📄 সত্যিকারের অংশগ্রহণ
বিশ্বায়নের হুমকি ও প্রতিশ্রুতি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এটি এত মহাপরিবর্তনের ইঙ্গিত নিয়ে আসছে যে, আজকের মুসলিম বিশ্বের তোলপাড় ও আন্দোলনগুলোকে দোষ দেওয়া যায় না। 'সার্বজনীনতা' ও 'আন্তর্জাতিকতা'র সাথে বিশ্বায়নকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। এটি বরং অর্থনীতি, যোগাযোগ, মানবিয় মূল্যবোধ সহ সবকিছুর আকৃতি-প্রকৃতিতে এক নতুন ধরণের পরিবর্তন।
বিশ্বায়নের ক্লাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানেরা। এ থেকে মনে হচ্ছে যে, এটি আসলে ছদ্মবেশী 'আমেরিকায়ন', বিশ্বশোষণ আর সাংস্কৃতিক একীভবনের হীন কৌশল।
মুসলিমরা এই ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করছে বটে। কিন্তু তারা বড় দুর্বল, বিভক্ত, ও অমনোযোগী। এ যেন অলিম্পিক প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে এক খোঁড়া ব্যক্তির ম্যারাথন প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বপ্ন।
অনেকেই বিশ্বায়নের দিকে সতর্ক চোখ রাখছে। এর কারণও আছে। এটা নিয়ে শুধু দুশ্চিন্তা করাই যথেষ্ট নয়। বিশ্বায়নের মাধ্যমে আনীত পরিবর্তনগুলো বিপজ্জনক হতে পারে, এটা জানা থাকা ভালো। কিন্তু একইসাথে একে দেখতে হবে এমন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে, যেখান থেকে অনেক সুবিধা বের করে নেবার সুযোগও আছে।
কোনো নির্দিষ্ট কৃত্রিম স্যাটেলাইট বা প্রশাসনব্যবস্থা বা আইনের মধ্যে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বরং ভাবতে হবে আমরা কি স্রোতের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিযোগিতা করতে আর নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রস্তুত, নাকি দূর থেকে বসে শুধু প্রতিবাদ আর অভিযোগ করাই যথেষ্ট?
এটা কি আমাদের ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচারের মোক্ষম সুযোগ নয়? সুদমুক্ত ব্যাংকিং ও বিনিয়োগব্যবস্থা চালু করে সুদের নিষ্পেষণ দূর করার কি এখনই সময় নয়?
মিডিয়া ব্যবহার করে ইসলামের অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দেবার এটাই কি যথার্থ সময় নয়? এভাবেই কি আমরা পারি না আমাদের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করে ইসলামি অনুশাসনের সাথে পরিচয় করাতে?
আমাদের স্থবির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে উন্নত করার এখনই কি সময় নয়? এই উন্নয়ন বিজাতীয়দের দেখানো শোষণমূলক রূপরেখা অনুযায়ী হবে না। বরং ইসলামের সত্যিকারের নিরাপদ ও কল্যাণকর মহান আদর্শ অনুযায়ী হবে।
ইসলামই সবচেয়ে স্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে আমাদের মানবাধিকার রক্ষা করে। এটি জনগণের আস্থা ও ঐক্য নিশ্চিত করে এবং মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সম্পর্কের শক্তি বৃদ্ধি করে আমাদের অবস্থা উন্নয়নের নির্দেশনা দেয়। ইসলামের দাবি হলো সমবায়ভাবে প্রকল্প আয়োজন করে আমাদের দেশ ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আমরা ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ সমাধান বের করা ছাড়াই আমরা এ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
আমাদের একমত হতে হবে যে, অংশগ্রহণ এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিমদের কল্যাণকামী সকলের জন্য আমাদের অংশগ্রহণ হবে একটি মৌলিক ভিত্তি। এর অর্থ এই না যে, ব্যক্তি ধরে ধরে সকলকে অংশগ্রহণ করতে হবে। তবে অন্তত এই মূলনীতির ব্যাপারে একমত হতে হবে।
বহু বছরের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পরই কেবল সৌদি আরবের লোকেরা স্থানীয় মিডিয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। অথচ স্যাটেলাইট টেলিভিশন চালু করার সিদ্ধান্ত তারা কত অল্প সময়ে নিয়ে নিল!
প্রতিটা ব্যাপারেই কি আমাদের উত্তপ্ত বিতর্ক করে তারপর সিদ্ধান্তে আসতে হবে?
আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। এই জিনিসগুলো হবে কি হবে না, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা এতে অংশগ্রহণ করব কি না, এতটুকু সিদ্ধান্তই আমাদের হাতে আছে। ট্রেন কিন্তু ছেড়ে দিচ্ছে। উঠতে চাইলে এখনই উঠতে হবে।
প্রশ্ন আর আপত্তি তো অসংখ্যবার তোলা যায়। শেষমেশ অনেক দেরিতে গিয়ে দেখা যায় অংশগ্রহণই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
কিছু মানুষ অন্তত এই কাজের পরিসরে বাস্তবেই অংশ নিক। সকলের অংশ নেয়া জরুরি না। তবে অন্তত অংশগ্রহণের বাস্তবতার ব্যাপারে সকলে একমত হই।
অংশগ্রহণের অর্থ আত্মসমর্পণ বা আত্মপরিচয় হারানো নয়। এর অর্থ হলো চারপাশে ব্যবহৃত হতে থাকা হাতিয়ার ও মাধ্যমগুলো দিয়ে ইসলামি কার্যক্রমের সূচনা। কোনো জিনিসকে ভুল বা আপত্তিকর বলে ঘোষণা করাটাই ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের আসল শিক্ষা হলো ভুলকে যথাসাধ্য সংশোধন করা। নবিজি (ﷺ) এর মাক্কি ও মাদানি উভয় জীবনই এর সাক্ষ্য বহন করে।
ভবিষ্যতের সুরক্ষা ও বর্তমানের নিরাপত্তার জন্য মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাগুলোর যথাসম্ভব ব্যবহার শুরু করতে হবে।
গণমাধ্যম, সংলাপ, শিক্ষা, রাজনীতি, নির্বাচন, সংগঠন... এই সব জায়গায় মানুষ জড়িত হতে পারে। সামনে কেবল দুটো বিকল্প। একটি হলো নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে জায়গায় বসে থাকা এবং কোনো প্রভাব ফেলতে না পারা। আরেকটি হলো সরাসরি যুক্ত হয়ে নিয়ন্ত্রকের আসনে ভাগ বসানো। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ ও পারদর্শী মুসলিমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশ নেবে। স্বার্থসিদ্ধি বা খ্যাতির লোভে নয়, ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি সত্যিকার দরদের কারণে নিষ্ঠার সাথে এ কাজগুলো করতে হবে। উপরন্তু এই অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে প্রশস্ত; দলান্ধ নয়।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এই ধরনের সত্যিকারের অংশগ্রহণ অত্যাসন্ন। অন্যের মতকে দমন করে এটি আসতে পারবে না। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সহযোগিতার অনুকূল একটি পরিবেশ সৃষ্টি করলেই তা সম্ভব। অন্যের মতকে কখনই চিরতরে দমিয়ে রাখা যায় না।
নিষ্ঠা এবং সততা থাকলে আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী। আমরা তাঁর কাছেই আমাদের সকল আশা প্রত্যর্পণ করি।
📄 সকল নবির সুন্নাহ
একবার রমজান মাসে মসজিদুল হারামে এক যুবকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি উমরাহ করতে এসেছিলেন। তাঁর মাথায় ছিল সাদা পাগড়ি আর কাঁধ পর্যন্ত বাবড়ি চুল। পরনের জোব্বা ছিল পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত লম্বা। জোব্বার উপর কালো রঙের চাদরের মতো একটি পোশাক ছিল। রমজানের এই ভিড়েও মক্কায় তাকে আলাদা করে চোখে পড়ছিল।
তিনি আমার পাশে বসা অবস্থায় আমি তাকে তার বেশভূষার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন যে, তিনি নবিজি (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করছেন।
আমি এই সুযোগে তাকে জানিয়ে দিলাম যে, পাগড়ি পরা সুন্নাহ নয়। প্রাক- ইসলামি যুগ থেকেই এটি একটি আরব সাংস্কৃতিক পোশাক। নবিজি (ﷺ) এটা পরতেন, কারণ এটাই তাঁর এলাকার প্রথা। এটা যেমন ধর্মীয় বিধান নয়, তেমনি হারামও নয়। পাগড়ির ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস নেই। এটা এমনি সাংস্কৃতিক বা প্রথাগত বিষয়।
তারপর ব্যাখ্যা করে দিলাম যে, চুলের দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফাতওয়াও এই যে, এটাও প্রথার উপর নির্ভরশীল। নবিজি (ﷺ)-এর চুলের দৈর্ঘ্য ইবাদাত সংক্রান্ত কোনো সুন্নাহ নয়। সুন্নাহ হলো যেটার ব্যাপারে নবিজি (ﷺ) আমাদের আদেশ করেছেন। আর তা হলো চুল পরিপাটি রাখা। চুলের দৈর্ঘ্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
তারপর বললাম, "আপনি উমরাহ করছেন। উমরাহর সময় পুরুষের মাথা কামানো যে সুন্নাহ, এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। নবিজি (ﷺ) আল্লাহর কাছে তিনবার এই বলে দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ! তাদের ক্ষমা করে দিন, যারা মাথামুণ্ডন করেছে...!' তারপর মাত্র একবার বলেছেন, '...আর যারা চুল কেটেছে।' এত স্পষ্ট একটি সুন্নাহ আপনি ত্যাগ করলেন কেন?"
