📄 বিয়ে ও তালাক
আবু লাহাবের প্রথম পুত্র উৎবা যে অবস্থায় রুকাইয়া (রাঃ)-কে তালাক দিয়ে বিবাহের বন্ধন ছিন্ন করে ফেলে যা রুকাইয়ার (রাঃ) জীবন-কাহিনীতে বিবৃত হয়েছে, ঐ একই উপায়ে উতাইবাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তৃতীয়া কন্যা উম্মু কুলসূম (রাঃ)-কে রুখসতী অর্থাৎ স্বামী গৃহে গমনের পূর্বেই তালাক দিয়ে দেয়। কিন্তু তালাক দিয়েই সে ক্ষান্ত হয় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সে বেয়াদবীর চূড়ান্ত পরিচয় দিতে থাকে। অত্যন্ত আপত্তিকর ও অসম্মানসূচক বাক্যাবলী সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে উচ্চারণ করে চলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কানে এ সব কথা আসতে থাকে। তিনি ব্যথিত এবং মর্মাহত হন। একদিন উতাইবার এমনি এক মর্মবিদারী বাক্যবাণে বিদ্ধ হওয়ার ফলে তাঁর আহত হৃদয় থেকে স্বতঃ উৎসারিত হয়ে এই কথা তাঁর পবিত্র মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে : পরওয়ারদিগার! তোমার দুই সৃষ্ট জীবের (বাঘ ও সিংহ) মধ্য থেকে একটিকে এই বদবখতের পিছনে লাগিয়ে দাও।
📄 উতাইবা যেভাবে ধ্বংস হলো
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাৎকারী রূপে অবতীর্ণ না হলেও তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে আসা- উক্ত বদ-দু'আ ব্যর্থ হতে পারে না। আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয় এবং উতাইবা অপমৃত্যুর শিকারে পরিণত হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বদ-দু'আ শুনার পর মুহূর্ত থেকে উতাইবার মনে ত্রাসের সঞ্চার হয়। তার পিতা আবু লাহাবের মনেও আতঙ্ক দেখা দেয় এবং উভয়ের চেহারায় ত্রাস ও আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠে।
কিছুদিন পর উতাইবা এবং আবু লাহাব উভয়ে বাণিজ্য উপলক্ষে সিরিয়া যাত্রা করে। পথিমধ্যে এক স্থানে হঠাৎ উতাইবার মনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বদ-দু'আর কথা উদিত হয়, সাথে সাথে আশঙ্কা ও আতঙ্ক তার হৃদয়কে গ্রাস করে ফেলে। ভয় হয় কখন কোন মুহূর্তে অতর্কিতে বাঘের আক্রমণ ঘটে যায়। তার সঙ্গী সাথীরা তাকে নানা কথায় নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবু আতঙ্ক দূর না হওয়ায় অবশেষে কাফিলার বাণিজ্য সম্ভার দিয়ে চারিদিকে প্রাচীরের মত এক রক্ষাব্যূহ তৈরী করে উতাইবাকে তার মধ্যস্থলে রেখে সতর্ক পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু মারে আল্লাহ রাখে কে?
রাত্রি গভীর হয়ে চলল। মধ্যরাত্রি পার হওয়ার পর কোথা থেকে কোন দিক দিয়ে সহসা এক হিংস্র জন্তুর আবির্ভাব ঘটল। সে জন্তু এক লাফে মালপত্রের প্রাচীর টপকে একেবারে উতাইবার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল এবং এক পলকের মধ্যে তার ঘাড় মটকিয়ে তাকে পীঠে তুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। যারা উতাইবার পাহারায় নিয়োজিত ছিল তারা ভীত চকিত নয়নে এই অচিন্তপূর্ব ভয়াবহ দৃশ্য শুধু দেখতে পেল কিন্তু কিছুই করতে পারল না। কাঠের পুতুলের ন্যায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর হতভম্ব হয়ে গেল।
📄 উসমান (রাঃ)-এর সাথে উম্মু কুলসুমের শুভ বিবাহ
একথা আমরা পূর্বেই অবগত হয়েছি যে, উসমান (রাঃ) তদীয় প্রথমা স্ত্রী রুকাইয়া (রাঃ)-কে অত্যধিক ভালবাসতেন। এই ভালবাসা রুকাইয়ার (রাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত অব্যাহত এবং অবিচল ছিল। তাঁর ইন্তিকালে উসমান (রাঃ) শোকে মুহ্যমান হলেন। তিনি সব সময় চিন্তাযুক্ত থাকতেন। তাঁর চিন্তা এবং উদ্বেগের ছাপ তাঁর চেহারায় ধরা পড়ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা তাঁকে এরূপ বিমর্ষ অবস্থায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু আবদিল্লাহ! (উসমান (রাঃ)-এর উপনাম) তোমাকে সর্বদাই বিমর্ষ ও চিন্তাযুক্ত দেখতে পাই, এর কারণ কি?
