📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 স্বামীর মক্কায় একাকী জীবন

📄 স্বামীর মক্কায় একাকী জীবন


যায়নাব (রাঃ) মদীনায় পিত্রালয়ে বসবাস করতে লাগলেন। তাঁর স্বামী আবুল 'আস মক্কায় অবস্থান করে ব্যবসা বাণিজ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও সফল ব্যবসায়ী, অত্যন্ত কর্মঠ ও আমানতদার এবং বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। ব্যবসার দ্রব্য নিয়ে তিনি সিরিয়া প্রভৃতি স্থানে গমন করতেন। উল্লেখিত গুণের জন্যই অনেকে আবুল 'আসের মাধ্যমে তাদের পণ্য দ্রব্যাদি দেশ-বিদেশে কেনা বেচা করাত।

আবুল 'আস একাকী জীবন যাপন করে চললেন। মাঝে মাঝেই তাঁর সুন্দরী গুণবতী প্রিয়তমা স্ত্রী যায়নাব (রাঃ)-এর কথা মনে পড়ত। তাঁর বিরহ বেদনা তাকে বিষণ্ণ ও ব্যথিত করে তুলত, আর কবিতার আকারে তার বেদনা-ক্লিষ্ট মনের সেই আহাজারির অভিব্যক্তি ঘটত। এমন একটি কবিতার দুটি পঙ্কতি তাবাকাতের বরাতে বর্ণিত হয়েছে যার বাংলা অনুবাদ হচ্ছেঃ

"আমি যখন 'এরাম' নামক স্থানটি অতিক্রম করছিলাম, তখন যায়নাব (রাঃ) আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল আর তখনই আমার মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দু'আ উচ্চারিত হলঃ হে আল্লাহ তুমি রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখো তাকে (আমার প্রিয়তমা নারীকে) যে অবস্থান করছে (মদীনার) হরমে। আল-আমীন (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কন্যাটিকে তাঁর কল্যাণ কাজের জন্য পুরস্কৃত করুন, প্রত্যেক স্বামী প্রশংসা করে থাকে তাকে (তার গুণবতী স্ত্রীকে) যাকে সে উত্তম জানে।"

দিন বয়ে চলল এবং এক এক করে চার চারটি বৎসর অতিক্রান্ত হল। ইসলামের শক্তি বেড়ে চলল কিন্তু আবুল 'আস তখন পর্যন্ত ইসলাম কবুল করলেন না। কারণ একটিই: আল্লাহর হুকুম তখন পর্যন্ত হয়নি।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 যায়নাব স্বামীকে আশ্রয় দিলেন

📄 যায়নাব স্বামীকে আশ্রয় দিলেন


৬ষ্ঠ হিজরীতে সেই প্রত্যাশিত হুকুম এল, তিনি ইসলাম কবুল করলেন। কি ভাবে- সে কথাই নিম্নে বিবৃত হচ্ছে।

আবুল 'আস তার সঙ্গী-সাথী সহ বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে সিরিয়ায় গেলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত ১৭০ জনের একটি মুজাহিদ বাহিনীর সাথে তাদের মুকাবিলা হল। ছোটখাটো যুদ্ধের পর কাফিরগণ পরাজিত হয়ে বন্দী হল। তাদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের যে মালপত্র ছিল সবই মুসলমানদের হস্তগত হল। আবুল 'আস কিন্তু কৌশলে বন্দী দশা থেকে নিজেকে মুক্ত করে সোজা মদীনায় চলে আসলেন এবং এসেই তাঁর প্রাক্তন জীবন-সঙ্গিনী নবী-দুলালী যায়নাব (রাঃ)-এর আশ্রয় প্রার্থনা করলেন।

একদিকে ভূতপূর্ব স্ত্রীর নিকট আশ্রয় লাভের জন্য আবুল 'আস-এর করুণ মিনতি, অপর দিকে প্রাণ-প্রিয় পূর্ব স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য যায়নাব (রাঃ)-এর আকুল হৃদয়-কামনা; সহানুভূতি ও প্রেমের স্মৃতি এই দুই দাবী উপেক্ষা করা যায়নাব (রাঃ)-এর মত খোলামন ও প্রেমময়ী নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি আবুল 'আসকে আশ্রয় দিলেন। প্রত্যুষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ফজরের নামায পড়ছিলেন তখন (কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে যে, নামায থেকে ফারিগ হয়েছেন এমন সময়) যায়নাব (রাঃ) সাহস সঞ্চয় করে সুমধুর মৃদু আওয়াযে ঘোষণা করলেন: "ইন্নী ক্বাদ আজারতু আবাল 'আস।" "আমি আবুল 'আসকে আশ্রয় প্রদান করেছি।"

