📄 অন্তরের শান্তি
অন্তরের শান্তিই সকল শান্তির উৎস। অন্তর যার প্রশান্ত, সে অন্যদের সাথেও শান্তিতে থাকে। মুসলিমরা প্রত্যেক সালাতের তাশাহহুদে বলে, “শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের উপর এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপর।” আল্লাহ বলেন,
فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً
“ঘরে প্রবেশের সময় নিজেদেরকে সালাম প্রদান করবে।” (সূরাহ আন-নূর ২৪:৬১)
এখানে ‘নিজেদের’ বলতে একদল মানুষকে বোঝানো হয়েছে। আসলেই আত্মার অন্তস্থল থেকেই শান্তি তথা সালাম বিকিরিত হয়।
নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক স্বচ্ছ থাকলে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অটুট থাকলে এবং অন্তরের অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তবেই অন্তরের শান্তি অর্জিত হয়। প্রতিপালকের সম্পর্কে জ্ঞানের পরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান হলো আপন আত্মার ব্যাপারে ও এর পরিশুদ্ধির ব্যাপারে জ্ঞান।
আপনার সামর্থ্য ও মেধার প্রতি যত্নশীল হোন, দুর্বলতা ও শক্তির ব্যাপারে হোন সচেতন। আপনি কি ধীরস্থির না তাড়াহুড়াপ্রবণ, চঞ্চল না শান্ত, আপনি কি নাছোড় স্বভাবের না এর বিপরীত? নিজের ব্যাপারে সত্যটা না জানলে আপনি বুঝতে পারবেন না শক্তি-সামর্থ্য কোন পথে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ উপকার পাবেন।
এর মানে এই না যে, অস্তিত্বের প্রকৃতি বা মানবাত্মার রহস্য নিয়ে গভীর গবেষণায় ডুব দিতে হবে। ওহীর মাধ্যমে যা জানানো হয়েছে, এর বাইরে এ সম্পর্কিত জ্ঞান আমাদের আয়ত্তের বাইরে। আল্লাহ বলেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
“তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, 'আত্মা আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হুকুম, যার ব্যাপারে তোমাদের সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” (সূরাহ আল-ইসরা ১৭:৮৫)
তবে আপনার ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক, সুপ্ত মেধা, ও সত্যিকারের স্বভাব আবিষ্কার করা কিন্তু অসম্ভব নয়। তারপর এই জ্ঞান ব্যবহার করে আপনি ভালো কিছু অর্জন করতে এবং মন্দ পরিহার করতে পারবেন।
ইসলামি শরিয়ত মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়েই হুকুম-আহকাম দেয়। নবি-রাসূলগণের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। তাঁরাও নিজেদের স্বভাব-প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করেছেন। তাঁরাও তো মানুষ, এর বেশিও নন, কমও নন। নবিজি (ﷺ) বলেছেন,
ইবরাহিম আলাইহিসসালাম এর তুলনায় আমাদের মনে অধিক সন্দেহ জাগতে পারে। তিনি বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন, আমাকে দেখান।” আল্লাহ বললেন, “তবে কি তুমি বিশ্বাস করোনি?” তিনি উত্তরে বললেন, "কেন করব না? তবে তা কেবল আমার চিত্ত প্রশান্তির জন্য।” (২: ২৬০)। আল্লাহ তাআলা লূত আলাইহিসসালাম এর উপর রহমত বর্ষণ করুন, তিনি কোনো শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর আশ্রয় গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ইউসুফ আলাইহিসসালাম এর দীর্ঘ কারাবরণের মতো আমাকেও যদি কারাগারে অবস্থান করতে হতো, তবে আমি রাজদূতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বসতাম। (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
ইবরাহিম আলাইহিসসালাম জ্ঞান অন্বেষণ করেছিলেন এবং বস্তুর সত্যিকার প্রকৃতি জানতে চেয়েছিলেন। এটার কারণ ছিল তাঁর স্বাভাবিক মানবিয় কৌতূহল মেটানো। মুহাম্মাদ (ﷺ) ইউসুফ আলাইহিসসালামের ব্যাপারে বলেছেন যে, তাঁর সমপরিমাণ কারাগারে থাকতে হলে "আমি রাজদূতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বসতাম।” তিনি এখানে আমাদের স্বাভাবিক মানবপ্রকৃতির কথা বলেছেন। স্বভাবতই আমরা মুক্তির প্রতি লালায়িত। বন্দীত্বকে আমরা ঘৃণা করি, বিশেষত যদি তা এত লম্বা সময় ধরে আমাদের শক্তি-সামর্থ্যকে বাধা দিয়ে রাখে।
মূসা আলাইহিসসালাম নিজের ব্যাপারে জানতেন এবং নিঃসংকোচে ও অকপটে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতেন। তিনি নিজের স্বাভাবিক ভয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, "আমি যখন তোমাকে (ফিরআউনকে) ভয় পেতাম, তখন তোমার কাছ থেকে পালিয়েছিলাম।” আরো বলেছেন, "হে প্রতিপালক! আমি ভয় করি সে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে অথবা আমাদের অত্যাচার করবে।” দেখা যাচ্ছে মূসা আলাইহিসসালাম নিজের ব্যাপারে জানতেন এবং সেভাবেই নিজেকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে যতটুকু সামর্থ্যে কুলায়, ততটুকু ভার নিয়েই তিনি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সাজাতেন।
আমরা মুখে যেসব মূলনীতি ও মূল্যবোধের কথা বলি, অন্তরও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এই মূল্যবোধের মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাথে সম্পর্কিত হই আর এর ভিত্তিতেই নিজেদের কথা ও কাজকে সাজাই। এই সত্য ও শাশ্বত মূল্যবোধগুলোই আমাদের আচরণের ভিত্তি হওয়া উচিত। নইলে সারাক্ষণই অমুককে খুশি করা, তমুককে অখুশি না করা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। আমাদের জীবন হয়ে উঠবে ভান আর চাটুকারিতাময়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আর স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে সারাক্ষণ চারপাশের মানুষদের কাছে আত্মসমর্পণ করে থাকতে হবে।
