📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 মুক্তি যেভাবে পেলেন

📄 মুক্তি যেভাবে পেলেন


অর্থের বিনিময়ে মুক্তিকামী বন্দীদের অর্থ আসল মক্কা থেকে। বিরহ বেদনা কাতর যায়নাব (রাঃ) স্বামীর মুক্তিপণ স্বরূপ আপন দেবর 'আমর ইবনু রবীকে তাঁর সেই হার ছড়াটি দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন- যে হারটি তাঁর মাতা খাদীজা (রাঃ) তাঁর বিয়েতে উপহার স্বরূপ প্রদান করেছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই হারটি দেখেই চিনতে পারলেন এবং চমকিত হলেন। প্রিয়তমা সহধর্মিনী ও সহমর্মিণী খাদীজার (রাঃ) উপহার দেয়া সেই হারটি থেকে কন্যাকে বঞ্চিত করতে তাঁর কোমল প্রাণে আঁচড় কাটল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাহাবীদের (রাঃ) অনুমতি ছাড়া তিনি নিজে থেকে কিছুই বললেন না।

সাহাবীদের ডেকে তিনি বললেন, তোমাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে এবং যদি সম্ভব মনে কর, তা হলে এই হারের বিনিময় ছাড়াই তোমরা আবুল 'আসকে মুক্তি প্রদান করতে পার।

ইসলামের জন্য খাদীজার (রাঃ) অতুল্য ত্যাগ এবং অনুপম খিদমতের কথা স্মরণ করে আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মানসিক অবস্থা দর্শনে এমন কে আছে যে বিরূপ অভিমত ব্যক্ত করতে পারে? তারা সবাই সানন্দে এবং এক বাক্যে সম্মতি দিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু বিনা শর্তে আবুল 'আসকে মুক্তি দিলেন না। তিনি একটি শর্ত আরোপ করলেন। শর্তটি হচ্ছে এই যে, আবুল 'আস মক্কায় ফিরে গিয়েই যায়নাবকে (রাঃ) মদীনায় পিতার নিকট ফেরত পাঠিয়ে দেবে। আবুল 'আস এই শর্ত মেনে নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন এবং এসেই যায়নাব (রাঃ)-এর মদীনায় প্রেরণের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু সহজে এবং সুস্থ দেহে যায়নাব (রাঃ)-এর পক্ষে মদীনায় পিত্রালয়ে পৌঁছা সম্ভব হয়নি।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 মদীনায় হিজরতের পথে বাধা

📄 মদীনায় হিজরতের পথে বাধা


মদীনার পথে রওয়ানা হওয়ার পর মক্কার অদূরে যে অপ্রীতিকর ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে যায়নাব (রাঃ) মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য হন অতঃপর সেই মর্মস্পর্শী ও হৃদয়-বিদারক ঘটনাটি বিবৃত হচ্ছে।

যায়নাব (রাঃ)-কে মক্কা থেকে মদীনায় নিয়ে আসার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল 'আসের সাথে তাঁর পালিত পুত্র এবং বিশ্বস্ত অনুচর যায়িদ ইবনু হারিসাকে (রাঃ) পাঠিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে এই নির্দেশ প্রদান করলেনঃ "তুমি 'বানি ইয়াজুজ' নামক স্থানে অপেক্ষা করতে থাকবে। যখন যায়নাব (রাঃ) সেখানে পৌঁছে যাবে তখন তাকে তুমি সাথে করে মদীনায় নিয়ে আসবে।” যায়িদ (রাঃ) যথাসময় সেখানে পৌঁছে অধীর আগ্রহে যায়নাব (রাঃ)-এর আগমন প্রত্যাশায় প্রতীক্ষা করে চললেন।

এদিকে আবুল 'আস মক্কায় এসে প্রতিশ্রুতি অনুসারে স্বীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা কেনানার সাথে যায়নাব (রাঃ)-কে 'বাতনি ইয়াজুজ' পর্যন্ত পৌঁছে দেবার নির্দেশ প্রদান করলেন।

যায়নাব গোপনে গোপনে মক্কা ত্যাগের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। কিন্তু তবুও কথা গোপন থাকল না। যায়নাবের (রাঃ) মক্কা ত্যাগের আয়োজনের কথা জানাজানি হয়ে গেল এবং এ নিয়ে এক মিশ্র REACTIONS এর সৃষ্টি হল। কেউ কেউ ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। কিন্তু কুট বুদ্ধি সম্পন্ন কিছু সংখ্যক লোক যাত্রা পথে বিঘ্ন সৃষ্টির জন্য ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিলো।