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যার সুমধুর কণ্ঠে উচ্চারিত এই ছোট্ট ঘোষণা শুনলেন। তিনি নামায শেষ করেই সাহাবাদের (রাঃ) লক্ষ্য করে বললেন: "হে লোকসকল! তোমরা কি কিছু শুনতে পেয়েছ? তারা সমস্বরে বললেন: জি হ্যাঁ, আমরা শুনতে পেয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমালেন, কসম সেই আল্লাহর যার হাতে আমার জীবন। গায়িবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, অন্য কেউ এর অধিকারী নয়, আমিও নই। সত্যই যায়নাবের (রাঃ) এই ঘোষণার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমিও জানতাম না যে, আবুল 'আস যায়নাবের (রাঃ) আশ্রয়ে আছে। তারপর তিনি বললেন: যদি সাধারণ একজন মুসলমানও কাউকে আশ্রয় দেয়, তা হলে সমস্ত মুসলমানের (তথা সরকারের) উচিত তা রক্ষা করা।

এরপর তিনি যায়নাব (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং বললেন: বেটী! আবুল 'আসের প্রতি যথারীতি লক্ষ্য রাখবে, তার যেন কোনরূপ কষ্ট না হয়, তার আদর যত্নের যেন কোন ত্রুটি না ঘটে, তবে তুমি তার থেকে অবশ্য নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবে। আবুল 'আসের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সহৃদয় ও নমনীয় মনোভাব দর্শনে যায়নাব (রাঃ) উৎসাহিত হয়ে উঠলেন এবং আবুল 'আসের জন্য একটি বড় রকম সুপারিশ জানালেন। যায়নাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আবুল 'আসের আটককৃত মালামালসহ তাকে মুক্ত করে দেয়ার অনুরোধ জানালেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন: হে আমার স্নেহময়ী কন্যা! এ ব্যাপারটি আমার একার ফায়সালার বিষয় নয়, এটা সমগ্র মুসলিম জামা'আতের এখতিয়ারভুক্ত। তারা যদি রাযী হয় উত্তম, না হলে আমার করার কিছু নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে (রাঃ) ডেকে বললেন: দেখ! আমার এবং আবুল 'আসের মধ্যে যে সম্পর্ক তা তোমরা সবাই জান, এবারও যদি তোমরা আবুল 'আসকে তার মালামালসহ- যা তোমরা গনীমাতরূপে পেয়েছ, মুক্তি প্রদান কর তবে তা আমার পক্ষে হবে খুবই খুশীর কারণ। তা ছাড়া এর জন্য তোমাদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে (যার ফল হবে অত্যন্ত শুভ)। তবে এ ব্যাপারে আমি তোমাদের বাধ্য করছি না। তোমরা নিজেরা বিবেচনা করে দেখ।

সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইচ্ছা এবং তাঁর খুশীর কারণ পূরণ না করে তাঁর বিরোধিতা করবেন- এমনটি হতেই পারে না। তারা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। সুতরাং তারা তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন এবং গনীমাতের মালগুলো এনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে হাজির করলেন।

আবুল 'আস মুক্তি পেলেন এবং অপ্রত্যাশিত ভাবে তাঁর ব্যবসার সমস্ত দ্রব্য সম্ভারও পেলেন। ফের তাঁর প্রতি যায়নাব (রাঃ)-এর আকর্ষণ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার জন্য সুপারিশ আর তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্নেহপূর্ণ ব্যবহার ও দয়ার্দ্র আচরণ তাঁকে অভিভূত করে তুলল। এর ভিতর দিয়ে ইসলামের মহান নীতি ও উদার আদর্শ তাঁর নিকট দিবালোকের ন্যায় প্রতিভাত হয়ে উঠলো। তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কিন্তু একটি বিশেষ বিবেচনায় তিনি তখন ইসলামে দীক্ষিত হলেন না। সেটা কী তা একটু পরেই জানা যাবে। অবশেষে স্বামী ইসলাম গ্রহণ করলেন।

আবুল 'আস তার মালপত্র নিয়ে নিরাপদে মক্কায় ফিরে এলেন। তাঁর নিকট মক্কার কুরাইশদের অনেকের অনেক টাকা পয়সা ও দ্রব্যাদি গচ্ছিত ছিল। তিনি মক্কায় ফিরে এসেই প্রত্যেককে যার যার গচ্ছিত টাকা কড়ি ও দ্রব্যাদি বুঝিয়ে দিলেন। তারপর কুরাইশদের একত্রে ডেকে তাদের লক্ষ্য করে বললেন: এখন আমার নিকট তোমাদের কারও কোন দেনা পাওনা নেই তো? সকলেই বললেন- না, কারও কোন কিছুই পাওনা নেই। তুমি প্রত্যেকের প্রাপ্য পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছ। তুমি একজন দায়িত্বসম্পন্ন, কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।

