📄 মনে রবে কি না রবে আমারে?
পরবর্তী প্রজন্ম তাকে কীভাবে মনে রাখবে, এ নিয়ে মানুষ বড় চিন্তিত থাকে। ধনকুবেররা এজন্যেই নিজের নামে বিরাট বিরাট মিনার আর সৌধ বানিয়ে যায়। ফিরআউনের বহুকাল আগ থেকেই ইতিহাসে এ ধারা চলে আসছে।
ইসলাম এসব কাজকর্ম ভালো চোখে দেখে না। ইসলাম শেখায় যে, সকলের কবর একইরকম হবে। কোনো কবর উঁচু করা যাবে না বা সাজানো যাবে না। কারো কবরের উপর সমাধিস্তম্ভ বা সৌধ হবে না।
তারপরও আমরা সবাইই তো চাই ভালো কিছুর জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকতে। এই ইচ্ছার তাড়নায় আমরা কিছু অর্জন করতে চাই। এই ইচ্ছা একেবারেই স্বাভাবিক। এতে কোনো দোষ নেই। খাদ্য, যৌনতা ও সম্পদের মতোই এটিও আমাদের স্বাভাবিক ক্ষুধা। বাকিগুলোর মতো এটিকেও সীমার মাঝে রাখতে হবে, যেন এগুলো কোনো অপকারের কারণ না হয়।
আমি চলে যাবার পর মানুষ আমার ব্যাপারে কী ভাববে, তা নিয়ে আমার মনেও ভাবনা আসে। স্বীকার করতে দোষ নেই। প্রতিটি মানুষই কখনো না কখনো নিজেকে এ প্রশ্ন করে। আমাদের পূর্বপুরুষগণও জীবিত থাকতে এসব ভেবেছেন, কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীতে তারা নিজের চিহ্ন রেখে চলে গেছেন, বেশিরভাগের চিহ্নই টিকে থাকেনি। কীসে আমাদের মানুষে পরিণত করে, এ প্রশ্নেরই অংশ এটি। আমাদের স্বভাবের মধ্যেই এমন কিছু একটা আছে, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে মানুষ আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের নিয়ে কী ভাববে।
আমাদের মাঝে বেশিরভাগ মানুষই খুব অল্পসংখ্যক মানুষের কাছে স্মরণীয় থেকে মারা যাবে। যেমন- পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী। তাদের মাঝে কেউ হয়তো আপনার নামে ছোট একটি প্রবন্ধ লিখে পত্রিকায় বা অনলাইনে প্রকাশ করবে। খুব অল্প মানুষের নামই বিভিন্ন কারণে ইতিহাস বইয়ে বা এনসাইক্লোপিডিয়ার গ্রন্থপঞ্জিতে ঠাঁই পাবে। এক্ষেত্রে আপনার নাম জড়িয়ে থাকবে আপনার অর্জনের সাথে।
লেখক যদি চান বা জীবিতরা উৎসাহ পাবে বলে মনে করেন, তাহলে হয়তো আপনার নামের সাথে কিছু প্রশংসাবাক্যও জুড়ে দেবেন।
প্রথমবার আপনার নাম জানতে পারা পাঠকরা চিন্তা করবে তথ্যগুলো কতটুক সঠিক। লেখক কি যথাযথভাবে আপনার ব্যাপারে লিখেছে, না রঙ চড়িয়েছে? লেখক আরেকটু আগ্রহী হলে আপনার জীবন ও অর্জনের আরো কিছু খুঁটিনাটি হয়তো থাকবে আপনার জীবনীগ্রন্থে। পাঠক ভাবতে বাধ্য হবে যে, আসলেই আপনি বলার মতো কিছু করে গেছেন। কিন্তু সত্য হলো, যাদের জীবনী এত ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়নি বা একেবারেই বিস্মৃত হয়ে গেছে, তারাও একই পরিমাণ অনন্য ছিল।
জীবন চলবে জীবনের মতো। পৃথিবী ঘুরতে থাকবে। মানুষ তার কাজ করে যাবে। আপনার বা আমার অনুপস্থিতি একসময় কারো কোনো চিন্তারই কারণ হবে না। বরং কারো জন্য সুযোগ আসবে পৃথিবীতে আমাদের ফেলে যাওয়া খালি জায়গাটি দখল করার। তারপর নিজেদের সুযোগ-সুবিধামতো তারা নিজ নিজ মেধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে থাকবে।
মৃত্যুর অনিবার্যতা আমাদের আরো কঠোর পরিশ্রমী বানানোর কথা। গঠনমূলক কিছু করতে, দক্ষতা বাড়াতে, বিশ্বে আমাদের অবদান বাড়াতে প্রচণ্ড চেষ্টা করে যেতে হবে। সুনিশ্চিত প্রস্থান যেন আমাদের হতাশ বা অবসন্ন না করে দেয়। মৃত্যুর জন্য তাড়াহুড়াও করা যাবে না।
আমাদের দ্বীন আমাদের জীবনভর পরিশ্রম করতে শেখায়। আল্লাহ বলেন,
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ ﴿٩٩﴾
“তোমার প্রতিপালকের ইবাদাত করতে থাকো, যতক্ষণ না সুনিশ্চিত বিষয়টি চলে আসে।” (সূরাহ আল-হিজর ১৫:৯৯)
বিখ্যাত তাবিয়ি আমর বিন মায়মুন নবিজি (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, “পাঁচটি জিনিসের আগেই পাঁচটি জিনিসের সদ্ব্যবহার করো। বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতা, ব্যস্ততার আগে অবসর, এবং মৃত্যুর আগে জীবন।”[৪২]
