📄 সহাবস্থান করতে শেখা
সহাবস্থানের কথা উঠলেই মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ খুব সতর্ক হয়ে উঠেন। তারা ভাবেন সহাবস্থান করতে হলে আমাদের ইসলামি শরিয়ত ত্যাগ করতে হবে। অথবা তারা ভাবেন এটা আসলে ইসলামের ভেতর বিজাতীয় ধ্যানধারণা প্রবেশ করানোর ফাঁদ।
সহাবস্থানের ব্যাপারে মুসলিমদের আরেকটি সন্দেহের কারণ হলো তারা একে পশ্চিমে জন্ম নেয়া একটি ধারণা বলে মনে করেন। পশ্চিমারা হয়তো এই জিনিসটার মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করে দিতে যায়, যাতে মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমের প্রতিচ্ছবি হয়ে যায়।
এই সতর্ক ও সংবেদনশীল মনোভাব অবশ্যই সম্মানের দাবিদার। তবে আসল কথা হলো সহাবস্থানের ধারণাটি একটি ইসলামি শিক্ষা। কুরআন-হাদিস এই ধারণাকে সমর্থন করে।
কিছু মানুষ অসদুদ্দেশ্যে 'সহাবস্থান' শব্দটা ব্যবহার করে বলেই এটাকে ঘৃণা করা উচিত নয়। শাব্দিক পার্থক্য নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। আমরা দেখব অর্থটা। যৌক্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে তবেই আমরা একটি বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জন করব।
আমাদের মূলনীতি হলো “জ্ঞান মুমিনের সম্পদ। যেখানেই সে তা পাবে, তার অধিকারই এর উপর সবচেয়ে বেশি হবে।” (সুনান আত-তিরমিযি)
ঈমানের ব্যাপারে সমঝোতা করে নিজেদের কিছু বিশ্বাস করা, এর সাথে সাংঘর্ষিক অন্য ধর্মের কিছু বিশ্বাস করাকে যদি সহাবস্থান বলা হয়, তাহলে তা একেবারেই ভুল। এটি সহাবস্থানের নেতিবাচক অর্থ। আল্লাহ বলেন,
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
“তাহলে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করো ও কিছু অংশ অবিশ্বাস করো?” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৫)
উল্টোদিকে সহাবস্থানের খুবই ইতিবাচক আরেকটি অর্থ আছে, যা অতি উচ্চমানের একটি নৈতিক মূল্যবোধ। এর অর্থ হলো পারস্পরিক যোগাযোগ, সংলাপ, এবং শান্তি ও উন্নতির জন্য একসাথে কাজ করতে সম্মত হওয়া। এতে প্রয়োজন ভিন্নতার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে সেগুলোকে সম্মান করা।
ইসলামে সহাবস্থানের অর্থ এটিই। আধুনিক 'সহাবস্থান' শব্দটির চেয়ে অনেক স্পষ্ট ও শ্রেয় ভাষায় কুরআন এর ব্যাপারে কথা বলেছে। যেমন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا
“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্র, যাতে তোমরা পরস্পরকে জানতে পারো।" (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
"পরস্পরকে জানা” শুধু নির্দিষ্ট নাম বা গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র মানবজাতিকে এখানে জ্ঞান, শিক্ষা ও ইতিবাচক মেলামেশা বিনিময় করতে বলা হচ্ছে। এর প্রমাণ আল্লাহর এই বাণী:
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا، وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
"যে সম্প্রদায় তোমাদের পবিত্র মসজিদে যেতে বাধা দিয়েছিল, তাদের প্রতি শত্রুতাবশত তোমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করে ফেলো। সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা করো। আর পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:২)
দ্বীনের মৌলিক ব্যাপারে অপর পক্ষ আমাদের সাথে একমত হোক বা না হোক, ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে কল্যাণকর ও ভালো কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে। দেখার বিষয় হলো সহযোগিতাতা যেন পাপাচার, অবিচার ও জুলুমের পথে না হয়। পরস্পরকে জানা ও সাহায্য করার ব্যাপারটিতে তাই সমগ্র মানবজাতি অন্তর্ভুক্ত। এই মূল্যবোধগুলো মানবতার কল্যাণ বয়ে আনে। সে অনুযায়ী কাজ করলে মানুষ আমাদের কাছে আসবে, ইসলামের কাছে আসবে।
মানুষ ও তাদের পরিস্থিতি বিভিন্নরকম হয়ে থাকে, এ তো একদম জানা কথা। আল্লাহই চেয়েছেন যে, তা এমন হবে। তিনি বলেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ﴿۱۱۸﴾ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ ، وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ ৯৯
“এবং যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে তিনি সকল মানুষকে একই মতাবলম্বী করে দিতেন। কিন্তু তোমার প্রতিপালক যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, সে ব্যতীত বাকিরা মতভেদ করতেই থাকবে। আর এজন্যই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন।” (সূরাহ হূদ ১১:১১৮-১১৯)