সবশেষে আমি তাকে এই উপদেশ দিলাম, "আপনার সত্যিকার নিয়তের ব্যাপারে সতর্ক হোন। বিশেষত নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে। আলিমদের মতপার্থক্যপূর্ণ কোনো বিষয়ে নির্দিষ্ট ধরণের বাহ্যিক আচরণ করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করবেন না। এটা শয়তানের একটা সূক্ষ্ম চাল। মনে রাখবেন, নবিজি (ﷺ) আমাদের এমন পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন, যা অযথা মনোযোগ আকর্ষণ করে।”
এই সুন্নাহর কথাই যুবক ভাইটি বেমালুম ভুলে ছিলেন। [৩৮]
সুন্নাহর ভুল ব্যাখ্যার এটা একটা উদাহরণ, যার কারণে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ও আসল বিষয়গুলো বাদ দিয়ে প্রথা ও অভ্যাসগত বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে বসে।
মানুষকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে পরীক্ষা করার জন্য সুন্নাহ আসেনি। মানুষের সাধ্যের বাইরের নিয়মনীতি আর তাত্ত্বিক অনুমান চাপিয়ে দেওয়া সুন্নাহর কাজ নয়। অন্য কিছু হলে খেয়ালই করত না, এরকম ব্যাপারে মানুষ যেন সুন্নাহ ভেবে অতিরিক্ত পেরেশান না হয়ে পড়ে। আর এসব ব্যাপারে এত আবেগী আচরণ করার ফলে যদি ইসলামি শরিয়তের সীমা লঙ্ঘিত হয়, তাহলে তা আরো খারাপ। যেমন- মানুষের অধিকার হরণ বা তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা। অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলো যেন আমাদের ঐক্য ও ঈমানের পরিচর্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাঘাত না ঘটায়।
নবি (ﷺ) এর সুন্নাহ খুবই মহান ও গভীর। ইবাদাতের খুঁটিনাটি সুন্নাহর অংশ হলেও শুধু এগুলোই সুন্নাহ নয়। এর পরিসর আরো বড় এবং প্রাসঙ্গিকতা আরো সাধারণ। নবুওয়াতের বার্তার উদ্দেশ্য যেসব মহান ধ্যান-ধারণার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, সে সবই সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের যে মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তা পূর্ণ করার জন্য সুন্নাহ একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আল্লাহ বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴿٥٦﴾
"নিশ্চয় আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরাহ আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)
সুন্নাহর উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন তার ঈমানের অর্থ তুলে ধরে, নেক আমলে এগিয়ে যায়, আর নিজেদের আচরণ সুন্দর করে। দ্বীনের খুঁটিগুলো (ঈমান, সালাত, যাকাত, রোজা, হজ্জ) কীভাবে পালন করতে হবে, তাও সুন্নাহ ব্যাখ্যা করে দেয়।
এ কারনেই আগেকার নবিগণের ব্যাপারে বলার সময় আল্লাহ তাঁদের সবচেয়ে বড় সুন্নাহর কথাই আমাদের জানান। আল্লাহ বলেন,
وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ ﴿٧٣﴾
"আর তাদেরকে আমি নেতা বানিয়েছিলাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত। আমি তাদের প্রতি সৎকাজ করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত প্রদান করার জন্য ওহী প্রেরণ করেছিলাম। আর তাঁরা আমারই ইবাদাত করত।” (সূরাহ আল-আম্বিয়া ২১:৭৩)
এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নেই নবিগণ কঠোর পরিশ্রম করেছেন। আলাইহিমুসসালাম। তাঁদের মিশন ও বার্তার মূল নির্যাস এটিই। কুরআনে আল্লাহ যে সুন্নাহর কথা বলেছেন এবং হাদিসে রাসূল (ﷺ) যা ব্যাখ্যা করেছেন, সেগুলোর ভিত্তি এটিই।
একটি হাদিসে জিবরিল আলাইহিসসালামের সাথে نبي (ﷺ) ইসলাম, ঈমান ও ইহসান নিয়ে কথা বলেন। সেখানেও আমরা এ কথাই দেখতে পাই। نبي (ﷺ) যেভাবে ইসলামি মূলনীতিগুলো প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করেছেন এবং নেক আমলগুলো যেভাবে করেছেন, তাতেও আমরা একই জিনিস দেখতে পাই। ইয়াকিন, নম্রতা, অন্তরের ইবাদাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, আল্লাহর ইবাদাতে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে যেভাবে তিনি ঈমানের প্রতিরক্ষা করেছেন, তাতেও একই কথা দেখতে পাই।
মানুষের মাঝে অস্থিরতা বা বিভক্তি আনার চেষ্টা কখনও তিনি করেননি। তাদের মাঝে দয়াশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি কোনো আপোস করেননি।
নবিজি (ﷺ) তাঁর অনুসারীদের আদেশ করেছেন, وَبَشِّرُوا وَلَا تُنفِرُوا “মানুষকে সুসংবাদ দাও। দূরে সরিয়ে দিও না।” [৩৯]