নবি (ﷺ) বলেন, “এই পৃথিবীতে মুসাফিরের মতো থাকো।”
নবিজির কাছে এই উপদেশ শোনা ইবনু উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে নিজের উপলব্ধি বলেন, “এর অর্থ সকাল দেখার আশা না করে রাতে ঘুমোতে যাওয়া, রাত দেখার আশা না করে সকালে ঘুম থেকে ওঠা। কিন্তু সেইসাথে স্বাস্থ্য ও জীবন থাকতে থাকতেই এগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা।”
আমাদের চিরবিদায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্য সুযোগ। তারা নিজেদের মতো করে পৃথিবীতে অবদান রাখার সুযোগ পায়। সুমহান আল্লাহ, যিনি আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবন দান করেছেন, তিনি নিজে চিরস্থায়ী। যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম আর যুগের পর যুগ নিয়ে আসেন।
টিকাঃ
[৪২] মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ৩/৩০৬
📄 শান্তসৌম্য
একটি পুরনো প্রবাদ আছে, “মহাসাগর যত শান্ত, তত গভীর।” আরেকটি এরকম, “খালি কলসি বাজে বেশি।” দুটির সারকথা একই। শান্ত থাকা একটি গুণ। এর সত্যতা নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।
চারপাশ শান্ত ও নীরব থাকলে মানবমন সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করতে পারে। তেমনি চিন্তাবিদের মেজাজ ঠাণ্ডা থাকলে চিন্তা ভালোমতো করা যায়। বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ তোলপাড়ে টালমাটাল থাকলেই এটি হঠকারী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই প্রতিপক্ষকে রাগিয়ে দেওয়া সবসময় একটি বিখ্যাত কৌশল। প্রতিপক্ষ যদি মেজাজ গরম করে ফেলে, তাহলে তার পরাজয় অত্যাসন্ন। বিশেষ করে আপনি যদি শান্তভাবে মুখে হাসি ধরে রাখতে পারেন।
যারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখে, তাদের বর্ণনায় আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ ﴿٣٧﴾
"...তারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয়, তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।” (সূরাহ আশ-শুরা ৪২:৩৭)
নবিজি (ﷺ) আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “ক্রোধ হলো মানবহৃদয়ে প্রজ্বলিত অঙ্গারের মতো।” [৪৩]
নবিজি (ﷺ) এর চাচা আবু তালিবের মৃত্যুশয্যার ঘটনায় শেখার আছে অনেককিছু। নবিজি (ﷺ) সে ঘরে প্রবেশ করে আবু জাহেল ও আব্দুল্লাহ বিন আবি উমাইয়্যাহকে দেখতে পান। এরা ছিল কুরাইশ কাফিরদের নেতা। নবিজি (ﷺ) আবু তালিবকে বললেন, “চাচা, 'লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সাক্ষ্য দিন, যাতে আল্লাহর কাছে আমি আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারি।”
তা শুনে আবু জাহেল আর আব্দুল্লাহ বিন আবি উমাইয়্যাহ তেড়েফুঁড়ে উঠল, “আবু তালিব! তুমি বুঝি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ছেড়ে দেবে?” আবু তালিব মারা গেলেন। ইসলামকে সত্য জেনেও লোকলজ্জার ভয়ে তা গ্রহণ না করে চলে গেলেন। তবু নবিজি (ﷺ) বললেন, “আল্লাহ যতক্ষণ নিষেধ না করেন, ততক্ষণ আমি আপনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে যাব।”
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ ﴿۱۱۳﴾
“নবি ও অন্যান্য মুমিনদের জন্য জায়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, এ কথা প্রকাশ হবার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী।” (সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:১১৩)
নবিজি (ﷺ)-এর জন্য এ এক কলিজা-ছেঁড়া মুহূর্ত। তিনি তাঁর চাচাকে ভালোবাসতেন, যিনি নিজেও নবিজিকে ভালোবেসে তাঁর জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর বিষয়ে ভুল হয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান না আনা এবং এক আল্লাহর ইবাদাত না করা। নবিজি তাঁর চাচার কাছে ঈমানের সাক্ষ্যটি ছাড়া আর কিছুই চাননি।