নানা মুনির নানা মত থাকার অর্থ এই না যে, ভালো আর খারাপ বলে কিছু নেই। মতভেদের অস্তিত্বই বরং ভালো আর মন্দের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্যের প্রমাণ। সহাবস্থান করার অর্থ নিজেদের মূল্যবোধ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। একসাথে থেকেই আমরা অপরের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করতে, সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে পারি। এগুলো ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সহাবস্থান অর্থ পারস্পরিক কল্যাণের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে সহযোগিতা করা, সার্বজনীন মূল্যবোধের শক্তিতে প্রতিবেশী হয়ে বাস করা আর মতবিনিময়ের জন্য সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মুমিনরা পৃথিবীকে উন্নততর করতে চায়। তারা সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধকারী জাতি। সত্য তুলে ধরা, মিথ্যেকে খণ্ডন করা, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও অজ্ঞতা দূর করার জন্য তারা সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
সবচেয়ে খারাপ স্বভাবগুলোর একটি হলো নিজেকে ধ্রুব সত্যের ঠিকাদার বানিয়ে নেয়া, তা সে যে নাম ব্যবহার করেই করা হোক না কেন। নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিতর্কের এতই ঊর্ধ্বে মনে করা যে, অন্য সবাইকে বিচার করা নিজের জন্য জায়েয বানিয়ে ফেলা।
এ ধরনের আচরণ ইসলামি শিক্ষার বিপরীত। ইসলামে বিশ্বাস করুক বা না করুক, শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে চাওয়া প্রত্যেকের জীবনকে ইসলাম পবিত্র বলে ঘোষণা করে।
ইতিহাসজুড়ে এমনটিই হয়ে এসেছে।
ইসলামের প্রথম শহর, যেখান থেকে ইসলাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই মদিনার সমাজেই ইসলামি সহাবস্থানের অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ইসলাম যখন প্রথমবারের মতো শক্তিশালী ও স্বাধীন অবস্থায় পৌঁছল, তখনই আল্লাহরই ইচ্ছায় নানা মতের মানুষের সহাবস্থান ঘটল। মদিনায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ইয়াহুদি ও পৌত্তলিক ছাড়াও বাস করত বিশাল সংখ্যক মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের মুসলিম। ছোট্ট একটি শহরে এরা সবাই পাশাপাশি বাস করত।
এমনকি আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর ঢাল একজন ইয়াহুদির কাছে বন্ধক ছিল। এ থেকেই বোঝা যায় যে, একসাথে বসবাসের এই মূলনীতি চিরন্তন এবং আমাদের দ্বীনের প্রতিষ্ঠিত ধারণা। এই বিধান রহিত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না।
মানবতার বিকাশ ও সভ্য জীবনযাপনের জন্য যে পদ্ধতিতে পৃথিবীর মানুষেরা পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময় করে, সেটাই সহাবস্থান। যেসব অভিজ্ঞতা আমাদের আরো ভালোভাবে বাঁচতে শেখাবে, সেগুলোর জ্ঞান আমরা বিনিময় করি। যেসব মূল্যবোধ আমরা সার্বজনীনভাবে স্বীকার করি, সেগুলোর বিকাশের একটি পথ হলো সহাবস্থান। এই পরিবেশেই আমরা অপরকে ইসলামের দিকে আহ্বানের সুযোগ লাভ করি। এর অর্থ এই না যে, এক পক্ষই অপর পক্ষকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। এর অর্থ পার্থিব ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা।
সাহাবিগণ যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁদের দ্বীন তাঁদের চারপাশের মানুষদের দ্বীন থেকে একেবারেই আলাদা। বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ, ইবাদাতের পদ্ধতি—সবখানে এই পার্থক্য শক্ত শেকড় মেলে আছে। তবুও সেখানে অনেক বিষয়ে পরস্পরের মাঝে মিলও আছে। আর পার্থিব ব্যাপারে মিলের কথা তো বলাই বাহুল্য।
আমরা দেখি আল্লাহর বাণী:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ، فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ﴿٦٤﴾
"বলো, 'হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে এসো, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান। আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ না করি।'
তারপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে বলো, 'তোমরা সাক্ষী থাকো যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।” (সূরাহ আলে ইমরান ৩:৬৪)
পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে বা আসবে, সবার চেয়ে রাসূলগণের ঈমান ছিল বেশি। তারপরও তাঁরা তাঁদের জাতির স্পষ্ট কাফির লোকগুলোর মাঝে বসবাস করেছেন। নূহ আলাইহিসসালাম তাঁর জাতির মাঝে ৯৫০ বছর বাস করেছেন। কুরআন বলে:
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا ﴿٥﴾ فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا ﴿٦﴾ وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا ﴿٨﴾ ثُمَّ إِنِّي أَعْلَمْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا ﴿9﴾ فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ﴿١٠﴾
"সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার কওমকে রাত-দিন আহ্বান করেছি। অতঃপর আমার আহ্বান কেবল তাদের পলায়নই বাড়িয়ে দিয়েছে। আর যখনই আমি তাদেরকে আহবান করেছি যেন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তারা নিজেদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজেদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, (অবাধ্যতায়) অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। তারপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে আহ্বান করেছি। অতঃপর তাদেরকে আমি প্রকাশ্যে এবং অতি গোপনেও আহ্বান করেছি। আর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল।” (সূরাহ নূহ ৭১:৫-১০)
নূহ আলাইহিসসালাম তাঁর জাতিকে ঈমানের দিকে দাওয়াহ দিয়েছেন, যৌক্তিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিতর্ক করেছেন ও তাদের সুস্থ বিবেকের কাছে আবেদন করেছেন। এ সবই সহাবস্থানের অংশ।
সহাবস্থানের অর্থ নিজের মতের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা নয়, ধর্মত্যাগ তো নয়ই। আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস আপনার পরিচয়ের অংশ। কেউ আপনাকে আপনার বিশ্বাস পরিবর্তনে জোর করার অধিকার রাখে না। যা থাকা উচিত নয়, তা হলো মানবতার উপর চেপে বসা দম বন্ধ করা গোঁড়ামি ও অমূলক উত্তেজনা। আমাদের দরকার উন্মুক্ত যোগাযোগসুবিধা, যেখানে আমরা উত্তম পদ্ধতিতে মানুষকে আহ্বান করতে পারব।
সহাবস্থান মানে নিজের মতের পক্ষে গোঁড়ামি ত্যাগ করা এবং অপরকে নিজের মত গ্রহণে বাধ্য না করা। নিজের বিশ্বাস পরিত্যাগ করা বা সবার কথাকে সমানভাবে সঠিক মনে করাও সহাবস্থানের অর্থ নয়।
📄 সহাবস্থানই শক্তি
বড় দুঃখ নিয়ে আজ বলতে হয় যে, মুসলিমদের কিছু গোষ্ঠীর চিন্তাজগতে সহাবস্থান নামক ধারণাটির কোনো জায়গাই নেই। মুসলিমদের সাথে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানের আলোচনা তো অনেক পরের ব্যাপার। মুসলিমরাই আজ মুসলিমদের সাথে সহাবস্থানে রাজি নয়। ভিন্ন মাজহাবের অনুসারী, ভিন্ন দলের কর্মী, ভিন্ন দেশের নাগরিক....এমনকি আরবের ভেতর ভিন্ন গোত্রের সদস্য হওয়ার ছুতোয় তারা একে অপরকে দেখতে পারে না। এই বিভক্তি কখনো কখনো সংঘাতে রূপ নেয়। দেখে মনে প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হলো?
অনেক মানুষ সহাবস্থানকে মনে করেন দুর্বল অবস্থায় জীবন বাঁচানোর একটি কৌশল। এটা একদমই ভুল ধারণা। বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায় সহাবস্থানের শেকড় দৃঢ় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে শক্তিশালী অবস্থায়। যে সমাজগুলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলে, সেগুলোই আবার সফলভাবে যুদ্ধ ঘোষণার সামর্থ্য রাখে। উল্টোদিকে যারা দুর্বল, তারা না শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে আর না যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। দুর্বলতা আর অস্থিতিশীলতার সময়েই সহাবস্থানের ধারণাটি সংকটে পড়ে যায়।
ঝগড়া বা অশান্তি না লাগিয়ে মতপার্থক্যকে স্থান দেওয়া ও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করা চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য শক্তি প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট মত চাপিয়ে দেওয়াকে শক্তি বলে না। রাসূল (ﷺ) বলেন, “কুস্তিতে যে অপরকে ধরাশায়ী করে, সে শক্তিশালী নয়। রাগের মাথায় নিজেকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই আসল শক্তিশালী।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আল-আকসা (জেরুজালেম) শহরের চাবি গ্রহণ করতে সেখানে প্রবেশ করেন। তাঁকে গির্জার ভেতর সালাত আদায়ের আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সে সময় শক্তিশালী অবস্থায় ছিলেন এবং বিজিত শহরে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারতেন। গির্জার ভেতরে সালাত আদায় করা ভুল কিছু নয়, তবু তিনি রাজি হননি। দূরদর্শিতা আর সংবেদনশীলতার প্রমাণ রেখে তিনি বলেন, “আমি আশংকা করি যে, আমি ভেতরে সালাত আদায় করলে ভবিষ্যতেও মুসলিমরা একই জায়গায় সালাত আদায় করতে চাইবে। তখন গির্জার লোকেরা অস্বস্তিতে পড়ে যাবে।” উমর গির্জার বাইরে সালাত আদায় করেন এবং খ্রিষ্টানদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেন।
মুসলিমদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট একবার ২৭০০ মুসলিম যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করে তাদের দেহ অ্যাকর শহরের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেন। অথচ সালাহউদ্দীন আল-আইউবি আল-আকসা পুনরুদ্ধার করার পর সেখানকার ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান সহ সকলের জান-মালের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি চাইলেই কিন্তু প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তা না করে তিনি ১১৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বর রিচার্ডের সাথে রামলা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী শহরের নিয়ন্ত্রণ থাকবে মুসলিমদের হাতে, কিন্তু খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের জন্যে শহরের ফটক খোলা থাকবে। মধ্যযুগের ইতিহাসে সহাবস্থানের এ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মুসলিমরা ইতিহাসে অনেকবার শক্তিশালী ও বিজয়ী অবস্থায় থেকেছে। একইসাথে মুসলিম ইতিহাস সহাবস্থানের বাস্তব নমুনা। এ হলো শান্তিচুক্তি, সমঝোতা ও সন্ধির ইতিহাস।
আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চুক্তি রক্ষা করো।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:১)
আল্লাহ আরো বলেন,
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولٌ
“চুক্তি রক্ষা করো। জেনে রেখো, চুক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরাহ আল-ইসরা ১৭:৩৪)
রাসূল (ﷺ) বলেন, “মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কাফিরকে যে হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের ভ্রমণের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।”
একবার রাসূল (ﷺ) একটি লাশবাহী দল দেখলেন। তিনি এর জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে জানানো হলো যে, এটি এক ইয়াহুদির লাশ। তিনি বললেন, “সে কি মানুষ নয়?” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
সাইপ্রাসের বাদশাহর উদ্দেশ্যে ইবনু তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ এর লেখা চিঠিটি দেখা যাক:
“সাইপ্রিয়টের রাজার ধার্মিকতা, দয়া ও জ্ঞানপিপাসার ব্যাপারে আমি জানতে পেরেছি। দেখেছি শাইখ আবুল আব্বাস আল-মাকদিসি কীভাবে রাজার নম্রতা, দয়াশীলতা, আতিথেয়তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। সেইসাথে তিনি পুরোহিত ও তাঁদের সমপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের প্রতিও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমরা এমন এক জাতি, যারা সকলের কল্যাণকামী। আমরা আশা করি আল্লাহ যেন আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ দান করেন।"
ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ তাঁকে শুধু মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তাতারি, ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান বন্দীদের ক্ষেত্রেও একই আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন,
“ইয়াহুদি-খ্রিষ্টান সহ আমাদের আইনি নিরাপত্তার অধীনে থাকা সকলকে আপনি মুক্তি দেবেন বলে আমরা আশা করছি। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে আমাদের কোনো নাগরিককেই আমরা ফেলে যাব না। সেইসাথে জেনে রাখুন, আমাদের অধীনে থাকা খ্রিষ্টান যুদ্ধবন্দীরা আমাদের সদাচরণ ও দয়ার ব্যাপারে জানে। এই আচরণের ব্যাপারে সর্বশেষ রাসূল (ﷺ) আমাদের আদেশ দিয়ে গেছেন।”
দুর্ভাগ্যবশত পরাজিত মানসিকতার মানুষেরা সহাবস্থানের ভাষাকে দুর্বলতার স্বীকৃতি বলে মনে করে। অনেকে আবার সহাবস্থানের এত শুদ্ধবাদী সংস্করণে বিশ্বাস করে, যার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়। সহাবস্থানের সঠিক মূল্যায়ন এই সংশয় নিরসনে সহায়ক হবে।
সহাবস্থানের সাফল্য নির্ভর করে বিবেকসম্পন্ন কণ্ঠগুলোর ফলপ্রসূ সংলাপে অংশগ্রহণে আগ্রহের মাধ্যমে। এভাবেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল সহজে লাভ করা সম্ভব। অন্যদিকে স্বার্থান্বেষী নির্বোধ কণ্ঠগুলো মঞ্চ দখল করে নিলে সহাবস্থানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। শক্তি ও জোরাজুরিই হলো এই লোকগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি আর সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি। সংঘাতকেই এরা মনে করে অপরের সাথে আচরণের মূল চাবিকাঠি।
পারস্পরিক মানবতা, সার্বজনীন মূল্যবোধ, আর সাধারণ প্রয়োজন ও চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কোনোকিছুকে দেখতে পারে না।
যুদ্ধকামীরা যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু ভাবতে জানে না। তাদের সকল বয়ান ঘুরেফিরে ওই একই উপসংহারে গিয়ে পৌঁছে।
কিছু লোকের ধারণা ধর্মের উদ্দেশ্যই মানুষে মানুষে সংঘাত বাঁধানো। বাস্তবতা এর বিপরীত। দ্বীনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের পারস্পরিক আচরণকে একটি নৈতিক আকৃতি প্রদান এবং সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, যাতে জীবনের মানোন্নয়নে সফল সহযোগিতা সম্ভব হয়।
আল্লাহ মানবতার ব্যাপারে বলেন,
هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ
“তিনিই ভূমি হতে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদের বসতি দান করেছেন।” (সূরাহ হুদ ১১:৬১)
আদম আলাইহিসসালামকে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাঁকে জমিনে বিচরণ ও আবাদ করার দায়িত্ব দেন। ফেরেশতাগণ প্রথমে মানবসৃষ্টির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন,
قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ
"আপনি কি সেখানে এমন কাউকে স্থাপন করবেন, যারা সংঘাত ও রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসা ও গুণকীর্তনে নিয়োজিত আছি।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৩০)
ফেরেশতাগণ ভালো করেই জানতেন যে, আল্লাহ সংঘাত ও রক্তপাত ঘৃণা করেন। তাহলে আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের নিজেদের মাঝে যুদ্ধ বাঁধানোর উদ্দেশ্যে মানবজাতির সৃষ্টি ও কিতাব প্রদান করেননি।
ইসলামের বাণী প্রচারের যে দায়িত্ব মুসলিমদের উপর রয়েছে, তার জন্য প্রয়োজন অন্তর ও হৃদয়কে জয় করা। তাদের ইসলামকে ইসলামের মতো করেই জানতে হবে। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত ধৈর্য ও সহনশীলতার অনুশীলন করা। কুরআনের একাধিক স্থানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গালমন্দের জবাবে আমাদের উত্তম কথা বলতে।
📄 সত্যিকারের অংশগ্রহণ
বিশ্বায়নের হুমকি ও প্রতিশ্রুতি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এটি এত মহাপরিবর্তনের ইঙ্গিত নিয়ে আসছে যে, আজকের মুসলিম বিশ্বের তোলপাড় ও আন্দোলনগুলোকে দোষ দেওয়া যায় না। 'সার্বজনীনতা' ও 'আন্তর্জাতিকতা'র সাথে বিশ্বায়নকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। এটি বরং অর্থনীতি, যোগাযোগ, মানবিয় মূল্যবোধ সহ সবকিছুর আকৃতি-প্রকৃতিতে এক নতুন ধরণের পরিবর্তন।
বিশ্বায়নের ক্লাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানেরা। এ থেকে মনে হচ্ছে যে, এটি আসলে ছদ্মবেশী 'আমেরিকায়ন', বিশ্বশোষণ আর সাংস্কৃতিক একীভবনের হীন কৌশল।
মুসলিমরা এই ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করছে বটে। কিন্তু তারা বড় দুর্বল, বিভক্ত, ও অমনোযোগী। এ যেন অলিম্পিক প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে এক খোঁড়া ব্যক্তির ম্যারাথন প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বপ্ন।
অনেকেই বিশ্বায়নের দিকে সতর্ক চোখ রাখছে। এর কারণও আছে। এটা নিয়ে শুধু দুশ্চিন্তা করাই যথেষ্ট নয়। বিশ্বায়নের মাধ্যমে আনীত পরিবর্তনগুলো বিপজ্জনক হতে পারে, এটা জানা থাকা ভালো। কিন্তু একইসাথে একে দেখতে হবে এমন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে, যেখান থেকে অনেক সুবিধা বের করে নেবার সুযোগও আছে।
কোনো নির্দিষ্ট কৃত্রিম স্যাটেলাইট বা প্রশাসনব্যবস্থা বা আইনের মধ্যে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বরং ভাবতে হবে আমরা কি স্রোতের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিযোগিতা করতে আর নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রস্তুত, নাকি দূর থেকে বসে শুধু প্রতিবাদ আর অভিযোগ করাই যথেষ্ট?
এটা কি আমাদের ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচারের মোক্ষম সুযোগ নয়? সুদমুক্ত ব্যাংকিং ও বিনিয়োগব্যবস্থা চালু করে সুদের নিষ্পেষণ দূর করার কি এখনই সময় নয়?
মিডিয়া ব্যবহার করে ইসলামের অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দেবার এটাই কি যথার্থ সময় নয়? এভাবেই কি আমরা পারি না আমাদের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করে ইসলামি অনুশাসনের সাথে পরিচয় করাতে?
আমাদের স্থবির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে উন্নত করার এখনই কি সময় নয়? এই উন্নয়ন বিজাতীয়দের দেখানো শোষণমূলক রূপরেখা অনুযায়ী হবে না। বরং ইসলামের সত্যিকারের নিরাপদ ও কল্যাণকর মহান আদর্শ অনুযায়ী হবে।
ইসলামই সবচেয়ে স্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে আমাদের মানবাধিকার রক্ষা করে। এটি জনগণের আস্থা ও ঐক্য নিশ্চিত করে এবং মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সম্পর্কের শক্তি বৃদ্ধি করে আমাদের অবস্থা উন্নয়নের নির্দেশনা দেয়। ইসলামের দাবি হলো সমবায়ভাবে প্রকল্প আয়োজন করে আমাদের দেশ ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আমরা ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ সমাধান বের করা ছাড়াই আমরা এ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
আমাদের একমত হতে হবে যে, অংশগ্রহণ এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিমদের কল্যাণকামী সকলের জন্য আমাদের অংশগ্রহণ হবে একটি মৌলিক ভিত্তি। এর অর্থ এই না যে, ব্যক্তি ধরে ধরে সকলকে অংশগ্রহণ করতে হবে। তবে অন্তত এই মূলনীতির ব্যাপারে একমত হতে হবে।
বহু বছরের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পরই কেবল সৌদি আরবের লোকেরা স্থানীয় মিডিয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। অথচ স্যাটেলাইট টেলিভিশন চালু করার সিদ্ধান্ত তারা কত অল্প সময়ে নিয়ে নিল!
প্রতিটা ব্যাপারেই কি আমাদের উত্তপ্ত বিতর্ক করে তারপর সিদ্ধান্তে আসতে হবে?
আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। এই জিনিসগুলো হবে কি হবে না, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা এতে অংশগ্রহণ করব কি না, এতটুকু সিদ্ধান্তই আমাদের হাতে আছে। ট্রেন কিন্তু ছেড়ে দিচ্ছে। উঠতে চাইলে এখনই উঠতে হবে।
প্রশ্ন আর আপত্তি তো অসংখ্যবার তোলা যায়। শেষমেশ অনেক দেরিতে গিয়ে দেখা যায় অংশগ্রহণই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
কিছু মানুষ অন্তত এই কাজের পরিসরে বাস্তবেই অংশ নিক। সকলের অংশ নেয়া জরুরি না। তবে অন্তত অংশগ্রহণের বাস্তবতার ব্যাপারে সকলে একমত হই।
অংশগ্রহণের অর্থ আত্মসমর্পণ বা আত্মপরিচয় হারানো নয়। এর অর্থ হলো চারপাশে ব্যবহৃত হতে থাকা হাতিয়ার ও মাধ্যমগুলো দিয়ে ইসলামি কার্যক্রমের সূচনা। কোনো জিনিসকে ভুল বা আপত্তিকর বলে ঘোষণা করাটাই ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের আসল শিক্ষা হলো ভুলকে যথাসাধ্য সংশোধন করা। নবিজি (ﷺ) এর মাক্কি ও মাদানি উভয় জীবনই এর সাক্ষ্য বহন করে।
ভবিষ্যতের সুরক্ষা ও বর্তমানের নিরাপত্তার জন্য মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাগুলোর যথাসম্ভব ব্যবহার শুরু করতে হবে।
গণমাধ্যম, সংলাপ, শিক্ষা, রাজনীতি, নির্বাচন, সংগঠন... এই সব জায়গায় মানুষ জড়িত হতে পারে। সামনে কেবল দুটো বিকল্প। একটি হলো নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে জায়গায় বসে থাকা এবং কোনো প্রভাব ফেলতে না পারা। আরেকটি হলো সরাসরি যুক্ত হয়ে নিয়ন্ত্রকের আসনে ভাগ বসানো। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ ও পারদর্শী মুসলিমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশ নেবে। স্বার্থসিদ্ধি বা খ্যাতির লোভে নয়, ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি সত্যিকার দরদের কারণে নিষ্ঠার সাথে এ কাজগুলো করতে হবে। উপরন্তু এই অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে প্রশস্ত; দলান্ধ নয়।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এই ধরনের সত্যিকারের অংশগ্রহণ অত্যাসন্ন। অন্যের মতকে দমন করে এটি আসতে পারবে না। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সহযোগিতার অনুকূল একটি পরিবেশ সৃষ্টি করলেই তা সম্ভব। অন্যের মতকে কখনই চিরতরে দমিয়ে রাখা যায় না।
নিষ্ঠা এবং সততা থাকলে আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী। আমরা তাঁর কাছেই আমাদের সকল আশা প্রত্যর্পণ করি।
📄 সকল নবির সুন্নাহ
একবার রমজান মাসে মসজিদুল হারামে এক যুবকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি উমরাহ করতে এসেছিলেন। তাঁর মাথায় ছিল সাদা পাগড়ি আর কাঁধ পর্যন্ত বাবড়ি চুল। পরনের জোব্বা ছিল পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত লম্বা। জোব্বার উপর কালো রঙের চাদরের মতো একটি পোশাক ছিল। রমজানের এই ভিড়েও মক্কায় তাকে আলাদা করে চোখে পড়ছিল।
তিনি আমার পাশে বসা অবস্থায় আমি তাকে তার বেশভূষার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন যে, তিনি নবিজি (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করছেন।
আমি এই সুযোগে তাকে জানিয়ে দিলাম যে, পাগড়ি পরা সুন্নাহ নয়। প্রাক- ইসলামি যুগ থেকেই এটি একটি আরব সাংস্কৃতিক পোশাক। নবিজি (ﷺ) এটা পরতেন, কারণ এটাই তাঁর এলাকার প্রথা। এটা যেমন ধর্মীয় বিধান নয়, তেমনি হারামও নয়। পাগড়ির ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস নেই। এটা এমনি সাংস্কৃতিক বা প্রথাগত বিষয়।
তারপর ব্যাখ্যা করে দিলাম যে, চুলের দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফাতওয়াও এই যে, এটাও প্রথার উপর নির্ভরশীল। নবিজি (ﷺ)-এর চুলের দৈর্ঘ্য ইবাদাত সংক্রান্ত কোনো সুন্নাহ নয়। সুন্নাহ হলো যেটার ব্যাপারে নবিজি (ﷺ) আমাদের আদেশ করেছেন। আর তা হলো চুল পরিপাটি রাখা। চুলের দৈর্ঘ্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
তারপর বললাম, "আপনি উমরাহ করছেন। উমরাহর সময় পুরুষের মাথা কামানো যে সুন্নাহ, এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। নবিজি (ﷺ) আল্লাহর কাছে তিনবার এই বলে দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ! তাদের ক্ষমা করে দিন, যারা মাথামুণ্ডন করেছে...!' তারপর মাত্র একবার বলেছেন, '...আর যারা চুল কেটেছে।' এত স্পষ্ট একটি সুন্নাহ আপনি ত্যাগ করলেন কেন?"