অন্তরের প্রশান্তির একটি দিক হলো ভেতরের সত্ত্বার সাথে বাইরের আচরণের মিল। আমাদের কাজকর্ম যেন হয় আমাদের কথার প্রতিফলন। আল্লাহ বলেন,
كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ ﴿۳﴾
"তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে গুরুতর অপরাধ।” (সূরাহ আস-সফ ৬১:৩)
তার মানে আমাদের কর্মপদ্ধতি হতে হবে সৎ ও সঠিক। রাসূল (ﷺ) এই জিনিসটি ভালোমতো ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। সুফিয়ান বিন আব্দুল্লাহ আস-সাকাফি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন,
يَا رَسُولَ اللَّهِ قُلْ لِي فِي الإِسْلامِ قَوْلاً لَا أَسْأَلُ عَنْهُ أَحَدًا بَعْدَكَ
“হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন, যাতে এ ব্যাপারে আর কাউকে জিজ্ঞেস না করা লাগে।”
রাসূল (ﷺ) বললেন,
قُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ فَاسْتَقِمْ
“বলো, 'আমি ইসলামে বিশ্বাস করি।' তারপর এতে অবিচল থাকো।”[৩৭]
ইবাদাত যেভাবে করি, মানুষের সাথে আচরণও সে অনুযায়ী হওয়া চাই। ইবাদাত আমাদের জাগতিক কাজকর্মের দিকনির্দেশক হবে। আমাদের ন্যায়পরায়ণ হতে ও অপরের অধিকারকে সম্মান করতে উৎসাহ যোগাবে। মাসজিদে এক চেহারা আর বাইরের দুনিয়ায় আরেক চেহারা দেখালে চলবে না।
বকধার্মিক লোকদের কারণে অনেক বিপর্যয় আসে। আমাদের ঈমান এত মজবুত ও গভীর করতে হবে, যেন তা জীবনের সকল পরীক্ষা ও বিপদে খুঁটি হয়ে দাঁড়ায়। বাসায়, কর্মস্থলে, নিজের ভেতর অনেকরকম সমস্যা ও হতাশা আসে। এগুলো সহ্য করে বিজয়ী হতে হলে আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় হতে হবে। এই ঈমানের সঙ্গী হবে অন্তরের অন্তস্থল থেকে আসা নিষ্ঠা, যা আমাদের বাহ্যিক ইবাদাতে মূর্ত হয়ে উঠবে।
অন্তরের শান্তির জন্য দরকার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নিজের সামর্থ্যের সীমায় বেঁধে রাখা। রাসূল (ﷺ) বলেন, “হে বিশ্বাসীরা! নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করো। তোমরা ক্লান্ত হলেও আল্লাহ ক্লান্ত হন না। অল্প অল্প করে হলেও নিয়মিত যে আমল করা হয়, সেটিই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।” (সহিহ আল-বুখারি)
এই উপদেশ সব জায়গায় খাটে। যেমন বস্তুগত সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে টাকার লোভের কারণে মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়।
আমরা যা প্রচার করি, তার সাথে আমাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আপনি যে দিকে আহ্বান করবেন, গোটা পৃথিবীর সবাই এর প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেবে না। এমনটা হয় না, এমনটা আশা করাও ঠিক না। এমনকি আল্লাহর মনোনীত রাসূলগণকেও সবাই মেনে চলেনি। আপনি যেটার জন্যই কাজ করেন না কেন, কেউ না কেউ ঠিক এটার বিপরীত কাজ করছে।
অন্তরের শান্তির জন্য প্রয়োজন নিজের অনন্য স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্য। যেটা যার স্বভাবের সাথে যায় না, সে সেটা গ্রহণ করতে পারবে না। রাসূল (ﷺ)-এর সামনে খাবার হিসেবে এক জাতের কাঁটাওয়ালা লেজের সরীসৃপ পেশ করা হয়েছিল। তিনি তা খেলেন না। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করলেন, এই প্রাণীটা খাওয়া হারাম কি না। রাসূল (ﷺ) বললেন, “না। আমার এলাকায় ওটা খায় না বলে আমার রুচি হয় না।” তিনি খাননি, কারণ তাঁর পছন্দ না। প্রশ্নটা হালাল-হারামের না, ব্যক্তিগত রুচির।
সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রত্যেকের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আলাদা। বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্তের কথাই ধরুন। ওহী নাজিল হওয়ার আগ পর্যন্ত যতক্ষণ বিভিন্ন মত দেওয়ার সুযোগ ছিল, ততক্ষণ প্রত্যেক সাহাবির মতের মধ্যে নিজ নিজ ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। আবু বকর শান্তশিষ্ট ও সহনশীল মানুষ। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজেও এ কথার স্বীকৃতি দিয়েছেন। উমর ছিলেন শক্তিমান আর দৃঢ় স্বভাবের, এটাও রাসূল (*) আমলে নিয়েছেন।
আমাদেরও নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য বুঝে নিয়ে তার সাথে মানিয়ে নিতে হবে। ব্যক্তিগত গুণাবলি আর মেজাজকে অস্বীকারের মাধ্যমে জোর করে ভান ধরে থাকা যায় না।
উমর বিন আব্দুল আযীয বলেছেন, “সবচেয়ে মনোরম জিনিস হলো, যখন কারো ব্যক্তিগত পছন্দ ইসলামের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।”
আমাদের আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এই সন্তুষ্ট থাকার অর্থ তাকদীরের কারণেই তাকদীরের ক্ষতি এড়ানোর পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করা। প্লেগ আক্রান্ত এক এলাকায় প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যথার্থই বলেছেন, "আমরা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর থেকে পলায়ন করে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের দিকেই যাই।”
