📄 নৈতিক চরিত্রের পরীক্ষা
সকল জনপদ ও ধর্মেই নৈতিক সততা ও ন্যায়পরায়ণ আচরণকে অত্যন্ত সম্মান করা হয়। এটি নবিগণের আনীত বার্তার একটি মৌলিক অংশ। শেষ নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) তো বলেই দিয়েছেন, “আমাকে সৎ চরিত্রের পূর্ণতা প্রদানের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।”
এ ব্যাপারে যেহেতু সবাই একমত, সেহেতু বিস্তারিত বলার কিছু নেই। নৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে যারা প্রচার-প্রচারণা চালায় ও অশ্লীল আচরণ করে, তারাও নৈতিক চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে।
প্রথা বা অভ্যাসগত কারণেই কিছু পরিস্থিতিতে একজন মানুষ সুন্দর আচরণ করতে পারে। এটাও ভালো জিনিস। প্রখ্যাত সাহাবি আবুদ্দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সহ আরো কয়েকজনের বর্ণনাসূত্র থেকে জানা যায় নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
“জ্ঞান লাভ হয় শেখার মাধ্যমে আর নম্রতা লাভ হয় নম্র হওয়ার মাধ্যমে। যে কেউ কল্যাণ লাভ করতে চায়, তাকেই তা দেওয়া হবে। আর যে-ই মন্দ থেকে বাঁচতে চায়, তাকে তা থেকে বাঁচানো হবে।” (তারিখ বাগদাদ এবং তারিখ দিমাশক)
তবে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির আশায় সুন্দর আচরণ দেখানো মোটেই প্রশংসনীয় নয়। সত্যিকারের নৈতিকতা বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে আসে না, ধ্রুব থাকে। এজন্যই পুরনো এক আরবি প্রবাদে আছে, “কারো আসল চরিত্র জানতে চাইলে তার সাথে সফরে বের হও।”
স্বামীর আসল চরিত্র বুঝতে হলে দেখতে হবে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সুখ ও দুঃখ উভয় সময়ে ঘরের ভেতর স্ত্রীর সাথে তাঁর আচরণ কেমন। এখানেই তাঁর নিজেকে সংবরণ করতে হয় এবং ধৈর্যের আসল পরীক্ষা হয়। অহংকার থেকে বেঁচে থাকা, ক্ষমাশীল ও সহনশীল হওয়া, সুন্দর আচরণ দেখানো ইত্যাদি সবই বিবাহিতজীবন ও সংসারজীবনে পরীক্ষিত হয়।
বন্ধুত্বের ব্যাপারেও একই কথা। পরিস্থিতি নির্বিশেষে ব্যক্তির আচরণ ধ্রুব ও নিষ্ঠাপূর্ণ হতে হয়। কত বন্ধুকে যে দুধের মাছি হিসেবে পাওয়া যায়, কিন্তু আসল দরকারের সময় থাকে অদৃশ্য!
বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠাবানদের জীবন সুন্দর ও বরকতময় হোক। এরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেরা বদলে যায় না এবং বিপদের সময় মুখ ঘুরিয়ে নেয় না। কতই না দুর্লভ এমন মানুষগুলো!
দীর্ঘ পরিচয় ও মেলামেশা থেকে কারো চরিত্রের দৃঢ়তা বা ঠুনকোভাব বোঝা যায়। এটাই নৈতিক চরিত্রের প্রথম পরীক্ষা।
আরেকটি পরীক্ষা আছে। ক্ষমতার পরীক্ষা। দুর্বল অবস্থায় অনেকে ভালো আচরণ দেখাতে পারে। কিন্তু এটা স্বভাবজাত নয়। অন্যরকম আচরণ করে দেখিয়ে দেবার ক্ষমতা নেই বলেই তারা অমন। এ ব্যাপারে প্রাচীন আরব কবি আল-মুতানাব্বি বলেন,
জুলুম করা তো মানবের স্বভাব না করলে বুঝবে সুযোগের অভাব।
আল-মুতানাব্বি হয়তো কথাটি অ্যারিস্টটলের থেকে ধার করে থাকবেন। অ্যারিস্টটল বলেছেন, "অত্যাচার মানবস্বভাবের অংশ। কেবল দুটি কারণেই মানুষ এ থেকে বিরত থাকে। হয় ন্যায়পরায়ণতা, নয়তো প্রতিশোধের ভয়।”
ক্ষমতা হাতে আসলেই ব্যক্তির আসল চরিত্র বেরিয়ে আসে। ক্ষমতা, সম্পদ, প্রতিপত্তি পেয়েও যদি কেউ নৈতিক মূল্যবোধ, অন্যের প্রতি মমতা, নম্রতা ও গালমন্দের জবাবে ক্ষমাশীলতা ধরে রাখতে পারে, তাহলেই সে সত্যিকারের মহান ও ভালো মানুষ।
কিন্তু হায়! আকস্মিক ক্ষমতা, খ্যাতি আর সম্পদ পেয়ে মাথা ঠিক রাখা মানুষের সংখ্যা বড়ই নগণ্য।
তৃতীয় পরীক্ষা হলো মতপার্থক্য। সমমনা মানুষদের সাথে প্রায় সবাইই ভালো আচরণ করে। কিন্তু আদর্শিক বা জাগতিক মতভেদ তৈরি হলে মানুষের আসল চেহারা বের হয়।