এগুলোই সুন্নাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। সুন্নাহর মাঝে কি আমরা নৈতিকতা ও দয়ার কোনো লঙ্ঘন দেখতে পাই? এগুলোই আল্লাহর বাণীর মৌলিক উদ্দেশ্য। সুন্নাহর মাঝে আমরা অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণার কোনো চাষাবাদ দেখি না। বরং এতে দেখি মহানুভবতা ও সুসংবাদ পৌঁছে দেবার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার।
নববি সুন্নাহর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় আমাদের পুনর্জীবিত করা দরকার, তা হলো ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা। যেমন- তিনি মানুষকে যেভাবে ধাপে ধাপে ইসলামের শিক্ষা দিয়েছেন, বিশেষত মাক্কি যুগে। এভাবে কাজ করতে ধৈর্য প্রয়োজন। আল্লাহ সকল নবিকেই ধৈর্যশীল বলে পরিচয় দিয়েছেন,
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ ﴿٢٤﴾ "আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম। তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত। কারণ তারা ধৈর্যধারণ করেছিল আর আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।” (সূরাহ আস-সাজদাহ ৩২:২৪)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দ্বীনি ব্যাপারে নেতৃত্ব লাভ করা যায় ধৈর্য ও ইয়াকীনের মাধ্যমে।
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর নবিজি (ﷺ) সময় নিয়ে একটি সমাজ গড়ে তুলেছেন। এখানে তাঁর অসাধারণ দূরদৃষ্টি ও পরিকল্পনা দেখা যায়। মানুষকে মানিয়ে নেবার সময় না দিয়ে রাতারাতি কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসার মতো অধৈর্য তিনি ছিলেন না। কিছু পদক্ষেপ দেখে অবস্থার অবনতি মনে হচ্ছিল। কিন্তু নবি (ﷺ) ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন কেন সেগুলোর দরকার ছিল।
এর একটি সুন্দর উদাহরণ হলো হুদাইবিয়ার চুক্তি। নবিজি (ﷺ) সে বছর হজ্জ না করে ফিরে যেতে এবং খুবই একপাক্ষিক একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে সম্মত হন। বেশিরভাগ সাহাবি একে মুসলিমদের জন্য পরাজয় ভেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু নবিজি ﷺ বুঝেছিলেন যে, এটি ইসলামের বিশাল একটি অর্জন। কুরআনে একে 'বিজয়' বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন, إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا ﴿ا﴾ “নিশ্চয় আমি আপনাকে দান করেছি এক স্পষ্ট বিজয়।” (সূরাহ আল-ফাতহ ৪৮:১)
এই চুক্তির ফলে আরব গোত্রগুলো মুসলিমদের সাথে সন্ধি করার স্বাধীনতা পায়। এভাবে অনেকে ইসলামে প্রবেশ করে। নবি ﷺ এই পরিস্থিতিগুলো ধৈর্যশীল ও চিন্তাশীল দৃষ্টিতে দেখেছেন। বৃহত্তর চিত্রের কথা মাথায় রেখে লক্ষ্য অর্জনে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিয়েছেন।
আরেকটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ হলো অন্যের অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার ব্যাপারে সচেতনতা। নবিজি ﷺ জানতেন মানুষের সাথে কীভাবে সম্পর্ক গড়তে হয়। তিনি সকলের প্রতি দয়া ও প্রাপ্য সম্মান দেখাতেন।
এছাড়াও তিনি অতীতের ভুল ক্ষমা করে দিতেন। এর ফলে অতীতের শত্রুভাবাপন্ন অনেক মানুষ পরে সহজে তাঁর কাছে আসতে পেরেছে। নববি সুন্নাহর এই দিকটিকে আজকের অনেক দাঈ উপেক্ষা করে যান। নবিজি ﷺ-এর বার্তা যারা প্রত্যাখ্যান করত, তাদের সাথে তিনি সেতু গড়ে তুলতেন। খোলাখুলি শত্রুতা করা মানুষদের জন্যও তিনি ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার একটি দরজা খোলা রাখতেন। অতীতে শত্রুতা করা কেউ যদি পরে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তাঁর কাছে আসত, তাহলে তিনি তাদের আগের ভুলের কথা বলে খোঁচাতেন না। বরং এমন আচরণ করতেন, যাতে তারা অতীতের কথা ভুলে যায়। এর সবচেয়ে নজরকাড়া উদাহরণ হলো মক্কাবিজয়ের পর তাঁর ঘোষণা: “যাও, তোমরা মুক্ত।”
এছাড়াও নবি মৃত মুশরিক ও কাফিরদের উপহাস করতে কিংবা অপমান করতে নিষেধ করে গেছেন। এর একটি কারণ হলো জীবিত কাফির-মুশরিকদের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বলেন,
لا تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَتُؤْذُوا الْأَحْيَاءَ “মৃত ব্যক্তিদেরকে তোমরা গালি দিও না, (যদি দাও) তাহলে জীবিতদেরই কষ্ট দিলে।" [৪০]
টিকাঃ