যায়নাব (রাঃ) কিছু দিন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন। অবশেষে অবস্থা কিছুটা অনুকূল ভেবে আল্লাহর উপর ভরসা করে দেবর কেনানাকে সাথে নিয়ে উটের পিঠে আরোহণ করে মদীনার পথে রওয়ানা হলেন।

কাফিররা এ সংবাদ যথাসময়ে জানতে পারল। কিছু সংখ্যক লোক উত্তেজনার বশে প্রতিরোধ সৃষ্টি এবং যায়নাব (রাঃ)-কে গ্রেফতারের জন্য বেরিয়ে পড়ল। এই দলে ছিল হোব্বার ইবনু আসওয়াদ নামে এক নিষ্ঠুর প্রকৃতির যুবক। এ ছিল খাদীজা (রাঃ)-এর চাচাত ভাই এর পুত্র এবং সেই সূত্রে যায়নাবের (রাঃ) রক্ত সম্পর্কীয় ভাই। কাফিররা 'যি-তুয়া' নামক স্থানে উটসহ যায়নাব (রাঃ) ও কেনানাকে ঘিরে ফেলল। তারা তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে চলল, বর্শা দ্বারাও আঘাত হানল। বর্শার এক আঘাতে যায়নাব (রাঃ)-এর উট মারাত্মক ভাবে আহত হল। কোন কোন বর্ণনায় যায়নাব (রাঃ)-এর পবিত্র দেহও তীর বর্শার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হল।

সর্বসম্মত মতে যায়নাব (রাঃ) উট থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন। এই সময় তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। পতন জনিত প্রচণ্ড আঘাতে তাঁর গর্ভপাত ঘটে গেল। তখন তাঁর অবস্থা অত্যন্ত করুণ এবং হৃদয়বিদারক। এই অবস্থায় কাফিরগণ রক্তরঞ্জিত যায়নাবকে (রাঃ) অধিকতর শাস্তিদানের উদ্দেশ্যে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। যায়নাবের দেবর কেনানা এবার জীবনপণ করে প্রতিরোধে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি তার তীরদানী থেকে তীর বের করে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “থামো। এখন যে কেউ এক পদ আমাদের দিকে অগ্রসর হবে তাকেই এই তীরের শিকারে পরিণত হতে হবে।” কেনানার উগ্রমূর্তি দেখে কাফিরগণ হিম্মত হারিয়ে ফেলল, তারা সেখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। এই সময় কুরাইশ সরদার আবু সুফিয়ানের তথায় আগমন ঘটল। তিনি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কেনানাকে লক্ষ্য করে বললেন : “তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। তুমি তোমার উদ্যত তীরটা সরিয়ে নাও, আমরা তোমার সাথে কিছু কথা বলে নেই।” কেনানা তীর বন্ধ করে বললেন- কি বলবার আছে তাড়াতাড়ি বলুন। আবু সুফিয়ান তখন বললেন : “কেনানা! তোমার তো অজানা নেই- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কী নিয়ে আমাদের বিরোধ। তাঁর হাতে আমাদের পরাজয় এবং বিপর্যয় ঘটছে এবং তার ফলে যে অবমাননা আমাদের বরদাশত করতে হয়েছে সে সম্পর্কেও তুমি ওয়াকিফহাল। যদি মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মেয়েকে মদীনায় যেতে দিই তা হলে লোকে ভাববে আমরা বড় দুর্বল হয়ে পড়েছি। আমাদের মধ্যে নানারূপ কথা উঠবে এবং একটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। কাজেই তুমি এখন যায়নাব (রাঃ)-কে নিয়ে মক্কায় ফিরে চল। উত্তেজনা কমে গেলে এবং অবস্থা কিছুটা শান্ত হলে তাঁকে সুযোগমত নির্বিঘ্নে মদীনায় পৌঁছিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে।"

কেনানা আবু সুফিয়ানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং যায়নাব (রাঃ)-এর আঘাতজনিত অবস্থা ও পরিস্থিতির বিষয় বিবেচনা করে আপাতত মক্কায় ফিরে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত মনে করলেন।