সবশেষে আমি তাকে এই উপদেশ দিলাম, "আপনার সত্যিকার নিয়তের ব্যাপারে সতর্ক হোন। বিশেষত নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে। আলিমদের মতপার্থক্যপূর্ণ কোনো বিষয়ে নির্দিষ্ট ধরণের বাহ্যিক আচরণ করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করবেন না। এটা শয়তানের একটা সূক্ষ্ম চাল। মনে রাখবেন, নবিজি (ﷺ) আমাদের এমন পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন, যা অযথা মনোযোগ আকর্ষণ করে।”
এই সুন্নাহর কথাই যুবক ভাইটি বেমালুম ভুলে ছিলেন। [৩৮]
সুন্নাহর ভুল ব্যাখ্যার এটা একটা উদাহরণ, যার কারণে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ও আসল বিষয়গুলো বাদ দিয়ে প্রথা ও অভ্যাসগত বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে বসে।
মানুষকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে পরীক্ষা করার জন্য সুন্নাহ আসেনি। মানুষের সাধ্যের বাইরের নিয়মনীতি আর তাত্ত্বিক অনুমান চাপিয়ে দেওয়া সুন্নাহর কাজ নয়। অন্য কিছু হলে খেয়ালই করত না, এরকম ব্যাপারে মানুষ যেন সুন্নাহ ভেবে অতিরিক্ত পেরেশান না হয়ে পড়ে। আর এসব ব্যাপারে এত আবেগী আচরণ করার ফলে যদি ইসলামি শরিয়তের সীমা লঙ্ঘিত হয়, তাহলে তা আরো খারাপ। যেমন- মানুষের অধিকার হরণ বা তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা। অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলো যেন আমাদের ঐক্য ও ঈমানের পরিচর্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাঘাত না ঘটায়।
নবি (ﷺ) এর সুন্নাহ খুবই মহান ও গভীর। ইবাদাতের খুঁটিনাটি সুন্নাহর অংশ হলেও শুধু এগুলোই সুন্নাহ নয়। এর পরিসর আরো বড় এবং প্রাসঙ্গিকতা আরো সাধারণ। নবুওয়াতের বার্তার উদ্দেশ্য যেসব মহান ধ্যান-ধারণার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, সে সবই সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের যে মহান উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তা পূর্ণ করার জন্য সুন্নাহ একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আল্লাহ বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴿٥٦﴾
"নিশ্চয় আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরাহ আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)
সুন্নাহর উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন তার ঈমানের অর্থ তুলে ধরে, নেক আমলে এগিয়ে যায়, আর নিজেদের আচরণ সুন্দর করে। দ্বীনের খুঁটিগুলো (ঈমান, সালাত, যাকাত, রোজা, হজ্জ) কীভাবে পালন করতে হবে, তাও সুন্নাহ ব্যাখ্যা করে দেয়।
এ কারনেই আগেকার নবিগণের ব্যাপারে বলার সময় আল্লাহ তাঁদের সবচেয়ে বড় সুন্নাহর কথাই আমাদের জানান। আল্লাহ বলেন,
وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ ﴿٧٣﴾
"আর তাদেরকে আমি নেতা বানিয়েছিলাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত। আমি তাদের প্রতি সৎকাজ করার, সালাত কায়েম করার এবং যাকাত প্রদান করার জন্য ওহী প্রেরণ করেছিলাম। আর তাঁরা আমারই ইবাদাত করত।” (সূরাহ আল-আম্বিয়া ২১:৭৩)
এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নেই নবিগণ কঠোর পরিশ্রম করেছেন। আলাইহিমুসসালাম। তাঁদের মিশন ও বার্তার মূল নির্যাস এটিই। কুরআনে আল্লাহ যে সুন্নাহর কথা বলেছেন এবং হাদিসে রাসূল (ﷺ) যা ব্যাখ্যা করেছেন, সেগুলোর ভিত্তি এটিই।
একটি হাদিসে জিবরিল আলাইহিসসালামের সাথে نبي (ﷺ) ইসলাম, ঈমান ও ইহসান নিয়ে কথা বলেন। সেখানেও আমরা এ কথাই দেখতে পাই। نبي (ﷺ) যেভাবে ইসলামি মূলনীতিগুলো প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করেছেন এবং নেক আমলগুলো যেভাবে করেছেন, তাতেও আমরা একই জিনিস দেখতে পাই। ইয়াকিন, নম্রতা, অন্তরের ইবাদাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, আল্লাহর ইবাদাতে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে যেভাবে তিনি ঈমানের প্রতিরক্ষা করেছেন, তাতেও একই কথা দেখতে পাই।
মানুষের মাঝে অস্থিরতা বা বিভক্তি আনার চেষ্টা কখনও তিনি করেননি। তাদের মাঝে দয়াশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি কোনো আপোস করেননি।
নবিজি (ﷺ) তাঁর অনুসারীদের আদেশ করেছেন, وَبَشِّرُوا وَلَا تُنفِرُوا “মানুষকে সুসংবাদ দাও। দূরে সরিয়ে দিও না।” [৩৯]
এগুলোই সুন্নাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। সুন্নাহর মাঝে কি আমরা নৈতিকতা ও দয়ার কোনো লঙ্ঘন দেখতে পাই? এগুলোই আল্লাহর বাণীর মৌলিক উদ্দেশ্য। সুন্নাহর মাঝে আমরা অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণার কোনো চাষাবাদ দেখি না। বরং এতে দেখি মহানুভবতা ও সুসংবাদ পৌঁছে দেবার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার।