[৩৮] পাঠক যেন এখান থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছেন যে, মাথায় টুপি বা পাগড়ি বাঁধা, লম্বা চুল রাখা (যেভাবে রাসূল (ﷺ) এর ছিল) এসব করতে এখানে নিষেধ করা হচ্ছে। এমনটা নয়। শাইখ আওদাহ মূলত যুবক ভাইটির মূল সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ে অন্য বিষয়ে সিরিয়াস হওয়ার উদাহরণ টেনেছেন। মাথায় পাগড়ি পরা, লম্বা চুল রাখতে রাসূল (ﷺ) সরাসরি কোথাও না বললেও, এসব রাসূলের প্র্যাকটিস ছিল। আমাদের জানামতে শাইখ আওদাহ নিজেও মাথায় টুপি পরেন। তাই মাথায় টুপি/পাগড়ি পরা সুন্নাহ কি না, কেমন সুন্নাহ এসব বিতর্কে যাওয়া এখানে উদ্দেশ্য নয়, যারা এসব করেন নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর প্রতি ভালোবাসা থেকেই করেন। এখানে কোথাও সেই আমলকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে না।- সাজিদ ইসলাম
[৩৯] সহিহ আল-বুখারি: ৬৯
[৪০] সুনান তিরমিযি: ১৯৮২
📄 ব্যক্তিগত দায়িত্ব
ব্যক্তি-সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইসাথে ইসলামি জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আসলে পুনরুত্থান ও শেষবিচারের ভিত্তিই হলো ব্যক্তিগত দায়িত্বের বাস্তবতা। আমা দের সৃষ্টির ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। আমরা একেকজন অনন্য ব্যক্তি হিসেবে সৃষ্ট হয়েছি। আল্লাহ বলেন, ذَرْنِي وَمَنْ خَلَقْتُ وَحِيدًا ﴿۱۱﴾
"যাকে আমি অনন্য করে সৃষ্টি করেছি, তার ব্যাপারে আমিই ব্যবস্থা নেব।” (সূরাহ আল-মুদ্দাসসির ৭৪:১১)
পরকালে নিজ নিজ সম্পদ, পরিবার, দল বা স্বদেশীর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হাশরের মাঠে পুনরুত্থানের আশা করা যায় না। বাস্তবতা হলো, নিকটতম মানুষটিও সেদিন আপনাকে পরিত্যাগ করবে।
আল্লাহ বলেন, وْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ﴿٣٤﴾ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ﴿٣٥﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ﴿٣٦﴾ لِكُلِّ امْرِي مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ﴿۳۷﴾
“সেদিন মানুষ পালিয়ে বেড়াবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, মা ও বাবার কাছ থেকে, সঙ্গী ও সন্তানের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকের নিজের গুরুতর অবস্থাই তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।” (সূরাহ আল-আবাসা ৮০:৩৪-৩৭)
ইতিকাফের একটি হিকমাহ হলো ব্যক্তিগত দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ফিরিয়ে আনা। কারণ যেসব সামাজিক ও দলগত টান আমাদের চিন্তাচেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, ইতিকাফ আমাদের তা থেকে মুক্ত করে আনে। একাকী একজন ব্যক্তি হিসেবে মসজিদে আশ্রয় নিয়ে আমরা আমাদের স্বাভাবিক মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করি।
মানুষ চেঁচামেচি করে, ধাক্কাধাক্কি করে, নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। এ কারণেই আল্লাহ আমাদের একা হতে নির্দেশনা দেন:
قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُم بِوَاحِدَةٍ أَن تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا
"বলো, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু'জন অথবা এক একজন করে দাঁড়িয়ে যাও। অতঃপর ভাবনাচিন্তা করো।” (সূরাহ সাবা ৩৪:৪৬)
অন্যের মতকে তার প্রাপ্য সম্মান অবশ্যই দিতে হবে। কেউ আমাদের সাথে একমত হবে, কেউ হবে না। তবে তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু ইসলাম আমাদের যে স্বচ্ছ চিন্তাভাবনার দিকে ডাকে তা হলো, মানুষের খেয়ালখুশির অনুসরণ ত্যাগ করা।
সাধারণভাবে মানবজাতি যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়, ব্যক্তিগতভাবেও প্রত্যেকে সেসব সমস্যা মোকাবেলা করে। মুসলিম উম্মাহর সামনে আজ যেসব সমস্যা বিদ্যমান, ব্যক্তি মুসলিমের সামনেও তার বেশিরভাগ সমস্যা বিদ্যমান। ইসলাম যে ধরণের আত্মসচেতনতা অর্জনের আদেশ দেয়, তা অর্জন না করেই সমস্যার মুখোমুখি হলে মানুষ সহজেই অন্য কিছুর উপর দোষ চাপিয়ে দিতে পারে। এই জায়গাতে এসেই মানুষ বিশ্বায়ন, জায়নবাদ, গোপন ষড়যন্ত্র ইত্যাদির ঘাড়ে দোষ চাপায়। সরকার, আলিমসমাজ, তাকদীর, ইতিহাস কোনোকিছুই দোষারোপের হাত থেকে মুক্তি পায় না।
নিজের দোষ কখনো এরা দেখবে না। নিজের আদালতে তারা স্বভাবতই বেকসুর খালাস। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের মত, সব সঠিক। তারাই সব জানে। সবাই যদি বুদ্ধি করে তাদের অনুসরণ করত, তাহলেই তো দুনিয়ার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়!