নবিজি ভালো করেই জানতেন যে, মৃত্যুর সময় মানুষ সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকে। এ সময় চিন্তাশক্তি পরিষ্কার থাকে না। তাই তিনি শান্ত ও স্পষ্ট ভাষায় বললেন, “চাচা, ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সাক্ষ্য দিন, যাতে আল্লাহর কাছে আমি আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারি।”
নবিজি (ﷺ) এর প্রতিপক্ষরা যখন কুরাইশদের ধর্মের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আবু তালিবকে ফুসলাতে শুরু করল, তখনও তিনি তাদের সাথে তর্ক জুড়ে দেননি। তিনি কেবল নিজের শান্ত অনুরোধটির পুনরাবৃত্তি করলেন। নবিজির এ আচরণ থেকে আমরা শিখলাম যে, সঠিক হলেই মাথা গরম করার কোনো অধিকার আমরা পেয়ে যাই না। আমরা সত্যের উপর থাকলে বরং আরো শান্ত থাকব। রেগে গেলে চিন্তা ঘোলাটে হয়ে যায় ও কথা আটকে যায়।
বলা হয়ে থাকে, শান্ত স্বভাব হলো উত্তম গুণ। ভেবে দেখুন, শান্ত লোক সব জায়গায় সুবিধা পায়। মতৈক্য হোক বা মতপার্থক্য, গ্রহণ হোক বা প্রত্যাখ্যান। শান্ত স্বভাবের কারণে কারো ভালো গুণ বড় করে চোখে পড়ে আর দোষগুলো ঢাকা পড়ে যায়। এমনকি পাপাচারীও তার ভাবগাম্ভীর্যের কারণে پاپاچارের জন্য দোষারোপ থেকে মুক্ত হয়ে যেতে পারে। নবিজি (ﷺ)-এর কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, “কুস্তিতে যে অপরকে ধরাশায়ী করে, সে শক্তিশালী নয়। রাগের মাথায় নিজেকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই আসল শক্তিশালী।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
টিকাঃ
[৪৩] মুসনাদ আহমাদ: ১১১৫৮
📄 নৈতিক চরিত্রের পরীক্ষা
সকল জনপদ ও ধর্মেই নৈতিক সততা ও ন্যায়পরায়ণ আচরণকে অত্যন্ত সম্মান করা হয়। এটি নবিগণের আনীত বার্তার একটি মৌলিক অংশ। শেষ নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) তো বলেই দিয়েছেন, “আমাকে সৎ চরিত্রের পূর্ণতা প্রদানের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।”
এ ব্যাপারে যেহেতু সবাই একমত, সেহেতু বিস্তারিত বলার কিছু নেই। নৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে যারা প্রচার-প্রচারণা চালায় ও অশ্লীল আচরণ করে, তারাও নৈতিক চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে।
প্রথা বা অভ্যাসগত কারণেই কিছু পরিস্থিতিতে একজন মানুষ সুন্দর আচরণ করতে পারে। এটাও ভালো জিনিস। প্রখ্যাত সাহাবি আবুদ্দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সহ আরো কয়েকজনের বর্ণনাসূত্র থেকে জানা যায় নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
“জ্ঞান লাভ হয় শেখার মাধ্যমে আর নম্রতা লাভ হয় নম্র হওয়ার মাধ্যমে। যে কেউ কল্যাণ লাভ করতে চায়, তাকেই তা দেওয়া হবে। আর যে-ই মন্দ থেকে বাঁচতে চায়, তাকে তা থেকে বাঁচানো হবে।” (তারিখ বাগদাদ এবং তারিখ দিমাশক)
তবে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির আশায় সুন্দর আচরণ দেখানো মোটেই প্রশংসনীয় নয়। সত্যিকারের নৈতিকতা বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে আসে না, ধ্রুব থাকে। এজন্যই পুরনো এক আরবি প্রবাদে আছে, “কারো আসল চরিত্র জানতে চাইলে তার সাথে সফরে বের হও।”
স্বামীর আসল চরিত্র বুঝতে হলে দেখতে হবে দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সুখ ও দুঃখ উভয় সময়ে ঘরের ভেতর স্ত্রীর সাথে তাঁর আচরণ কেমন। এখানেই তাঁর নিজেকে সংবরণ করতে হয় এবং ধৈর্যের আসল পরীক্ষা হয়। অহংকার থেকে বেঁচে থাকা, ক্ষমাশীল ও সহনশীল হওয়া, সুন্দর আচরণ দেখানো ইত্যাদি সবই বিবাহিতজীবন ও সংসারজীবনে পরীক্ষিত হয়।
বন্ধুত্বের ব্যাপারেও একই কথা। পরিস্থিতি নির্বিশেষে ব্যক্তির আচরণ ধ্রুব ও নিষ্ঠাপূর্ণ হতে হয়। কত বন্ধুকে যে দুধের মাছি হিসেবে পাওয়া যায়, কিন্তু আসল দরকারের সময় থাকে অদৃশ্য!
বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠাবানদের জীবন সুন্দর ও বরকতময় হোক। এরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেরা বদলে যায় না এবং বিপদের সময় মুখ ঘুরিয়ে নেয় না। কতই না দুর্লভ এমন মানুষগুলো!
দীর্ঘ পরিচয় ও মেলামেশা থেকে কারো চরিত্রের দৃঢ়তা বা ঠুনকোভাব বোঝা যায়। এটাই নৈতিক চরিত্রের প্রথম পরীক্ষা।
আরেকটি পরীক্ষা আছে। ক্ষমতার পরীক্ষা। দুর্বল অবস্থায় অনেকে ভালো আচরণ দেখাতে পারে। কিন্তু এটা স্বভাবজাত নয়। অন্যরকম আচরণ করে দেখিয়ে দেবার ক্ষমতা নেই বলেই তারা অমন। এ ব্যাপারে প্রাচীন আরব কবি আল-মুতানাব্বি বলেন,
জুলুম করা তো মানবের স্বভাব না করলে বুঝবে সুযোগের অভাব।
আল-মুতানাব্বি হয়তো কথাটি অ্যারিস্টটলের থেকে ধার করে থাকবেন। অ্যারিস্টটল বলেছেন, "অত্যাচার মানবস্বভাবের অংশ। কেবল দুটি কারণেই মানুষ এ থেকে বিরত থাকে। হয় ন্যায়পরায়ণতা, নয়তো প্রতিশোধের ভয়।”
ক্ষমতা হাতে আসলেই ব্যক্তির আসল চরিত্র বেরিয়ে আসে। ক্ষমতা, সম্পদ, প্রতিপত্তি পেয়েও যদি কেউ নৈতিক মূল্যবোধ, অন্যের প্রতি মমতা, নম্রতা ও গালমন্দের জবাবে ক্ষমাশীলতা ধরে রাখতে পারে, তাহলেই সে সত্যিকারের মহান ও ভালো মানুষ।
কিন্তু হায়! আকস্মিক ক্ষমতা, খ্যাতি আর সম্পদ পেয়ে মাথা ঠিক রাখা মানুষের সংখ্যা বড়ই নগণ্য।
তৃতীয় পরীক্ষা হলো মতপার্থক্য। সমমনা মানুষদের সাথে প্রায় সবাইই ভালো আচরণ করে। কিন্তু আদর্শিক বা জাগতিক মতভেদ তৈরি হলে মানুষের আসল চেহারা বের হয়।
সম্মানার্হ ও সচ্চরিত্রবান একজন মানুষ সুবিবেচকের মতো ও স্পষ্ট ভাষায় নিজের মত তুলে ধরবে। আর ভিন্নমতের প্রতি অপমান ও অপবাদসূচক ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবে। নৈতিক চরিত্র যেকোনো ধরনের নীচ আচরণকে প্রতিরোধ করবে। যুক্তির বিচারে না পেরে আবেগে বিস্ফারিত হয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে।
এর বিপরীত স্বভাবের মানুষ একই পরিস্থিতিতে অন্য সবার প্রতি গালমন্দ ও নালিশ শুরু করে দেবে। এই অযাচিত আচরণ মুহূর্তেই তার নৈতিকতার প্রাসাদ ধসিয়ে দেবে। কেউ কেউ মিথ্যা ও অস্পষ্ট ভাষার আশ্রয় নিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রসঙ্গের বাইরে এনে ধরাশায়ী করতে চাইবে।
মতানৈক্যও সম্পর্কে ফাটল ধরাবে না, এ দাবি করা তো ভালো। কিন্ত আসল পরিস্থিতিতে মানুষ কী করে, সেটাই দেখার বিষয়। কিছু ধার্মিক তরুণকে দেখেছি নিজেদের মাঝে মতপার্থক্য হলে তারা এমনসব ভয়াবহ ভাষা ব্যবহার করে, যা শুনে হৃদয়টা ফেটে যায় আর চোখে পানি চলে আসে। পরস্পরকে নির্বোধ বলে ডাকে, অপমান করে, ধোঁকা, বিদ'আত, অনৈতিকতা ও কুফরের অভিযোগ করে। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি: এইসব নোংরা ঝগড়ার শেষ কোথায়? আল্লাহর মনোনীত ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত একটি উম্মাহর বৈশিষ্ট্য কবে এদের মাঝে আসবে? নিজেদের মাঝে ও শত্রুদের সাথে আচরণের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা কবে তাদের মাঝে আসবে?