সম্মানার্হ ও সচ্চরিত্রবান একজন মানুষ সুবিবেচকের মতো ও স্পষ্ট ভাষায় নিজের মত তুলে ধরবে। আর ভিন্নমতের প্রতি অপমান ও অপবাদসূচক ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবে। নৈতিক চরিত্র যেকোনো ধরনের নীচ আচরণকে প্রতিরোধ করবে। যুক্তির বিচারে না পেরে আবেগে বিস্ফারিত হয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে।
এর বিপরীত স্বভাবের মানুষ একই পরিস্থিতিতে অন্য সবার প্রতি গালমন্দ ও নালিশ শুরু করে দেবে। এই অযাচিত আচরণ মুহূর্তেই তার নৈতিকতার প্রাসাদ ধসিয়ে দেবে। কেউ কেউ মিথ্যা ও অস্পষ্ট ভাষার আশ্রয় নিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রসঙ্গের বাইরে এনে ধরাশায়ী করতে চাইবে।
মতানৈক্যও সম্পর্কে ফাটল ধরাবে না, এ দাবি করা তো ভালো। কিন্ত আসল পরিস্থিতিতে মানুষ কী করে, সেটাই দেখার বিষয়। কিছু ধার্মিক তরুণকে দেখেছি নিজেদের মাঝে মতপার্থক্য হলে তারা এমনসব ভয়াবহ ভাষা ব্যবহার করে, যা শুনে হৃদয়টা ফেটে যায় আর চোখে পানি চলে আসে। পরস্পরকে নির্বোধ বলে ডাকে, অপমান করে, ধোঁকা, বিদ'আত, অনৈতিকতা ও কুফরের অভিযোগ করে। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি: এইসব নোংরা ঝগড়ার শেষ কোথায়? আল্লাহর মনোনীত ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত একটি উম্মাহর বৈশিষ্ট্য কবে এদের মাঝে আসবে? নিজেদের মাঝে ও শত্রুদের সাথে আচরণের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা কবে তাদের মাঝে আসবে?
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
"এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কোরো না। ন্যায়বিচার করো। এটি তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:৮)
কখন আমরা বুঝব যে, ব্যক্তিগত আবেগ ও ক্রোধের বশে করা অনেক আচরণকে আমরা ধার্মিকতা ভেবে ভুল করি?
শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান বলে পরিচিত কিছু লেখককে দেখি। অথচ দ্বিচারিতা ও নির্লজ্জতায় তাঁরা এদের চেয়ে খারাপ না হলেও একইরকম।
মানুষের মনে আক্রমণাত্মক মনোভাব সুপ্ত থাকে। বের হয়ে আসার অপেক্ষা করে। আদর্শ বা রাজনীতিতে সামান্য মতভেদ আসামাত্রই সভ্যতার বাহ্যিক আবরণ ছুঁড়ে ফেলে হিংস্রভাবে একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মতভেদের সময়েও সহমর্মী আচরণ ধরে রাখতে শিখব কবে? কবে কাঙ্ক্ষিত শালীনতা বজায় রাখতে শিখব? কখন আমাদের মূল্যবোধ আর নৈতিকতাগুলো তত্ত্ব থেকে জীবনে অনূদিত হবে? টিকে থাকবে আমাদের জীবন ও সম্পর্কের পুরোটা সময় ধরে? ক্ষমতাধর প্রশাসক, মিডিয়ার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, সামাজিক প্রভাবশালী বা সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পরও এই আচরণগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে। মতভেদের সময়েও এই আচরণগুলো বজায় রাখতে হবে। নাহলে তো কাউকে ভুল করতে দেখলে বা কারো সাথে মতভেদ হলে আমাদের সামনে কেবল দুটিই বিকল্প থাকবে। সম্পর্ক শেষ করে ফেলা অথবা চুপ করে সহ্য করা।
যদিও আমি লিখছি, কিন্তু আমার কলম ধীর দ্বিধান্বিত। কলম যেন আমারই দিকে ফিরে বলছে, “তুমি নিজে কি এসব মানো?” জবাব দিতে হয়, “না, কিন্তু আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব বলে কথা দিচ্ছি, যতবারই হোঁচট খাই না কেন…”
📄 রাগের সময় আত্মসংবরণ
আমাদের সবাইকেই রাগ সামাল দিতে হয়। এ এমন এক অনুভূতি, যা সময়ে সময়ে জ্বলে উঠে আমাদের শক্তি পরীক্ষা করে। আমাদের সাথে যে অসদাচরণ করেছে, আমরাও তার পর্যায়ে নেমে যাই কি না- তার পরীক্ষা নেয়। কিছু মানুষ আসলেই রাগের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে। এর জন্য বেশ কিছু গুণ থাকা লাগে। এর মধ্যে আমি নয়টি গুণ নিয়ে এখানে কথা বলব।