আবুল 'আস তখন বললেন: তোমরা এখন শুন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনঃ আমি এখনই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছি। এই কথা বলেই তিনি সকলের সম্মুখে সুউচ্চ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন: "আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ।" আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত পক্ষে অন্য কোন উপাস্য নাই, তিনি এক ও একক, তাঁর কোনই শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দাস এবং রাসূল।

কাফিররা তার ইসলাম গ্রহণের কথা এবং ঘোষণা শুনে হতভম্ভ ও স্তম্ভিত হয়ে গেল। তিনি তাঁদের লক্ষ্য করে আরও বললেন: আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে তাঁর কন্যার আশ্রয়ে যখন অবস্থান করছিলাম তখনই ইসলাম কবুল করতাম। করিনি শুধু একটি কারণে আর তা হচ্ছে এই যে, তোমরা হয়ত ভাবতে যে, তোমাদের গচ্ছিত অর্থ ও দ্রব্যাদি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই আমি ইসলাম কবুল করেছি। এ ভ্রান্ত ধারণা যাতে আদৌ সৃষ্টি না হতে পারে, সেজন্যই আমি তোমাদের গচ্ছিত সব কিছু প্রত্যার্পণ করে তারপর ইসলাম কবূল করলাম।

সপ্তম হিজরীর মুহাররাম মাসের ঘটনা এটি। এর পরপরই আবুল 'আস মক্কা-মুয়ায্যমা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারায় তাশরীফ নিয়ে গেলেন। আবুল 'আস মদীনায় পৌঁছে সোজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কথা বিবৃত করলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কৌতুহলের সাথে জিজ্ঞেস করলেন: আবুল 'আস! তুমি যখন বন্দী অবস্থায় এখানে অবস্থান করছিলে এবং যখন তোমাকে তোমার মালসহ মুক্ত করে দেয়া হল তখন তুমি কেন ইসলাম কবুল করলে না? আবুল 'আস আরয করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মনে মনে তখনই ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু মুখে কালিমায়ি শাহাদাত শুধু এ জন্যই উচ্চারণ করিনি যে, লোকে এই বলে অভিযোগ দিবে যে, ভয়ে ভীত হয়ে এবং মাল ফেরত পাওয়ার লোভে আমি ইসলাম কবুল করেছি। আবুল 'আসের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদে মদীনার মুসলমানদের মনে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 যায়নাবের শিশু সন্তানের ইন্তিকাল

📄 যায়নাবের শিশু সন্তানের ইন্তিকাল


আবুল 'আস ইসলাম কবুল করার পর যায়নাব (রাঃ)-এর সাথে তার পুনর্মিলনের বাধা অপসারিত হল। দীর্ঘ ছয় বৎসরের বিচ্ছেদ বেদনা এবং দুঃসহ বিরহ যাতনা ভোগের পর স্বামী-স্ত্রীর একান্ত বাঞ্ছিত মিলন ঘটল।

মনে হয় আবুল 'আস ও যায়নাব (রাঃ) দম্পতির জন্য নিকটেই কোন বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার সানন্দে তাঁর প্রিয়তমা কন্যা যায়নাব (রাঃ)-কে অনুমতি দান করলেন। স্বামী-স্ত্রী নতুন করে সুখের নীড় রচনায় মনোনিবেশ করলেন। সে নীড় রচিত হল এবং দুই অথবা তিনটি সন্তান সহ তাঁরা সেই সুখের সংসারে সন্তোষ-ধন্য জীবন যাপন শুরু করলেন।

কিন্তু খুব বেশী দিন এ সুখ স্থায়ী হতে পারল না। প্রথমে তাদের একটি সন্তান আল্লাহর আহ্বানে এ অস্থায়ী জগত থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করল। সহীহ বুখারীতে উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে- তিনি বলেন- আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে বসে আছি এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক কন্যার খাদিম এসে খবর দিলো যে, তার মনিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডেকে পাঠিয়েছেন। কেননা তার সন্তান মৃত্যু শয্যায় শায়িত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে পাঠালেন, যাও গিয়ে কন্যাকে বলো: ইন্না লিল্লাহি মা আখাযা ওয়া লাহু মা আ'তা ওয়া কুলু শায়য়িন ইন্দাহু বিআজালিম মুসাম্মা। "আল্লাহ যা ফিরিয়ে নেন তা অবশ্যই তাঁর এবং যা তিনি প্রদান করেন তাও তাঁরই, আর প্রত্যেক বস্তুর নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত হয়ে আছে তাঁর নিকট।" "কন্যাকে একথাও বলে দিওঃ সে যেন সবর করে এবং ধৈর্য ধারণ করে চলে।"