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
"এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ কোরো না। ন্যায়বিচার করো। এটি তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:৮)
কখন আমরা বুঝব যে, ব্যক্তিগত আবেগ ও ক্রোধের বশে করা অনেক আচরণকে আমরা ধার্মিকতা ভেবে ভুল করি?
শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান বলে পরিচিত কিছু লেখককে দেখি। অথচ দ্বিচারিতা ও নির্লজ্জতায় তাঁরা এদের চেয়ে খারাপ না হলেও একইরকম।
মানুষের মনে আক্রমণাত্মক মনোভাব সুপ্ত থাকে। বের হয়ে আসার অপেক্ষা করে। আদর্শ বা রাজনীতিতে সামান্য মতভেদ আসামাত্রই সভ্যতার বাহ্যিক আবরণ ছুঁড়ে ফেলে হিংস্রভাবে একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মতভেদের সময়েও সহমর্মী আচরণ ধরে রাখতে শিখব কবে? কবে কাঙ্ক্ষিত শালীনতা বজায় রাখতে শিখব? কখন আমাদের মূল্যবোধ আর নৈতিকতাগুলো তত্ত্ব থেকে জীবনে অনূদিত হবে? টিকে থাকবে আমাদের জীবন ও সম্পর্কের পুরোটা সময় ধরে? ক্ষমতাধর প্রশাসক, মিডিয়ার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, সামাজিক প্রভাবশালী বা সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পরও এই আচরণগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে। মতভেদের সময়েও এই আচরণগুলো বজায় রাখতে হবে। নাহলে তো কাউকে ভুল করতে দেখলে বা কারো সাথে মতভেদ হলে আমাদের সামনে কেবল দুটিই বিকল্প থাকবে। সম্পর্ক শেষ করে ফেলা অথবা চুপ করে সহ্য করা।
যদিও আমি লিখছি, কিন্তু আমার কলম ধীর দ্বিধান্বিত। কলম যেন আমারই দিকে ফিরে বলছে, “তুমি নিজে কি এসব মানো?” জবাব দিতে হয়, “না, কিন্তু আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব বলে কথা দিচ্ছি, যতবারই হোঁচট খাই না কেন…”
📄 রাগের সময় আত্মসংবরণ
আমাদের সবাইকেই রাগ সামাল দিতে হয়। এ এমন এক অনুভূতি, যা সময়ে সময়ে জ্বলে উঠে আমাদের শক্তি পরীক্ষা করে। আমাদের সাথে যে অসদাচরণ করেছে, আমরাও তার পর্যায়ে নেমে যাই কি না- তার পরীক্ষা নেয়। কিছু মানুষ আসলেই রাগের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে। এর জন্য বেশ কিছু গুণ থাকা লাগে। এর মধ্যে আমি নয়টি গুণ নিয়ে এখানে কথা বলব।
১। ভুল করা ব্যক্তির প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও শিথিলতা
রাসূল (ﷺ)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন,
بِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ۖ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিনহৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।” (সূরাহ আলে ইমরান ৩:১৫৯)
এই আয়াতে খুবই উপকারী একটি শিক্ষা রয়েছে। মানুষকে কোমলতা ও সহজতার মাধ্যমে কাছে টানা যায়। কঠোরতা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে নয়। আল্লাহ বলেন, “...আপনি যদি রাগী ও কঠিনহৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।”
এই আয়াতে যে মানুষদের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা হলেন নবিজি (ﷺ)-এর সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম। ঈমান বাঁচাতে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে হিজরত করা এবং সেই মুহাজিরদের সাদরে বরণ করে নেয়া মানুষ। মুমিনদের মাঝে এঁদেরকে বলা হয়েছে “সবচেয়ে অগ্রবর্তী” (সূরাহ আত-তাওবাহর ১০০ তম আয়াত দ্রষ্টব্য)। তাঁদের পরে আসা মানুষদের কাছে তাঁদের চেয়ে বেশি কিছু কী করে আশা করা যায়? আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চেয়ে অনেক নিচের সারিতে অবস্থান করা আলিম, ইসলামি কর্মী ও নেতাদের কাছে কতটুকুই বা আশা করা যায়? তাই দয়া ও ক্ষমাশীলতা ছাড়া অন্যকিছুকে ভিত্তি ধরে ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব।
