📄 অবশেষে মদীনায় হিজরত
হিজরতের পর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। কন্যা ও জামাতার সংবাদ জানার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিতৃ হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠলো। কিন্তু অনেক দিন পর্যন্ত কোন খবরাখবর পাওয়া গেল না। উদ্বেগ ও অস্থিরতায় তিনি মাঝে মাঝে মক্কা থেকে বের হয়ে পড়তেন। যখন কোন পথিককে আবিসিনিয়া থেকে মক্কার দিকে আসতে দেখতেন তখন তার কাছে গিয়ে রুকাইয়ার (রাঃ) ও উসমান (রাঃ)-এর সংবাদ নেয়ার চেষ্টা করতেন। একদা হঠাৎ এক বৃদ্ধার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে গেল। সে আবিসিনিয়া থেকে আসছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি হাবশ রাজ্যে আমার কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এবং জামাতা উসমানকে (রাঃ) দেখতে পেয়েছ? বৃদ্ধা জওয়াবে বললেন, হাঁ তাদের আমি দেখে এসেছি। তারা ভাল আছেন, আপনি আশ্বস্ত হউন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সংবাদ শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি উদ্বেগমুক্ত হলেন এবং তাঁদের জন্য দু'আ করলেন।
উসমান (রাঃ)-এর আবিসিনিয়ায় অবস্থানকালে এই খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, মক্কার কাফিররা ইসলামের প্রতি বৈরী ভাব পরিত্যাগ করেছে এবং মুসলমানদের প্রতি কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা কমে এসেছে। এ সংবাদ শুনে উসমান (রাঃ) তদীয় সহধর্মিণী রুকাইয়া (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে আশায় বুক বেঁধে স্বদেশে ফিরে আসলেন। কিন্তু এখানে ফিরে এসেই জানতে পারলেন, উক্ত সংবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যে ও ভিত্তিহীন। বরং তিনি নিজেই প্রত্যক্ষ করলেন যে, অত্যাচারের মাত্রা পূর্বাপেক্ষা আরও বেড়েছে। এখানে অবস্থান করলে তাদেরকে আবারও দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সুতরাং উসমান (রাঃ) তার স্ত্রীকে নিয়ে আবার আবিসিনিয়ায় ফিরে যেতে বাধ্য হলেন।
মুসলমানদের মধ্যে যারা মক্কায় অবস্থান করছিলেন তারা কাফিরদের অত্যাচার উৎপীড়নের যাঁতাকলে অবিরাম পিষ্ট হচ্ছিলেন। রাসূল নিজেও কাফিরদের জুলম-নির্যাতন এবং ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। সীমাহীন অত্যাচারে তাওহীদের ঝাণ্ডাবাহী সহায়-সম্বলহীন আল্লাহর বান্দাদের ধৈর্যের বাঁধ একেবারে ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হল- এমন সময় আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় বান ডেকে উঠল। তিনি মুসলমানদিগকে দলবদ্ধভাবে ব্যাপক আকারে মাদীনায় হিজরাত করার অনুমতি প্রদান করলেন। তারা যাত্রা শুরু করলেন।
যথাসময়ে আবিসিনিয়ায় এ খবর পৌছুল। 'উসমান (রাযিঃ) এ সংবাদ পেয়ে পুনরায় রুকাইয়া (রাযিঃ)-কে সাথে নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন। এসে রাসূলুল্লাহ -এর দরবারে হাযির হলেন। অতঃপর রাসূল -এর অনুমতি নিয়ে তাঁরাও মাদীনায় হিজরাত করলেন।