এই মানুষগুলোই দেখবেন তাদের ঘরের ভেতরের সমস্যাগুলো সমাধানেও অপারগ। দুই আর দুই মিলিয়ে চারের সমাধান তারা বের করতে জানে না। এরা হতে পারে অনভিজ্ঞ, অপ্রশিক্ষিত, সিদ্ধান্তহীন। হতে পারে নিজের বদভ্যাস ও চরিত্রের ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে অপারগ।
নতুন নতুন দ্বীন মানতে শুরু করা অল্পবয়সীদের মাঝে এই প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়। এদের মাঝে অনেকেরই ধারণা সব সমস্যা সমাধানের চাবি তাদেরই হাতে। ঈসা আলাইহিসসালামের মতোই যেন তারা আল্লাহর আদেশে শ্বেতরোগীকে সুস্থ করতে পারে, অন্ধকে চক্ষুষ্মান করতে পারে, মৃতকে জীবিত করতে পারে।
কুরআন-সুন্নাহ যেন তারা একাই বোঝে। অন্যের অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতাকে দায়ী করা এদের কাছে কত যে সহজ!
এই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা মুসলিম উম্মাহর সার্বিক সমস্যা আরো গুরুতর করেছে। সমাধানে এর কোনো ভূমিকা নেই।
কোনো ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক অবস্থানের গুরুত্বের ভিত্তিতে তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব বিভিন্নরকম হয়। এই দায়িত্ব রাতারাতি গজিয়ে ওঠে না। এটি একটি ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের ভেতরে অবস্থান করে। দায়িত্ব মানে বোঝা বইতে জানা, কর্তব্য-অধিকার ঠিক রাখা, যা কিছু ঠিক তা তা করা।
সংজ্ঞা মতে যদিও ব্যক্তিগত দায়িত্বের মূল আলোচ্য ব্যক্তি নিজে, তারপরও এর কল্যাণ পুরো সমাজই লাভ করে। নবিজি (ﷺ) বলেন,
كُلُّ سُلامَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ - قَالَ - تَعْدِلُ بَيْنَ الإِثْنَيْنِ صَدَقَةٌ وَتُعِينُ الرَّجُلَ فِي دَابَّتِهِ فَتَحْمِلُهُ عَلَيْهَا أَوْ تَرْفَعُ لَهُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ - قَالَ - وَالْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ وَكُلُّ خَطْوَةٍ تَمْشِيهَا إِلَى الصَّلَاةِ صَدَقَةٌ وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
"প্রতিদিন শরীরের প্রতিটি জোড়ার উপর সদকার দায়িত্ব আসে। বিবাদমান দুই ব্যক্তির মাঝে মীমাংসা করা সদকা। কাউকে তার বাহনে চড়তে সাহায্য করা সদকা। তার কাছে তার মালপত্র তুলে দেওয়া সদকা। ভালো কথা বলা সদকা। সালাতের দিকে যেতে প্রতিটি পদক্ষেপ সদকা। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো সদকা।” [৪১]
কিছু না পারলেও রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করাও সদকা।
ব্যক্তিগত যেসব ফরজ ইবাদাতের কথা ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থাদিতে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো ব্যক্তিগত দায়িত্বেরই অন্তর্ভুক্ত। এই সব দায়িত্বগুলো দেওয়া হয়েছে ব্যক্তির ইসলামি চরিত্র উন্নয়নের উদ্দেশ্যে। এর ফলে সে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
তারপরও আমরা দেখি ব্যক্তিগত ত্রুটিবচ্যুতি কাটিয়ে না উঠেই অনেক মুসলিম বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। মুসলিম বিশ্বের দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত থাকে অথচ নিজের দেশের সমস্যা চোখ এড়িয়ে যায়। মানবজাতির অবস্থা নিয়ে মাতম করে অথচ নিজেরাই অজ্ঞতা, অলসতা ও ঈমানি দুর্বলতার মাধ্যমে নিজেদের উপর জুলুম করে।