তাকদীরকে মুমিন পূর্ণরূপে মেনে নেয়। যা বিলম্বিত করা হয়েছে, তা নিয়ে তাড়াহুড়া করতে নেই। যা দ্রুত নিয়ে আসা হচ্ছে, তা স্থগিত করতে নেই। মুমূর্ষু রোগী, কুৎসিত চেহারাধারী, দুর্বল চিত্তের অধিকারী, অবিবাহিত-অবিবাহিতা, ইয়াতীম সহ যেকোনো ধরনের দুর্দশা ভোগকারী ব্যক্তির উচিত প্রথমে আল্লাহর এই তাকদীরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে শেখা। তারপর নিজের বাসনা পূরণে বাস্তবসম্মত ও বৈধ উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা এবং সাধ্যের বাইরের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা।
ন্যায়পরায়ণ ও পক্ষপাতহীন হওয়াটাও অন্তরের শান্তি অর্জনের শর্ত। এর জন্য স্বার্থপরতা, অসার কামনা, ও লোভ-লালসা ত্যাগ করতে হবে। মহান সাহাবি আম্মার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “কেউ যদি তিনটি জিনিস অর্জন করে, তাহলে ঈমানের স্বাদ বুঝতে পারবে। নিজের প্রতি ন্যায়বিচার করা, সকলকে সালাম দেওয়া, অভাবের সময়েও দান করা।” (সহিহ আল-বুখারি)
মতভেদ হলে নিজেকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে কল্পনা করলে কেমন হয়, যাতে পুরো বিষয়টাকে একবার তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়? অন্তত এতটুকু তো মেনে নেয়া যাবে যে, তারা নিজেদের জন্য ওটাই চায়। আমি নিশ্চিত যে, নিজের প্রতি সত্যিই সৎ থাকা লোক খুবই অল্প। এদের প্রতি আল্লাহ মহা অনুগ্রহ করেছেন। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “ভাইয়ের চোখে ধূলা দেখতে পাও অথচ নিজের চোখে ময়লা দেখতে পাও না!”
অন্তরের প্রশান্তির আরেকটি শর্ত হলো রাসূলগণ গায়েবের ব্যাপারে যে জ্ঞান নিয়ে এসেছেন, তা মেনে নেয়া। সত্যিকার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও সঠিক যুক্তির সাথে এগুলোর কোনো বিরোধ নেই। উপকথায় তো সত্য-মিথ্যা নির্বিশেষে সব গালগল্প মিশ্রিত থাকে। আমরা এই মনোভাবে আক্রান্ত না হয়েই গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞানে বিশ্বাস করি। গায়েবের ব্যাপারগুলো মানবমনের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে, আর গালগল্প- কিচ্ছাকাহিনী মানবমনের চেয়ে নিচু স্তরের। আমাদের অবশ্যই যুক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। হৃদয়কে সৃষ্টি করা হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তির হাতিয়ার হিসেবে, শুধুই তথ্যের ভাণ্ডার হিসেবে নয়।
প্রখ্যাত কাযি ও ফকিহ ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম এটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন যে, মানবকল্যাণ করার এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ করার জ্ঞান ওহী নাজিলের আগ থেকেই যুক্তিগ্রাহ্য। আমি যোগ করছি যে, ওহী নাযিলের পরও এগুলো যুক্তিগ্রাহ্য আছে। এভাবেই আমরা কুরআন-সুন্নাহ বুঝি এবং বিভিন্ন ফাতওয়ার মাঝে তুলনা করি। আমরা উপকার-অপকার বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিই। মানবহৃদয়ের সত্যিকার সামর্থ্যকে খাটো করেও দেখি না, অতিরঞ্জিতও করি না। কিছু সীমার বাইরে আমাদের মন আর যেতে পারে না।
আমাদের মন যেসব ওয়াসওয়াসা দ্বারা আক্রান্ত হয়, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়াও জরুরি। এগুলো আমাদের ইবাদাত ও জাগতিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বেশিরভাগ ওয়াসওয়াসাই মনস্তাত্ত্বিক (যেমন, ঠিকমতো ওযু করার পরও পবিত্রতা অর্জন হয়নি বলে মনে হওয়া। – অনুবাদক)। এগুলোর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হলো জোর করে সেসব সংশয়কে উপেক্ষা করা, সেগুলোকে সময় না দেওয়া। রাসূল (ﷺ) দেখানো তরিকা অনুযায়ী সূরাহ ইখলাস তিলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে সাহায্য ও আশ্রয় চাওয়া।
আমাদের সবটুকু আত্মিক শক্তি জড়ো করে এই ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করতে হবে। বিশেষত ওযু-গোসলের ব্যাপারে। আল্লাহ আমাদের এ থেকে মুক্ত হওয়ার পথ দেখিয়ে দেবার আগ পর্যন্ত এসব ওয়াসওয়াসা হলো কিছু জিনিস উপেক্ষা করার অনুমোদন। আমাদের অন্তরের নিষ্ঠার ব্যাপারে আল্লাহ অবগত আছেন। আর আল্লাহ নিষ্ঠাবানদের সাহায্যকারী।
টিকাঃ
[৩৭] সহিহ মুসলিম: ৩৮
📄 সহাবস্থান করতে শেখা
সহাবস্থানের কথা উঠলেই মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ খুব সতর্ক হয়ে উঠেন। তারা ভাবেন সহাবস্থান করতে হলে আমাদের ইসলামি শরিয়ত ত্যাগ করতে হবে। অথবা তারা ভাবেন এটা আসলে ইসলামের ভেতর বিজাতীয় ধ্যানধারণা প্রবেশ করানোর ফাঁদ।
সহাবস্থানের ব্যাপারে মুসলিমদের আরেকটি সন্দেহের কারণ হলো তারা একে পশ্চিমে জন্ম নেয়া একটি ধারণা বলে মনে করেন। পশ্চিমারা হয়তো এই জিনিসটার মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করে দিতে যায়, যাতে মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমের প্রতিচ্ছবি হয়ে যায়।
এই সতর্ক ও সংবেদনশীল মনোভাব অবশ্যই সম্মানের দাবিদার। তবে আসল কথা হলো সহাবস্থানের ধারণাটি একটি ইসলামি শিক্ষা। কুরআন-হাদিস এই ধারণাকে সমর্থন করে।
কিছু মানুষ অসদুদ্দেশ্যে 'সহাবস্থান' শব্দটা ব্যবহার করে বলেই এটাকে ঘৃণা করা উচিত নয়। শাব্দিক পার্থক্য নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। আমরা দেখব অর্থটা। যৌক্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে তবেই আমরা একটি বিষয়কে গ্রহণ বা বর্জন করব।