আবিসিনিয়া এবং মাদীনাহ্ এ দু'স্থানে হিজরাত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন- 'উসমান (রাযিঃ) এবং তাঁর জীবন-সঙ্গিনী রুকাইয়া (রাযিঃ)।
মাদীনার আনসারগণ মক্কার মুহাজিরগণকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে একেক পরিবারকে একেক বাড়ীতে আশ্রয় প্রদান করেন। শুধু আশ্রয় প্রদানই নয়, তাঁরা মুহাজিরদেরকে আপন ভাইরূপে বরণ করে নেন। 'উসমান (রাযিঃ)-কে ভ্রাতৃরূপে বরণ করে নিলেন হাসান (রাযিঃ)-এর ভাই উয়াইস ইবনু সাবিত (রাযিঃ)।
মাদীনায় উসমান (রাযিঃ) তদীয় জীবন-সঙ্গিনীকে নিয়ে সুখের ঘর পাতলেন এবং ইসলামের আদর্শে সন্তোষধন্য দাম্পত্য জীবন গড়ে তুললেন। দৈহিক সৌন্দর্য, পারস্পরিক ভালবাসায় আর একের প্রতি অপরের সুমধুর আচরণে এ সুখী দম্পতি ছিল তুলনাহীন।
📄 রুকাইয়ার (রাঃ) ইন্তিকাল
আল্লাহর ইচ্ছা ও মরযী অনুধাবন করা মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য। মাদীনায় তাঁদের মধুর দাম্পত্য জীবন বেশি দিন স্থায়ী হল না। হিজরাতের দ্বিতীয় বর্ষেই রুকাইয়া (রাযিঃ) হঠাৎ বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলেন। আর ঠিক এ সময়টিতে বদর প্রান্তরে অনুষ্ঠিত হয় মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম জিহাদ এবং জাতি হিসেবে মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার জীবন মরণ সংগ্রাম। ঠিক এ সময়েই দূরারোগ্য ও কঠিন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলেন নাবী-নন্দিনী রুকাইয়া (রাযিঃ)। মুসলমানদের ইমাম ও নেতারূপে রাসূল ﷺ-এর পক্ষে- মুসলিম জাতির এ জীবন মরণ সংগ্রামে কন্যার কঠিন পীড়ার মত পারিবারিক কারণে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকার প্রশ্নই উঠে না। সুতরাং প্রিয় কন্যাকে আল্লাহর হিফাযাতে রেখে তিনি সাহাবীদের নিয়ে যুদ্ধ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলেন।
কিন্তু সমস্যায় নিপতিত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন রুকাইয়া (রাযিঃ)-এর স্বামী 'উসমান (রাযিঃ)। একদিকে সারা জীবনের সুখ দুখের চির-সঙ্গিনী রোগ শয্যায় শায়িতা এবং মারাত্মক রোগ যন্ত্রনায় ছটফট করে চলেছেন, অপরদিকে ইসলামের প্রতি কর্তব্যবোধ- যে ইসলামকে দুনিয়ার বুক থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করার জন্য কাফিররা বিপুল অস্ত্রসম্ভারে সজ্জিত হয়ে এসেছে। একদিকে স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা এবং দায়িত্ব- অপরদিকে ইসলামের এ মহা সঙ্কটকালে জিহাদে অংশ গ্রহণের কর্তব্যবোধ- কোনটির প্রতি তিনি অধিক গুরুত্ব দিবেন? এ দু' পরস্পর বিরোধী মানসিক দ্বন্দ্বে ইসলামের প্রতি তাঁর অটল মহব্বতই জয়ী হল। তিনিও স্ত্রীকে আল্লাহর হস্তে সোপর্দ করে জিহাদে যোগদান করতে মনস্থ করলেন এবং এজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।