অন্যের সম্পদ দখল, অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া, গীবত ও অপবাদ প্রদান, স্বার্থচিন্তা ইত্যাদি সমস্যায় যদি ব্যক্তি হিসেবেই আমরা ডুবে থাকি, তাহলে মুসলিম উম্মাহর সার্বিক সমস্যা নিয়ে আমরা কীভাবে কথা বলতে পারি? আমরা এমন হলে তো আমরা নিজেরাই সমস্যার অংশ।
তাই বিশ্বের সমস্যা সমাধান করার প্রথম ধাপ হলো নিজের ত্রুটিগুলো সংশোধন করা। সমাজসংস্কারের মহাসড়কে যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ হলো আত্মসংস্কার। পৃথিবীর সমস্যা নিয়ে আমরা এত ব্যস্ত যে, আত্মার সমস্যার দিকে আমরা তাকাই না। আত্মোন্নয়নের ও চিন্তাপদ্ধতি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমরা ফেলে রাখি। অথচ সার্বজনীন সমস্যা সমাধানে এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে। ব্যক্তি নিয়েই তো সংগঠন, প্রতিষ্ঠান আর জাতি। ইতিহাসে নাম লেখা না থাকলেও সকল ব্যক্তিরই ক্ষমতা আছে পরিবর্তন আনার পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার।
ইসলামের শুরুর যুগের ব্যাপক প্রসারের পেছনে শুধু ইতিহাসের পাতায় আসা নামগুলোর একার অবদান নেই। যারা যারা কষ্ট সহ্য করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, এমনকি জীবন দিয়েছেন; যেসব নারী তাঁদের সহযোগিতা করে গেছেন, কষ্ট সয়েছেন; সকলকেই স্মরণ করতে হবে।
ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণের কৃতিত্ব শুধু খলিফা আর সুলতানদেরই নয়। শ্রমিক, মিস্ত্রি, চিন্তাবিদ, পরিকল্পনাবিদ, বিনিয়োগকারী সকলেরই অবদান আছে; ইতিহাস তাঁদের মনে রাখুক বা না রাখুক।
কুরআন ও ইসলামি চিন্তাধারার শিক্ষায় ব্যক্তিগত দায়িত্বের ধারণা ওতপ্রোতভাবে গেঁথে আছে। সমাজ বিনির্মাণে এটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রতিটি দালান তৈরি হয়েছে অনেকগুলো ইট দিয়ে।
নবিজি (ﷺ) বলেন, “মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক একটি দালানের মতো। প্রত্যেকে পুরো কাঠামোকে অবলম্বন দান করছে।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
টিকাঃ
[৪১] সহিহ আল-বুখারি: ২৯৮৯, সহিহ মুসলিম: ১০০৯
📄 মনে রবে কি না রবে আমারে?
পরবর্তী প্রজন্ম তাকে কীভাবে মনে রাখবে, এ নিয়ে মানুষ বড় চিন্তিত থাকে। ধনকুবেররা এজন্যেই নিজের নামে বিরাট বিরাট মিনার আর সৌধ বানিয়ে যায়। ফিরআউনের বহুকাল আগ থেকেই ইতিহাসে এ ধারা চলে আসছে।
ইসলাম এসব কাজকর্ম ভালো চোখে দেখে না। ইসলাম শেখায় যে, সকলের কবর একইরকম হবে। কোনো কবর উঁচু করা যাবে না বা সাজানো যাবে না। কারো কবরের উপর সমাধিস্তম্ভ বা সৌধ হবে না।
তারপরও আমরা সবাইই তো চাই ভালো কিছুর জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকতে। এই ইচ্ছার তাড়নায় আমরা কিছু অর্জন করতে চাই। এই ইচ্ছা একেবারেই স্বাভাবিক। এতে কোনো দোষ নেই। খাদ্য, যৌনতা ও সম্পদের মতোই এটিও আমাদের স্বাভাবিক ক্ষুধা। বাকিগুলোর মতো এটিকেও সীমার মাঝে রাখতে হবে, যেন এগুলো কোনো অপকারের কারণ না হয়।
আমি চলে যাবার পর মানুষ আমার ব্যাপারে কী ভাববে, তা নিয়ে আমার মনেও ভাবনা আসে। স্বীকার করতে দোষ নেই। প্রতিটি মানুষই কখনো না কখনো নিজেকে এ প্রশ্ন করে। আমাদের পূর্বপুরুষগণও জীবিত থাকতে এসব ভেবেছেন, কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীতে তারা নিজের চিহ্ন রেখে চলে গেছেন, বেশিরভাগের চিহ্নই টিকে থাকেনি। কীসে আমাদের মানুষে পরিণত করে, এ প্রশ্নেরই অংশ এটি। আমাদের স্বভাবের মধ্যেই এমন কিছু একটা আছে, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে মানুষ আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের নিয়ে কী ভাববে।
