাবলী ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্য
সৎ-স্বভাব, অমায়িক ব্যবহার এবং মিষ্টি ভাষা ছিল উম্মু কুলসুমের (রাঃ) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
তিনি তাঁর স্বামীর খিদমত করতেন তাঁর দরদ মাখা অন্তর দিয়ে। উভয়ের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল মাধুর্যমণ্ডিত। মাত্র ছয় বৎসরের কিছু অধিককাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল তাদের মিলিত জীবন। এই সময়ে তাঁদের প্রেম ও প্রীতিতে পরিপূর্ণ সম্পর্কটি নিরন্তর এমন মধুময় ছিল যে, একদিনের জন্যও তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়নি, কারো বিরুদ্ধে কারো কোন দুঃখ অভিযোগ ছিল না। এক ঐতিহাসিক লিখেছেন, উম্মু কুলসূম (রাঃ) স্বীয় সম্মানিত পিতার নির্দেশ-ক্রমে সর্বদা স্বামীর কথামত চলতেন এবং তাঁর খিদমত করতে ব্যস্ত থাকতেন। অপর পক্ষে তিনি পিতার সেবার কোন সুযোগ যখন পেতেন তখন তার সদ্ব্যবহার করতেও উন্মুখ থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর গৃহে প্রবেশ করতেন তখন তিনি মনে-প্রাণে তাঁর খিদমত করতেন।
📄 ওফাত
উম্মু কুলসূম (রাঃ) নবম হিজরীর শাবান মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সম্ভাব্য সব রকম চিকিৎসা সত্ত্বেও আল্লাহর ডাকে তাঁকে সাড়া দিতে হল। প্রিয় স্বামী এবং সম্মানিত পিতাকে শোকাকুল করে তিনি এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মায়া ছেড়ে অপরিণত বয়সে চিরস্থায়ী ঠিকানায় প্রস্থান করলেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নয়নমণি ও কলিজার টুকরাকে গোসল দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। উম্মু আতিয়াহ, আসমা বিনতে উমায়স, সাফিয়া বিনতু আবদুল মুত্তালিব এবং লাইলা বিনতু কায়িফ (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ মত তাঁর গোসল দিলেন। গোসল শেষে যখন তিনি লাইলা বিনতু কায়িফের নিকট একটির পর একটি কাফনের কাপড় বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র চক্ষু যুগল থেকে টপ টপ করে অশ্রু ধারা ঝরে পড়ছিল।
বলাবাহুল্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তার জানাযার নামায পড়ালেন।
তাঁকে মাদীনার 'বাকী' নামক কবরস্থানে দাফন করা হল। অনুমতি ক্রমে আবূ তালহা, আলী, ফযল ইবনু আব্বাস এবং উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) একের পর এক কবরে অবতরণ করেন। উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) দেহ কবরে শায়িত করলেন।
আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন: যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালহাকে কবরে নামার অনুমতি দিলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে অবস্থান করছিলেন। দেখা গেল তখন তাঁর পবিত্র চক্ষুদ্বয় থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু বয়ে চলেছে।
দাফনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন: বিয়ে দেয়ার মত আমার আর কোন কন্যা নেই- যাকে উসমানের (রাঃ) সাথে বিয়ে দিতে পারি, থাকলে তৃতীয় দফায় আমি তাকেও উসমানের (রাঃ) হাতে সঁপে দিতাম।
আলী (রাঃ) বলেন: নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যদি আল্লাহ আমাকে চল্লিশ জন কন্যা দিতেন তা হলে প্রয়োজনে আমি একের পর এক প্রত্যেককে উসমানের (রাঃ) নিকট বিয়ে দিতাম- আমার শেষ মেয়েটি পর্যন্ত।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যদি আমার একশতটি মেয়ে থাকত এবং একের পর একটি মারা যেতো- তবু আমি তাদের প্রত্যেকের বিবাহ উসমানের (রাঃ) সাথে দিতে থাকতাম।