'উসমান (রাযিঃ)-এর এ সংকল্পের কথা জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ তাঁকে ডেকে পাঠালেন। তাঁকে তিনি বুঝিয়ে বললেন : “তোমাকে এবার যুদ্ধযাত্রা স্থগিত রাখতে হবে, তুমি যুদ্ধে গেলে রুকাইয়া (রাযিঃ)-এর দেখাশুনা এবং সেবা শুশ্রূষা করবে কে?” 'উসমান আরয করলেন, তবে কি জিহাদে যোগদানের সাওয়াব থেকে আমি বঞ্চিত হবো? রাসূলুল্লাহ ইরশাদ ফরমালেন, তোমার সহধর্মিণী রুকাইয়া (রাযিঃ)-এর সেবা শুশ্রূষা করে তুমি জিহাদে যোগদানের সমান সাওয়াব পাবে, এছাড়া গাণীমাতের মালের অংশও তুমি ঠিক ঠিক মত পেয়ে যাবে।
রাসূলুল্লাহ -এর ইচ্ছা এবং নির্দেশ মুতাবিক 'উসমান (রাযিঃ) মদীনায় থেকে গেলেন এবং স্ত্রীর সেবা শুশ্রূষা করে চললেন। কিন্তু প্রাণপণ সেবা করেও তিনি তাঁর প্রিয়তমাকে অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেন না। হিজরী দ্বিতীয় সালে মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে স্নেহশীল মহান পিতার অনুপস্থিতিতে এবং প্রেমময় স্বামীর চোখের সামনে ধৈর্য সহিষ্ণুতা, প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক নাবী-নন্দিনী রুকাইয়া (রাযিঃ) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
রুকাইয়া (রাযিঃ)-এর ইন্তিকালে তদীয় স্বামী 'উসমান (রাযিঃ) হৃদয়ে এক চরম আঘাত পেলেন। নাবী-নন্দিনী রুকাইয়া (রাযিঃ)-কে জীবন-সঙ্গিনী, সহধর্মিণী ও সহমর্মিণীরূপে লাভ করে তিনি যে অপার আনন্দ এবং পরম সন্তোষ লাভ করেছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। বিবাহের পর থেকে সুখে-দুঃখে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ছায়ার মতো অবস্থান করেছেন। কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে 'উসমান (রাযিঃ) যখন নিজের প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে আবিসিনিয়ায় হিজরাত করতে বাধ্য হন, তখনও তিনি তাঁকে একা ছেড়ে দেননি। ইচ্ছে করলে অন্যান্যের মতো তিনিও জন্মভূমি মক্কায় থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না, স্বামীর সাথে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দণ্ড বেছে নিলেন। তরঙ্গবিক্ষুদ্ধ সমুদ্র, ঊষর মরুভূমি এবং বিপদ সঙ্কুল ও বন্ধুর পার্বত্য পথ অতিক্রম করার কষ্ট তিনি হৃষ্টমনে বরদাশত করেন। প্রেমময় মহান পিতার স্নেহচ্ছায়া, দরদী ভগ্নিত্রয়ের প্রীতির আকর্ষণ এবং অন্যান্য আপন জনের মায়া মমতার বাঁধন সাময়িকভাবে পরিত্যাগ করে প্রতিকুল পরিবেশের কষ্টকর প্রবাস-জীবন তিনি বরণ করে নেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ছাড়াও স্বীয় স্বামীকে তাঁর সাহচর্য দ্বারা খুশি রাখার এবং নিজে তাঁর সাহচর্যের দ্বারা খুশী থাকার বাসনা এ কষ্ট বরণের পশ্চাতে নিশ্চয় সক্রিয় ছিল। পারস্পরিক গভীর প্রেম এবং আকর্ষণে তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল মাধুর্যমণ্ডিত। যেন এক বৃন্তের দুটি সুষমামণ্ডিত ও সুবিকশিত ফুল। এ যুগল দম্পতি সম্পর্কে যথার্থই বলা হয়েছে-
“আহ্সানুয যাওজাইনে রা'আহুমাল ইনসানু- রুকাইয়া ওয়া যাউজুহা 'উসমান।"
"সুন্দরতম দম্পতি যা মানুষ দেখতে পেয়েছে তা হচ্ছে রুকাইয়া (রাযিঃ) এবং তাঁর স্বামী 'উসমান (রাযিঃ)।"
