📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 চরিত্র-বৈশিষ্ট্য

📄 চরিত্র-বৈশিষ্ট্য


নবী নন্দিনী যায়নাব (রাঃ)-এর জীবনী সম্পর্কে খুব বেশী তথ্য পাওয়া যায় না। যতটা আমরা সংগ্রহ করতে পেরেছি মোটামুটি তা পাঠক-পাঠিকাদের সম্মুখে পরিবেশন করেছি। উক্ত বিবরণীতে তাঁর সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা সম্ভব হয়নি। তবে যতটা তথ্য পাওয়া গেছে এবং পরিবেশিত হয়েছে তা থেকে তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এবং আদর্শ রমণীর পরিচয় পরিস্ফুট হয়ে উঠে।

নারী জীবনের তিনটি রূপ কন্যা, স্ত্রী-গৃহিণী এবং মাতা যায়নাব (রাঃ) ছিলেন সুন্দরতম চরিত্র ও মহত্তম আচরণের প্রতীক, মানুষের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আদর্শা রমণী খাদীজাতুল কুবরার (রাঃ) প্রথমা কন্যা এবং হয়ত বা প্রথম সন্তান।

দশ বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কৈশোরের সূচনায় এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত লাভের পূর্বে যায়নাব (রাঃ) খালাতো ভাই আবুল 'আসের সাথে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। কন্যা রূপে তাঁর ইসলাম কবুল করার আহ্বানে ত্বড়িত সাড়া প্রদান এবং তা এমন অবস্থায় যখন প্রিয়তম ব্যক্তি- আপন স্বামী তা গ্রহণ করতে নারায।

চির সত্যবাদী মহান পিতার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ছাড়াও তাঁর ইসলাম গ্রহণের মধ্যে আমরা তাঁর চরিত্রের যে দিকটি দেখতে পাই তা হচ্ছে : সত্যকে সহজে চেনার ক্ষমতা এবং যা সত্য তা প্রতিকূল পরিবেশেও বরণ করে নেয়ার অতুল্য সাহসিকতা।

আমরা দেখতে পাই কিশোরী কন্যা যায়নাব (রাঃ) বিবাহিতা হয়েও এবং শ্বশুর গৃহে কাফির পরিবারে অবস্থান করেও পিতার উপর কাফিরদের অমানুষিক অত্যাচারের কথা শুনে ব্যথিত ও বিচলিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এসেছেন, মহান পিতার প্রতি নির্মম অত্যাচারের চিহ্ন দর্শনে অঝোরে কেঁদেছেন এবং প্রয়োজনীয় সেবা শুশ্রূষা করেছেন। আরও দেখতে পাই তিনি 'শিআবি আবি তালিবে' পিতা এবং অন্যান্য আপন জনের সাথে দীর্ঘ অন্তরীণ জীবনের অন্তহীন ও দুঃসহ কষ্ট যাতনা স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছেন।

রিসালাতের মহান দায়িত্ব কর্তব্য পালনে নিয়োজিত নির্যাতিত পিতার প্রতি- বিরুদ্ধ পরিবেশে অবস্থানরত কন্যার কর্তব্য পালন এবং তাঁর সাথে একাত্মতা প্রকাশের সুন্দরতম আদর্শ আমরা যায়নাবের (রাঃ) মাঝে এই সব দৃষ্টান্তের মাধ্যমে দেখতে পাই।

ইসলামের বিজয়ের প্রতি আগ্রহ-প্রবণতা, মহান পিতার সহিত মিলিত হওয়ার ব্যগ্র-ব্যাকুলতা, বিরুদ্ধ পরিবেশে অবস্থানের অস্থিরতা এবং স্বীয় পিতা ও উদীয়মান মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে অন্যায় সমরে স্বামীর অংশ গ্রহণে এবং উহার ফলাফল শ্রবণে একদিকে আনন্দ অপর দিকে স্বামীর জন্য উদ্বিগ্নতা, পরবর্তী পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন স্বামীর সাথে মিলনের জন্য হৃদয়ের আকুলতা প্রভৃতি বিচিত্র মানসিক দ্বন্দ্বের শিকারে পরিণত হন যায়নাব (রাঃ) একের পর এক।

এই সব ঘাত প্রতিঘাতে ক্ষতবিক্ষত যায়নাব (রাঃ) তাঁর সত্যপ্রীতি ও পিতৃ-অনুরাগের জন্য কাফিরদের নিষ্করুণ হস্তে সাংঘাতিকভাবে আহত এবং রক্তরঞ্জিত হন। ধৈর্য ও তিতিক্ষার অতুলনীয় নিদর্শনও আমরা তার মধ্যে লক্ষ্য করি এই সব পর্যায়ক্রমিক ঘটনাবলীর মধ্যে।

এখানেই তার পরীক্ষার শেষ নয়- তাঁর এক শিশু সন্তানকে আল্লাহ তুলে নিয়ে তাঁর সবর এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর তাওয়াক্কুলের চরম পরীক্ষা গ্রহণ করেন এবং তিনি তাতেও উত্তীর্ণ হন।