১। ভুল করা ব্যক্তির প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও শিথিলতা
রাসূল (ﷺ)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন,
بِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিনহৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।” (সূরাহ আলে ইমরান ৩:১৫৯)
এই আয়াতে খুবই উপকারী একটি শিক্ষা রয়েছে। মানুষকে কোমলতা ও সহজতার মাধ্যমে কাছে টানা যায়। কঠোরতা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে নয়। আল্লাহ বলেন, “...আপনি যদি রাগী ও কঠিনহৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।”
এই আয়াতে যে মানুষদের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা হলেন নবিজি (ﷺ)-এর সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। ঈমান বাঁচাতে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে হিজরত করা এবং সেই মুহাজিরদের সাদরে বরণ করে নেয়া মানুষ। মুমিনদের মাঝে এঁদেরকে বলা হয়েছে “সবচেয়ে অগ্রবর্তী” (সূরাহ আত-তাওবাহর ১০০ তম আয়াত দ্রষ্টব্য)। তাঁদের পরে আসা মানুষদের কাছে তাঁদের চেয়ে বেশি কিছু কী করে আশা করা যায়? আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চেয়ে অনেক নিচের সারিতে অবস্থান করা আলিম, ইসলামি কর্মী ও নেতাদের কাছে কতটুকুই বা আশা করা যায়? তাই দয়া ও ক্ষমাশীলতা ছাড়া অন্যকিছুকে ভিত্তি ধরে ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব।
আবুদ্দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে অপমান করা এক লোককে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, "আমাদের গালমন্দ কোরো না। সমঝোতার কিছুটা সুযোগ রাখো। আমাদের ব্যাপারে যারা আল্লাহকে অমান্য করে, তাদের প্রতি আমরা একই ভাষায় উত্তর দিই না। বরং তাদের ব্যাপারে আমরা আল্লাহকে মান্য করি।”
ইমাম আশ-শা'ফিকে এক লোক অপমান করায় তিনি উত্তর দেন, “তুমি যেমনটা বললে, আমি সত্যিই এমন হয়ে থাকলে আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আর আমি সেরকম না হয়ে থাকলে আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন।"
খলিফা মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে এক ব্যক্তি একদম সরাসরি খুব কটু ভাষায় অপমান করল। তিনি সেই ব্যক্তির জন্য দু'আ করলেন ও তাকে কিছু অর্থসাহায্যও করলেন। এভাবেই তিনি সেই ব্যক্তির কটু কথার জবা দিলেন।
আমরা যেন আরো বেশি গ্রহণশীল, ধৈর্যশীল ও সহনশীল হই। নম্রতা অনুশীলন করতে করতেই চরিত্রে নম্রতা আসে।
নবিজি (ﷺ) থেকে আবুদ্দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “জ্ঞান লাভ হয় শেখার মাধ্যমে আর নম্রতা লাভ হয় নম্র হওয়ার মাধ্যমে। যে কেউ কল্যাণ লাভ করতে চায়, তাকেই তা দেওয়া হবে। আর যে-ই মন্দ থেকে বাঁচতে চায়, তাকে তা থেকে বাঁচানো হবে।”
নিজেদের ভেতরটার দিকে তাকাতে হবে। অন্যের সাথে আচরণ করার আগে নিজেদের ঠিক করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, ইসলামি সম্ভাষণ হলো “আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।” নবিজি (ﷺ) আমাদের আদেশ করেছেন ঘরে প্রবেশের সময় এই সম্ভাষণ প্রদান করতে। আল্লাহ বলেন,
“ঘরে প্রবেশের সময় নিজেদেরকে সালাম প্রদান করবে।” (সূরাহ আন-নূর ২৪:৬১)
শিশু-বৃদ্ধ, পরিচিত-অপরিচিত সকলকেই আমরা এই সম্ভাষণ দিই। নবিজি (ﷺ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,
أَيُّ الإِسْلَامِ خَيْرٌ "কোন ইসলাম উত্তম?”