আবুদ্দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে অপমান করা এক লোককে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, "আমাদের গালমন্দ কোরো না। সমঝোতার কিছুটা সুযোগ রাখো। আমাদের ব্যাপারে যারা আল্লাহকে অমান্য করে, তাদের প্রতি আমরা একই ভাষায় উত্তর দিই না। বরং তাদের ব্যাপারে আমরা আল্লাহকে মান্য করি।”
ইমাম আশ-শা'ফিকে এক লোক অপমান করায় তিনি উত্তর দেন, “তুমি যেমনটা বললে, আমি সত্যিই এমন হয়ে থাকলে আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আর আমি সেরকম না হয়ে থাকলে আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন।"
খলিফা মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে এক ব্যক্তি একদম সরাসরি খুব কটু ভাষায় অপমান করল। তিনি সেই ব্যক্তির জন্য দু'আ করলেন ও তাকে কিছু অর্থসাহায্যও করলেন। এভাবেই তিনি সেই ব্যক্তির কটু কথার জবা দিলেন।
আমরা যেন আরো বেশি গ্রহণশীল, ধৈর্যশীল ও সহনশীল হই। নম্রতা অনুশীলন করতে করতেই চরিত্রে নম্রতা আসে।
নবিজি (ﷺ) থেকে আবুদ্দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “জ্ঞান লাভ হয় শেখার মাধ্যমে আর নম্রতা লাভ হয় নম্র হওয়ার মাধ্যমে। যে কেউ কল্যাণ লাভ করতে চায়, তাকেই তা দেওয়া হবে। আর যে-ই মন্দ থেকে বাঁচতে চায়, তাকে তা থেকে বাঁচানো হবে।”
নিজেদের ভেতরটার দিকে তাকাতে হবে। অন্যের সাথে আচরণ করার আগে নিজেদের ঠিক করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, ইসলামি সম্ভাষণ হলো “আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।” নবিজি (ﷺ) আমাদের আদেশ করেছেন ঘরে প্রবেশের সময় এই সম্ভাষণ প্রদান করতে। আল্লাহ বলেন,
“ঘরে প্রবেশের সময় নিজেদেরকে সালাম প্রদান করবে।” (সূরাহ আন-নূর ২৪:৬১)
শিশু-বৃদ্ধ, পরিচিত-অপরিচিত সকলকেই আমরা এই সম্ভাষণ দিই। নবিজি (ﷺ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,
أَيُّ الإِسْلَامِ خَيْرٌ "কোন ইসলাম উত্তম?”
নবি (ﷺ) বললেন,
تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ "অভাবীকে আহার দান করা এবং পরিচিত-অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা।" [৪৪]
আম্মার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “কেউ যদি তিনটি জিনিস অর্জন করে, তাহলে ঈমানের স্বাদ বুঝতে পারবে। নিজের প্রতি ন্যায়বিচার করা, সকলকে সালাম দেওয়া, অভাবের সময়েও দান করা।” (সহিহ আল-বুখারি)
এই শান্তির সম্ভাষণের অনেক অর্থ রয়েছে। একটি অর্থ হলো যাকে সালাম দেওয়া হয়েছে, সে আপনার কথা, চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বা অত্যাচারিত হবে না।
এই সম্ভাষণ শান্তি, নিরাপত্তা, দয়া ও অনুগ্রহের দু'আ। বহুল ব্যবহৃত এই কথাগুলোর অর্থ বুঝে এগুলোকে জীবনযাপন ও আচার-আচরণের পদ্ধতি বানিয়ে নিতে হবে।
২। মহানুভবতা ও সর্বোচ্চ সুধারণা
প্রতিপক্ষের উপর প্রতিশোধ নেবার ক্ষমতা থাকলেও ক্ষমা ও সহনশীলতার মাধ্যমে জবাব দেওয়া যায়। এটি সত্যিকারের মহানুভবতা। কথায় আছে, “সর্বোত্তম গুণ হলো প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকলেও মাফ করে দেওয়া এবং দারিদ্র্যের সময়ও দানশীল হওয়া।" আল্লাহ বলেন,
وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ﴿٤٣﴾
“আর যে কেউ ধৈর্য ধরে ও ক্ষমা করে, নিঃসন্দেহে তা দৃঢ়চিত্তের পরিচায়ক।” (সূরাহ আশ-শুরা ৪২:৪৩)
মক্কাবিজয়ের দিন কুরাইশ জমায়েতের উদ্দেশে নবি (ﷺ) বলেন, “তোমাদের সাথে আমি কী করব বলে মনে করো?”