আমাদের মূলনীতি হলো “জ্ঞান মুমিনের সম্পদ। যেখানেই সে তা পাবে, তার অধিকারই এর উপর সবচেয়ে বেশি হবে।” (সুনান আত-তিরমিযি)
ঈমানের ব্যাপারে সমঝোতা করে নিজেদের কিছু বিশ্বাস করা, এর সাথে সাংঘর্ষিক অন্য ধর্মের কিছু বিশ্বাস করাকে যদি সহাবস্থান বলা হয়, তাহলে তা একেবারেই ভুল। এটি সহাবস্থানের নেতিবাচক অর্থ। আল্লাহ বলেন,
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
“তাহলে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করো ও কিছু অংশ অবিশ্বাস করো?” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৮৫)
উল্টোদিকে সহাবস্থানের খুবই ইতিবাচক আরেকটি অর্থ আছে, যা অতি উচ্চমানের একটি নৈতিক মূল্যবোধ। এর অর্থ হলো পারস্পরিক যোগাযোগ, সংলাপ, এবং শান্তি ও উন্নতির জন্য একসাথে কাজ করতে সম্মত হওয়া। এতে প্রয়োজন ভিন্নতার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়ে সেগুলোকে সম্মান করা।
ইসলামে সহাবস্থানের অর্থ এটিই। আধুনিক 'সহাবস্থান' শব্দটির চেয়ে অনেক স্পষ্ট ও শ্রেয় ভাষায় কুরআন এর ব্যাপারে কথা বলেছে। যেমন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا
“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্র, যাতে তোমরা পরস্পরকে জানতে পারো।" (সূরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
"পরস্পরকে জানা” শুধু নির্দিষ্ট নাম বা গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমগ্র মানবজাতিকে এখানে জ্ঞান, শিক্ষা ও ইতিবাচক মেলামেশা বিনিময় করতে বলা হচ্ছে। এর প্রমাণ আল্লাহর এই বাণী:
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا، وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
"যে সম্প্রদায় তোমাদের পবিত্র মসজিদে যেতে বাধা দিয়েছিল, তাদের প্রতি শত্রুতাবশত তোমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করে ফেলো। সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা করো। আর পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:২)
দ্বীনের মৌলিক ব্যাপারে অপর পক্ষ আমাদের সাথে একমত হোক বা না হোক, ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে কল্যাণকর ও ভালো কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে। দেখার বিষয় হলো সহযোগিতাতা যেন পাপাচার, অবিচার ও জুলুমের পথে না হয়। পরস্পরকে জানা ও সাহায্য করার ব্যাপারটিতে তাই সমগ্র মানবজাতি অন্তর্ভুক্ত। এই মূল্যবোধগুলো মানবতার কল্যাণ বয়ে আনে। সে অনুযায়ী কাজ করলে মানুষ আমাদের কাছে আসবে, ইসলামের কাছে আসবে।
মানুষ ও তাদের পরিস্থিতি বিভিন্নরকম হয়ে থাকে, এ তো একদম জানা কথা। আল্লাহই চেয়েছেন যে, তা এমন হবে। তিনি বলেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ﴿۱۱۸﴾ إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ ، وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ ৯৯
“এবং যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন, তাহলে তিনি সকল মানুষকে একই মতাবলম্বী করে দিতেন। কিন্তু তোমার প্রতিপালক যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, সে ব্যতীত বাকিরা মতভেদ করতেই থাকবে। আর এজন্যই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন।” (সূরাহ হূদ ১১:১১৮-১১৯)
নানা মুনির নানা মত থাকার অর্থ এই না যে, ভালো আর খারাপ বলে কিছু নেই। মতভেদের অস্তিত্বই বরং ভালো আর মন্দের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্যের প্রমাণ। সহাবস্থান করার অর্থ নিজেদের মূল্যবোধ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া নয়। একসাথে থেকেই আমরা অপরের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করতে, সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে পারি। এগুলো ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সহাবস্থান অর্থ পারস্পরিক কল্যাণের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে সহযোগিতা করা, সার্বজনীন মূল্যবোধের শক্তিতে প্রতিবেশী হয়ে বাস করা আর মতবিনিময়ের জন্য সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মুমিনরা পৃথিবীকে উন্নততর করতে চায়। তারা সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধকারী জাতি। সত্য তুলে ধরা, মিথ্যেকে খণ্ডন করা, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও অজ্ঞতা দূর করার জন্য তারা সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
সবচেয়ে খারাপ স্বভাবগুলোর একটি হলো নিজেকে ধ্রুব সত্যের ঠিকাদার বানিয়ে নেয়া, তা সে যে নাম ব্যবহার করেই করা হোক না কেন। নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিতর্কের এতই ঊর্ধ্বে মনে করা যে, অন্য সবাইকে বিচার করা নিজের জন্য জায়েয বানিয়ে ফেলা।
এ ধরনের আচরণ ইসলামি শিক্ষার বিপরীত। ইসলামে বিশ্বাস করুক বা না করুক, শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে চাওয়া প্রত্যেকের জীবনকে ইসলাম পবিত্র বলে ঘোষণা করে।
ইতিহাসজুড়ে এমনটিই হয়ে এসেছে।