নবি (ﷺ) বললেন,
تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ "অভাবীকে আহার দান করা এবং পরিচিত-অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা।" [৪৪]
আম্মার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “কেউ যদি তিনটি জিনিস অর্জন করে, তাহলে ঈমানের স্বাদ বুঝতে পারবে। নিজের প্রতি ন্যায়বিচার করা, সকলকে সালাম দেওয়া, অভাবের সময়েও দান করা।” (সহিহ আল-বুখারি)
এই শান্তির সম্ভাষণের অনেক অর্থ রয়েছে। একটি অর্থ হলো যাকে সালাম দেওয়া হয়েছে, সে আপনার কথা, চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বা অত্যাচারিত হবে না।
এই সম্ভাষণ শান্তি, নিরাপত্তা, দয়া ও অনুগ্রহের দু'আ। বহুল ব্যবহৃত এই কথাগুলোর অর্থ বুঝে এগুলোকে জীবনযাপন ও আচার-আচরণের পদ্ধতি বানিয়ে নিতে হবে।
২। মহানুভবতা ও সর্বোচ্চ সুধারণা
প্রতিপক্ষের উপর প্রতিশোধ নেবার ক্ষমতা থাকলেও ক্ষমা ও সহনশীলতার মাধ্যমে জবাব দেওয়া যায়। এটি সত্যিকারের মহানুভবতা। কথায় আছে, “সর্বোত্তম গুণ হলো প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকলেও মাফ করে দেওয়া এবং দারিদ্র্যের সময়ও দানশীল হওয়া।" আল্লাহ বলেন,
وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ﴿٤٣﴾
“আর যে কেউ ধৈর্য ধরে ও ক্ষমা করে, নিঃসন্দেহে তা দৃঢ়চিত্তের পরিচায়ক।” (সূরাহ আশ-শুরা ৪২:৪৩)
মক্কাবিজয়ের দিন কুরাইশ জমায়েতের উদ্দেশে নবি (ﷺ) বলেন, “তোমাদের সাথে আমি কী করব বলে মনে করো?”
তারা বলল, “উত্তম আচরণ। আপনি একজন সম্মানিত ভাই এবং একজন সম্মানিত ভাইয়ের ছেলে।”
তিনি বললেন, "যাও, তোমরা মুক্ত।”
ইউসুফ আলাইহিসসালামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ভাইয়েরা অবশেষে তাঁর কব্জায় এলে তিনি তাদের বলেন,
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ﴿٩٢﴾
"আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন, এবং তিনি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সূরাহ ইউসুফ ১২:৯২)
৩। মহৎ মানসিকতা
কিছু অপমানের জবাব দেওয়া মানে নিজেকে আরো ছোট করা। অপমান সহ্য করে হাসিখুশি থাকার অভ্যাস করতে হবে। ধীরে হলেও নিয়মিত আত্মসংবরণের অনুশীলন করে যেতে হবে।
৪। শুধুই আল্লাহর কাছে প্রতিদান চাওয়া
রাগ একটি তিক্ত জিনিস। মাঝেমাঝে আল্লাহর রহমত ও পুরস্কারের আশায় কষ্ট করে হলেও তা গিলে ফেলতে হয়।
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ
“রাগ প্রকাশের ক্ষমতা থাকার পরও যে আত্মসংবরণ করবে, কিয়ামতের দিন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে সবার মাঝ থেকে ডেকে নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো পবিত্র সঙ্গী বেছে নেবার অধিকার দেবেন।”[৪৫]
এসব জিনিস নিয়ে কথা বলা সহজ। এতে কোনো পরিশ্রমও লাগে না। আমার মনে হয় রাগের সময় আত্মসংবরণ করা নিয়ে যে কেউই সুন্দর বক্তৃতা দিতে পারবে। কিন্তু আসল সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। ওই সময়টার জন্য আমাদের যেন আগে থেকেই ধৈর্য, মহানুভবতা, ক্ষমাশীলতার চর্চা থাকে। নাহলে কথা ও কাজের পার্থক্য দেখে আমরা আচমকা স্তম্ভিত হয়ে যাব।
৫। লজ্জাশীলতা
যে আমাদের উপর অন্যায় করছে, আমরাও তার মতো একই পর্যায়ে নেমে যেতে পারি না, এটা করার আগে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। জ্ঞানী লোকেরা বলেছেন, “নির্বোধকে সহ্য করা তার স্বভাব গ্রহণ করার চেয়ে ভালো। কারো অজ্ঞতা অনুকরণ করার চেয়ে উপেক্ষা করা ভালো।"
তাইফ থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে নোংরা আচরণের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেবার ঘটনাটি দেখুন। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সেসময়ের কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি একবার তাঁকে (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, “উহুদের যুদ্ধের চেয়েও খারাপ কোনো দিন কি আপনার গেছে?” নবিজি (ﷺ) বললেন,
