📄 উসমান (রাঃ)-এর সাথে উম্মু কুলসুমের শুভ বিবাহ
একথা আমরা পূর্বেই অবগত হয়েছি যে, উসমান (রাঃ) তদীয় প্রথমা স্ত্রী রুকাইয়া (রাঃ)-কে অত্যধিক ভালবাসতেন। এই ভালবাসা রুকাইয়ার (রাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত অব্যাহত এবং অবিচল ছিল। তাঁর ইন্তিকালে উসমান (রাঃ) শোকে মুহ্যমান হলেন। তিনি সব সময় চিন্তাযুক্ত থাকতেন। তাঁর চিন্তা এবং উদ্বেগের ছাপ তাঁর চেহারায় ধরা পড়ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা তাঁকে এরূপ বিমর্ষ অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু আবদিল্লাহ! (উসমান (রাঃ)-এর উপনাম) তোমাকে সর্বদাই বিমর্ষ ও চিন্তাযুক্ত দেখতে পাই, এর কারণ কি?
উসমান (রাঃ) জওয়াবে বললেন: রুকাইয়ার (রাঃ) মৃত্যুতে আমার কোমর ভেঙ্গে গেছে। আমার উপর এমন মুসীবত নাযিল হয়েছে যা আর কারও উপর নাযিল হয়নি। তাঁর মৃত্যুশোকে আমার হৃদয় ভেঙ্গে খান-খান হয়ে গেছে। বিশেষ করে তাঁর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল তা ছিন্ন হয়েছে, ফলে যে নৈকট্য অর্জিত হয়েছিল তাও ব্যাহত হয়ে গেছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তখন আশ্বস্ত করে বললেন: “তুমি চিন্তিত হয়ো না, উদ্বিগ্ন হয়ো না। সাধারণ লোকের মধ্যে বৈবাহিক কারণে অর্জিত সম্পর্ক স্ত্রীর মৃত্যু দ্বারা বিচ্ছিন্ন হলেও তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা এমন নয় যে, আমার কন্যা রুকাইয়া (রাঃ)-এর মৃত্যুতে তা ছিন্ন হয়ে যাবে।” একথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবছিলেন কি করে উসমানের (রাঃ) শোক দূরীভূত এবং দুঃখ কষ্টকে আনন্দ উল্লাসে পরিণত করা যায়। এমন সময় জিব্রীল (আঃ) ঐশী বাণী নিয়ে হাজির হলেন। বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনার নিকট তাঁর পয়গাম পাঠিয়েছেন, “আপনার চোখের জ্যোতিঃ উম্মু কুলসূমকে রুকাইয়ার মোহরেই উসমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিন। আর তাকে একথা বলে দিন: সে যেন উম্মু কুলসূম (রাঃ)-কে ঠিক রুকাইয়া (রাঃ)-এর মত ভালবাসে এবং তেমনি আদর যত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করে।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথেই তাঁকে উক্ত খোশখবর শুনালেন। উসমান (রাঃ)-এর তখন সমস্ত দুঃখ বেদনা আনন্দে রূপান্তরিত হল। সেই আনন্দের কোন সীমা পরিসীমা রইল না।
হিজরী তৃতীয় বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে রুকাইয়ার মোহরেই উসমান (রাঃ)-এর সাথে উম্মু কুলসূম (রাঃ)-এর শুভ বিবাহ যথারীতি সুসম্পন্ন হল।
📄 যান্ নূরাইন
উসমান (রাযিঃ) এ বিবাহ্রে ফলশ্রুতিতে একটি বিশেষ খিতাবে (উপাধিতে) ভূষিত হলেন আর তা হল যুন্-নূরাইন- অর্থাৎ দুই নূরের অধিকারী। এ দুই নূর হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কন্যা। 'উসমান (রাযিঃ) পর পর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কন্যাকে বিয়ে করার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তিনি ছাড়া কোন ব্যক্তির নাবীর দু'কন্যার স্বামী হওয়ার সৌভাগ্য কারো ভাগ্যে ঘটেনি। এ ব্যাপারে তিনি একক এবং অন্যান্য বহু দিকের ন্যায় এ দিক দিয়েও তিনি বিশেষ ফাযীলাত এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।
📄 স্বামীর মর্যাদা সম্পর্কে স্ত্রীর গৌরবানুভূতি
আদর্শ স্ত্রীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা তাদের স্বামীদের উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন দেখতে এবং তাদের গুণগান শুনতে অভিলাষী হন এবং তাদের গৌরব বোধ করে থাকেন। রাসূল-কন্যা উম্মু কুলসূম (রাযিঃ) মধ্যেও আদর্শ নারী চরিত্রের এ বৈশিষ্ট্য পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান ছিল।
এক দিনের কথা। উম্মু কুলসুম (রাযিঃ)-এর মনে এ কৌতূহল জাগ্রত হল আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ﷺ-এর নিকট তাঁর স্বামীর আসন কোথায়- বিশেষ করে তাঁর ছোট বোন ফাতিমা (রাযিঃ)-এর স্বামী 'আলী (রাযিঃ)-এর মুকাবিলায়।
যেমন মনে হওয়া তেমনি তিনি তাঁর সম্মানিত পিতা রাসূল ﷺ-এর দরবারে গিয়ে হাজির হয়ে আরয করলেন: আব্বাজান! অনুমতি পেলে আমি আপনার খিদমাতে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই। স্নেহপ্রবণ পিতা মুচকি হেসে বললেন: হ্যাঁ বেটি, নিশ্চয়, বল- তোমার প্রশ্নটা কি?