ইসলামের প্রথম শহর, যেখান থেকে ইসলাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই মদিনার সমাজেই ইসলামি সহাবস্থানের অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ইসলাম যখন প্রথমবারের মতো শক্তিশালী ও স্বাধীন অবস্থায় পৌঁছল, তখনই আল্লাহরই ইচ্ছায় নানা মতের মানুষের সহাবস্থান ঘটল। মদিনায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ইয়াহুদি ও পৌত্তলিক ছাড়াও বাস করত বিশাল সংখ্যক মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের মুসলিম। ছোট্ট একটি শহরে এরা সবাই পাশাপাশি বাস করত।
এমনকি আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর ঢাল একজন ইয়াহুদির কাছে বন্ধক ছিল। এ থেকেই বোঝা যায় যে, একসাথে বসবাসের এই মূলনীতি চিরন্তন এবং আমাদের দ্বীনের প্রতিষ্ঠিত ধারণা। এই বিধান রহিত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না।
মানবতার বিকাশ ও সভ্য জীবনযাপনের জন্য যে পদ্ধতিতে পৃথিবীর মানুষেরা পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময় করে, সেটাই সহাবস্থান। যেসব অভিজ্ঞতা আমাদের আরো ভালোভাবে বাঁচতে শেখাবে, সেগুলোর জ্ঞান আমরা বিনিময় করি। যেসব মূল্যবোধ আমরা সার্বজনীনভাবে স্বীকার করি, সেগুলোর বিকাশের একটি পথ হলো সহাবস্থান। এই পরিবেশেই আমরা অপরকে ইসলামের দিকে আহ্বানের সুযোগ লাভ করি। এর অর্থ এই না যে, এক পক্ষই অপর পক্ষকে নিজের দিকে আহ্বান করবে। এর অর্থ পার্থিব ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা।
সাহাবিগণ যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁদের দ্বীন তাঁদের চারপাশের মানুষদের দ্বীন থেকে একেবারেই আলাদা। বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ, ইবাদাতের পদ্ধতি—সবখানে এই পার্থক্য শক্ত শেকড় মেলে আছে। তবুও সেখানে অনেক বিষয়ে পরস্পরের মাঝে মিলও আছে। আর পার্থিব ব্যাপারে মিলের কথা তো বলাই বাহুল্য।
আমরা দেখি আল্লাহর বাণী:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ، فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ ﴿٦٤﴾
"বলো, 'হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে এসো, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান। আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া কাউকে রব হিসাবে গ্রহণ না করি।'
তারপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে বলো, 'তোমরা সাক্ষী থাকো যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।” (সূরাহ আলে ইমরান ৩:৬৪)
পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে বা আসবে, সবার চেয়ে রাসূলগণের ঈমান ছিল বেশি। তারপরও তাঁরা তাঁদের জাতির স্পষ্ট কাফির লোকগুলোর মাঝে বসবাস করেছেন। নূহ আলাইহিসসালাম তাঁর জাতির মাঝে ৯৫০ বছর বাস করেছেন। কুরআন বলে:
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا ﴿٥﴾ فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا ﴿٦﴾ وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا ﴿٨﴾ ثُمَّ إِنِّي أَعْلَمْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا ﴿9﴾ فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ﴿١٠﴾
"সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার কওমকে রাত-দিন আহ্বান করেছি। অতঃপর আমার আহ্বান কেবল তাদের পলায়নই বাড়িয়ে দিয়েছে। আর যখনই আমি তাদেরকে আহবান করেছি যেন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তারা নিজেদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজেদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, (অবাধ্যতায়) অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। তারপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে আহ্বান করেছি। অতঃপর তাদেরকে আমি প্রকাশ্যে এবং অতি গোপনেও আহ্বান করেছি। আর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল।” (সূরাহ নূহ ৭১:৫-১০)
নূহ আলাইহিসসালাম তাঁর জাতিকে ঈমানের দিকে দাওয়াহ দিয়েছেন, যৌক্তিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিতর্ক করেছেন ও তাদের সুস্থ বিবেকের কাছে আবেদন করেছেন। এ সবই সহাবস্থানের অংশ।
সহাবস্থানের অর্থ নিজের মতের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা নয়, ধর্মত্যাগ তো নয়ই। আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস আপনার পরিচয়ের অংশ। কেউ আপনাকে আপনার বিশ্বাস পরিবর্তনে জোর করার অধিকার রাখে না। যা থাকা উচিত নয়, তা হলো মানবতার উপর চেপে বসা দম বন্ধ করা গোঁড়ামি ও অমূলক উত্তেজনা। আমাদের দরকার উন্মুক্ত যোগাযোগসুবিধা, যেখানে আমরা উত্তম পদ্ধতিতে মানুষকে আহ্বান করতে পারব।
সহাবস্থান মানে নিজের মতের পক্ষে গোঁড়ামি ত্যাগ করা এবং অপরকে নিজের মত গ্রহণে বাধ্য না করা। নিজের বিশ্বাস পরিত্যাগ করা বা সবার কথাকে সমানভাবে সঠিক মনে করাও সহাবস্থানের অর্থ নয়।
📄 সহাবস্থানই শক্তি
বড় দুঃখ নিয়ে আজ বলতে হয় যে, মুসলিমদের কিছু গোষ্ঠীর চিন্তাজগতে সহাবস্থান নামক ধারণাটির কোনো জায়গাই নেই। মুসলিমদের সাথে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানের আলোচনা তো অনেক পরের ব্যাপার। মুসলিমরাই আজ মুসলিমদের সাথে সহাবস্থানে রাজি নয়। ভিন্ন মাজহাবের অনুসারী, ভিন্ন দলের কর্মী, ভিন্ন দেশের নাগরিক....এমনকি আরবের ভেতর ভিন্ন গোত্রের সদস্য হওয়ার ছুতোয় তারা একে অপরকে দেখতে পারে না। এই বিভক্তি কখনো কখনো সংঘাতে রূপ নেয়। দেখে মনে প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হলো?