তোমার গোত্র আমাকে বড় যন্ত্রণা দিয়েছে। আর এর মাঝেও সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিল আকাবাহর দিন। সেদিন আমি ইবনু আব্দু ইয়ালাইল বিন আব্দু কুলালের সামনে উপস্থিত হই। তিনি আমার অনুরোধ রাখলেন না। আমি মনে খুব কষ্ট নিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে সামনে এগিয়ে চললাম। একসময় কারনুস সালিবে উপস্থিত হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে দেখলাম একটি মেঘখণ্ড এগিয়ে আসছে। আমি এর মাঝে জিবরিলকে দেখলাম।
তিনি আমাকে ডেকে বললেন, "আপনার জাতির লোকেরা আপনাকে যা যা বলেছে ও বিতর্ক করেছে, তা আল্লাহ শুনেছেন। আল্লাহ আমার সাথে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। আপনার যা করার ইচ্ছা হয়, তাকে তা আদেশ করুন।" পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডেকে সালাম দিয়ে বললেন, “হে মুহাম্মাদ! যা চান, আদেশ করুন। আপনি চাইলে আমি তাদের দু পাহাড়ের মাঝে পিষে ফেলব।”
আমি বললাম, “না। আমি আশা করি আল্লাহ এদের বংশধরদের থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদাত করবে। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
৬। দয়া ও মহানুভবতা ঈমানের অঙ্গ
আমাদের অন্তর প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে সক্ষম। তাই আমাদের উচিত একে নিয়মিত মহানুভবতার অনুশীলন করানো। আমাদের শিখতে হবে কীভাবে নিজের অধিকার খুশিমনে ছেড়ে দিতে হয় এবং প্রত্যেকবার নিজের পাওনা দাবি করা পরিহার করতে হয়। হৃদয়কে মমতার চর্চা করাতে হবে।
হৃদয়ে যদি অন্যদের প্রতি ভালোবাসার আবাদ করতে পারেন, তাহলে তা কখনও তাদের দ্বারা কষ্ট পাবে না। প্রতিবার নতুন অতিথি এলে তা প্রশস্ত হয়ে জায়গা করে দেবে। প্রতিটি যোগ্য ব্যক্তিকে সে টেনে নেবে।
প্রতিরাতে ঘুমোতে যাবার আগে অন্তরকে মহানুভবতা ও সহনশীলতা শিক্ষা দিন। দেখবেন ঘুম শান্তির হবে। যে কেউ যেভাবেই আপনার প্রতি অন্যায় করে থাকুক, তাদের মাফ করে আল্লাহর কাছে তাদের সংশোধনের দু'আ করুন। এতে আপনিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।
মানুষ তাকাবে বলে প্রতিদিন যেমন কয়কবার আমরা মুখ ধুই, তেমনি অন্তরকেও পরিষ্কার করতে হবে। কারণ আল্লাহ আমাদের অন্তর দেখেন। নবিজি (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ বা সম্পদ দেখেন না। তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ দেখেন।"
আল্লাহ যেহেতু আমাদের অন্তর দেখেন, তাই এর ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। মহত্তম চিন্তা ও সুন্দরতম সংকল্প থাকতে হবে। প্রতিদিন অন্তর থেকে হিংসা, ঘৃণা, কুচিন্তার আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। জীবনে ইতিবাচক অগ্রগতির পথে এসব আবর্জনা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৭। মুখের উপর লাগাম
অন্য কেউ অপমান করতে শুরু করলে নিজেকে সামলানো বড্ড মুশকিল। এর জন্য কঠিন প্রত্যয় দরকার। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় পাল্টা জবাব দেওয়ার পেছনে শক্তি ব্যয় করার চেয়ে নীরবতার পেছনে শক্তি ব্যয় করলে লাভ বেশি।
নীরবতার মাধ্যমে জবান ও অন্তরের হেফাজত হয়, মূল্যবান সময় বাঁচে। তাই তো আল্লাহ মারইয়াম আলাইহাসসালামকে বলতে বলেন,
إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنسِيًّا ﴿٢٦﴾
"আমি পরম করুণাময়ের জন্য চুপ থাকার মানত করেছি। অতএব আজ আমি কোনো মানুষের সাথে কিছুতেই কথা বলব না।” (সূরাহ মারইয়াম ১৯:২৬)
পাল্টাপাল্টি তর্ক ও ঝগড়ায় অন্তর আহত হয়, লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়।
৮। পরিণতির ভাবনা
সার্বিক কল্যাণের জন্য কোনটি বেশি জরুরি, তা নিরীক্ষা করে বুঝে নেয়া দরকার। এজন্যই পৌত্র হাসান ইবনু আলির প্রশংসায় নবিজি (ﷺ) বলেন, “আমার এই নাতি এক নেতা। হয়তো বিবাদমান দুটি মুসলিম পক্ষের মাঝে আল্লাহ তার হাত দিয়ে মীমাংসা করাবেন।” (সহিহ আল-বুখারি)
এ থেকে বোঝা যায় যে, সকলের জন্য কল্যাণকর বিষয়ে খেয়াল রাখা মহত্ত্বের লক্ষণ। যেমন- ঐক্য রক্ষা, যুদ্ধ বন্ধ করা।
৯। অতীতের ভালো কাজ স্মরণ ও স্বীকার করা
নবিজি (ﷺ) বলেন, “অপরের গুণ স্বীকার করা ঈমানের অঙ্গ।”
ইমাম আশ-শাফিঈ বলেন, “মহৎ মানুষের প্রতি এক মুহূর্তের জন্য মহানুভবতা দেখালেও তিনি তার সম্মান করেন। এক মুহূর্তের জন্যও উপকার করা প্রতিটি মানুষের সাথে তিনি সুসম্পর্ক বজায় রাখেন।”
টিকাঃ
[৪৪] সহিহ মুসলিম: ৬৫
[৪৫] সুনান আত-তিরমিযি এবং সুনান আবু দাউদ
📄 আমি তো ছিলাম ভালো...