নববি সুন্নাহর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় আমাদের পুনর্জীবিত করা দরকার, তা হলো ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা। যেমন- তিনি মানুষকে যেভাবে ধাপে ধাপে ইসলামের শিক্ষা দিয়েছেন, বিশেষত মাক্কি যুগে। এভাবে কাজ করতে ধৈর্য প্রয়োজন। আল্লাহ সকল নবিকেই ধৈর্যশীল বলে পরিচয় দিয়েছেন,
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ ﴿٢٤﴾ "আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম। তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত। কারণ তারা ধৈর্যধারণ করেছিল আর আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।” (সূরাহ আস-সাজদাহ ৩২:২৪)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দ্বীনি ব্যাপারে নেতৃত্ব লাভ করা যায় ধৈর্য ও ইয়াকীনের মাধ্যমে।
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর নবিজি (ﷺ) সময় নিয়ে একটি সমাজ গড়ে তুলেছেন। এখানে তাঁর অসাধারণ দূরদৃষ্টি ও পরিকল্পনা দেখা যায়। মানুষকে মানিয়ে নেবার সময় না দিয়ে রাতারাতি কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসার মতো অধৈর্য তিনি ছিলেন না। কিছু পদক্ষেপ দেখে অবস্থার অবনতি মনে হচ্ছিল। কিন্তু নবি (ﷺ) ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন কেন সেগুলোর দরকার ছিল।
এর একটি সুন্দর উদাহরণ হলো হুদাইবিয়ার চুক্তি। নবিজি (ﷺ) সে বছর হজ্জ না করে ফিরে যেতে এবং খুবই একপাক্ষিক একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে সম্মত হন। বেশিরভাগ সাহাবি একে মুসলিমদের জন্য পরাজয় ভেবে নিয়েছিলেন। কিন্তু নবিজি ﷺ বুঝেছিলেন যে, এটি ইসলামের বিশাল একটি অর্জন। কুরআনে একে 'বিজয়' বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন, إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا ﴿ا﴾ “নিশ্চয় আমি আপনাকে দান করেছি এক স্পষ্ট বিজয়।” (সূরাহ আল-ফাতহ ৪৮:১)
এই চুক্তির ফলে আরব গোত্রগুলো মুসলিমদের সাথে সন্ধি করার স্বাধীনতা পায়। এভাবে অনেকে ইসলামে প্রবেশ করে। নবি ﷺ এই পরিস্থিতিগুলো ধৈর্যশীল ও চিন্তাশীল দৃষ্টিতে দেখেছেন। বৃহত্তর চিত্রের কথা মাথায় রেখে লক্ষ্য অর্জনে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিয়েছেন।
আরেকটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ হলো অন্যের অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার ব্যাপারে সচেতনতা। নবিজি ﷺ জানতেন মানুষের সাথে কীভাবে সম্পর্ক গড়তে হয়। তিনি সকলের প্রতি দয়া ও প্রাপ্য সম্মান দেখাতেন।
এছাড়াও তিনি অতীতের ভুল ক্ষমা করে দিতেন। এর ফলে অতীতের শত্রুভাবাপন্ন অনেক মানুষ পরে সহজে তাঁর কাছে আসতে পেরেছে। নববি সুন্নাহর এই দিকটিকে আজকের অনেক দাঈ উপেক্ষা করে যান। নবিজি ﷺ-এর বার্তা যারা প্রত্যাখ্যান করত, তাদের সাথে তিনি সেতু গড়ে তুলতেন। খোলাখুলি শত্রুতা করা মানুষদের জন্যও তিনি ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার একটি দরজা খোলা রাখতেন। অতীতে শত্রুতা করা কেউ যদি পরে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তাঁর কাছে আসত, তাহলে তিনি তাদের আগের ভুলের কথা বলে খোঁচাতেন না। বরং এমন আচরণ করতেন, যাতে তারা অতীতের কথা ভুলে যায়। এর সবচেয়ে নজরকাড়া উদাহরণ হলো মক্কাবিজয়ের পর তাঁর ঘোষণা: “যাও, তোমরা মুক্ত।”
এছাড়াও নবি মৃত মুশরিক ও কাফিরদের উপহাস করতে কিংবা অপমান করতে নিষেধ করে গেছেন। এর একটি কারণ হলো জীবিত কাফির-মুশরিকদের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বলেন,
لا تَسُبُّوا الْأَمْوَاتَ فَتُؤْذُوا الْأَحْيَاءَ “মৃত ব্যক্তিদেরকে তোমরা গালি দিও না, (যদি দাও) তাহলে জীবিতদেরই কষ্ট দিলে।" [৪০]
টিকাঃ
[৩৮] পাঠক যেন এখান থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছেন যে, মাথায় টুপি বা পাগড়ি বাঁধা, লম্বা চুল রাখা (যেভাবে রাসূল (ﷺ) এর ছিল) এসব করতে এখানে নিষেধ করা হচ্ছে। এমনটা নয়। শাইখ আওদাহ মূলত যুবক ভাইটির মূল সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ে অন্য বিষয়ে সিরিয়াস হওয়ার উদাহরণ টেনেছেন। মাথায় পাগড়ি পরা, লম্বা চুল রাখতে রাসূল (ﷺ) সরাসরি কোথাও না বললেও, এসব রাসূলের প্র্যাকটিস ছিল। আমাদের জানামতে শাইখ আওদাহ নিজেও মাথায় টুপি পরেন। তাই মাথায় টুপি/পাগড়ি পরা সুন্নাহ কি না, কেমন সুন্নাহ এসব বিতর্কে যাওয়া এখানে উদ্দেশ্য নয়, যারা এসব করেন নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর প্রতি ভালোবাসা থেকেই করেন। এখানে কোথাও সেই আমলকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে না।- সাজিদ ইসলাম
[৩৯] সহিহ আল-বুখারি: ৬৯
[৪০] সুনান তিরমিযি: ১৯৮২