অনেক মানুষ সহাবস্থানকে মনে করেন দুর্বল অবস্থায় জীবন বাঁচানোর একটি কৌশল। এটা একদমই ভুল ধারণা। বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায় সহাবস্থানের শেকড় দৃঢ় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে শক্তিশালী অবস্থায়। যে সমাজগুলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলে, সেগুলোই আবার সফলভাবে যুদ্ধ ঘোষণার সামর্থ্য রাখে। উল্টোদিকে যারা দুর্বল, তারা না শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে আর না যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। দুর্বলতা আর অস্থিতিশীলতার সময়েই সহাবস্থানের ধারণাটি সংকটে পড়ে যায়।
ঝগড়া বা অশান্তি না লাগিয়ে মতপার্থক্যকে স্থান দেওয়া ও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করা চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য শক্তি প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট মত চাপিয়ে দেওয়াকে শক্তি বলে না। রাসূল (ﷺ) বলেন, “কুস্তিতে যে অপরকে ধরাশায়ী করে, সে শক্তিশালী নয়। রাগের মাথায় নিজেকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই আসল শক্তিশালী।” (সহিহ আল-বুখারি এবং সহিহ মুসলিম)
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আল-আকসা (জেরুজালেম) শহরের চাবি গ্রহণ করতে সেখানে প্রবেশ করেন। তাঁকে গির্জার ভেতর সালাত আদায়ের আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সে সময় শক্তিশালী অবস্থায় ছিলেন এবং বিজিত শহরে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারতেন। গির্জার ভেতরে সালাত আদায় করা ভুল কিছু নয়, তবু তিনি রাজি হননি। দূরদর্শিতা আর সংবেদনশীলতার প্রমাণ রেখে তিনি বলেন, “আমি আশংকা করি যে, আমি ভেতরে সালাত আদায় করলে ভবিষ্যতেও মুসলিমরা একই জায়গায় সালাত আদায় করতে চাইবে। তখন গির্জার লোকেরা অস্বস্তিতে পড়ে যাবে।” উমর গির্জার বাইরে সালাত আদায় করেন এবং খ্রিষ্টানদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেন।
মুসলিমদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট একবার ২৭০০ মুসলিম যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করে তাদের দেহ অ্যাকর শহরের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেন। অথচ সালাহউদ্দীন আল-আইউবি আল-আকসা পুনরুদ্ধার করার পর সেখানকার ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান সহ সকলের জান-মালের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি চাইলেই কিন্তু প্রতিশোধ নিতে পারতেন। তা না করে তিনি ১১৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বর রিচার্ডের সাথে রামলা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী শহরের নিয়ন্ত্রণ থাকবে মুসলিমদের হাতে, কিন্তু খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের জন্যে শহরের ফটক খোলা থাকবে। মধ্যযুগের ইতিহাসে সহাবস্থানের এ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মুসলিমরা ইতিহাসে অনেকবার শক্তিশালী ও বিজয়ী অবস্থায় থেকেছে। একইসাথে মুসলিম ইতিহাস সহাবস্থানের বাস্তব নমুনা। এ হলো শান্তিচুক্তি, সমঝোতা ও সন্ধির ইতিহাস।
আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চুক্তি রক্ষা করো।” (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫:১)
আল্লাহ আরো বলেন,
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولٌ
“চুক্তি রক্ষা করো। জেনে রেখো, চুক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরাহ আল-ইসরা ১৭:৩৪)
রাসূল (ﷺ) বলেন, “মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কাফিরকে যে হত্যা করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের ভ্রমণের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।”
একবার রাসূল (ﷺ) একটি লাশবাহী দল দেখলেন। তিনি এর জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে জানানো হলো যে, এটি এক ইয়াহুদির লাশ। তিনি বললেন, “সে কি মানুষ নয়?” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
সাইপ্রাসের বাদশাহর উদ্দেশ্যে ইবনু তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ এর লেখা চিঠিটি দেখা যাক:
“সাইপ্রিয়টের রাজার ধার্মিকতা, দয়া ও জ্ঞানপিপাসার ব্যাপারে আমি জানতে পেরেছি। দেখেছি শাইখ আবুল আব্বাস আল-মাকদিসি কীভাবে রাজার নম্রতা, দয়াশীলতা, আতিথেয়তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। সেইসাথে তিনি পুরোহিত ও তাঁদের সমপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের প্রতিও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমরা এমন এক জাতি, যারা সকলের কল্যাণকামী। আমরা আশা করি আল্লাহ যেন আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ দান করেন।"
ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ তাঁকে শুধু মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তাতারি, ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান বন্দীদের ক্ষেত্রেও একই আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন,