তারা বলল, “উত্তম আচরণ। আপনি একজন সম্মানিত ভাই এবং একজন সম্মানিত ভাইয়ের ছেলে।”
তিনি বললেন, "যাও, তোমরা মুক্ত।”
ইউসুফ আলাইহিসসালামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ভাইয়েরা অবশেষে তাঁর কব্জায় এলে তিনি তাদের বলেন,
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ﴿٩٢﴾
"আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন, এবং তিনি দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সূরাহ ইউসুফ ১২:৯২)
৩। মহৎ মানসিকতা
কিছু অপমানের জবাব দেওয়া মানে নিজেকে আরো ছোট করা। অপমান সহ্য করে হাসিখুশি থাকার অভ্যাস করতে হবে। ধীরে হলেও নিয়মিত আত্মসংবরণের অনুশীলন করে যেতে হবে।
৪। শুধুই আল্লাহর কাছে প্রতিদান চাওয়া
রাগ একটি তিক্ত জিনিস। মাঝেমাঝে আল্লাহর রহমত ও পুরস্কারের আশায় কষ্ট করে হলেও তা গিলে ফেলতে হয়।
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন,
مَنْ كَظَمَ غَيْظًا - وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ - دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ مَا شَاءَ
“রাগ প্রকাশের ক্ষমতা থাকার পরও যে আত্মসংবরণ করবে, কিয়ামতের দিন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে সবার মাঝ থেকে ডেকে নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো পবিত্র সঙ্গী বেছে নেবার অধিকার দেবেন।”[৪৫]
এসব জিনিস নিয়ে কথা বলা সহজ। এতে কোনো পরিশ্রমও লাগে না। আমার মনে হয় রাগের সময় আত্মসংবরণ করা নিয়ে যে কেউই সুন্দর বক্তৃতা দিতে পারবে। কিন্তু আসল সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। ওই সময়টার জন্য আমাদের যেন আগে থেকেই ধৈর্য, মহানুভবতা, ক্ষমাশীলতার চর্চা থাকে। নাহলে কথা ও কাজের পার্থক্য দেখে আমরা আচমকা স্তম্ভিত হয়ে যাব।
৫। লজ্জাশীলতা
যে আমাদের উপর অন্যায় করছে, আমরাও তার মতো একই পর্যায়ে নেমে যেতে পারি না, এটা করার আগে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। জ্ঞানী লোকেরা বলেছেন, “নির্বোধকে সহ্য করা তার স্বভাব গ্রহণ করার চেয়ে ভালো। কারো অজ্ঞতা অনুকরণ করার চেয়ে উপেক্ষা করা ভালো।"
তাইফ থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে নোংরা আচরণের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেবার ঘটনাটি দেখুন। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সেসময়ের কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি একবার তাঁকে (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, “উহুদের যুদ্ধের চেয়েও খারাপ কোনো দিন কি আপনার গেছে?” নবিজি (ﷺ) বললেন,
তোমার গোত্র আমাকে বড় যন্ত্রণা দিয়েছে। আর এর মাঝেও সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিল আকাবাহর দিন। সেদিন আমি ইবনু আব্দু ইয়ালাইল বিন আব্দু কুলালের সামনে উপস্থিত হই। তিনি আমার অনুরোধ রাখলেন না। আমি মনে খুব কষ্ট নিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে সামনে এগিয়ে চললাম। একসময় কারনুস সালিবে উপস্থিত হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে দেখলাম একটি মেঘখণ্ড এগিয়ে আসছে। আমি এর মাঝে জিবরিলকে দেখলাম।
তিনি আমাকে ডেকে বললেন, "আপনার জাতির লোকেরা আপনাকে যা যা বলেছে ও বিতর্ক করেছে, তা আল্লাহ শুনেছেন। আল্লাহ আমার সাথে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। আপনার যা করার ইচ্ছা হয়, তাকে তা আদেশ করুন।" পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডেকে সালাম দিয়ে বললেন, “হে মুহাম্মাদ! যা চান, আদেশ করুন। আপনি চাইলে আমি তাদের দু পাহাড়ের মাঝে পিষে ফেলব।”