লজ্জাবনত বদনে, বিনয়-নম্র বচনে উন্মু কুলসূম (রাযিঃ) আরয করলেন, আমার মনে কৌতূহল জেগেছে এই কথা জানতে যে, আমার স্বামী উসমান (রাঃ) এবং ফাতিমার (রাঃ) স্বামী আলী (রাঃ) এর দু'জনের মধ্যে কার মর্তবা শ্রেষ্ঠতর কার মর্যাদা উচ্চতর?
প্রশ্নটা ছিল যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সূক্ষ্মতাত্বিক। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া সাধারণতঃ সুকঠিন। বিশেষ করে যখন এর সাথে কন্যার ভাবাবেগ, স্বামীর প্রতি অনুরাগ-ভক্তি এবং গৌরববোধ জড়িত। কিন্তু সমগ্র বিশ্বের পথ প্রদর্শক ও শিক্ষক রূপে যার আগমন ঘটেছিল এবং মানব প্রকৃতি সম্পর্কে যার জ্ঞান ছিল অত্যন্ত প্রখর তাঁর পক্ষে এর সন্তোষজনক উত্তরদান কঠিন ছিল না। তিনি ক্ষণিকের জন্য খামোশ থেকে পরক্ষণেই উত্তর দিলেন :
প্রিয় কন্যা! তোমার এই কথা শুনে খুশী হওয়া উচিত যে, তোমার স্বামী উসমান (রাঃ) ঐ সব ভাগ্যবান ব্যক্তিদের অন্যতম যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অন্তর দিয়ে ভালবাসে এবং আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে অনুরূপ ভালবাসেন।
তারপর তিনি বললেন :
আমি যখন বেহেশতে ভ্রমণরত ছিলাম তখন দেখতে পেলাম তোমার স্বামীর বালাখানা সব চেয়ে প্রশস্ত, সব চেয়ে উচ্চ- আমার অন্য কোন সাহাবীর জন্য এর চাইতে প্রশস্ততর ও উচ্চতর বালাখানা আর একটাও দেখতে পেলাম না। তাঁর এই বিশেষ মর্যাদা এজন্যই দেয়া হবে যে, কিছু লোক তাঁকে হত্যা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠবে আর সেদিন উসমান (রাঃ) সবর এবং শুকরিয়ার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
📄 গুণাবলী ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্য
সৎ-স্বভাব, অমায়িক ব্যবহার এবং মিষ্টি ভাষা ছিল উম্মু কুলসুমের (রাঃ) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
তিনি তাঁর স্বামীর খিদমত করতেন তাঁর দরদ মাখা অন্তর দিয়ে। উভয়ের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল মাধুর্যমণ্ডিত। মাত্র ছয় বৎসরের কিছু অধিককাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল তাদের মিলিত জীবন। এই সময়ে তাঁদের প্রেম ও প্রীতিতে পরিপূর্ণ সম্পর্কটি নিরন্তর এমন মধুময় ছিল যে, একদিনের জন্যও তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়নি, কারো বিরুদ্ধে কারো কোন দুঃখ অভিযোগ ছিল না। এক ঐতিহাসিক লিখেছেন, উম্মু কুলসূম (রাঃ) স্বীয় সম্মানিত পিতার নির্দেশ-ক্রমে সর্বদা স্বামীর কথামত চলতেন এবং তাঁর খিদমত করতে ব্যস্ত থাকতেন। অপর পক্ষে তিনি পিতার সেবার কোন সুযোগ যখন পেতেন তখন তার সদ্ব্যবহার করতেও উন্মুখ থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর গৃহে প্রবেশ করতেন তখন তিনি মনে-প্রাণে তাঁর খিদমত করতেন।