সে আদর্শ দম্পতির অর্ধাঙ্গিনী যখন চোখ বুঝল- বৃত্তচ্যুত হয়ে যখন কোমলতর ফুলটি ঝরে পড়ল তখন অপর অর্ধেক তথা বৃত্তযুক্ত পুষ্পটির মানসিক অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আদর্শা সহধর্মিণীর চির বিদায়ের ফলে 'উসমান (রাযিঃ)-এর হৃদয়ে বিরহের অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অটল মূর্তি এবং আল্লাহর ইচ্ছার সম্মুখে অবনত মস্তক 'উসমান (রাযিঃ) মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে বুকে পাথর বেঁধে স্ত্রীর কাফন-দাফনের আশু কর্তব্য সুসম্পন্ন করলেন।
📄 রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকাইয়া (রাঃ)-এর ইন্তিকালের সংবাদে মর্মাহত
সময়টি ছিল পবিত্র রামাযান মাস। হিজরাতের পর এক বৎসর ছয় মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। দাফন কার্য এ মাত্র সম্পন্ন হয়েছে, কবরে তখনও মাটি দেয়া চলছে- এমন সময় যায়িদ ইবনু হারিসা (রাযিঃ) বদর যুদ্ধে মুসলমানদের মহা বিজয়ের খোশখবর নিয়ে মাদীনায় প্রবেশ করলেন। জয়-উল্লাসে উচ্চারিত 'আল্লাহু আকবার' 'আল্লাহু আকবার' এর গগণ-বিদারী আওয়াজে মাদীনার পাহাড় পর্বত ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত এবং তার অলী-গলী মুখরিত হয়ে উঠল। জানা গেল, মিথ্যা ও সত্যের দ্বন্দ্বে সত্যের নিকট অসত্য পরাভূত হয়েছে, আলোর মাঝ থেকে অন্ধকার বিদূরিত হয়েছে। আরও জানা গেল, বিজয়ী আনসার ও মুহাজির মুজাহিদ দল সমভিব্যাহারে রাসূল মাদীনার দ্বার প্রান্তে উপনীত।
বিজয়ের জয়মাল্য পরে নাবী কারীম মাদীনায় প্রবেশ করলেন। বস্তিতে ঢুকেই তিনি তাঁর প্রিয়তমা কন্যার ইন্তিকাল সংবাদ শুনে মর্মাহত হলেন। স্বভাবতঃই তাঁর পিতৃ-হৃদয় আকুলভাবে কেঁদে উঠল। শোকাকুল হৃদয়েই তিনি সোজা চলে গেলেন মাদীনার বাকী নামক কবরস্থানে- যেখানে তাঁর কন্যা রুকাইয়া (রাযিঃ) চিরশয্যা রচিত হয়েছিল। কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে দু'আ করার পর রাসূল শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন: "উসমান ইবনু মাযউন (রাযিঃ) আগে চলে গিয়েছে, এখন তুমি গিয়ে তার সাথে মিলিত হও।"
'উসমান ইবনু মাসযউন (রাযিঃ) ছিলেন এক জন বিশিষ্ট সাহাবী, তাঁকে রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত ভালবাসতেন। ইনি মুহাজিরদের মধ্যে সে ব্যক্তি যিনি মাদীনায় এসে প্রথম ইন্তিকাল করেন। নাবী -এর শোকাকুল অবস্থা ও নীরব ক্রন্দন এবং উক্ত মন্তব্য শুনে আনসার ও মুহাজিরদের মহিলারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। মাদীনায় শোকার্ত মেয়ে মহলের এ করুণ কান্নায় এক বিষাদঘন অবস্থার সৃষ্টি হল। এ সময়ে কঠোর প্রকৃতি ও উগ্র মেজাজী 'উমার (রাযিঃ)-এর আবির্ভাব ঘটল। তিনি এ অবস্থা দেখে মেয়েদের শাসাতে শুরু করলেন। তখন রাসূল তাঁকে বাঁধা দিয়ে বলেনঃ ওমর তাদের কাঁদতে দাও, কেননা কান্নার সম্পর্ক যখন হৃদয় ও চোখের সাথে তখন আল্লাহর রহমত থেকে তা উৎসারিত। কিন্তু তাতে যদি মুখ এবং হাতের সংযোগ ঘটে (অর্থাৎ- যখন তারা উচ্চ স্বরে চিৎকার করে কাঁদে এবং হাত-পা ছুঁড়ে বুক চাপড়িয়ে ও চুল ছিঁড়ে শোকের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়) তখন বুঝবে যে তথায় শয়তানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে রাসূল একথাও বললেনঃ “আলহামদু লিল্লা, কন্যাদের দাফন করা একটা সম্মানজনক কাজ।"