খাদিম চলে যায়। কিন্তু আবার ফিরে আসে। এসে বলে: তিনি আল্লাহর কসম দিয়ে বলেছেন যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই তাশরীফ নিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন না গিয়ে পারলেন না। তাঁর সাথে গমন করেন সা'দ ইবনু উবাদা (রাঃ) এবং মা'আয ইবনু জাবাল (রাঃ)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সেই শিশুটিকে দেখান হল, তখন তার শেষ অবস্থা। নিশ্বাস প্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে, নাড়ির গতি থেমে যাচ্ছে, ঢেকুর বেড়ে চলেছে.........।

আল্লামা কাজী সুলাইমান মনসুরপুরী (রঃ) তাঁর বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ 'রাহমাতুললিল আলামীন' দ্বিতীয় খণ্ড ৯৮ পৃষ্ঠায় এই হাদীসের উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন, খুব সম্ভব এই শিশুটি ছিল আলী (সাবতির রাসূল) ইবনু আবিল 'আস। কিন্তু পরবর্তী পর্যালোচনায় জানা যাবে যায়নাব (রাঃ)-এর প্রথম পুত্র আলীর মৃত্যু আরও পরের ঘটনা।

উপরোক্ত ঘটনাটি আরও একটু বিস্তারিত ভাবে বর্ণিত হয়েছে। আমরা নিম্নে তার অনুবাদ পেশ করছি:

যায়নাবের একটি শিশু সন্তান ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্বল্পায়ু করেছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অবস্থা যখন সংগীন হয়ে উঠল এবং মৃত্যুর আশঙ্কা নিশ্চিতরূপে দেখা দিল, তখন যায়নাব (রাঃ) তাঁর পিতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সংবাদ দিয়ে তাঁর আদুরে নাতীকে দেখে যাওয়ার জন্য ডেকে পাঠালেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন শিশুর অন্তিম মুহূর্ত অতি নিকটে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ার্দ্র হৃদয় এবং করুণাপ্রবণ। শিশুদের অস্থিরতা, অস্বস্তি এবং কষ্ট যাতনা দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত ও বিচলিত হয়ে পড়তেন। এ জন্যই প্রথমে তিনি তথায় যেতে ইতস্ততঃ করছিলেন। কিন্তু স্নেহের মেয়ে পুনরায় যখন আল্লাহর কসম দিয়ে ডেকে পাঠালেন তখন তিনি আর সে ডাক উপেক্ষা করতে পারলেন না। দৌহিত্রকে তিনি দেখতে গেলেন। যায়নাব মুমূর্ষু শিশুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোলে দিলেন। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই রুগ্ন শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়েছেন তখন শিশুটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানী চেহারার প্রতি নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু-পূর্ব হেচকী শুরু হয়ে গেল।

কোলের উপর এবং চোখের সামনে এই বিদায় দৃশ্য অবলোকন করে তাঁর কোমল হৃদয় বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু-ধারা ঝড়ে পড়তে লাগল। একজন সাহাবা বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! কী আশ্চর্য, আপনিও কাঁদছেন? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এ হচ্ছে আমার প্রিয় কন্যার প্রিয় সন্তান, তাঁর মৃত্যুতে ব্যথিত হৃদয়ের শোকাবেগে চক্ষু দিয়ে অশ্রু-ধারা নির্গত হওয়া কোন দোষের কথা নয়। (অবশ্য চিৎকার করে কান্না কাটি করা দূষণীয়)

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 যায়নাব (রাঃ)-এর ইন্তিকাল

📄 যায়নাব (রাঃ)-এর ইন্তিকাল


'আবুল 'আস-এর সাথে পুনর্মিলনের মাত্র বৎসরাধিক কাল পর ৮ম হিজরীর কোন এক সময় স্বয়ং যায়নাব (রাঃ) ইহজগত থেকে মাত্র ৩১ বৎসর বয়সে চির বিদায় গ্রহণ করলেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)

মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় মক্কার এক কাফিরের বর্শা দ্বারা আক্রান্ত হয়ে উটের পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যাওয়ার কারণে তাঁর যে গর্ভপাত ঘটে যায় সেই আঘাত এবং গর্ভপাত জনিত রক্তক্ষরণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেননি। পুনঃ পুনঃ রোগের আবির্ভাব ঘটতে থাকে, অবশেষে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে ও রোগ তীব্রতর হয়ে উঠে এবং তিনি আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর অনন্ত সান্নিধ্যে প্রস্থান করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)

এর চার বৎসর পর ১২ হিজরীর যিল-হজ্ব মাসে আবুল 'আসও (রাঃ) পরলোক গমন করেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px