আল্লাহ বলেন,
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدًا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَاء إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا ﴿٣٥﴾
"আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায়, তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত।” (সূরাহ আন-নিসা ৪:৩৫)
যারা সত্যিকার অর্থেই সম্প্রীতি চায়, আল্লাহ তাদের সাফল্য দানে ধন্য করার ওয়াদা করেছেন। এটা শুধু স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেই না; পিতামাতা-সন্তান, ভাই-বোন, ব্যবসায়িক অংশীদার, সহকর্মী, প্রতিবেশী- সবার ক্ষেত্রেই সত্য।
এই সম্প্রীতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিজের মতকে সবসময় ঠিক এবং নিজেকে সবসময় নির্দোষ ভেবে গোঁ ধরে থাকা। উভয় পক্ষই নিজেকে অপরপক্ষের নির্যাতনের শিকার বলে মনে করে।
সম্প্রীতির পথে এই বাধাকে যদি এক শব্দে বলি তবে সেটা হলো 'অহমিকা'।
এমনকি নিজের আত্মীয়দের মাঝে দ্বন্দ্বেও আমি এই বিষয় একাধিকবার দেখেছি। একবার তো একপক্ষ পাঁচ বছর আগ থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত কত খুঁটিনাটি বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার ফিরিস্তি দেওয়া শুরু করল। অপরপক্ষ বেশ কিছুক্ষণ ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চুপ করে শুনছিল। পরে একসময় তাও অসহ্য হয়ে ওঠে।
অপরপক্ষ যখন বলতে শুরু করল, আবার দেখি ঘুরেফিরে একই ব্যাপার। দীর্ঘ ফিরিস্তি, দীর্ঘ ধৈর্য। এই ধৈর্যটুকু কি এরা এতদিন একজন আরেকজনের সাথে দেখাতে পারল না?
দুঃখের বিষয় এই যে, উভয়পক্ষের কথা শুনলেই মনে হবে তার কথাই ঠিক। কথাগুলো এত আবেগ আর হৃদয় দিয়ে বলা হয় আর মুখের ভঙ্গিমাও এমন হয় যে, এভাবে মিথ্যে বলা সম্ভব না। উভয় পক্ষের কাছেই নাকি শক্ত স্বাক্ষী আছে।
স্বামী-স্ত্রী নিজেরা তাদের বিরোধের কথা বলার সময় মনে হয় যেন সত্যের পাল্লায় একটি আঙুল রেখে তা নিজের দিকে ঝুলিয়ে রাখে। মাঝেমাঝে একটু দোষ স্বীকার করার মতো দয়াও হয় কারো কারো, "হ্যাঁ, এটা সত্যি যে আমি এমন অমন করেছি...কিন্তু যত যা-ই হোক...।" দিনশেষে উভয়ের উপসংহার হবে, "আমি তো ভালোই ছিলাম, উনিই না যত ঝামেলাটা লাগালেন।” সবসময় অপরপক্ষটাই জানে না কীভাবে আচরণ করতে হয়, কীভাবে সঙ্গীর ভালো স্বভাবের মান রাখতে হয়।
এ থেকেই বোঝা যায় অহমিকার মূল কত গভীরে আর মানুষ তা স্বীকার করতে কতটা অনিচ্ছুক। ভাইরাসের মতো ছোট আর দ্রুত যে, ধরাও যায় না। কিন্তু ঠিকই সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের সিদ্ধান্ত, কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুতে সবার অলক্ষে প্রভাব ফেলে যায়।
আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সময় শয়তানও এই অহমিকাই দেখিয়েছে। আল্লাহ যখন আদমের সামনে সিজদাহ করতে বললেন, ইবলিস বলেছিল,
قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ ﴿٧٦﴾
"আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” (সূরাহ সাদ ৩৮:৭৬)
মূসা আলাইহিসসালামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যানের জন্য ফিরআউনের অজুহাতও ছিল অহমিকা।
أَمْ أَنَا خَيْرٌ مِّنْ هَذَا الَّذِي هُوَ مَهِينٌ وَلَا يَكَادُ يُبِينُ ﴿٥٢﴾
"হীন এবং স্পষ্ট কথা বলতে অক্ষম এই লোকের চেয়ে আমি কি শ্রেষ্ঠ নই?” (সুরাহ আয-যুখরুফ ৪৩:৫২)
কারুনের অবাধ্যতার অজুহাতও একই অহমিকা। আল্লাহ বলেন,
قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِندِي ، أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِن قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا ، وَلَا يُسْأَلُ عَن ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ ﴿۷۸﴾
“সে বলল, 'আমি তো আমার নিজের জ্ঞানবলে এসব পেয়েছি।' সে কি জানে না যে, আল্লাহ তার পূর্বে তার চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী অনেক প্রজন্মকে ধ্বংস করেছেন? কিন্তু অপরাধীদের তাদের অপরাধের জন্য তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করা হয় না।” (সূরাহ আল-কাসাস ২৮:৭৮)
অহমিকা কারো অজান্তেই তার মাঝে চলে আসতে পারে। এর বিপদ থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকতে হয়। এজন্যই কোনো বক্তব্য দেওয়ার আগে নবিজি (ﷺ) এই দু'আ পড়তেন,
وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَسَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا
“আর আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই নিজেদের ক্ষতি ও আমাদের কাজকর্মের ক্ষতি থেকে।” [৪৬]
প্রতিপালককে তিনি এই দু'আ করেও ডাকতেন,
اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي وَأَعِذْنِي مِنْ شَرِّ نَفْسِي .
“হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথ দেখান এবং আমাকে নিজের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন।” [৪৭]
আল্লাহ বলেন,
وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿٩﴾
“যাদেরকে আত্মার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (সূরাহ আল-হাশর ৫৯:৯)
আশপাশের মানুষগুলোর আচরণ ও মতামত নিরীক্ষা করলে দেখবেন যে, অনেকের আচরণই তাদের অহমিকা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। যারা নিজেদের নিরপেক্ষ ও বুঝদার দাবি করে, তারাও আলাদা কিছু নয়। দ্বীনদারদের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। কেউই এ থেকে মুক্ত না। নফসের ধোঁকা বড় সূক্ষ্ম, বৈচিত্র্যময় ও অধরা। আমরা কখনওই এই অহংবোধ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারব না। কিন্তু এর দ্বারা যেসব ক্ষতি হয়, সেগুলোর ব্যাপারে আগে থেকে সতর্ক তো থাকতে পারব। সত্যি বলতে অহংকার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়াটাই অস্বাভাবিক। আর এই অহংকারের কিছু ইতিবাচক প্রভাবও আছে। ইবরাহিম আলাইহিসসালাম দু'আ করেছিলেন,
وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ ﴿٨٤﴾
“এবং আমাকে পরবর্তী প্রজন্মগুলোর মাঝে সুখ্যাতি দান করুন।” (সূরাহ আশ-শু'আরা ২৬:৮৪)
এক ব্যক্তি ভালো কাজ করার পর লোকে তার প্রশংসা করে। এমন ব্যক্তি সম্পর্কে নবিজি (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দেন,
تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ
“এটা তো দুনিয়াতে মুমিনের জন্য সুসংবাদ।”[৪৮]
তিনি আরো বলেন,
إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তিনটি ছাড়া তার বাকি সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং তার জন্য দু'আ করা নেক সন্তান।”[৪৯]
আমাদের অহংবোধ আমাদের অন্যসব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মতোই। মানবস্বত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। কেউ পারে, কেউ একটু কম পারে। এটা যৌনক্ষুধার মতোই। বংশবিস্তারের জন্য এটি জরুরি, কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণে না রাখলে তুলকালাম অবিচার ছড়িয়ে পড়ে। আমরা নিজেদের ব্যাপারে ভালো করে জানলে টের পাব কখন আমরা অহংয়ের দাস হয়ে যাই। এই জায়গাগুলো সনাক্ত করতে পারলে নিজেরাও যেমন সুখী থাকতে পারব, অন্যদের সাথেও সঠিক আচরণ করতে পারব। নিজের অহংকার মাপার একটি পদ্ধতি হলো নিজের কথার দিকে খেয়াল করা। এক দিনে আপনি কয়বার 'আমি' শব্দটি ব্যবহার করেন? মানুষের মুখে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর মাঝে এটি একটি। আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়ে থাকলে, এখনই সময় পরিবর্তনের।
টিকাঃ
[৪৬] সুনান তিরমিযি: ১১০৫
[৪৭] সুনান তিরমিযি: ৩৪৮৩
[৪৮] সহিহ মুসলিম: ২৬৪২
[৪৯] সহিহ মুসলিম: ১৬৩১
📄 চলুন, সম্প্রীতি গড়ি
'সমঝোতা'র চেয়ে 'সম্প্রীতি'র আলোচনা করাই আমার পছন্দের। আমি মতভেদ দূর করতে বা প্রশমিত করতে চাই না। দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় ক্ষেত্রেই এমন কিছু বিষয় আছে, যাতে মতভেদ কখনওই এড়ানো যাবে না। এসব মতভেদ বরং দরকারি ও উপকারী।
কিছু ব্যাপারে পার্থক্য না থাকলে তো মানুষ অনেক উপকারী বিকল্প থেকেই বঞ্চিত হয়ে যেত। এটা আল্লাহ তাআলার হিকমাহ যে তিনি আমাদেরকে নানা ভাষা, নানা রঙ সহ অনেক রকম বৈচিত্র দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই বৈচিত্র আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে।
সম্প্রীতি মানে আমাদের মতভেদকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পরিণত হতে না দিয়ে ইতিবাচক উপায়ে ব্যবহার করা। এর অর্থ মানুষের চিন্তাধারা এক করা নয়, বরং হৃদয়গুলোকে এক করা।