এক বর্ণনায় পাওয়া যায় মরহুমা রুকাইয়া (রাযিঃ)-এর সর্বকনিষ্ঠা বোন ফাতিমাতুয যাহরা প্রিয়তমা ভগ্নির মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন হন। তিনি শোকের আতিশয্যে স্বীয় পিতা রাসূল -এর কাছে বসে আহাজারী করে কেঁদে চলেছিলেন। রাসূল স্বীয় চাদরের আঁচল দিয়ে তাঁর অশ্রু মুছে দিচ্ছিলেন আর ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়ে চলেছিলেন। এ ছিল আদর্শ নারীর আদর্শ কাজ। মানবিক সহৃদয়তার স্বাভাবিক প্রকাশ এবং নবুওয়াতী দায়িত্ব পালনের সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
📄 দৈহিক সৌন্দর্য
রুকাইয়ার (রাঃ) অনুপম দৈহিক সৌন্দর্যের কথা ইতিপূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে। সমগ্র আরবের মধ্যে কুরাইশরা ছিল সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত। স্বভাবতঃই দৈহিক সৌন্দর্যেও তারা ছিল সকলের ঊর্ধ্বে। তাদের মেয়েরাও হত প্রায়শঃ সুন্দরী। সে সময়ে সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে যারা ছিল সুন্দরতম, রুকাইয়া (রাঃ) ছিলেন তাদের অন্যতম। তাঁর দৈহিক গঠন ও রূপের খ্যাতি সমগ্র মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর জীবনসাথী রূপে যাঁকে জুটিয়ে দেন সেই উসমান (রাঃ) ও ছিলেন তেমনি আকর্ষণীয় সৌন্দর্যের অধিকারী। সমসাময়িক কুরাইশ যুবকদের মধ্যে সৌন্দর্যে কেউ তাঁর মতো ছিল না বললেই চলে। যেমন স্বামী তেমনি স্ত্রী। উভয়কে একত্রে দেখলে মনে হত কী চমৎকার মানিয়েছে তাদের মিলন। এমন মিলন খুব কমই ঘটে থাকে।
এই প্রসঙ্গে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাদিম ছিলেন বালক উসামা ইবনু যায়িদ। একবার রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পাঠালেন উসমানের (রাঃ) গৃহে। উসামা (রাঃ) নিজেই বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কিছু ভুনা গোশত দিয়ে বললেন: যাও, উসমান (রাঃ)-এর ঘরে দিয়ে এস। আমি সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখলাম উসমান (রাঃ) এবং রুকাইয়া (রাঃ) একই চাটাইয়ে বসে আছেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই এত সুন্দর দেখাচ্ছিল যে, আমি একবার তাকাই রুকাইয়া (রাঃ)-এর দিকে, আর একবার তাকাই উসমান (রাঃ)-এর দিকে! ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একথা উল্লেখ করলাম। তিনি খুশী হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন: বল দেখি, তুমি কি এদের চাইতে সুন্দরতর আর কোন মিঞা-বিবি দেখেছ? আমি বললাম, জী না, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।