আহত ও অসুস্থ যায়নাব (রাঃ) মক্কায় ফিরে গেলেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলেন। অতঃপর অবস্থা বুঝে কেনানা তার ভ্রাতৃবধূ যায়নাব (রাঃ)-কে নিয়ে পুনরায় মদীনার পথে রওয়ানা হলেন। 'বানি ইয়াজুজ' উপত্যকায় পৌঁছে তথায় অপেক্ষারত যায়েদ ইবনু হারিসার (রাঃ) হাতে যায়নাব (রাঃ)-কে সোপর্দ করে তিনি মক্কায় ফিরে এলেন।

যায়িদ (রাঃ) নবী-নন্দিনী যায়নাব (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে যথা সময় মদীনায় পৌঁছলেন এবং সসম্মানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে তাঁর আদরের দুলালীকে অপর্ণ করলেন।

স্নেহময়ী কন্যার নিকট তাঁর মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা শুনে দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। নবী সহধর্মিণী আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) বর্ণনা করেন: এই সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত দুর্ঘটনার কথা শুনে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলে উঠেন: "আফসোস! আমার কন্যা যায়নাব আমার সব কন্যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ- আর তাকেই শুধু আমার প্রতি তাঁর ভালবাসার কারণে কাফিরদের হাতে এরূপ কষ্ট ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হল।"

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 স্বামীর মক্কায় একাকী জীবন

📄 স্বামীর মক্কায় একাকী জীবন


যায়নাব (রাঃ) মদীনায় পিত্রালয়ে বসবাস করতে লাগলেন। তাঁর স্বামী আবুল 'আস মক্কায় অবস্থান করে ব্যবসা বাণিজ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও সফল ব্যবসায়ী, অত্যন্ত কর্মঠ ও আমানতদার এবং বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। ব্যবসার দ্রব্য নিয়ে তিনি সিরিয়া প্রভৃতি স্থানে গমন করতেন। উল্লেখিত গুণের জন্যই অনেকে আবুল 'আসের মাধ্যমে তাদের পণ্য দ্রব্যাদি দেশ-বিদেশে কেনা বেচা করাত।

আবুল 'আস একাকী জীবন যাপন করে চললেন। মাঝে মাঝেই তাঁর সুন্দরী গুণবতী প্রিয়তমা স্ত্রী যায়নাব (রাঃ)-এর কথা মনে পড়ত। তাঁর বিরহ বেদনা তাকে বিষণ্ণ ও ব্যথিত করে তুলত, আর কবিতার আকারে তার বেদনা-ক্লিষ্ট মনের সেই আহাজারির অভিব্যক্তি ঘটত। এমন একটি কবিতার দুটি পঙ্কতি তাবাকাতের বরাতে বর্ণিত হয়েছে যার বাংলা অনুবাদ হচ্ছেঃ

"আমি যখন 'এরাম' নামক স্থানটি অতিক্রম করছিলাম, তখন যায়নাব (রাঃ) আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল আর তখনই আমার মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দু'আ উচ্চারিত হলঃ হে আল্লাহ তুমি রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখো তাকে (আমার প্রিয়তমা নারীকে) যে অবস্থান করছে (মদীনার) হরমে। আল-আমীন (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কন্যাটিকে তাঁর কল্যাণ কাজের জন্য পুরস্কৃত করুন, প্রত্যেক স্বামী প্রশংসা করে থাকে তাকে (তার গুণবতী স্ত্রীকে) যাকে সে উত্তম জানে।"

দিন বয়ে চলল এবং এক এক করে চার চারটি বৎসর অতিক্রান্ত হল। ইসলামের শক্তি বেড়ে চলল কিন্তু আবুল 'আস তখন পর্যন্ত ইসলাম কবুল করলেন না। কারণ একটিই: আল্লাহর হুকুম তখন পর্যন্ত হয়নি।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 যায়নাব স্বামীকে আশ্রয় দিলেন

📄 যায়নাব স্বামীকে আশ্রয় দিলেন


৬ষ্ঠ হিজরীতে সেই প্রত্যাশিত হুকুম এল, তিনি ইসলাম কবুল করলেন। কি ভাবে- সে কথাই নিম্নে বিবৃত হচ্ছে।