উসমান (রাঃ) জওয়াবে বললেন: রুকাইয়ার (রাঃ) মৃত্যুতে আমার কোমর ভেঙ্গে গেছে। আমার উপর এমন মুসীবত নাযিল হয়েছে যা আর কারও উপর নাযিল হয়নি। তাঁর মৃত্যুশোকে আমার হৃদয় ভেঙ্গে খান-খান হয়ে গেছে। বিশেষ করে তাঁর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল তা ছিন্ন হয়েছে, ফলে যে নৈকট্য অর্জিত হয়েছিল তাও ব্যাহত হয়ে গেছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তখন আশ্বস্ত করে বললেন: “তুমি চিন্তিত হয়ো না, উদ্বিগ্ন হয়ো না। সাধারণ লোকের মধ্যে বৈবাহিক কারণে অর্জিত সম্পর্ক স্ত্রীর মৃত্যু দ্বারা বিচ্ছিন্ন হলেও তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা এমন নয় যে, আমার কন্যা রুকাইয়া (রাঃ)-এর মৃত্যুতে তা ছিন্ন হয়ে যাবে।” একথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবছিলেন কি করে উসমানের (রাঃ) শোক দূরীভূত এবং দুঃখ কষ্টকে আনন্দ উল্লাসে পরিণত করা যায়। এমন সময় জিব্রীল (আঃ) ঐশী বাণী নিয়ে হাজির হলেন। বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনার নিকট তাঁর পয়গাম পাঠিয়েছেন, “আপনার চোখের জ্যোতিঃ উম্মু কুলসূমকে রুকাইয়ার মোহরেই উসমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিন। আর তাকে একথা বলে দিন: সে যেন উম্মু কুলসূম (রাঃ)-কে ঠিক রুকাইয়া (রাঃ)-এর মত ভালবাসে এবং তেমনি আদর যত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করে।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথেই তাঁকে উক্ত খোশখবর শুনালেন। উসমান (রাঃ)-এর তখন সমস্ত দুঃখ বেদনা আনন্দে রূপান্তরিত হল। সেই আনন্দের কোন সীমা পরিসীমা রইল না।
হিজরী তৃতীয় বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে রুকাইয়ার মোহরেই উসমান (রাঃ)-এর সাথে উম্মু কুলসূম (রাঃ)-এর শুভ বিবাহ যথারীতি সুসম্পন্ন হল।
📄 যান্ নূরাইন
উসমান (রাযিঃ) এ বিবাহ্রে ফলশ্রুতিতে একটি বিশেষ খিতাবে (উপাধিতে) ভূষিত হলেন আর তা হল যুন্-নূরাইন- অর্থাৎ দুই নূরের অধিকারী। এ দুই নূর হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কন্যা। 'উসমান (রাযিঃ) পর পর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দুই কন্যাকে বিয়ে করার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তিনি ছাড়া কোন ব্যক্তির নাবীর দু'কন্যার স্বামী হওয়ার সৌভাগ্য কারো ভাগ্যে ঘটেনি। এ ব্যাপারে তিনি একক এবং অন্যান্য বহু দিকের ন্যায় এ দিক দিয়েও তিনি বিশেষ ফাযীলাত এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।