আমাদের মাঝে বেশিরভাগ মানুষই খুব অল্পসংখ্যক মানুষের কাছে স্মরণীয় থেকে মারা যাবে। যেমন- পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী। তাদের মাঝে কেউ হয়তো আপনার নামে ছোট একটি প্রবন্ধ লিখে পত্রিকায় বা অনলাইনে প্রকাশ করবে। খুব অল্প মানুষের নামই বিভিন্ন কারণে ইতিহাস বইয়ে বা এনসাইক্লোপিডিয়ার গ্রন্থপঞ্জিতে ঠাঁই পাবে। এক্ষেত্রে আপনার নাম জড়িয়ে থাকবে আপনার অর্জনের সাথে।
লেখক যদি চান বা জীবিতরা উৎসাহ পাবে বলে মনে করেন, তাহলে হয়তো আপনার নামের সাথে কিছু প্রশংসাবাক্যও জুড়ে দেবেন।
প্রথমবার আপনার নাম জানতে পারা পাঠকরা চিন্তা করবে তথ্যগুলো কতটুক সঠিক। লেখক কি যথাযথভাবে আপনার ব্যাপারে লিখেছে, না রঙ চড়িয়েছে? লেখক আরেকটু আগ্রহী হলে আপনার জীবন ও অর্জনের আরো কিছু খুঁটিনাটি হয়তো থাকবে আপনার জীবনীগ্রন্থে। পাঠক ভাবতে বাধ্য হবে যে, আসলেই আপনি বলার মতো কিছু করে গেছেন। কিন্তু সত্য হলো, যাদের জীবনী এত ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়নি বা একেবারেই বিস্মৃত হয়ে গেছে, তারাও একই পরিমাণ অনন্য ছিল।
জীবন চলবে জীবনের মতো। পৃথিবী ঘুরতে থাকবে। মানুষ তার কাজ করে যাবে। আপনার বা আমার অনুপস্থিতি একসময় কারো কোনো চিন্তারই কারণ হবে না। বরং কারো জন্য সুযোগ আসবে পৃথিবীতে আমাদের ফেলে যাওয়া খালি জায়গাটি দখল করার। তারপর নিজেদের সুযোগ-সুবিধামতো তারা নিজ নিজ মেধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে থাকবে।
মৃত্যুর অনিবার্যতা আমাদের আরো কঠোর পরিশ্রমী বানানোর কথা। গঠনমূলক কিছু করতে, দক্ষতা বাড়াতে, বিশ্বে আমাদের অবদান বাড়াতে প্রচণ্ড চেষ্টা করে যেতে হবে। সুনিশ্চিত প্রস্থান যেন আমাদের হতাশ বা অবসন্ন না করে দেয়। মৃত্যুর জন্য তাড়াহুড়াও করা যাবে না।
আমাদের দ্বীন আমাদের জীবনভর পরিশ্রম করতে শেখায়। আল্লাহ বলেন,
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ ﴿٩٩﴾
“তোমার প্রতিপালকের ইবাদাত করতে থাকো, যতক্ষণ না সুনিশ্চিত বিষয়টি চলে আসে।” (সূরাহ আল-হিজর ১৫:৯৯)
বিখ্যাত তাবিয়ি আমর বিন মায়মুন নবিজি (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, “পাঁচটি জিনিসের আগেই পাঁচটি জিনিসের সদ্ব্যবহার করো। বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতা, ব্যস্ততার আগে অবসর, এবং মৃত্যুর আগে জীবন।”[৪২]
নবি (ﷺ) বলেন, “এই পৃথিবীতে মুসাফিরের মতো থাকো।”
নবিজির কাছে এই উপদেশ শোনা ইবনু উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে নিজের উপলব্ধি বলেন, “এর অর্থ সকাল দেখার আশা না করে রাতে ঘুমোতে যাওয়া, রাত দেখার আশা না করে সকালে ঘুম থেকে ওঠা। কিন্তু সেইসাথে স্বাস্থ্য ও জীবন থাকতে থাকতেই এগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা।”
আমাদের চিরবিদায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্য সুযোগ। তারা নিজেদের মতো করে পৃথিবীতে অবদান রাখার সুযোগ পায়। সুমহান আল্লাহ, যিনি আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবন দান করেছেন, তিনি নিজে চিরস্থায়ী। যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম আর যুগের পর যুগ নিয়ে আসেন।
টিকাঃ
[৪২] মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ৩/৩০৬