সম্প্রীতির একটি নৈতিক প্রেরণা আছে। এর দৃষ্টিভঙ্গি প্রশস্ত, শুধু জ্ঞান আর সচেতনতা বাড়ানোর মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু তথ্য জানলেই বা অপরপক্ষের মত শুনলেই মানুষের মতামত, আচরণ, আগ্রহ ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের এই পার্থক্য যেন কিছুতেই একে অপরের প্রতি আমাদের অন্তরগুলো কঠিন করে না দেয়।
সম্প্রীতি মানে হলো যেসব বিষয়ে আমরা একমত, সেগুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া। আর আমাদের সবার প্রয়োজনীয় মানবিক প্রচেষ্টায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। এমন অনেক বিষয়ে অন্যদের সাথে ইতিবাচক লেনদেনের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় ব্যাপারেও এ কথা খাটে।
এই প্রচেষ্টাগুলো আমাদের সময় ও মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। কুরআন-সুন্নাহ আমাদের এভাবেই আচরণ করতে শেখায়। আমাদের ভালো-খারাপ মানবিয় অভিজ্ঞতার সমষ্টি থেকে বোঝা যায় যে, সদিচ্ছা ও সম্প্রীতির সাথে একে অপরের সাথে কাজ করাই সর্বোত্তম। সাধারণ নীতি, বিশ্বাস, ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে একসাথে কাজ করলে আমরা সবাইই উপকৃত হই।
আমাদের মধ্যকার ছোট বা বড় পার্থক্যগুলো ভুলে যাওয়া ঠিক নয়। তবে এগুলোর ব্যাপারে এত সংবেদনশীল হওয়া যাবে না, যার ফলে সেগুলোই আমাদের চিন্তা ও আবেগের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এমন শক্তিশালী হতে হবে যেন মতপার্থক্যের ফলে তাতে ভাঙন সৃষ্টি না হয়।
জীবন কোনো যুদ্ধ নয়। সম্প্রীতি অর্থ ভদ্রভাবে দ্বিমত করা, প্রতিশ্রুতি সহকারে একমত হওয়া। এটি একটি জানাশোনা নৈতিক অবস্থান। বুদ্ধিবৃত্তির বৈধ অধিকার আর অহমিকার অবৈধ উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝে এটিই পার্থক্য গড়ে দেয়।
সম্প্রীতি মানে এক চিরন্তন দ্বন্দ্বে জয়লাভ করা। এই দ্বন্দ্ব আমাদের খেয়াল-খুশি ও লোভ-লালসার বিরুদ্ধে। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের স্বার্থান্বেষী চিন্তাগুলো অনেক সময়ই “দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠা”র ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়। ফলে তাদের সহজে চেনা যায় না।
আল্লাহ বলেন, كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَى ﴿٦﴾ أَن رَّاهُ اسْتَغْنَى ﴿٧﴾ “মানুষ অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করে। কারণ, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।” (সূরাহ আল-আলাক ৯৬:৬-৭)
সুমহান আল্লাহ, যিনি মানবমনের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর জটিলতাগুলো সম্পর্কে জানেন। يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ﴿١٩﴾ “আল্লাহ চক্ষুর অন্যায় কর্ম সম্পর্কেও অবগত; আর অন্তর যা গোপন করে, সে সম্পর্কেও।” (সূরাহ গাফির ৪০:১৯)
হৃদয়ের বিশুদ্ধতা শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তা যদি আপনার থাকে, তাহলে অন্যের সাথে সম্প্রীতি গড়ার জন্য আপনার চাই প্রতিপালকের সামনে বিনয়ী হওয়া, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান জানানো, এবং নিজের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায় ক্ষমা করা।
মনে রাখতে হবে যে, কাজের চেয়ে কথা সবসময়ই সহজ। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ও জাতি হিসেবে অগ্রসর হতে হলে তুচ্ছ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সকল কাজে সততার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।
কুরআনের এই দু'আ ভালো করে খেয়াল করি সবাই: رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿١٠﴾
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে ঈমান আনা ভাইদের ক্ষমা করে দিন। আমাদের অন্তরের মাঝে ঈমানদারদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আপনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু।” (সূরাহ আল-হাশর ৫৯:১০)