আবুল 'আস তার সঙ্গী-সাথী সহ বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে সিরিয়ায় গেলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত ১৭০ জনের একটি মুজাহিদ বাহিনীর সাথে তাদের মুকাবিলা হল। ছোটখাটো যুদ্ধের পর কাফিরগণ পরাজিত হয়ে বন্দী হল। তাদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের যে মালপত্র ছিল সবই মুসলমানদের হস্তগত হল। আবুল 'আস কিন্তু কৌশলে বন্দী দশা থেকে নিজেকে মুক্ত করে সোজা মদীনায় চলে আসলেন এবং এসেই তাঁর প্রাক্তন জীবন-সঙ্গিনী নবী-দুলালী যায়নাব (রাঃ)-এর আশ্রয় প্রার্থনা করলেন।

একদিকে ভূতপূর্ব স্ত্রীর নিকট আশ্রয় লাভের জন্য আবুল 'আস-এর করুণ মিনতি, অপর দিকে প্রাণ-প্রিয় পূর্ব স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য যায়নাব (রাঃ)-এর আকুল হৃদয়-কামনা; সহানুভূতি ও প্রেমের স্মৃতি এই দুই দাবী উপেক্ষা করা যায়নাব (রাঃ)-এর মত খোলামন ও প্রেমময়ী নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি আবুল 'আসকে আশ্রয় দিলেন। প্রত্যুষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ফজরের নামায পড়ছিলেন তখন (কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে যে, নামায থেকে ফারিগ হয়েছেন এমন সময়) যায়নাব (রাঃ) সাহস সঞ্চয় করে সুমধুর মৃদু আওয়াযে ঘোষণা করলেন: "ইন্নী ক্বাদ আজারতু আবাল 'আস।" "আমি আবুল 'আসকে আশ্রয় প্রদান করেছি।"

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যার সুমধুর কণ্ঠে উচ্চারিত এই ছোট্ট ঘোষণা শুনলেন। তিনি নামায শেষ করেই সাহাবাদের (রাঃ) লক্ষ্য করে বললেন: "হে লোকসকল! তোমরা কি কিছু শুনতে পেয়েছ? তারা সমস্বরে বললেন: জি হ্যাঁ, আমরা শুনতে পেয়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমালেন, কসম সেই আল্লাহর যার হাতে আমার জীবন। গায়িবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, অন্য কেউ এর অধিকারী নয়, আমিও নই। সত্যই যায়নাবের (রাঃ) এই ঘোষণার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমিও জানতাম না যে, আবুল 'আস যায়নাবের (রাঃ) আশ্রয়ে আছে। তারপর তিনি বললেন: যদি সাধারণ একজন মুসলমানও কাউকে আশ্রয় দেয়, তা হলে সমস্ত মুসলমানের (তথা সরকারের) উচিত তা রক্ষা করা।

এরপর তিনি যায়নাব (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং বললেন: বেটী! আবুল 'আসের প্রতি যথারীতি লক্ষ্য রাখবে, তার যেন কোনরূপ কষ্ট না হয়, তার আদর যত্নের যেন কোন ত্রুটি না ঘটে, তবে তুমি তার থেকে অবশ্য নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করবে। আবুল 'আসের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সহৃদয় ও নমনীয় মনোভাব দর্শনে যায়নাব (রাঃ) উৎসাহিত হয়ে উঠলেন এবং আবুল 'আসের জন্য একটি বড় রকম সুপারিশ জানালেন। যায়নাব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আবুল 'আসের আটককৃত মালামালসহ তাকে মুক্ত করে দেয়ার অনুরোধ জানালেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন: হে আমার স্নেহময়ী কন্যা! এ ব্যাপারটি আমার একার ফায়সালার বিষয় নয়, এটা সমগ্র মুসলিম জামা'আতের এখতিয়ারভুক্ত। তারা যদি রাযী হয় উত্তম, না হলে আমার করার কিছু নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে (রাঃ) ডেকে বললেন: দেখ! আমার এবং আবুল 'আসের মধ্যে যে সম্পর্ক তা তোমরা সবাই জান, এবারও যদি তোমরা আবুল 'আসকে তার মালামালসহ- যা তোমরা গনীমাতরূপে পেয়েছ, মুক্তি প্রদান কর তবে তা আমার পক্ষে হবে খুবই খুশীর কারণ। তা ছাড়া এর জন্য তোমাদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে (যার ফল হবে অত্যন্ত শুভ)। তবে এ ব্যাপারে আমি তোমাদের বাধ্য করছি না। তোমরা নিজেরা বিবেচনা করে দেখ।

সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইচ্ছা এবং তাঁর খুশীর কারণ পূরণ না করে তাঁর বিরোধিতা করবেন- এমনটি হতেই পারে না। তারা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। সুতরাং তারা তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন এবং গনীমাতের মালগুলো এনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে হাজির করলেন।

আবুল 'আস মুক্তি পেলেন এবং অপ্রত্যাশিত ভাবে তাঁর ব্যবসার সমস্ত দ্রব্য সম্ভারও পেলেন। ফের তাঁর প্রতি যায়নাব (রাঃ)-এর আকর্ষণ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার জন্য সুপারিশ আর তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্নেহপূর্ণ ব্যবহার ও দয়ার্দ্র আচরণ তাঁকে অভিভূত করে তুলল। এর ভিতর দিয়ে ইসলামের মহান নীতি ও উদার আদর্শ তাঁর নিকট দিবালোকের ন্যায় প্রতিভাত হয়ে উঠলো। তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কিন্তু একটি বিশেষ বিবেচনায় তিনি তখন ইসলামে দীক্ষিত হলেন না। সেটা কী তা একটু পরেই জানা যাবে। অবশেষে স্বামী ইসলাম গ্রহণ করলেন।

আবুল 'আস তার মালপত্র নিয়ে নিরাপদে মক্কায় ফিরে এলেন। তাঁর নিকট মক্কার কুরাইশদের অনেকের অনেক টাকা পয়সা ও দ্রব্যাদি গচ্ছিত ছিল। তিনি মক্কায় ফিরে এসেই প্রত্যেককে যার যার গচ্ছিত টাকা কড়ি ও দ্রব্যাদি বুঝিয়ে দিলেন। তারপর কুরাইশদের একত্রে ডেকে তাদের লক্ষ্য করে বললেন: এখন আমার নিকট তোমাদের কারও কোন দেনা পাওনা নেই তো? সকলেই বললেন- না, কারও কোন কিছুই পাওনা নেই। তুমি প্রত্যেকের প্রাপ্য পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছ। তুমি একজন দায়িত্বসম্পন্ন, কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।

আবুল 'আস তখন বললেন: তোমরা এখন শুন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনঃ আমি এখনই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছি। এই কথা বলেই তিনি সকলের সম্মুখে সুউচ্চ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন: "আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ।" আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত পক্ষে অন্য কোন উপাস্য নাই, তিনি এক ও একক, তাঁর কোনই শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দাস এবং রাসূল।

কাফিররা তার ইসলাম গ্রহণের কথা এবং ঘোষণা শুনে হতভম্ভ ও স্তম্ভিত হয়ে গেল। তিনি তাঁদের লক্ষ্য করে আরও বললেন: আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে তাঁর কন্যার আশ্রয়ে যখন অবস্থান করছিলাম তখনই ইসলাম কবুল করতাম। করিনি শুধু একটি কারণে আর তা হচ্ছে এই যে, তোমরা হয়ত ভাবতে যে, তোমাদের গচ্ছিত অর্থ ও দ্রব্যাদি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই আমি ইসলাম কবুল করেছি। এ ভ্রান্ত ধারণা যাতে আদৌ সৃষ্টি না হতে পারে, সেজন্যই আমি তোমাদের গচ্ছিত সব কিছু প্রত্যার্পণ করে তারপর ইসলাম কবূল করলাম।

সপ্তম হিজরীর মুহাররাম মাসের ঘটনা এটি। এর পরপরই আবুল 'আস মক্কা-মুয়ায্যমা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারায় তাশরীফ নিয়ে গেলেন। আবুল 'আস মদীনায় পৌঁছে সোজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাযির হলেন এবং তাঁর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কথা বিবৃত করলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কৌতুহলের সাথে জিজ্ঞেস করলেন: আবুল 'আস! তুমি যখন বন্দী অবস্থায় এখানে অবস্থান করছিলে এবং যখন তোমাকে তোমার মালসহ মুক্ত করে দেয়া হল তখন তুমি কেন ইসলাম কবুল করলে না? আবুল 'আস আরয করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মনে মনে তখনই ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু মুখে কালিমায়ি শাহাদাত শুধু এ জন্যই উচ্চারণ করিনি যে, লোকে এই বলে অভিযোগ দিবে যে, ভয়ে ভীত হয়ে এবং মাল ফেরত পাওয়ার লোভে আমি ইসলাম কবুল করেছি। আবুল 'আসের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদে মদীনার মুসলমানদের মনে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px