📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 দাওআতের কাজে সহযোগিতা

📄 দাওআতের কাজে সহযোগিতা


রাসূলুল্লাহ -এর নিজ বংশ এবং নিজ গোত্রে সে কুরাইশদের- যারা আল্লাহর একত্ববাদের কথা ভুলে গিয়ে শির্ক তথা পুতুল পূজার গুমরাহীতে লিপ্ত ছিল তাদেরকে- সত্য পথের সন্ধান দিলেন। ভ্রান্ত পথে চলার পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করলেন এবং এক আল্লাহর স্বরূপ তুলে ধরলেন। তিনি তাদের ডাক দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:

"হে লোক সকল! তোমরা শুনে রাখ, আল্লাহ এক, তাঁর কোনই শারীক নেই। তিনিই বিশ্ব জগতের খালিক ও মালিক- স্রষ্টা ও অধিশ্বর। তিনিই মানুষ এবং অন্য সব সৃষ্টবস্তুর অভাবমোচক- দুঃখ-কষ্টের অপসারক এবং বিপদউত্তারক। অতএব তোমরা একমাত্র তাঁরই 'ইবাদাত-বন্দেগী কর, তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। নিজ হস্তে তৈরী মূর্তিগুলোকে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী এবং সাহায্যকারী ভেবো না। আল্লাহকে ভয় এবং সমীহ করে চল আর গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা কর। অন্যথায় ক্বিয়ামাতের ভয়াবহ দিবসে তিনি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।"

এই ছিল সেই বাণী যা শুনে মক্কার অধিবাসীগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। এ ধরনের বাণী যতই তারা শুনতে লাগল ততই তাদের উত্তেজনা ও ক্ষিপ্ততা বেড়ে চলল। যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাদের নিকট আদর্শ-চরিত্র ও বিশ্বস্ততম ব্যক্তি তিনি হয়ে উঠলেন তাদের সবচেয়ে অপ্রিয় ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তি- ঘোরতর শত্রু। তারা তাঁর প্রতি ও তাঁর মুষ্টিমেয় অনুসারীদের প্রতি অকথ্য অত্যাচার উৎপীড়ন শুরু করে দিল। তিনি যে পথ দিয়ে চলাফেরা করতেন সে পথেই কাফিররা কাঁটা ছড়িয়ে রাখত। তাঁর গলায় মোটা চাদর জড়িয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি করত। কখনও বা আল্লাহর ঘর কাবা গৃহে নামাযে সিজদারত অবস্থায় রাসূলের উপর উটের নাড়িভুড়ি চাপিয়ে দিত।

যায়নাব (রাঃ) তখন কিশোরী এবং বিবাহিতা। তিনি মহান পিতার উপর কুরাইশদের এই অন্যায় বর্বর আচরণে মর্মাহত ও উদ্বেগাকুল হয়ে পড়তেন। তিনি অস্থির হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসতেন।

একদিনের একটি ঘটনা নিম্নে বর্ণনা দেওয়া হল:

"মুদারিক ইবনু হারিস 'আমেদী (রাঃ)-এর বর্ণনা মতে তিনি বলেন, ইসলাম-পূর্ব জাহিলিয়াতের যুগে আমার পিতার সঙ্গে একবার হজ্ব করতে মক্কায় গিয়েছিলাম। মিনা প্রান্তরে আমি দেখতে পেলাম: একটি লোক দাঁড়িয়ে, তাকে পরিবেষ্টিত করে আছে অসংখ্য লোক! আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে ঐ লোকটি যাকে এত লোকে ঘিরে রেখেছে? তিনি বললেন: “এ হচ্ছে সেই পথভ্রষ্ট বেদুঈন! যার নাম মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), সে তার বাপ দাদার ধর্ম ত্যাগ করে নতুন ধর্ম প্রচার করছে।”