আমি বললাম, “না। আমি আশা করি আল্লাহ এদের বংশধরদের থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদাত করবে। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
৬। দয়া ও মহানুভবতা ঈমানের অঙ্গ
আমাদের অন্তর প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে সক্ষম। তাই আমাদের উচিত একে নিয়মিত মহানুভবতার অনুশীলন করানো। আমাদের শিখতে হবে কীভাবে নিজের অধিকার খুশিমনে ছেড়ে দিতে হয় এবং প্রত্যেকবার নিজের পাওনা দাবি করা পরিহার করতে হয়। হৃদয়কে মমতার চর্চা করাতে হবে।
হৃদয়ে যদি অন্যদের প্রতি ভালোবাসার আবাদ করতে পারেন, তাহলে তা কখনও তাদের দ্বারা কষ্ট পাবে না। প্রতিবার নতুন অতিথি এলে তা প্রশস্ত হয়ে জায়গা করে দেবে। প্রতিটি যোগ্য ব্যক্তিকে সে টেনে নেবে।
প্রতিরাতে ঘুমোতে যাবার আগে অন্তরকে মহানুভবতা ও সহনশীলতা শিক্ষা দিন। দেখবেন ঘুম শান্তির হবে। যে কেউ যেভাবেই আপনার প্রতি অন্যায় করে থাকুক, তাদের মাফ করে আল্লাহর কাছে তাদের সংশোধনের দু'আ করুন। এতে আপনিই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।
মানুষ তাকাবে বলে প্রতিদিন যেমন কয়কবার আমরা মুখ ধুই, তেমনি অন্তরকেও পরিষ্কার করতে হবে। কারণ আল্লাহ আমাদের অন্তর দেখেন। নবিজি (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ বা সম্পদ দেখেন না। তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ দেখেন।"
আল্লাহ যেহেতু আমাদের অন্তর দেখেন, তাই এর ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। মহত্তম চিন্তা ও সুন্দরতম সংকল্প থাকতে হবে। প্রতিদিন অন্তর থেকে হিংসা, ঘৃণা, কুচিন্তার আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। জীবনে ইতিবাচক অগ্রগতির পথে এসব আবর্জনা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৭। মুখের উপর লাগাম
অন্য কেউ অপমান করতে শুরু করলে নিজেকে সামলানো বড্ড মুশকিল। এর জন্য কঠিন প্রত্যয় দরকার। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় পাল্টা জবাব দেওয়ার পেছনে শক্তি ব্যয় করার চেয়ে নীরবতার পেছনে শক্তি ব্যয় করলে লাভ বেশি।
নীরবতার মাধ্যমে জবান ও অন্তরের হেফাজত হয়, মূল্যবান সময় বাঁচে। তাই তো আল্লাহ মারইয়াম আলাইহাসসালামকে বলতে বলেন,
إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنسِيًّا ﴿٢٦﴾
"আমি পরম করুণাময়ের জন্য চুপ থাকার মানত করেছি। অতএব আজ আমি কোনো মানুষের সাথে কিছুতেই কথা বলব না।” (সূরাহ মারইয়াম ১৯:২৬)
পাল্টাপাল্টি তর্ক ও ঝগড়ায় অন্তর আহত হয়, লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়।
৮। পরিণতির ভাবনা
সার্বিক কল্যাণের জন্য কোনটি বেশি জরুরি, তা নিরীক্ষা করে বুঝে নেয়া দরকার। এজন্যই পৌত্র হাসান ইবনু আলির প্রশংসায় নবিজি (ﷺ) বলেন, “আমার এই নাতি এক নেতা। হয়তো বিবাদমান দুটি মুসলিম পক্ষের মাঝে আল্লাহ তার হাত দিয়ে মীমাংসা করাবেন।” (সহিহ আল-বুখারি)
এ থেকে বোঝা যায় যে, সকলের জন্য কল্যাণকর বিষয়ে খেয়াল রাখা মহত্ত্বের লক্ষণ। যেমন- ঐক্য রক্ষা, যুদ্ধ বন্ধ করা।
৯। অতীতের ভালো কাজ স্মরণ ও স্বীকার করা
নবিজি (ﷺ) বলেন, “অপরের গুণ স্বীকার করা ঈমানের অঙ্গ।”
ইমাম আশ-শাফিঈ বলেন, “মহৎ মানুষের প্রতি এক মুহূর্তের জন্য মহানুভবতা দেখালেও তিনি তার সম্মান করেন। এক মুহূর্তের জন্যও উপকার করা প্রতিটি মানুষের সাথে তিনি সুসম্পর্ক বজায় রাখেন।”
টিকাঃ
[৪৪] সহিহ মুসলিম: ৬৫
[৪৫] সুনান আত-তিরমিযি এবং সুনান আবু দাউদ