“ইয়াহুদি-খ্রিষ্টান সহ আমাদের আইনি নিরাপত্তার অধীনে থাকা সকলকে আপনি মুক্তি দেবেন বলে আমরা আশা করছি। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে আমাদের কোনো নাগরিককেই আমরা ফেলে যাব না। সেইসাথে জেনে রাখুন, আমাদের অধীনে থাকা খ্রিষ্টান যুদ্ধবন্দীরা আমাদের সদাচরণ ও দয়ার ব্যাপারে জানে। এই আচরণের ব্যাপারে সর্বশেষ রাসূল (ﷺ) আমাদের আদেশ দিয়ে গেছেন।”
দুর্ভাগ্যবশত পরাজিত মানসিকতার মানুষেরা সহাবস্থানের ভাষাকে দুর্বলতার স্বীকৃতি বলে মনে করে। অনেকে আবার সহাবস্থানের এত শুদ্ধবাদী সংস্করণে বিশ্বাস করে, যার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়। সহাবস্থানের সঠিক মূল্যায়ন এই সংশয় নিরসনে সহায়ক হবে।
সহাবস্থানের সাফল্য নির্ভর করে বিবেকসম্পন্ন কণ্ঠগুলোর ফলপ্রসূ সংলাপে অংশগ্রহণে আগ্রহের মাধ্যমে। এভাবেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল সহজে লাভ করা সম্ভব। অন্যদিকে স্বার্থান্বেষী নির্বোধ কণ্ঠগুলো মঞ্চ দখল করে নিলে সহাবস্থানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। শক্তি ও জোরাজুরিই হলো এই লোকগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি আর সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি। সংঘাতকেই এরা মনে করে অপরের সাথে আচরণের মূল চাবিকাঠি।
পারস্পরিক মানবতা, সার্বজনীন মূল্যবোধ, আর সাধারণ প্রয়োজন ও চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কোনোকিছুকে দেখতে পারে না।
যুদ্ধকামীরা যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু ভাবতে জানে না। তাদের সকল বয়ান ঘুরেফিরে ওই একই উপসংহারে গিয়ে পৌঁছে।
কিছু লোকের ধারণা ধর্মের উদ্দেশ্যই মানুষে মানুষে সংঘাত বাঁধানো। বাস্তবতা এর বিপরীত। দ্বীনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের পারস্পরিক আচরণকে একটি নৈতিক আকৃতি প্রদান এবং সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা, যাতে জীবনের মানোন্নয়নে সফল সহযোগিতা সম্ভব হয়।
আল্লাহ মানবতার ব্যাপারে বলেন,
هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ
“তিনিই ভূমি হতে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদের বসতি দান করেছেন।” (সূরাহ হুদ ১১:৬১)
আদম আলাইহিসসালামকে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাঁকে জমিনে বিচরণ ও আবাদ করার দায়িত্ব দেন। ফেরেশতাগণ প্রথমে মানবসৃষ্টির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন,
قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ
"আপনি কি সেখানে এমন কাউকে স্থাপন করবেন, যারা সংঘাত ও রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসা ও গুণকীর্তনে নিয়োজিত আছি।” (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:৩০)
ফেরেশতাগণ ভালো করেই জানতেন যে, আল্লাহ সংঘাত ও রক্তপাত ঘৃণা করেন। তাহলে আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের নিজেদের মাঝে যুদ্ধ বাঁধানোর উদ্দেশ্যে মানবজাতির সৃষ্টি ও কিতাব প্রদান করেননি।
ইসলামের বাণী প্রচারের যে দায়িত্ব মুসলিমদের উপর রয়েছে, তার জন্য প্রয়োজন অন্তর ও হৃদয়কে জয় করা। তাদের ইসলামকে ইসলামের মতো করেই জানতে হবে। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত ধৈর্য ও সহনশীলতার অনুশীলন করা। কুরআনের একাধিক স্থানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গালমন্দের জবাবে আমাদের উত্তম কথা বলতে।
📄 সত্যিকারের অংশগ্রহণ
বিশ্বায়নের হুমকি ও প্রতিশ্রুতি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এটি এত মহাপরিবর্তনের ইঙ্গিত নিয়ে আসছে যে, আজকের মুসলিম বিশ্বের তোলপাড় ও আন্দোলনগুলোকে দোষ দেওয়া যায় না। 'সার্বজনীনতা' ও 'আন্তর্জাতিকতা'র সাথে বিশ্বায়নকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। এটি বরং অর্থনীতি, যোগাযোগ, মানবিয় মূল্যবোধ সহ সবকিছুর আকৃতি-প্রকৃতিতে এক নতুন ধরণের পরিবর্তন।
বিশ্বায়নের ক্লাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানেরা। এ থেকে মনে হচ্ছে যে, এটি আসলে ছদ্মবেশী 'আমেরিকায়ন', বিশ্বশোষণ আর সাংস্কৃতিক একীভবনের হীন কৌশল।
মুসলিমরা এই ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করছে বটে। কিন্তু তারা বড় দুর্বল, বিভক্ত, ও অমনোযোগী। এ যেন অলিম্পিক প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে এক খোঁড়া ব্যক্তির ম্যারাথন প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বপ্ন।
অনেকেই বিশ্বায়নের দিকে সতর্ক চোখ রাখছে। এর কারণও আছে। এটা নিয়ে শুধু দুশ্চিন্তা করাই যথেষ্ট নয়। বিশ্বায়নের মাধ্যমে আনীত পরিবর্তনগুলো বিপজ্জনক হতে পারে, এটা জানা থাকা ভালো। কিন্তু একইসাথে একে দেখতে হবে এমন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে, যেখান থেকে অনেক সুবিধা বের করে নেবার সুযোগও আছে।
কোনো নির্দিষ্ট কৃত্রিম স্যাটেলাইট বা প্রশাসনব্যবস্থা বা আইনের মধ্যে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বরং ভাবতে হবে আমরা কি স্রোতের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিযোগিতা করতে আর নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রস্তুত, নাকি দূর থেকে বসে শুধু প্রতিবাদ আর অভিযোগ করাই যথেষ্ট?
