📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 চলুন, সম্প্রীতি গড়ি

📄 চলুন, সম্প্রীতি গড়ি


'সমঝোতা'র চেয়ে 'সম্প্রীতি'র আলোচনা করাই আমার পছন্দের। আমি মতভেদ দূর করতে বা প্রশমিত করতে চাই না। দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় ক্ষেত্রেই এমন কিছু বিষয় আছে, যাতে মতভেদ কখনওই এড়ানো যাবে না। এসব মতভেদ বরং দরকারি ও উপকারী।
কিছু ব্যাপারে পার্থক্য না থাকলে তো মানুষ অনেক উপকারী বিকল্প থেকেই বঞ্চিত হয়ে যেত। এটা আল্লাহ তাআলার হিকমাহ যে তিনি আমাদেরকে নানা ভাষা, নানা রঙ সহ অনেক রকম বৈচিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই বৈচিত্র আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে।
সম্প্রীতি মানে আমাদের মতভেদকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পরিণত হতে না দিয়ে ইতিবাচক উপায়ে ব্যবহার করা। এর অর্থ মানুষের চিন্তাধারা এক করা নয়, বরং হৃদয়গুলোকে এক করা।
সম্প্রীতির একটি নৈতিক প্রেরণা আছে। এর দৃষ্টিভঙ্গি প্রশস্ত, শুধু জ্ঞান আর সচেতনতা বাড়ানোর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু তথ্য জানলেই বা অপরপক্ষের মত শুনলেই মানুষের মতামত, আচরণ, আগ্রহ ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের এই পার্থক্য যেন কিছুতেই একে অপরের প্রতি আমাদের অন্তরগুলো কঠিন করে না দেয়।
সম্প্রীতি মানে হলো যেসব বিষয়ে আমরা একমত, সেগুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া। আর আমাদের সবার প্রয়োজনীয় মানবিক প্রচেষ্টায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। এমন অনেক বিষয়ে অন্যদের সাথে ইতিবাচক লেনদেনের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় ব্যাপারেও এ কথা খাটে।
এই প্রচেষ্টাগুলো আমাদের সময় ও মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। কুরআন-সুন্নাহ আমাদের এভাবেই আচরণ করতে শেখায়। আমাদের ভালো-খারাপ মানবিয় অভিজ্ঞতার সমষ্টি থেকে বোঝা যায় যে, সদিচ্ছা ও সম্প্রীতির সাথে একে অপরের সাথে কাজ করাই সর্বোত্তম। সাধারণ নীতি, বিশ্বাস, ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে একসাথে কাজ করলে আমরা সবাইই উপকৃত হই।
আমাদের মধ্যকার ছোট বা বড় পার্থক্যগুলো ভুলে যাওয়া ঠিক নয়। তবে এগুলোর ব্যাপারে এত সংবেদনশীল হওয়া যাবে না, যার ফলে সেগুলোই আমাদের চিন্তা ও আবেগের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এমন শক্তিশালী হতে হবে যেন মতপার্থক্যের ফলে তাতে ভাঙন সৃষ্টি না হয়।
জীবন কোনো যুদ্ধ নয়। সম্প্রীতি অর্থ ভদ্রভাবে দ্বিমত করা, প্রতিশ্রুতি সহকারে একমত হওয়া। এটি একটি জানাশোনা নৈতিক অবস্থান। বুদ্ধিবৃত্তির বৈধ অধিকার আর অহমিকার অবৈধ উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝে এটিই পার্থক্য গড়ে দেয়।
সম্প্রীতি মানে এক চিরন্তন দ্বন্দ্বে জয়লাভ করা। এই দ্বন্দ্ব আমাদের খেয়াল-খুশি ও লোভ-লালসার বিরুদ্ধে। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের স্বার্থান্বেষী চিন্তাগুলো অনেক সময়ই “দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠা”র ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়। ফলে তাদের সহজে চেনা যায় না।
আল্লাহ বলেন, كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَى ﴿٦﴾ أَن رَّاهُ اسْتَغْنَى ﴿٧﴾ “মানুষ অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করে। কারণ, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।” (সূরাহ আল-আলাক ৯৬:৬-৭)
সুমহান আল্লাহ, যিনি মানবমনের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর জটিলতাগুলো সম্পর্কে জানেন। يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ﴿١٩﴾ “আল্লাহ চক্ষুর অন্যায় কর্ম সম্পর্কেও অবগত; আর অন্তর যা গোপন করে, সে সম্পর্কেও।” (সূরাহ গাফির ৪০:১৯)
হৃদয়ের বিশুদ্ধতা শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তা যদি আপনার থাকে, তাহলে অন্যের সাথে সম্প্রীতি গড়ার জন্য আপনার চাই প্রতিপালকের সামনে বিনয়ী হওয়া, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান জানানো, এবং নিজের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায় ক্ষমা করা।
মনে রাখতে হবে যে, কাজের চেয়ে কথা সবসময়ই সহজ। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ও জাতি হিসেবে অগ্রসর হতে হলে তুচ্ছ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সকল কাজে সততার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।
কুরআনের এই দু'আ ভালো করে খেয়াল করি সবাই: رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿١٠﴾
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে ঈমান আনা ভাইদের ক্ষমা করে দিন। আমাদের অন্তরের মাঝে ঈমানদারদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আপনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু।” (সূরাহ আল-হাশর ৫৯:১০)

📘 প্রিয় শত্রু! তোমাকে ধন্যবাদ > 📄 লেখক পরিচিতি

📄 লেখক পরিচিতি


শাইখ সালমান বিন ফাহদ বিন আবদুল্লাহ আল আওদাহ ১৯৫৫ সালে সৌদি আরবের বুরাইদা শহরের নিকটবর্তী আল-বাসর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হন। সেখানে দুই বছর অধ্যয়নের পর তিনি ভর্তি হন শরিয়াহ ফ্যাকাল্টিতে। এখান থেকে ইসলামি শরিয়াহর উপর তিনি B.A, M.A এবং পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এখান থেকে তিনি আবার বুরাইদা ফিরে যান এবং সেখানে একাডেমিক ইনস্টিটিউটে আরও ছয় বছর অধ্যয়ন করেন।
সালমান আল আওদাহ শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু বায, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমিন, শাইখ আবদুল্লাহ আব্দুর রহমান জিবরিন সহ আরও অনেক আলিমের অধীনে পড়াশোনা করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতা, লেখালেখি এবং দাওয়াতি কাজে নিয়োজিত। ২০১৭ সালে সৌদি আরবে চলমান আলিমদের গ্রেফতার প্রক্রিয়ায় শাইখ সালমান আল আওদাহও গ্রেফতার হন এবং কোনো বিচার ছাড়াই তিনি এখনও সেখানে বন্দী আছেন। আল্লাহ তাঁর কল্যাণকর মুক্তি ত্বরান্বিত করুন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00