কন্যার দুঃখে ও বেদনায় মহান পিতার উৎকণ্ঠা, কন্যার হৃদয়-প্রবণতার প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সহৃদয়তা এবং তাঁর সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে কন্যার প্রতি পিতার কর্তব্য পালনের মহান আদর্শের আমরা সুন্দরতম নিদর্শনই দেখতে পাই মহা মানব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণ ও সুব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে যার আলোচনা আমরা উপরে করে এসেছি।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 স্ত্রীরূপে যায়নাব (রাঃ)

📄 স্ত্রীরূপে যায়নাব (রাঃ)


স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে রক্ত সম্পর্ক থাকতে পারে কিন্তু সেটা মোটেই দাম্পত্য সম্পর্কের মুখ্য কথা নয়। পারস্পরিক ভালবাসা, প্রেম ও প্রীতির সম্পর্কই হচ্ছে উক্ত বন্ধনের সফলতা এবং সার্থকতার মূল সূত্র। অকৃত্রিম প্রেম ও নিবিড় ভালবাসা আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর অপরিহার্য গুণ এবং অমূল্য ভূষণ।

যায়নাব (রাঃ) ও আবুল 'আস (রাঃ)- উভয়ের মধ্যে আমরা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই বাঞ্ছিত গুণের চমৎকার সমাবেশ দেখতে পাই।

বিভিন্ন ঘটনা ও আচরণে আমরা উভয়ের পারস্পরিক ভালবাসার গভীরতার পরিচয় লাভ করি। ধর্মে পৃথক পথ অবলম্বন এবং মুসলিম-কাফিরদের মধ্যে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও দুজনের কেউই তাদের দাম্পত্য বন্ধন ছিন্ন করতে প্রস্তুত নন বরং বন্ধন অটুট রাখতেই একান্ত অভিলাষী।

কুরাইশদের কতক লোক আবুল 'আসের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল যায়নাব (রাঃ)-কে তালাক দেয়ার জন্য। এমন কি তাঁর পরিবর্তে আবুল 'আসের পছন্দ মত কুরাইশদের যে কোন সুন্দরী মেয়েকে তার সাথে বিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও তারা প্রদান করে। কিন্তু আবুল 'আস তাদের সে প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে যায়নাবের প্রতি তার অটুট প্রেম ও গভীরতম ভালবাসার নির্ভুল প্রমাণ প্রদান করেন।

বদর যুদ্ধে পরাজিত কাফিরদের মধ্যে যারা বন্দী হয়ে মদীনায় নীত হয়, তাদের মধ্যে আবুল 'আসও ছিল অন্যতম। তার মুক্তিপণ রূপে যায়নাব (রাঃ) কর্তৃক তাঁর মাতৃপ্রদত্ত সোনার হার প্রেরণের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর স্বামী-অনুরাগের অতল গভীরতা এবং অত্যুজ্জ্বল ত্যাগের পরিচয় পাই।

পরবর্তী পর্যায়ে মদীনায় পিতৃগৃহে অবস্থান কালে পুনরায় বন্দী আবুল 'আসকে আশ্রয় প্রদান এবং দখলকৃত মালামাল সহ তাকে মুক্ত করে দেয়ার জন্য পিতার নিকট নির্ভর সুপারিশের মধ্যেও আমরা আবার আবুল 'আসের প্রতি যায়নাব (রাযিঃ)-এর অকৃত্রিম ভালবাসা ও অবিচ্ছিন্ন অনুরাগ দেখতে পাই যার শুভ পরিণতি ঘটে তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত পুনর্মিলনে।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 মাতারূপে যায়নাব (রাঃ)

📄 মাতারূপে যায়নাব (রাঃ)


পুত্র ও কন্যার প্রতি স্নেহানুরাগ, আন্তরিক মায়া এবং রোগ বিরোগে উদ্বেগ ও শোকাকুলতা মাতৃ হৃদয়ের এক স্বাভাবিক ব্যাপার ও সহজাত বৃত্তি। এ বৃত্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল যায়নাব (রাযিঃ)-এর মধ্যেও। তার কিঞ্চিৎ পরিচয় আমরা উপরে পেয়েছি। তথ্যের অভাবে পূর্ণ পরিচয় থেকে আমরা বঞ্চিত।

ইসলাম-প্রীতি, রাসূলপ্রীতি এবং পিতৃ অনুরাগের জন্যই তিনি কাফিরদের হাতে আঘাত প্রাপ্ত হন- সে আঘাতের প্রতিক্রিয়াতেই তাঁকে যুবতীকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়। যুবতী বয়সে একটি বিকাশোম্মুখ ফুল ঝরে পড়ায় আমরা তাঁর পূর্ণ সুবাস থেকে বঞ্চিত হলেও তাঁর জীবনী থেকে যতটুকু শিক্ষনীয় তাও নেহায়েত কম নয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে, বিশেষ করে আমাদের মা ও বোনদেরকে তাঁর মহৎ জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও প্রেরণা লাভের তাওফীক্ব প্রদান করুন-আমীন ॥

ফন্ট সাইজ
15px
17px