এই কথাগুলো বলে আমার পিতাও ঐ সমাবেশের দিকে এগিয়ে গেলেন, আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। গিয়ে দেখি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে উপদেশ দিয়ে চলেছেন আর লোকেরা তাঁর কথা না শুনে উল্টো তাঁর প্রতি পাথর ছুঁড়ে মারছে এবং ধূলোবালি নিক্ষেপ করে চলেছে! তারা এই অমানুষিক আচরণ চালাতে গিয়ে প্রখর রৌদ্রে ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। ঠিক এমনি সময় আমরা দেখতে পেলাম একটি সুন্দরী কিশোরী বালিকা ব্যথিত, বিচলিত এবং ক্রন্দনরত অবস্থায় দৌড়ে সেখানে এসে উপস্থিত হল। তার হাতে পানির একটি পাত্র আর জামার বোতামগুলো খোলা। এই নিষ্কলঙ্ক মাসূম বালিকাটির পরিচয় সমবেত লোকদের মুখেই জানা গেল। তারা বলাবলি করতে লাগল, ঐ দেখ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেয়েটি এসে গেছে। কিশোরী যায়নাবের তখনকার অবস্থা বর্ণনাতীত। বুযুর্গ পিতার ঐ অবস্থা দর্শনে কন্যা যায়নাব অত্যন্ত ব্যথিত। সহানুভূতি ও দরদভরা হৃদয় নিয়ে তিনি পিতার সাহায্যে সেখানে সমুপস্থিত। বুক ফেটে তার কান্না বেরিয়ে আসছে, চোখ দিয়ে অশ্রু-ধারা ঝরে পড়ছে। সেই অবস্থায় তিনি পানি ভর্তি পাত্রটি পিতার হাতে এগিয়ে দিলেন আর অঝোরে কেঁদে চললেন। তার মাথা এবং জামার বোতাম খোলা, সে দিকে তাঁর মোটেই খেয়াল নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যাকে লক্ষ্য করে মায়াভরা কণ্ঠে ডেকে বললেন: প্রিয়তমা কন্যা! জামার বোতাম আগে লাগিয়ে নাও। তুমি এত বেশী বিচলিত এবং পেরেশান হচ্ছ কি জন্য? আল্লাহর রাস্তায় চলতে গিয়ে তোমার আব্বা পরাজিত ও পর্যুদস্ত হবেন- এ ভয় এ আশঙ্কা তুমি কস্মিনকালে তোমার হৃদয়ে স্থান দিও না।

যতই দিন যেতে লাগল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরামহীন প্রচারের ফলে মুসলমানের সংখ্যা ক্রমে ক্রমে ততই বেড়ে চলল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা মহাবীর হামযা (রাঃ) এবং সিংহ-হৃদয় ওমর ইবনু খাত্তাবের (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের ফলে তাদের সাহসিকতা এবং উৎসাহদীপ্ত সহযোগিতার ফলে ইসলামের শক্তি বর্ধিত হয়ে চলল। ফলে 'আল্লাহু আকবার' তাকবীর ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে শোভাযাত্রা সহকারে মুসলমানগণ কাবা গৃহে গমন এবং তথায় প্রকাশ্যে জামা'আতের সঙ্গে শুকরিয়ার নামায আদায় করার তাওফীক লাভ করলেন। এ সব দেখে কাফিরদের মনে হিংসার আগুন দিগুণ জ্বলে উঠল। তারা মুসলমানদের উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ১১৮ জন মুসলমান দু'বারে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে বাধ্য হন।

মুসলমানগণ ইসলামের বাণী সেখানে বহন করে নিয়ে যান এবং ইসলামের নাম, সুখ্যাতি ও শক্তি আরবের বাইরেও প্রসারিত হতে থাকে। ইসলামের এই দুর্বার অগ্রগতিতে মক্কার কাফিরগণ তাদের ভবিষ্যৎ ভেবে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত হয়ে উঠে।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 যায়নাবের (রাঃ) মদীনায় হিজরত হলো না

📄 যায়নাবের (রাঃ) মদীনায় হিজরত হলো না


নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন জন্মভূমি মক্কা মুয়ায্যমার মায়া পরিত্যাগ করে যখন মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করতে বাধ্য হলেন, তখন পর পর তাঁর তিন কন্যাও মদীনায় গিয়ে তাঁর নৈকট্য ও সাহচর্যে অবস্থানের সৌভাগ্য লাভ করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে মক্কায় মুশরিক স্বামী আবুল 'আসের গৃহে রয়ে যেতে বাধ্য হলেন বড় কন্যা যায়নাব (রাঃ)।

স্নেহময়ী মাতা চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন, অত্যাচার ও যুলম-নির্যাতনের শিকার হয়ে মহান পিতা জন্মভূমি ছেড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তিনশত মাইল দূরে- এক অজানা অচেনা পরিবেশে। স্বামী আবুল 'আস যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধাসম্পন্ন, তবু ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে আতঙ্কিত মক্কাবাসীদের সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রায় অংশ নিতে বাধ্য হন।

মহান পিতা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের বিপুল সমর সম্ভার সহ যুদ্ধ যাত্রায় এবং তাতে স্বীয় স্বামীর অংশ গ্রহণের ফলে স্বামীর ভবিষ্যৎ চিন্তায় কাতর যায়নাব (রাঃ)-এর নারীসূলভ কোমল হৃদয় তখন মানসিক দ্বন্দ্বে ও অস্থিরতায় কিরূপ বিচলিত হয়ে উঠেছিল তা শুধু হৃদয় দিয়েই অনুভব করা যায়।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 যায়নাবের স্বামী বন্দী হলেন