এটা কি আমাদের ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচারের মোক্ষম সুযোগ নয়? সুদমুক্ত ব্যাংকিং ও বিনিয়োগব্যবস্থা চালু করে সুদের নিষ্পেষণ দূর করার কি এখনই সময় নয়?
মিডিয়া ব্যবহার করে ইসলামের অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দেবার এটাই কি যথার্থ সময় নয়? এভাবেই কি আমরা পারি না আমাদের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করে ইসলামি অনুশাসনের সাথে পরিচয় করাতে?
আমাদের স্থবির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে উন্নত করার এখনই কি সময় নয়? এই উন্নয়ন বিজাতীয়দের দেখানো শোষণমূলক রূপরেখা অনুযায়ী হবে না। বরং ইসলামের সত্যিকারের নিরাপদ ও কল্যাণকর মহান আদর্শ অনুযায়ী হবে।
ইসলামই সবচেয়ে স্পষ্ট ও খোলাখুলিভাবে আমাদের মানবাধিকার রক্ষা করে। এটি জনগণের আস্থা ও ঐক্য নিশ্চিত করে এবং মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সম্পর্কের শক্তি বৃদ্ধি করে আমাদের অবস্থা উন্নয়নের নির্দেশনা দেয়। ইসলামের দাবি হলো সমবায়ভাবে প্রকল্প আয়োজন করে আমাদের দেশ ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আমরা ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ সমাধান বের করা ছাড়াই আমরা এ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
আমাদের একমত হতে হবে যে, অংশগ্রহণ এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিমদের কল্যাণকামী সকলের জন্য আমাদের অংশগ্রহণ হবে একটি মৌলিক ভিত্তি। এর অর্থ এই না যে, ব্যক্তি ধরে ধরে সকলকে অংশগ্রহণ করতে হবে। তবে অন্তত এই মূলনীতির ব্যাপারে একমত হতে হবে।
বহু বছরের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পরই কেবল সৌদি আরবের লোকেরা স্থানীয় মিডিয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। অথচ স্যাটেলাইট টেলিভিশন চালু করার সিদ্ধান্ত তারা কত অল্প সময়ে নিয়ে নিল!
প্রতিটা ব্যাপারেই কি আমাদের উত্তপ্ত বিতর্ক করে তারপর সিদ্ধান্তে আসতে হবে?
আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। এই জিনিসগুলো হবে কি হবে না, এ ব্যাপারে আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা এতে অংশগ্রহণ করব কি না, এতটুকু সিদ্ধান্তই আমাদের হাতে আছে। ট্রেন কিন্তু ছেড়ে দিচ্ছে। উঠতে চাইলে এখনই উঠতে হবে।
প্রশ্ন আর আপত্তি তো অসংখ্যবার তোলা যায়। শেষমেশ অনেক দেরিতে গিয়ে দেখা যায় অংশগ্রহণই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
কিছু মানুষ অন্তত এই কাজের পরিসরে বাস্তবেই অংশ নিক। সকলের অংশ নেয়া জরুরি না। তবে অন্তত অংশগ্রহণের বাস্তবতার ব্যাপারে সকলে একমত হই।
অংশগ্রহণের অর্থ আত্মসমর্পণ বা আত্মপরিচয় হারানো নয়। এর অর্থ হলো চারপাশে ব্যবহৃত হতে থাকা হাতিয়ার ও মাধ্যমগুলো দিয়ে ইসলামি কার্যক্রমের সূচনা। কোনো জিনিসকে ভুল বা আপত্তিকর বলে ঘোষণা করাটাই ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের আসল শিক্ষা হলো ভুলকে যথাসাধ্য সংশোধন করা। নবিজি (ﷺ) এর মাক্কি ও মাদানি উভয় জীবনই এর সাক্ষ্য বহন করে।
ভবিষ্যতের সুরক্ষা ও বর্তমানের নিরাপত্তার জন্য মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাগুলোর যথাসম্ভব ব্যবহার শুরু করতে হবে।
গণমাধ্যম, সংলাপ, শিক্ষা, রাজনীতি, নির্বাচন, সংগঠন... এই সব জায়গায় মানুষ জড়িত হতে পারে। সামনে কেবল দুটো বিকল্প। একটি হলো নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে জায়গায় বসে থাকা এবং কোনো প্রভাব ফেলতে না পারা। আরেকটি হলো সরাসরি যুক্ত হয়ে নিয়ন্ত্রকের আসনে ভাগ বসানো। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ ও পারদর্শী মুসলিমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশ নেবে। স্বার্থসিদ্ধি বা খ্যাতির লোভে নয়, ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি সত্যিকার দরদের কারণে নিষ্ঠার সাথে এ কাজগুলো করতে হবে। উপরন্তু এই অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে প্রশস্ত; দলান্ধ নয়।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এই ধরনের সত্যিকারের অংশগ্রহণ অত্যাসন্ন। অন্যের মতকে দমন করে এটি আসতে পারবে না। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সহযোগিতার অনুকূল একটি পরিবেশ সৃষ্টি করলেই তা সম্ভব। অন্যের মতকে কখনই চিরতরে দমিয়ে রাখা যায় না।
নিষ্ঠা এবং সততা থাকলে আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী। আমরা তাঁর কাছেই আমাদের সকল আশা প্রত্যর্পণ করি।