📄 যায়নাবের স্বামী বন্দী হলেন


হিজরী দ্বিতীয় সালে এবং নবুওয়াতের চতুর্দশ বর্ষে- ইসলামের প্রথম এবং সুদূর ফলপ্রসারী ধর্মযুদ্ধ বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়। এক তৃতীয়াংশেরও কম সংখ্যক যোদ্ধা খুব অল্প সমর-সরঞ্জাম নিয়ে বিপুল অস্ত্র সজ্জিত এক হাজার যোদ্ধার সমবায়ে গঠিত কুরাইশ-বাহিনীকে আল্লাহর অপার অনুগ্রহে পরাভূত ও পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধে মুসলমানদের ৩১৩ জন মুজাহিদের মধ্যে মাত্র ১৪ জন শাহাদাৎ বরণ করেন। অপর পক্ষে অধিকাংশ কুরাইশ নেতা সহ মোট ৭০ জন শত্রু সৈন্য নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়। বন্দীদের অন্যতম ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাতা- যায়নাব (রাঃ)-এর স্বামী আবুল 'আস। বন্দীদের সকলকে মদীনায় আনা হল। তাদের হত্যা করা হবে- না মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে এই বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের (রাঃ) পরামর্শ চাইলেন। আবূ বকর (রাঃ) সহ অধিকাংশ সাহাবা (রাঃ) মুক্তিপণ নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। দয়াল নবী এই পরামর্শ গ্রহণ করলেন। মুক্তি পণ রূপে কেউ দিলেন অর্থ ও কেউ অন্য কিছু। তবে যে সকল বন্দী লেখা পড়া জানত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলে দিলেন যে, তোমরা প্রত্যেকে মদীনার দশ জন বালককে লেখা-পড়া শিখিয়ে দাও- এটাই তোমাদের মুক্তিপণ।

📘 প্রিয় রাসূলের (সাঃ) কন্যাগণ 📄 মুক্তি যেভাবে পেলেন

📄 মুক্তি যেভাবে পেলেন


অর্থের বিনিময়ে মুক্তিকামী বন্দীদের অর্থ আসল মক্কা থেকে। বিরহ বেদনা কাতর যায়নাব (রাঃ) স্বামীর মুক্তিপণ স্বরূপ আপন দেবর 'আমর ইবনু রবীকে তাঁর সেই হার ছড়াটি দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন- যে হারটি তাঁর মাতা খাদীজা (রাঃ) তাঁর বিয়েতে উপহার স্বরূপ প্রদান করেছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই হারটি দেখেই চিনতে পারলেন এবং চমকিত হলেন। প্রিয়তমা সহধর্মিনী ও সহমর্মিণী খাদীজার (রাঃ) উপহার দেয়া সেই হারটি থেকে কন্যাকে বঞ্চিত করতে তাঁর কোমল প্রাণে আঁচড় কাটল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাহাবীদের (রাঃ) অনুমতি ছাড়া তিনি নিজে থেকে কিছুই বললেন না।

সাহাবীদের ডেকে তিনি বললেন, তোমাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে এবং যদি সম্ভব মনে কর, তা হলে এই হারের বিনিময় ছাড়াই তোমরা আবুল 'আসকে মুক্তি প্রদান করতে পার।

ইসলামের জন্য খাদীজার (রাঃ) অতুল্য ত্যাগ এবং অনুপম খিদমতের কথা স্মরণ করে আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মানসিক অবস্থা দর্শনে এমন কে আছে যে বিরূপ অভিমত ব্যক্ত করতে পারে? তারা সবাই সানন্দে এবং এক বাক্যে সম্মতি দিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু বিনা শর্তে আবুল 'আসকে মুক্তি দিলেন না। তিনি একটি শর্ত আরোপ করলেন। শর্তটি হচ্ছে এই যে, আবুল 'আস মক্কায় ফিরে গিয়েই যায়নাবকে (রাঃ) মদীনায় পিতার নিকট ফেরত পাঠিয়ে দেবে। আবুল 'আস এই শর্ত মেনে নিয়ে মক্কায় ফিরে এলেন এবং এসেই যায়নাব (রাঃ)-এর মদীনায় প্রেরণের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু সহজে এবং সুস্থ দেহে যায়নাব (রাঃ)-এর পক্ষে মদীনায় পিত্রালয়ে পৌঁছা সম্ভব হয়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px